somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রূপম রিজওয়ান
আরো সতেরোটা বছর পর মধ্যবয়সী রূপমের মনে ওর জীবনের অপূর্ণতাগুলো নিয়ে অনেক আক্ষেপ জন্মাবে; কিন্তু টাইম ট্রাভেল করে ও আর সতেরো বছর বয়সে ফিরে আসতে পারবে না। তাই ভবিষ্যত রূপমের অপূর্ণতাগুলোকে যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে যা করার,তা এখনি করতে হবে,এক্ষুনি....

নালন্দাকেন্দ্রিক বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পতন: বঙ্গবিজেতা তুর্কি সেনাপতি বিন বখতিয়ার খলজি-ই কি ইতিহাসের একমাত্র খলনায়ক?-(পর্ব: ১)

১৪ ই জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গারমসিরের উষর ভূমির মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে হেলমান্দ নদী। নদীর তীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামগুলোতে সেসময় ছিল বহু দরিদ্র খলজি পরিবারের বাস। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভাগ্যান্বেষণে হিন্দুস্থানে পাড়ি জমাতো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এমনি বহু খলজি তরুণ। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজি ছিলেন তেমনি এক ভাগ্যান্বেষী যুবক। প্রথম জীবনে মুহাম্মাদ ঘুরি অবজ্ঞা করে তাঁকে নিজ সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈন্য হিসেবে গ্রহণ করতেও অস্বীকৃতি জানান। ভাগ্যের পরিক্রমায় সেই বখতিয়ারই পরবর্তীতে বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তুর্কি শাসনের গোড়াপত্তন করেন। ইতিহাসের এক অংশের ধ্বংস যেমন তাঁর হাতে, তেমনি অপর অংশের সৃষ্টিও তাঁরই হাতে। সহজিয়াপন্থি সুফি-সাধকদের জন্য বাংলা ও বিহারের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়ে এক শ্রেণির কাছে পরিচিত হয়েছেন 'গাজি মালিক' নামে। আবার বহু মন্দির-বিহার ধূলিসাৎ করার অভিযোগে বখতিয়ার অপর এক শ্রেণির কাছে কেবলই এক যুদ্ধবাজ লুটেরার নাম।


বখতিয়ারের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বোধহয় ভারতবর্ষের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিহার ধ্বংস এবং এর ৯০ লক্ষ বই পুড়িয়ে ফেলা। ওদন্তপুরী বিহার ধ্বংসে বখতিয়ারের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই;কিন্তু বিহার অভিযানে নালন্দাতেও বখতিয়ারের পা পড়েছিল-এটা কি সত্যিই শতভাগ সুনিশ্চিত? এ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও সাম্প্রতিককালে ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ,ভারতীয় গণমাধ্যম একতরফাভাবে বখতিয়ারের বিরুদ্ধে নালন্দা ধ্বংস ও গৌতমবুদ্ধের মৃত্যুস্থান মগধে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পতনের দায় চাপিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি প্রাসঙ্গিক,কেননা সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার,শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশে বৌদ্ধদের মাঝে মুসলিম বিদ্বেষ বৃদ্ধিকল্পে উইথারুর মত উগ্রবাদী ভিক্ষুরা যে কয়েকটি রেফারেন্স দেয়,বখতিয়ারের হাতে নালন্দার পতনও তার মধ্যে অন্যতম। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যমে পাঁচ শতকে নালন্দা প্রতিষ্ঠা ও ১১৯৩ সালে বখতিয়ারের বিহার অভিযানের মধ্যকার সুদীর্ঘ সাতশো বছরে ভারত এবং নালন্দায় ঘটে যাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বেমালুম গোপন করা হয়। গোপন করা হয় ভাদ্র কল্পদ্রুমের চাঞ্চল্যকর তথ্যকে,যাকে আমলে নিলে বাংলা-বিহারের ইতিহাসকে ভিন্নভাবে লিখতে হতে পারে! দুর্ভাগ্যজনকভাবে উইকিপিডিয়ার মত বিশ্বকোষেও 'আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ'এর গ্রন্থাবলিকে অনুসরণ করে নালন্দা প্রসঙ্গে সেই সাতশো বছরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসকে এড়িয়ে গিয়ে শুধু বখতিয়ারকেই সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তিন পর্বের পোস্টের প্রথম দুই কিস্তিতে বখতিয়ারের আগমনের পূর্বেকার সেই ঘটনাসমূহকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।
সঙ্গত কারণে সম্রাট অশোকের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের অতি পরিচিত কাহিনীটি দিয়ে শুরু করা যাক।

এক যে ছিলেন সম্রাট অশোক; ব্রাহ্মণপুত্র কেন গ্রহণ করলেন বৌদ্ধধর্ম?


