
নর ও নারী সৃষ্টির অপরিহার্য অংশ। একে অন্যকে ছাড়া অপূর্ণ, এবং প্রকৃতি অপূর্ণ উহাদের ছাড়া।
পূর্বের পর্ব: প্রিয় ব্লগার ভাইয়েরা, আপনি কি নারী মনের রহস্য জালে দিশেহারা? নো চিন্তা, সামুপাগলা ইজ হেয়ার উইথ সাম হেল্প!
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মেয়েরা ছোট ছোট বিষয়কে বড় করে দেখে কেন? কেন? কেন? ক্ষুদ্র ভুলগুলোর জন্যে লম্বা সময় ঝগড়াঝাটি, কান্নাকাটি, যোগাযোগ বন্ধ করার মানে কি? এত পেইন কেন দেয় নারীজাতি?
ছেলেদের ব্যাখ্যাসমূহ:
১) মেয়েদের মনে জিলাপির প্যাঁচ, সহজকে সহজ ভাবে দেখার ক্ষমতা এদের নেই।
২) ছেলেদের নিয়ে খেলে, তাদেরকে ঘুরিয়ে এবং পেইন দিয়ে মেয়েরা মজা পায়!
বলাই বাহুল্য, এসব ব্যাখ্যা একপাক্ষিকভাবে মেয়েদেরকে দোষী করে এবং রাগের মাথায় ছেলেরা এভাবেই ভাবে। ক্রোধ বুদ্ধি বিনাশ করে বিধায় এসব ব্যাখ্যার কোন মূল্য নেই।
আসল ব্যাখ্যা: একবার ভাবুনতো, আপনি যেমন ভাবছেন সঙ্গীনি ছোট বিষয়কে বড় করে দেখছে, আপনার সঙ্গীনিরও ভাবার অবকাশ আছে যে আপনি বড় বিষয়কে ছোট করে দেখছেন!
উদাহরণ ১:

সব সম্পর্কের কমন সমস্যা, ছেলেটি বিশেষ কোন দিন ভুলে যাবে, এবং মেয়েটি সেটি নিয়ে অভিমানে গাল ফুলিয়ে সারাদিন কথাই বলবেনা। এভাবে বিশেষ দিনটি বিশেষ সুন্দর হবার বদলে বিরহ ডেকে আনে!
মেয়েরা তারিখকে অনেক গুরুত্ব দেয়। আপনি ভাবছেন, সামান্য ডেট মনে না রাখলে কি?
কিন্তু সে ভাবছে একটি তারিখ ভোলা মানে, দুজনের বিশেষ মুহূর্তকে ভোলা, বিশেষ মুহূর্তকে কেউ ভুলতে পারেনা, আপনি যখন ভুলে গিয়েছেন তার মানে সেই মুহূর্তটি এবং মানুষটি আপনার কাছে বিশেষ ছিল না! মেয়েটি নিজেকে আপনার জীবনে গুরুত্বহীনা ভাবতে থাকে, কষ্ট পায়, রাগ করে। মেয়েদের রাগ ভীষন একটা কষ্ট ও অভিমানের জায়গা থেকে আসে। যে মানুষ যত রাগ করে তার ভেতরটা তত বেশি নরম!
