somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গরু নিয়ে হাম্বাগিরীতে নিজের ভারতবাসের অভিজ্ঞতা (পর্ব-৩)

০৯ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
দুর্ভাগ্যজনকভাবে গরু নিয়ে আমাদের রাজনীতি/সংস্কৃতি/সমাজ এখন সরগরম। অথচ আমাদের কথা হতে পারত নাসার সবশেষ মঙ্গলাভিযান বা জার্মানির প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা নিয়ে।



আমাদের আলোচনার বিষয় হতে পারত জাপানিদের হার না মানা জীবন বা পড়শি দেশ চীন তরতর করে কোথায় উঠে গেল আর আমরা কোন হোগার পেছনেই পড়ে রইলাম সেসব। তা না, আমরা আছি গরু ‘কেন খাবি? আর খামুই’ হুংকারে ব্যস্ত।

ভারতে এ নিয়ে রীতিমতো খুনাখুনি চলছে। সবল গরুপক্ষ বিপক্ষকে পেটাচ্ছে। যে জিনিস খেয়ে/করে আমার অভ্যাস। আমাকে মেরেধরে তা খাওয়া থেকে/করা থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব না। হলে দুনিয়ায় মদ বলে কিছু থাকত না। কোন জিনিস নিষিদ্ধ করলেই তা শেষ হয়ে যেত।

আইন/বিধানই একমাত্র কথা হলে পাপ বলে কিছু থাকার কথা না। ভারতে আজ গরু খাওয়ার জন্য কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যেমন সমর্থন করিনা। তেমনি বাংলাদেশে কেউ গরু খেয়ে কারো ওপরে শো অফ করাটা সুস্থ রুচির পরিচয় বলে মনে হয় না। দু’টোই বন্ধ হওয়া জরুরি। জরুরি সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রেখে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন।

ইউরোপ ও আমি:
ইউরোপের মানুষ গরু-শূকর (বিফ-পর্ক) সব খায়। সেসব দেশের সুপারশপগুলোতে সব পাশাপাশি ঝুলে। সেখানে গিয়ে কিন্তু হিন্দু-মুসলিম কাজিয়া বাঁধায় না। আমি নিজের পাতে ২/৩ বার শোকর পেয়েছি (হাঙ্গেরিতে সামার স্কুল করার সময়)। বলেছি-খাই না। পরিবর্তন করে দিয়েছে। আবার কখনো তারা আগেই জেনে নিয়েছে পর্ক না নন পর্ক। হোটেলে খেতে গিয়ে দেখেছি পর্ক, নন-পর্ক আইটেমগুলো থরে থরে সাজানো (হোটেল ম্যারিয়ট, বার্লিন)। রাতে পার্টিতে গিয়ে পর্ক, নন-পর্ক স্নেকস পদ আলাদা করাই সম্ভব হয়নি। আমি নিজের মতো করে খাওয়া সেরেছি।

খাগড়াছড়িতে ঘুরতে গিয়ে ‘হোটেল সিস্টেমে’ বোধহয় হরেক রকম শূকরের পদ দেখেছি। এখন আমি শূকর খাই না। কিন্তু শূকরতো উপজাতিদের প্রিয় খাবার। আমি কি আইন করে শূকর জবাই নিষিদ্ধ করব! বাংলাদেশে না হয় গায়ের জোরে করলাম দেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে গেলে পারবতো এই হামভরা ভাব ধরে রাখতে? ভারতের হিন্দুরা কি পারে! তারা কি ধর্ম/বিশ্বাসের সাথে আপস করে চলছে না (যতো জুলুম শুধু নিজ দেশের গরীব মুসলমানদের ওপর!)। মুসলমানরা কি চলে না। তাহলে কেন বাড়াবাড়ি?

হালাল-হারাম:
ইহুদি ও ইসলাম ধর্মে ক্ষুধা নিবারণের জন্য শুধু খাবার হলে হয় না। সেই খাবারটা হালালও হতে হয়। হালাল খাবার আবার হালাল উপার্জন দিয়ে কেনা হতে হয়! মুসলিমরা সংখ্যায় কম যেসব দেশে সেসব দেশে কি সব পশু হালাল উপায়ে জবাই করা হয়? মুসলমানরা কি হারাম উপায়ে জবাই করা গোস্ত খায় না? আমিতো খাই। আরও বহু মুসলমানকে খেতে দেখেছি। হালাল উপায়ে জবাই না বলে খায়নি এমন মুসলমানের দেখা আজ পর্যন্ত পাইনি।

আর বাংলাদেশে যারা হালাল উপায়ে পশু জবাই নিয়ে চিল্লায় তাদের ক’জন হালাল উপার্জনের টাকায় পশু কেনে? হালাল উপার্জন করে কয়েক লাখ টাকায় পশু কোরবানি দেয়া যায় নাকি!