বিন্দুসারের পুত্র মৌর্য সম্রাট অশোক(খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯-২৩২) ছিলেন পূর্ব ভারতসহ উপমহাদেশের বিশাল অংশের অধিপতি। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন নিতান্তই এক নিষ্ঠুর ও যুদ্ধবাজ শাসক। কিন্তু কলিঙ্গযুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর মনোজগতে নিয়ে আসে আমূল পরিবর্তন। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে ১ লক্ষ মানুষের প্রাণহানী ঘটে। যুদ্ধের এ ভয়াবহতা অবলোকন করে তিনি দিগ্বজয়ী হবার বাসনা থেকে সরে এসে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। ধর্মত্যাগ করে দীক্ষিত হন বৌদ্ধধর্মে। সম্রাট নিজেকে ঘোষণা করেন 'দেবনামপিয় পিয়দসি'। রাজ্যজয়ের নেশা ভুলে আত্মনিয়োগ করেন পুরো ভারতবর্ষে 'ধম্ম' প্রতিষ্ঠায়।


১৮৩৭ সালে জেমস প্রিন্সেপ অশোকলিপির পাঠোদ্ধার করলে তার তেরো নম্বর প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায়-
‘‘যখন তিনি (অশোক) ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র, রাজা পিয়দসি আট বছর অতিবাহিত করলেন, তখন কলিঙ্গ জয় হল। এতে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার লোক গৃহহীন হয়, এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং তারও কয়েক গুণ বেশী মানুষ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর যখন কলিঙ্গ তাঁর রাজ্যভুক্ত হয়, তখন ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র ঐকান্তিকতার সঙ্গে ‘ধম্ম’ পালন করেন, তাঁর একমাত্র কাম্য হয়, ধম্ম প্রচার।.......তারা সত্যিকার এবং স্থায়ী জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শুধুমাত্র ধম্ম-এর মাধ্যমে জয় করার বিষয়টিই বিবেচনা করবে এবং ধম্ম-এর আনন্দই হবে তাদের পরিপূর্ণ আনন্দ। কারণ এ আনন্দই পার্থিব জগৎ এবং পর জগতের জন্য মূল্যবান।’’ [সূত্র: Ashoka and the Decline of the Mauryas, Oxford University Press 1997, পেপারবুক,পৃষ্ঠা ২৫৫-২৫৭।]

গুপ্তযুগে (?) প্রতিষ্ঠিত হলো নালন্দা; নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে?



ভারতবর্ষের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদ্যাপীঠ নালন্দা খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকের শেষ দিকে বা পঞ্চম শতকের শুরুতে প্রাচীন মগধ রাজ্যে (বর্তমান বিহার) প্রতিষ্ঠা লাভ করে বলে ধারণা করা হয়। নালন্দাকে কেন্দ্র করে প্রাচীন মগধ রাজ্যে আরো অনেক বিহার এবং বৌদ্ধধর্মচর্চা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সপ্তম শতকে চীনা ভিক্ষু ও পরিব্রাজক হিউয়েন সাং নালন্দা পরিদর্শনের বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় সেসময় পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বৌদ্ধ ভাবধারা প্রসার ও শিক্ষার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ছিল এটি। প্রাচীন নথিপত্র থেকে জানা যায় নালন্দার বৃহৎ গ্রন্থাগার ভবনে আনুমানিক ৯০ লক্ষ বই ছিল,যাকে প্রাচীন ভারতে গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বৃহত্তম লিপিবদ্ধ আধার বিবেচনা করা হয়। বিহারের পাটনা থেকে ৮৫ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে এবং আধুনিক রাজগিরের ১১ কিমি উত্তরে অবস্থিত বড়গাঁও গ্রামের কাছে নালন্দার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাংলার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থিত হলেও নালন্দা মহাবিহারের সঙ্গে বাংলার যোগসূত্র ছিল ।



নালন্দা হতে প্রাপ্ত প্রাচীনতম নথিপত্রগুলো গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সময়কার। তাই 'সাম্প্রতিককালের' ভারতীয় ইতিহাসবিদগণ ধারণা করছেন 'হিন্দু সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ' গুপ্তসাম্রাজ্যের সময়েই নালন্দা প্রতিষ্ঠিত হয়(উইকিপিডিয়াতেও তাই লেখা)। কিন্তু সে আমলের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রেফারেন্স দিয়ে অনেক ঐতিহাসিক নালন্দা মৌর্যযুগে প্রতিষ্ঠিত; বরং গুপ্তযুগে পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়ে জৌলুস হারায় বলে মত দেন। যাহোক, নালন্দায় কিন্তু সনাতন ধর্মচর্চা এবং ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু নালন্দা তো প্রাচীনযুগে বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধধর্মের প্রসার ও বিকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী কেন্দ্র,'বৌদ্ধবিহার' হিসেবেই পরিচিত। তবে? এ নিয়ে খানিক পরেই সবিস্তারে আলোচনা করা হবে।