আপনি তার রাগের বিষয়টিকে ছোট করে দেখলে সে আরো রেগে যাবে। সরিটা যদি শুধু বলার জন্যে বলেন, মিন না করেন তাহলে সে আরো বেশি রেগে যাবে। উপায় কি? উপায় হচ্ছে তার রাগের অন্তর্নিহিত মানেটা বোঝার চেষ্টা করুন। হাজার বার সরি বলার চেয়ে একবার তাকে বুঝে কিছু বললেই সে খুশি হয়ে যাবে। ছোট বিষয়টিকে ঘিরে সে বড় বড় স্বপ্ন, আশা, চাওয়া নিয়ে বসেছিল। সে নিজেও তো আপনারই মতো নানা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তবুও সে ভোলে না বিশেষ দিনগুলো। আপনার দিক থেকে একই রেসপন্স না পেলে তার মনে হয়, আপনি তার কাছে যতোটা গুরুত্বপূর্ণ, সে আপনার কাছে ততটা নয়! তাই, মোবাইলে সব বিশেষ দিনগুলো এলার্ম হিসেবে সেভ করে রাখুন। এর ব্যতয় ঘটিলে যে ঝড় আসবে তা থেকে বাঁচা সম্ভব নাও হতে পারে! তবুও আমি উপায় বলে দিচ্ছি। তারিখ পার হয়েছে তো কি? ভালোবাসা তো পার হয়ে যায়নি! লেইটে হলেও তার জন্যে স্পেশাল কিছুর ব্যবস্থা করুন। তার প্রিয় খাবার, প্রিয় উপহার, প্রিয় স্থান ইত্যাদি হাবিজাবি তার সামনে হাজির করুন, বা তাকে নিয়ে হাজির হয়ে যান।
উদাহরণ ২:

আপনাকে আপনার বউ বলল, পাকা কলা আনতে, আপনি নিয়ে এলেন কাঁচা কলা। বাড়িতে এসে বাজারের থলে রাখলেন, সে দেখল আর শুরু হয়ে গেল মহাযুদ্ধ! আপনার ওপর দিয়ে সে কথার সাইক্লোন বইয়ে দিল। আপনি যে কোন কাজের না, আপনাকে বিয়ে করে তার জীবন বরবাদ হয়ে গিয়েছে সেটা আবারো মনে করিয়ে দিল! আপনি আর কতক্ষন শুনবেন? আপনিও কিছু কঠিন কথা শুনিয়ে দিলেন। সে শুরু করল কান্না, চলে গেল বাপের বাড়ি। আপনি রেগে মেগে কলার সবজি রাঁধতে বসলেন এবং হাত পুড়িয়ে ফেললেন।
শুধু একটি কলার জন্যে এত বড় কিছু হয়ে যাওয়ায় আপনি হতবাক ও ক্ষুদ্ধ হয়ে পোড়া হাতে বরফ ডলতে ডলতে মনে মনে নারীজাতির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে বসলেন।
এতসব ঝামেলা এড়াতে একটু গভীরে ভাবা শুরু করুন। কলার মধ্যে নিজের ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করবেন না। কলা কোন ব্যাপার না, আপনার বুদ্ধমতী বউও সেটা জানে। কাঁচা কলা এনেছেন, একসময়ে সেটা পেকে যাবে, সেজন্যে তো গিন্নি মেজাজ গরম করেননি। করেছেন অন্য কারণে। একটা মেয়ের সবচেয়ে বেশি অপছন্দের বিষয় হলো, তার কথা যখন মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়না এবং দুঃখজনকভাবে বেশিরভাগ পুরুষই নিজের সঙ্গিনীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেনা। ল্যাপটপ, ফোন, বই, টিভি ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে পুরোটা সময় "হু হা হুমম" করে যায়। আরেহ, বউ তো বুয়া না যে সারাক্ষন চুপচাপ বাড়ির কাজ করে যাবে। সে আপনার জীবনসঙ্গীনি, তার মনে হাজারো কথা জমে থাকে, সেগুলো সে কার কাছে গিয়ে বলবে? একটা বয়সের পরে অনেককিছুই বাবা মাকে বলা যায়না, তাদেরকে চিন্তিত করতে চান না সন্তানেরা। আর বন্ধু বান্ধবীরাও ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের চাপে ছুটে যায়। আপনিই তো তার পরম বন্ধু ও আত্মীয়। আপনার কাছেই তার যত আবদার, আল্লাদ ও কথার ঝুলি খুলে বসবে। সেসব কথা যদি আপনি ঠিকমতো না শোনেন, আব্দারগুলো না রাখেন তবে নয় নাম্বার বিপদ সংকেতেের ঘন্টা তো বাজতে বাধ্য!