শূকর না খাওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। আর শূকর খাওয়াকে ঘৃণার চোখে দেখাটা আপত্তির বিষয়। আরেকজনের পছন্দে, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। যে বুনো বিড়াল বা কাছিম খেয়ে মজা পায় তাকে যোগান থাকলে তা খাওয়ায় সমর্থন দেয়াটাই উত্তম রুচি। আর বাকিসব কুরুচি, বিকৃতি। জোরজবরদস্তি কেবল ভাংগন ডেকে আনে আর কিছু না।

ভারত বাসের অভিজ্ঞতা:
এখন আমি ভারতবাসী (পাঞ্জাব)। একটা ডর্মেটরিতে থাকি। স্বভাবতই ভারতের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী ভেজ/নিরামিশাষী। এ নিয়ে আমি, বা অন্য বাংলাদেশি/বিদেশিরা পড়েছি মহাসমস্যায়। ভেজ যতই খাই পেট ভরে না। এই কষ্ট তাদের বুঝাতেও পারি না। তারা বলে ভেজ গুড। ভেজ পার্সন টয়লেট নো স্মেল… নন ভেজ ভেরি বেড স্মেল… ভেজ হেল্দি…নন ভেজ হেল্থ প্রবলেম…হসপিটাল… মানি লস্ট…

ঈদ ও মাছ:
ঈদ গেল ক’দিন আগে (১৪ মে, ২০২১, ঈদ-উল-ফিতর)। হোস্টেলের মুসলিম ছাত্ররা টাকা তুলে বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছে। কর্তৃপক্ষকে বলা হলো, আমাদের মাটন বা মাছ কোন একটা পদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। তারা বলল সম্ভব না। এখানে ননভেজ খাবার হিসেবে শুধু ডিম আর মুরগি অনুমোদিত। তাদের পুনরায় অন্তত মাছ খাওয়ানোর অনুরোধ করা হলো। বলা হলো, কোনভাবেই সম্ভব না। কেন না? নিরামিশাষী হিন্দুরা মাছ বা মাটনের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। ক্যান্টিনে তাই মাছ বা মাটন নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় শিক্ষার্থীদের খাওয়ার স্থান (ক্যান্টিন) আলাদা তবু না।

স্মৃতি অমলিন:
এই ঘটনায় কারো মন খারাপ হতে পারে। এমন আরও অনেক মন খারাপ করার মতো ঘটনা হয়তো আছে/থাকবে। আবার আছে খুব মন ভালো করার স্মৃতিও। এমন একটা বলি। আমাদের ডিনার টাইম রাত ৯টা পর্যন্ত। একদিন ৮.৫০ এর দিকে পাশের রুমের দক্ষিণ আফ্রিকান সাবালো দরজা ধাক্কাচ্ছে। বলল- ম্যানেজার/ওয়ার্ডেন তোমাকে ডাকে। পিসিতে বসে কাজ করছিলাম। বাকি দুনিয়ার খবর নেই। কিছুটা ভয় নিয়েই নিচে নামলাম। কি হলো এই রাতে! আমাকে দেখেই ওয়ার্ডেন বললেন, মেহেদী ডিনার করেছ? আমি আমতা আমতা করলাম। ‘দ্রুত যাও, দ্রুত। সময় শেষ।‘ পরে এসে দেখে গেলেন আমি খাচ্ছি কি না।

এক হিন্দু এখানে ভালোবাসা দিয়ে আরেক মুসলমানের মন জিতে নেয়। তারা আবার ভিনদেশী, ভিন্ন ভাষীও। দুনিয়াজোড়া এভাবেই জিতে যায় ভালোবাসা। হেরে যায় ঘৃণার সওয়ারিরা।

সারা উত্তর, উত্তর পশ্চিম/উত্তর পূর্ব ভারতজুড়েই একটা ধর্মীয় উন্মাদনা চলছে। মানুষকে জোর করে সবজি খাওয়ানো হচ্ছে। নিরীহ ও হতদরিদ্র মুসলমানদের গিনীপিগ বানানো হচ্ছে। গরুতো দূরের কথা মাছ খেতে চেয়েও খোদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরই হেনস্থার স্বীকার হতে হচ্ছে। এই জোরাজুরি করে ধর্ম রক্ষা না হলেও ক্ষমতার ভাগাভাগি ও লুটপাটে এসবের কোনো জুড়ি নেই। আমি পাক-ভারত উপমহাদেশে যা দেখি সেখানে ‘মায়ের অনুভূতি বা খুব স্বাদ’ ম্যাটার করে না, করে রাজনীতি-ক্ষমতা-গেইম অব থ্রোনস। আগাগোড়া রাজনীতিবীদদের নষ্টামি।
আর বরাবরই বোকা জনগণের বোকামী/গোঁয়ার্তুমি …