ভিনসেন্ট আর্থার স্মিথের ভাষায়,নালন্দার ইতিহাস হলো মহাযান বৌদ্ধদের ইতিহাস। আপাতত আগে জানা প্রয়োজন বৌদ্ধধর্মের দুটো প্রাচীন শাখা হীনযান(থেরবাদ) ও মহাযান সম্পর্কে। হীনযান মোতাবেক গৌতম বুদ্ধ ঈশ্বর ছিলেন না,তিনি ছিলেন রক্তমাংসের মানুষ যিনি মানুষকে 'নির্বাণ' লাভের পথ শিক্ষা দিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে মহাযানপন্থিরা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী। তারা গৌতম বুদ্ধকে ঈশ্বর মানেন। চীনা ভিক্ষু ইৎসিং এর ব্যাখ্যায়,
"উভয়েই চতুরার্য সত্য পালন করে। যাঁরা বোধিসত্ত্বগণের পূজা করেন এবং মহাযান সূত্রাবলি পাঠ করেন, তাঁদের বলা হয় ‘মহাযানী’।"
হীনযান ও মহাযান ধারার বৌদ্ধভিক্ষুদের মধ্যে সেসময় বেশ কয়েকটি সংঘাতের কথা ইতিহাসে জানা যায়। এখানে একটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়-গুপ্তযুগে মহাযানীদের একটি বড় অংশ গৌতমবুদ্ধের পাশাপাশি হিন্দুধর্মের কিছু দেবতার পূজাও করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। খোদ নালন্দার ভিতরেও এরূপ বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে। কিন্তু কেন??? এ কি নিতান্তই ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি? একটু পরই বলা হচ্ছে।
তার আগে শ্বেতহূন মিহিরকুলের আক্রমণ এবং নালন্দার প্রথম দফায় ক্ষতিগ্রস্ত হবার কাহিনীটা জেনে নেওয়া যাক।

গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিন্ন-ভিন্ন বর্বর শ্বেত হূনজাতির আক্রমণে; মিহিরকুল বাহিনীর হাতে ধ্বংস হলো অজস্র বৌদ্ধবিহার



হূনজাতি ছিল মধ্য এশিয়ার এক বর্বর শ্বেতাঙ্গ জাতি। যুদ্ধবাজ ও নিষ্ঠুরজাতি হিসেবে ইতিহাসে তাদের কুখ্যাতি রয়েছে। বিশেষত এশিয়ার বৌদ্ধদের কাছে তারা শয়তানসম জাতি। তাদের একটি গ্রুপ রোমান সাম্রাজ্যের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় একটি গ্রুপ পূর্বদিকে ভারত পর্যন্ত চলে এসেছিল। তখন ভারতে গুপ্ত সম্রাটদের রমরমা অবস্থা। বর্বর হূনজাতি খাইবার পেরিয়ে ভারতের ভেতরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকে(৫১৫ খ্রিস্টাব্দ) হূন-সর্দার তোরামান একটি যুদ্ধে পরাস্ত ও নিহত হলে বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন তোরামানপুত্র মিহিরকুল


প্রতিশোধপরায়ণ মিহিরকুল নিষ্ঠুরতায় পিতা তোরামানকেও ছাড়িয়ে যান। বিশাল হস্তিবাহিনী ও দক্ষ সেনাবাহিনী নিয়ে উত্তর-পশ্চিমে একেরপর এক রাজ্য দখল করে মধ্য ভারতের দিকে এগিয়ে আসেন। কৌতুহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো,হূনরা কিন্তু প্রথম দিকে মোটেও বৌদ্ধ-বিদ্বেষী ছিল না;বরং অতীতে হূনদের মধ্যে অনেক বৌদ্ধ ধর্মবলম্বীও ছিল। কিন্তু মিহিরকুল ছিলেন কট্টর বৌদ্ধ-বিদ্বেষী। সনাতম(শৈব) ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ পাওয়া গেলেও সত্যিই তিনি ধর্মান্তরিত শিবপূজারি ছিলেন কি না তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে। তার প্রতিটি যুদ্ধে অজস্র বৌদ্ধবিহার ও স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়। আনুমানিক ১৫০০ বৌদ্ধ মন্দির-বিহার মিহিরকুল ধ্বংস করেন। মধ্য ভারতে তিনি প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন। মগধ রাজ্যে (যেখানে নালন্দা ছিল) তিনি শেষমেশ গুপ্ত রাজা বালাদিত্যের কাছে পরাস্ত হলেও তার পূর্বে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান। মিহিরকুলের আক্রমণে মগধের বহু বৌদ্ধস্থাপনার ক্ষতিগ্রস্ত হবার কথা সে সময়কার ভিক্ষুদের লেখা গ্রন্থ-নথিতে উঠে এসেছে।