আপনাকে বারবার পাকা কলা আনতে বলেছে নিশ্চই কোন কারণে। হয়ত পরিবারের কেউ নিয়মিত কলা খায়, বা ডক্টর বলে দিয়েছেন। আপনি কাঁচা কলা নিয়ে বাড়িতে হাজির হবার মানে সে যখন আপনার কাছে কলা কেন আনতে হবে সেই গল্পটি করছিল আপনি কিছুই শোনেননি। তার আত্মসম্মানবোধে লেগে গেল ব্যাপারটা। মেয়েরা অবহেলা একেবারেই সহ্য করতে পারেনা। সে কাঁচা কলাটির মধ্যে নিজের অবহেলা দেখল আর আপনার ওপরে রাগের গুলি বর্ষাতে লাগল। আর আপনিও ফায়ার ব্যাক করলেন এটা ভেবে যে দুটাকার কলার জন্যে চিল্লাচিল্লির কি আছে?
এধরণের সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে, তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন। সহমত হলে তেমনই কাজ করুন, দ্বিমত থাকলে তার সাথে আলোচনা করে তারপরেই অন্যরকম কিছু করুন। আপনার জীবনে তাকে গুরুত্ব দিন, সময় দিন। সবচেয়ে বড় কথা পুরো ঘটনার ভেতরের ঘটনা দেখার চেষ্টা করুন।
নারীজাতি ঝগড়ার সময়ে পুরোন কথা টানে কেন?
আমি মেয়ে হয়েও মানছি, এটা মেয়েদের মারাত্মক বাজে স্বভাব। ঝগড়া ২০১৯ সালের হলেও পর্যায়ক্রমে সে পেছনে আপনার যত ভুল ছিল সবগুলো টেনে এনে আরেক দফা আপনাকে কথা শোনাবে! শুধু প্রেমের সম্পর্কেই নয়, আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে ঝগড়ার সময়ে একই কাজ করে! হাহা।
ছেলেদের ব্যাখ্যা:
১) মেয়েরা সেলফ অবসেসড। সারাক্ষন নিজেকে নিয়ে পরে থাকে। অন্যদের দিকটা দেখার চেষ্টা করেনা।
২) মেয়েরা ক্ষমা করতে পারেনা, সবকিছু মনে পুষে রাখে আর সময় পেলে এটাক করতে থাকে!

প্রথম কারণটি ভুল, তবে দ্বিতীয় ভাবনায় কিছু মেরিট আছে। পুরোটা আলোচনা করছি।
আসল ব্যাখ্যা: একজন পুরুষ আর নারীর ত্বক খেয়াল করে দেখবেন, নারীর ত্বক অনেক বেশি কোমল হয় পুরুষের তুলনায়। নারীর সবকিছুতেই কোমলতা থাকে।
হুমায়ুন স্যার বলেছেন,
"ব্যবহার করা কপালের টিপটার আঠা নষ্ট হলেও, মেয়েরা সেটা যত্ন করে রেখে দেয়। একজোড়া কানের দুলের একটা হারিয়ে গেলেও অন্যটা ফেলে না। পুরাতন শাড়ি, ভাঙা চুড়ি কাজে লাগবেনা জেনেও তুলে রাখে। এসবের কারণ হলো মায়া। মেয়েরা মায়ার টানে ফেলনা জিনিসও ফেলে না। অসংখ্য কষ্ট, যন্ত্রণা পেয়েও মেয়েরা মায়ার টানে একটা ভালোবাসা, একটা সম্পর্ক, একটা সংসার টিকিয়ে রাখতে চায়। এজন্যই মেয়েরা মায়াবতী আর মায়াবতীর কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই।"
হুমায়ুন স্যারের ওপরের কথাগুলো একদম ঠিক। নিজেকে দিয়েই বলি, আমার নিজের দুলের বাক্স খুললেও বেশ কয়েকটি কানের দুল দেখবেন যার জোড়াটি নেই। টিপের পাতায় আঠার অভাবে আলগা হয়ে পরে থাকা টিপও পাবেন। বেশিরভাগ মেয়ের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। এই সরল ব্যাপারটির মধ্যে বড় একটি সত্য লুকিয়ে। যারা ছোট ছোট জিনিসের মায়া কাটাতে পারেনা, তারা প্রিয় মানুষগুলোর ওপরে কত না মায়া লাগিয়ে বসে থাকে!