সেসবের কিছু হাওয়া বাংলাদেশে এসেও লাগছে বা লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে, বুঝতে পারি। সমাজটা ভাংছে ভেবে ভয় হয় আবার প্রমোদ গুণি-বাংলার একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে ভেবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে আমাকে এক বাঙালি হিন্দু অধ্যাপক বলেছিলেন-ভুলে যেওনা এটা বাংলা! আমারও মনে হয়, বাংলার মানুষ ধর্ম মানে কিন্তু ধর্মান্ধতা/উগ্রতা পছন্দ করে না। ফলে এখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে দীর্ঘসময় অনাচার/যথেচ্ছাচার চালানো সম্ভব হয়নি কখনো, হবেও না।

যারা উত্তর ভারতে ধর্মান্ধ হিন্দুদের বাড়াবাড়ির খবরে আহত হয়েছেন প্রশ্নটা তাদের কাছে। আপনিও কি সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে বাংলাদেশে গায়ের জোরে গরুচার (পড়ুন, অনাচার/অশান্তি/ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি/দাঙ্গা/হাঙ্গামা) শুরু করবেন নাকি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন?

আপনার বিবেক, আপনার বিবেচনা…

(নোট: ভারতে ননভেজ খেতে চাওয়া একটা সমস্যা। তবে বিফ/পর্ক ছাড়া বাকি পদগুলো সব জায়তাতেই পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ভেজ/নিরামিষ খাবার পাওয়া এক রকম অসম্ভবই! চিন্তা করে দেখেছেন কখনো?)

দিল্লির রাস্তায় ছবিটি তুলেছেন তুরস্কের মুস্তাফা কেমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সেদাত জেরেজি।

(আগামী পর্বে সমাপ্তি)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:৪৮
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশে শিক্ষিত বেয়াদব ধান্দাবাজ লোকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২৪ শে জুন, ২০২১ দুপুর ১২:৫১




আমাদের দেশে শিক্ষিত বেয়াদব ধান্দাবাজ লোকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। সত্যি চিন্তার বিষয়।।

নওম চমস্কি পৃথিবীর অন্যতম জীবিত দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, বলা যায়, উনি একটি প্রতিষ্ঠান।
এত বড় একজন মহামানবকে যে সাক্ষাৎকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ প্রতিযোগিতা সম্পর্কিত কিছু আপডেট এবং বিচারক প্যানেল।

লিখেছেন কাল্পনিক_ভালোবাসা, ২৪ শে জুন, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:০৯

প্রিয় ব্লগার বৃন্দ,
ছবি ব্লগ প্রতিযোগিতা ২০২১কে অভাবনীয় সাফল্যমন্ডিত করার জন্য আপনাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। ছবি ব্লগ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ন আপডেট এখানে যুক্ত করা হলোঃ

১। ইতিপূর্বে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ ২:

লিখেছেন সুমন জেবা, ২৪ শে জুন, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:১০

ছবি ১: ঝুমকোলতা ফুল
ঝুমকো লতা কানের দুল, উঠল ফুটে বনের ফুল



ছবি ২: জারুল
তোমায় দিলাম অযূত জারুল ফুল।



ছবি ৩:রঙ্গন
ফুল যদি নিয়ে আসো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি প্রতিযোগিতা ২ (আমার দেশের বাড়ি ভ্রমণ)

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৪ শে জুন, ২০২১ রাত ৯:২৯



চাঁদের হাসি




বলুনতো এটা কি ফুল, আমি জীবনে প্রথম দেখেছি।




আকাশ মেঘে ঢাকা।




কচি, একদম কচি।



পথ চিরদিন সাথি হয়ে রইবে আমার




অনেক হলো পরিশ্রম,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ও ক্যামেরার গল্প!

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৪ শে জুন, ২০২১ রাত ১১:১৩


গল্পটা ছোটবেলার! মফস্বলে ছিলাম বলে শহর থেকে(বিশেষ করে ঢাকা থেকে) অনেকখানি পিছিয়ে ছিলাম আমরা- তাই সময়টা খুব বেশি পেছনের না হলেও বেশ পুরনো বলেই মনে হবে।
আমাদের ওখানে একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×