উল্লেখ্য, বখতিয়ারের মগধ অভিযানের ঐতিহাসিক বিবরণে যেমন সরাসরি কোথাও 'নালন্দা' উল্লেখ নেই, মিহিরকুলের মগধ অভিযানেও তাই। কিন্তু সাম্প্রতিককালে 'কমন সেন্স' খাটিয়ে বখতিয়ারের নালন্দা আক্রমণের 'সম্ভাবনা'কে 'নিশ্চিত' কল্পনা করে ভারতীয় কিছু রাজনৈতিক দলের প্রচার মাধ্যমে তাকে খলনায়ক বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে মিহিরকুলের আক্রমণে প্রথম দফায় নালন্দার ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনাকে বেমালুম চেপে যাওয়া হচ্ছে! অথচ মিহিরকুলের হূন বাহিনী বখতিয়ারের বাহিনীর চেয়ে কলেবরে বহুগুণ বিশাল ও বর্বরতায় অনেক এগিয়ে ছিল। অন্তত এটি তো সুস্পষ্ট যে ইসলাম ধর্মের জন্মের কিছু বছর আগেও হূনজাতির মাধ্যমে নালন্দাকেন্দ্রিক বৌদ্ধ সংস্কৃতির উপর ভয়াবহ আঘাত এসেছিল। কাজেই পবিত্র ভূমিতে বৌদ্ধধর্মের ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পতিত হবার দায়ের পুরোটাই কি তুর্কি(মুসলিম?) আগ্রাসনের?
তবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে,মাত্র পঞ্চাশ বছরে ভিনদেশি হূনজাতি বৌদ্ধধর্মকে নিজ জন্মভূমি থেকে বিলীন করে দিবে। তুর্কিরা ভারতের মাটিতে পা ফেলবার আগেই হীন রাজনৈতিক কূটকৌশলের দ্বারা বৌদ্ধধর্মকে তিলে তিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবার দায় কিন্তু স্থানীয় একটি গোষ্ঠীর উপরও বর্তায়। কারা তারা?

ভারতে হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান এবং বৌদ্ধধর্মের পতনে ব্রাহ্মণসমাজের ভূমিকা:



আর্যদের বয়ে আনা বর্ণপ্রথা বা জাতপ্রথায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই সর্বনিম্ন স্তর 'শূদ্র' ক্যাটাগরিতে পড়েছিল। জাতপ্রথা নিম্নবর্ণের মানুষদের সম্মান এবং অধিকারকে খুবই সীমিত পর্যায়ে রেখেছিল। উপরন্তু উচ্চবর্ণের কর্তৃত্ববাদী আচরণে ভারতবর্ষজুড়ে শূদ্র সম্প্রদায়ের মাঝে একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করত। সম্রাট অশোকের বৌদ্ধধর্ম প্রচারে তাই ব্যাপক সাড়া না পাবার কোন কারণই ছিল না। বৌদ্ধ আদর্শ প্রসারের জন্য এহেন বৈষম্যপূর্ণ তৎকালীন ভারতীয় সমাজব্যবস্থার চেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র আর কি-ই বা হতে পারত!



কিন্তু বৌদ্ধধর্মের এ সুদিন কিন্তু খুব বেশিদিন টেকেনি। গুপ্তযুগে মাধব,রামানুজ,শঙ্করাচার্যদের হাত ধরে হিন্দুধর্ম সমহিমায় ফিরে আসে। গুপ্ত সম্রাটদের আনুকূল্য পেতে সম্রাট অশোকের পথ অনুসরণ করে বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া স্থানীয় রাজারা একে একে সনাতন ধর্মে ফিরে আসতে থাকেন। কিন্তু নিম্নবর্গের যারা গৌতমবুদ্ধের আদর্শ গ্রহণ করেছিল,তাদেরকে পুনরায় জাতপাতের নিগড়ে ফিরিয়ে আনা মোটেও সহজ ছিল না। এজন্য আবশ্যক ছিল বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধধর্মগুরুদের উপর প্রভাব বিস্তার করা। কারণ কান টানলেই যে মাথা আসে!