মেয়েদের কোমল মনে যখন কোনকিছুর দাগ পরে যায়, সেটা সার্ফেক্সেল দিয়েও মোছা যায়না। সে যে ক্ষমা করেনি, বা মনে আপনার জন্যে রাগ পুষে রেখেছে ব্যাপারটি তেমন নয়। তার মনের কষ্টের রেখাটি কোনভাবেই মুছতে পারেনা অনেক চেষ্টা করেও। তার মাথায় বনবন করে ঘুরতে থাকে আপনি কবে কোন তারিখে কিভাবে তাকে অবহেলা করেছিলেন, কষ্ট দিয়েছেন, ভুল বুঝেছেন ইত্যাদি! মনের ডিপ ফ্রিজের কোনায় সে রেখে দেয় এসব, যখনই আপনি নতুন কোন কষ্ট দেন, পুনরায় সবকিছু জাগ্রত হয়ে যায়! যে কষ্টগুলো জমিয়ে রেখেছিল, তা গলে গলে আপনার ওপরে বর্ষাতে থাকে।
ছেলেরা অবশ্য সাধারণত এমন হন না। তারা এতকিছু মনে রেখে দেন না। নি:সন্দেহে এটি তাদের ভালো একটি দিক। তবে তার মানে এই নয় মেয়েদের মধ্যেও সেই ভালো দিকটি থাকবেই। নারীদেরকে ভিন্নভাবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে।
এই পুরো সমস্যা থেকে বাঁচার জন্যে প্রথমেই বলব, বোনেরা পিলিজ যখন যে বিষয় নিয়ে ঝগড়া করবেন, সেই বিষয়টি নিয়েই বলবেন, পুরোন কথা টেনে ঝগড়ার আগুন বাড়াবেন না!
আর ভাইয়েরা, যখন সে ঝগড়া করে পুরোন কথা তুলবে, তখন, "পুরনো কথা তুলছ কেন" বলে চিল্লাচিল্লি করবেন না। তাকে পুরোটা বলতে দেবেন, যত বেশি সে ভেতরের আগুন বের করবে, ততই শান্ত হবে, এবং আপনাকে শান্তিতে থাকতে দেবে। "মেয়ে মানষের সবকিছুতেই প্যাঁচ, বুদ্ধিহীন, ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদা ছাড়া আর কোন কাজ নেই" ইত্যাদি ভাবনায় নিজের মনকে আবদ্ধ করে রাখবেন না। নারীকে বুঝতে না শিখলে, সম্মান না করতে পারলে বউ হয়ত পেয়ে যাবেন, কিন্তু প্রেম ভালোবাসা নামক জিনিসটি পাবেন না। নারীর মন পাওয়া যত কঠিন, তা ধরে রাখা ততোধিক কঠিন!
রবিঠাকুরের কথায়:
"রমণীর মন
সহস্রবর্ষেরই সখা সাধনার ধন!"
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
পরিচিত এবং আপনজনদের মধ্যকার সম্পর্কের কিছু সাধারণ, নিত্য ইস্যু প্রায়ই দেখি, সেসব মুহূর্ত ও মানুষদের মনোভাব, কথা নিয়ে লেখা হয়েছে পোস্টটি। কিন্তু সব মানুষ নিশ্চই একরকম নয়। সবার জন্যে সব পরিস্থিতি ও ব্যাখ্যা খাটবেনা স্বাভাবিকভাবেই। তবে কারো কারো পোস্টটি পড়ে উপকার হবে নিশ্চিত, সেসব মানুষকে বলব, "ইউ আর ওয়েলকাম গাইজ!"
ছবিসূত্র: গুগল মামা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