বিষয়টিকে কিভাবে দেখবেন,সেটা আপনার দর্শনের উপর নির্ভর করছে। কারো কাছে এটা হয়তো 'ধর্মত্যাগী' 'বিপথগামী'দেরকে পূর্বপুরুষের ধর্মে ফিরিয়ে আনা। আবার কারো কাছে এ কেবলই বৌদ্ধধর্মের উপর বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজের আগ্রাসন। বৈদিক সনাতনধর্মকে বৌদ্ধ ভাবধারায় আকৃষ্ট নিম্নবর্ণের সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পুনরায় জনপ্রিয় করে তোলার জন্য নেওয়া হলো বেশ কিছু উদ্যোগ। প্রথমত, নিম্নবর্ণের সম্প্রদায়গুলোর জন্য জাতপ্রথাকে কিছুটা শিথিল করে দেওয়া হলো। অনেকক্ষেত্রে,বেদ পড়ার অনুমতি নেই এমন কিছু সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীকে মহাভারত পড়ার অনুমতি দেওয়া হলো। বৌদ্ধধর্মগ্রন্থের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ হিসেবে এসময়েই 'মহাভারত'কে হিন্দুসমাজে জনপ্রিয় করে তোলা হয়। এর প্রতিফল দেখা গেল আমজনতার মধ্যে। হিন্দু সমাজে সঞ্চারিত হলো নব উদ্দীপনা,আজকে আমরা হিন্দুধর্ম বা হিন্দুসংস্কৃতি বলতে যা বুঝি,তার ভিত্তি মূলত গুপ্তযুগের এ সময়টিতেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দ্বিতীয়ত, বৌদ্ধধর্মের বেশ কিছু নীতি ও আদর্শকে গ্রহণ করলো ব্রাহ্মণসমাজ। এতে যেমন নিম্নজাতের মানুষদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লো, তেমনি বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠীর মন জয় করে নিতে পারলো। আলাদাভাবে বলতে গেলে এ কৌশল গ্রহণ করে তারা বৌদ্ধধর্মগুরুদের সাথে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। এবার ফিরে আসা যাক সেই মহাযান-হীনযান প্রসঙ্গে। যেমনটা আগেও বলা হয়েছে,মহাযানীরা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী। বর্তমান বিশ্বে বৌদ্ধসম্প্রদায়ের যে বৃহত্তর অংশকে(যেমন :চীন,ভুটান,থাইল্যান্ড ইত্যাদি) গৌতম বুদ্ধের আদর্শ বিশ্বাসের পাশাপাশি স্থানীয় দেবতাদেরও আরাধনা করতে দেখা যায়,তাদের সিংহভাগই মহাযান মতবাদ উদ্ভূত। জন্মভূমি ভারতেও হিন্দুধর্মের সাথে কিছুটা বা অনেকটাই একীভূত হয়ে যায় বৌদ্ধদের এ অংশটিই। আর এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণসমাজের উল্লেখিত দ্বিতীয় নীতিটি যে বাজিমাত করেছিল,সেটা হলফ করে বলা যেতেই পারে। নালন্দায় হীনযান বা থেরবাদীদের শিক্ষার প্রমাণ পাওয়া গেলেও কার্যত সেখানে মহাযানপন্থি বৌদ্ধ ও হিন্দু ব্রাহ্মণদের সহাবস্থান ছিল। আপাত দৃষ্টিতে এটিকে ধর্মীয় সহনশীলতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বলা গেলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কিন্তু ছিল এবং বৌদ্ধধর্মের উপর এ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটির ফল ছিল ভয়াবহ।



সনাতন ধর্মের সাথে বৌদ্ধধর্মের এ 'সহাবস্থান' কিন্তু বৌদ্ধধর্মগুরুদের সবাই মেনে নিতে পারেনি। এদের একটা বড় অংশ গৌতম বুদ্ধকে ঈশ্বর মানারই পক্ষপাতী ছিল না,সেখানে সনাতন দেব-দেবীদের স্বীকৃতি দেওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। সব মিলিয়ে বৌদ্ধসমাজ অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এসময় বেশ কয়েকটি মহাযান-হীনযান সংঘাতের কথা ইতিহাসে জানা যায়। এ রেশারেশি নালন্দা পর্যন্তও পৌঁছেছিল। তৎকালীন কিছু বৌদ্ধভিক্ষুর বিবরণ থেকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জের ধরে বিহারে অগ্নিসংযোগের কথাও জানা যায়। বৌদ্ধসমাজের এ বহুধাবিভক্তি ও সংঘাতের কারণে ভারতে তাদের বহুকাল ধরে অর্জিত সুনাম বিনষ্ট হয়।

বৈদিক ব্রাহ্মণসমাজের প্রথম দুটি নীতি গ্রহণযোগ্য হলেও আরেকটি নীতি কোনভাবেই নীতিসঙ্গত ছিল না। এখানে একটা কথা আগেভাগেই বলে রাখা ভালো,এর দায় সনাতন সম্প্রদায়ের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশের(এমনকি ব্রাহ্মণসমাজের একটা বড় অংশ এর বিরোধী ছিল), সম্পূর্ণ হিন্দুসমাজের উপর মোটেও এর দায় বর্তায় না। তৃতীয় এ নীতিটি হলো কূটকৌশল ও জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধতাবাদী বৌদ্ধসমাজকে সনাতন ধর্মে ফিরতে বাধ্য করা। আবারও উল্লেখ করছি,যে সকল ব্রাহ্মণ এটা করেছিল,তাদেরকে পুরো হিন্দুসমাজের প্রতিনিধি ভাবাটা মারাত্মক ভুল হবে। এ কৌশল মোতাবেক স্বকীয়তাবাদী বৌদ্ধদেরকে সামাজিকভাবে কোনঠাসা করার চেষ্টা করা হয়। নানাভাবে তাদের মধ্যে জুলুম-অত্যাচার করা হয়। এমনকি অনেক বৌদ্ধবিহারকে দেবমন্দিরে রূপান্তরের প্রমাণও পাওয়া যায়।উপমহাদেশে বৌদ্ধধর্মের পতন নিয়ে দীর্ঘসময় গবেষণা করা গবেষক নরেশ কুমার লিখেছেন,
"বোধগয়ার মহাবোধি বিহারকে জোর করে শিব মন্দিরে পরিণত করা হয়েছে কিনা – তা নিয়ে বাদানুবাদ আজও চলছে। কুশিনগরের বুদ্ধের স্তুপ-প্যাগোডাকে রমহর ভবানী নামের এক অখ্যাত হিন্দু দেবতার মন্দিরে পরিবর্তিত করা হয়। জানা যায় যে আদি শঙ্কর অধিকৃত বৌদ্ধ আশ্রমের জায়গাতে হিন্দু শ্রীঙ্গেরী মঠ বানিয়েছিলেন। অযোধ্যার অনেক হিন্দু তীর্থস্থান, যেমন সবরীমালা, বদ্রীনাথ কিংবা পুরীর মত প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ্য মন্দির আদতে একসময় ছিল বৌদ্ধ মন্দির।”


বৌদ্ধদেরকে সামাজিকভাবে নিষ্পেষিত ও কোনঠাসা করার কয়েকটি প্রমাণ নিয়ে কথা বলা যাক। অনেক শাস্ত্র-বিধানে বৌদ্ধদেরকে 'অচ্ছুত'(Untouchable) ঘোষণা করা হয়। মনু ও অপরাকা তাদের বিধানগ্রন্থে 'বুদ্ধ-স্পর্শের' প্রতিবিধান হিসেবে স্নান করাকে আবশ্যক করেন। ব্রাদ্ধ হরিত ঘোষণা করেন যে বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করা পাপ, কেবল 'আচারিক স্নান'এর মাধ্যমেই এ পাপমোচন সম্ভব। প্রাচীন নাটিকা 'মৃচ্ছাকথিকা'তে (পর্ব ৭), নায়ক চারুদত্ত এক বৌদ্ধ সন্তকে হেঁটে আসতে দেখে, বন্ধু মৈত্রীয়কে ক্রোধক্তিতে বলেন – "আহ্‌! কী অশুভ দৃশ্য – এক বৌদ্ধ সন্ত দেখছি আমাদের দিকেই আসছে।" 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থের রচয়িতা চাণক্যের বিধান ছিল,""যদি কেউ শক্য (বৌদ্ধ), অজিবিকাশ, শুদ্র বা নিষ্ক্রান্ত ব্যক্তিদের ঈশ্বর বা পূর্ব-পুরুষদের পূণ্যার্থে উৎসর্গিত ভোজসভায় যোগদান করে – তবে তার উপর একশ পানা অর্থদণ্ড আরোপিত হবে।" অতএব,গুপ্তযুগে যে বৌদ্ধধর্ম হিন্দুধর্মের সাথে কিছুটা সন্ধি করলেও স্বকীয়তাবাদী বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণসমাজের একাংশের শোষণ-নিষ্পেষণের বিষয়টিকেও অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।



এরপর এলো স্বকীয়তাবাদী বৌদ্ধদের উপর জঘন্যতম আঘাতটি। দাবি করা হলো-"গৌতম বুদ্ধ হিন্দু বিধাতা বিষ্ণুর আরেকটি অবতার ছাড়া আর কিছুই নন"। অর্থাৎ,গৌতমবুদ্ধকে মৎস্য অবতার,বরাহ অবতার,নৃসিংহ অবতার,পরশুরাম,শ্রীকৃষ্ণের মত একজন সাধারণ বিষ্ণু অবতার ঘোষণা করা হলো! স্বকীয়তাবাদীদের আহবান জানানো হলো 'বিকৃত ধর্মচর্চা' পরিত্যাগ করে ভগবান বিষ্ণুর প্রকৃত আদর্শে ফিরে আসতে! এমনকি বিষ্ণু-অবতার হিসেবে সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে গৌতমবুদ্ধের আরাধনারও প্রচলনের চেষ্টা করা হয়। এ 'শুদ্ধি প্রক্রিয়া'য় অনেক বৌদ্ধ হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হন(কিংবা ফিরে আসেন)। বৌদ্ধধর্মগুরুদের মাঝে বিভক্তি ও সংঘাত আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। স্বকীয়তাবাদীদের অনেকে জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র (বিশেষত নেপাল) চলে যেতে বাধ্য হন। অন্তঃকলহের জন্য দুর্বল হয়ে পড়া বৌদ্ধসমাজে কোথাও কোথাও তন্ত্রবিদ্যা,যাদুবিদ্যা,অশ্লীল সাহিত্যচর্চা প্রসার লাভ করে। নানা কুসংস্কার ও অসামাজিক কার্যকলাপ বাসা বাধে সেযুগের 'আধুনিক' এ ধর্মটিতেও। নালন্দাকেন্দ্রিক বৌদ্ধ আধিপত্যে ভাটা পড়ে। হিউয়েন সাংএর বৃত্তান্তেও সাত শতকে ভারতের কিছু অংশে বৌদ্ধধর্মের ভালো অবস্থার কথা জানা গেলেও মগধসহ ভারতের অনেক জায়গায় বৌদ্ধধর্মকে 'মৃতপ্রায়' আখ্যা দেন। হিউয়েন সাং কিন্তু গৌতমবুদ্ধের মৃত্যুস্থান মগধে বৌদ্ধধর্মের দুরবস্থার জন্য দায়ী করেন বাংলার তৎকালীন শাসককে! এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের উপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি বোধহয় তার আমলেই এসেছিল। উপড়ে ফেলা হয়েছিল 'বোধিবৃক্ষকে'! হত্যা করা হয় রাজ্যবর্ধনকে। আঘাত আসে নালন্দায়ও। হিউয়েন সাং তাকে আখ্যা দেন বিষাক্ত গৌড় সাপ। কে সে??

(চলবে......)

তথ্যসূত্র:
১)Nalanda-Wikipedia
২)Even Hindu rulers destroyed Buddhist stupas and built temples on them!
৩)Who destroyed Nalanda University and why?
৪)Mihirkula-Wikipedia
৫)ভারতে বৌদ্ধধর্মের অবলুপ্তির কারণ
৬)নালন্দা ধ্বংসে বখতিয়ার খিলজি: ইতিহাসের এক নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে
৭)নালন্দা পতন বা ধ্বংসের ইতিহাস: মূল কারণ কি ছিল?
ছবিসূত্র: গুগল
........................................….....……………............................................................................................................

দৃষ্টি আকর্ষণ: তিন পর্বের পোস্টটির উদ্দেশ্য মোটেও বিহারি মুসলিমদের 'গাজি মালিক' বিন বখতিয়ার খলজির পক্ষে সাফাই গাওয়া নয়;কেননা বখতিয়ারের হাতও রক্তে রাঙা। মূলত সমসাময়িক প্রাসঙ্গিক দুটো বিষয়ের প্রেক্ষাপটেই পোস্টটি:
১) ভারতে বৌদ্ধধর্মের অগ্রযাত্রা থমকে যাওয়ার জন্য এককভাবে কোন সম্প্রদায় দায়ী নয়(অন্তত বুদ্ধের মৃত্যুস্থান মগধ ও নালন্দার ক্ষেত্রে)। মিহিরকুল,শশাঙ্ক,বখতিয়ার মোটেও নিজ নিজ ধর্মের প্রতিনিধি নয়। যদি তাদের অপকর্মের জন্য পুরো ধর্মসম্প্রদায়ের উপর দায় চাপাতেই হয়,তবে ব্রাহ্মণ,শৈব,মুসলিম কেউই রেহাই পাবে না। এমনকি স্বকীয়তা হারিয়ে ও অন্তঃকলহে জড়িয়ে পড়ে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার দায় খোদ বৌদ্ধসমাজও এড়াতে পারে না। তাহলে সব কিছু ছেড়ে কেবল মুসলিম আধিপত্যের দিকে আঙুল তুলে বৌদ্ধদের মাঝে মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টির যৌক্তিকতা কতটুকু?

২)প্রাচীন ও প্রাক-মধ্যযুগে ভারতের কিছু অংশে স্বার্থান্বেষী শাসক ও ব্রাহ্মণদের দাপটে বৌদ্ধধর্মগুরুদের সামনে তিনটি অপশনই ছিল,ক.সব সয়ে নিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাক। খ.জন্মভূমি ছেড়ে বৌদ্ধশাসিত অন্য রাজ্যে নির্বাসিত হয়ে 'ধম্মরক্ষা' কর(চর্যাপদের রচয়িতারা নেপাল গেল কেন??)। গ.পূর্বপুরুষের ধর্মে ফিরে এসো। আমাদের আশেপাশের কোন দেশে সম্প্রতি একই রকম কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে কি?? প্রাচীনযুগে বিশেষ একটি মহলের হাতে কলুষিত হওয়া ধর্মটিকে স্বামী বিবেকানন্দের মত মহাপুরূষেরা সংস্কার করেছেন,আধুনিক বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে কেন আজ স্বামী বিবেকানন্দদের আদর্শকে পায়ে ঠেলে শশাঙ্কদের নীতিকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে?
এটা ভুলে গেলে চলবে না,বৌদ্ধরাজা হর্ষবর্ধনের সাথে দ্বন্দ্বের জেরে রাজা শশাঙ্কও ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু শশাঙ্কের মৃত্যুর পর রাজ্যে এতটাই ভারসাম্যহীনতা,অন্তঃকলহ ও অরাজকতা দেখা দিয়েছিল যে গোপালের হাতে বাংলায় বৌদ্ধ পালযুগের গোড়াপত্তনের আগ পর্যন্ত একশত বছরের কালো অধ্যায়টি ইতিহাসে মাৎসন্যায়ের যুগ নামে পরিচিত হয়েছে। ভারতবর্ষকে কি আরেকটি মাৎসন্যায়ের যুগের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২০ দুপুর ২:৫৫
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চীনে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা কেমন আছে।

লিখেছেন খোলা মনের কথা, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১:৫৮


করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত চীন ও তার পার্শ্ববর্তীদেশগুলো। এই পর্যন্ত অর্ধশতাধীক লোক মারা গেছে এই ভাইরাসে। এখনো পর্যন্ত সনাক্ত করা যায়নি কোথা থেকে করোনা ভাইরাস ছাড়িয়েছে বা এর প্রতিকার কি!... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুখে থাকতে ভূতে কিলায়

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২০ দুপুর ২:১১


আমাদের শাহেদ জামাল ঠিক করেছে সে আরেকটা বিয়ে করবে।
যদিও তার সুখের সংসার। ঝামেলা বিহীণ সংসার। ইদানিং শাহেদের স্ত্রী নীলা বারবার বলেছে- একটা সংসারে অনেক কাজ থাকে। সারাটা দিন নীলা'র একাএকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাসঃ বিশ্বে মারা যাবে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২০ দুপুর ২:২৩


চীন থেকে গোটা বিশ্বে দ্রুত ছড়াচ্ছে নোভেল করোনা ভাইরাস। ইউহান প্রদেশের মাছের বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের বাহক যে মানবদেহ, সেটাও নিশ্চিত করেছে চীন। চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চীনাদের কারণে ভাইরাস জন্ম নেয়, আমেরিকা ভেকসিন বানায়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৫৮



আমেরিকান বাইওটেক, 'মডেরনা' আগামী ২ মাসের ভেতরে 'করোনা ভাইরাসের' ভেকসিন বের করবে; তার ১৫ দিনের মাঝে চীন উহা নকল করে, অন্য নাম দিয়ে ব্যবহার করবে; পারলে বার্মা, শ্রীলংকা, মরিসাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু ধর্ম এবং দার্শনিক ধর্মগুরু কথা

লিখেছেন শের শায়রী, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:৫৬



ইদানিং বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে, বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করছি নিজ ধর্ম সহ। আমার কাছে এই পৃথিবীর সব থেকে বড় রহস্যময় বিষয় মনে হয় ধর্ম। ধর্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×