
১৯৯৫ সালে চেন্নাইয়ের পানাগাল পার্কের উল্টোদিকে মিষ্টির দোকান দেখে আমরা ঢুকে পড়লাম । আমাদের হাতে অনেক শপিং ব্যাগ । অনেক রকম মিষ্টির মধ্যে আমরা দু তিনটি মিষ্টি খেতে চাইলাম দাড়িয়ে । ওরা তাই দিল । কালো জাম খেতে গিয়ে মনে হল থুতনি বেয়ে যা পড়ছে তা ঘিয়ের মত । আমি ক্যাশিয়ারকে জিজ্ঞাসা করলাম এই মিষ্টির মধ্যে কি কেমিক্যাল যা ঘিয়ের মত স্বাদ দেওয়া হয়েছে । সে হেসে বলল ঘি দেওয়া মানে ঘিয়ে ভাজা । লোক বাড়ছে , আমরা আরও দুকেজি বিবিধ মিষ্টি বেধে দিতে বললাম , হোটেলে নিয়ে যাব । বেড়ে যাওয়া ভিড়ের মধ্যেও তারা আমাদের অনুরোধ রেখেছে । কাল কালী পুজা । মিষ্টি নিতে লাইন বড় হচ্ছে । লোকটি বুঝতে পেরেছে আমরা বাংলাদেশের । আমি বললাম কিভাবে সম্ভব এই দামে ঘিয়ে ভাজা মিষ্টি । তার হাত চলছে দ্রুত আর মুখ চলছে আমার জন্য । ছয় সাতজন সেলস ম্যান দ্রুত মিষ্টি বাধছে , ভিড় বাড়ছে । চেন্নাইয়ে আজ দুধের দাম ৩. ১২ আনা লিটার ছিল । এই দুধ আসে কেরালা দুগ্ধ সমবায় সমিতির ট্রাকে চেন্নাই এবং অন্যান্য শহরে । প্রতিটি বাড়িতে গাই আছে । ভোর রাতে মেশিন দিয়ে দুধ দুইয়ে ছোট ড্রামে বাড়ির সামনে হাইওয়ের কিনারে রাখা থাকে । মিল্ক ট্রাক এসে ওগুলো খালি করে দ্রুত দুধ নিয়ে চলে যায় । হাজার পয়েন্ট থেকে কয়েক ডজন ট্রাক দুধ নিয়ে সকাল নয়টার মধ্যে চেন্নাইয়ে কারখানায় । এরপর তা থেকে মিষ্টি বানিয়ে এইসব আউটলেটে । শুনেছি দুধ বেশি হলে নাকি দাম ঠিক রাখতে সমুদ্রে ফেলে দেয় । সে হাসল এবং বলল এখন বাড়তি দুধ দিয়ে ঘি , পনির তৈরি হয় যা পুরো ভারতের ব্যাবসায়িরা নিয়ে যায় । আমোদিত আমি । শ্রদ্ধা বেড়ে গেল । দোকানের বাইরে ২০০ গজ লাইন , মিষ্টি কিনবে। ওদের প্রচণ্ড ব্যাস্ততার মধ্যে বিগ থ্যাংক ইউ বলে বেরিয়ে এলাম । গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে আমি আর আমার সঙ্গী মিষ্টি খেয়েছি নিত্য। একেক মিষ্টির একেক স্বাদ ।
পুরো সমবায় সমিতির ফান্ডে ওই ট্রাক , পাম্প মেশিন , বড় বোতল সব কেনা । ওই এলাকার মানুষ ভাল কিছু করছে এতেই খুশী ।
সন্ধ্যায় একটি মার্কেটে গেলাম । ৬ তালা মার্কেট পুরোটাই তামিলনাড়ু বস্ত্র সমবায় সমিতির ৬০ হাজার মেম্বারদের । মহাবলিপুরম এবং কাঞ্জিভরমে যে হ্যান্ডলুম আর মেশিনে কাপড় , শাড়ি তৈরি হয় তাই সমিতির দোকানে এবং অন্যান্য প্রদেশেও বিক্রি হয়। তামিল মহিলারা টিকেট দিয়ে কেনাকাটা করছিল । জানলাম এরা সমিতির সদস্য বলে তাদের লভ্যাংশের অর্থের বদলে টিকেট দিয়ে কেনাকাটা করছে । সুতা তৈরি , রঙ দিয়ে রাঙ্গানো , শাড়ি কাপড় বয়ন , অটো মেশিনে শাড়ি কাপড় বয়ন , মাড় দেওয়া , ইস্ত্রি করে প্যাকেট করা এই বিশাল ৬০০০০ সদস্যদের কাজ । বিশাল কর্মযজ্ঞ । আমি ১৯৯৫ সালের কথা বলছি ।
কলকাতায় ১৯৯৬ সালে একদোকানে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছি মালিকের জন্য । পাশেই একলোক লিখছেন নতুন অর্ডার । তিনিও টাকার জন্য মালিকের অপেক্ষায় । জানলাম কলিকাতার কাছেই উপশহরে তাদের কর্মকাণ্ড । সালোয়ার কামিজ বানান তারা ১৪ জন সমবায়ী । ব্লক প্রিন্টিং এবং বাজার থেকে কাপড় কিনে তা কাটিং করে সেলাই করা তাদের কাজ । তিনি টাকা পয়সা সংগ্রহ , মাল পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদির কাজ একাই করেন । তিনি আমায় জানালেন কলকাতার চারিদিকে যে ৬০ টির অধিক উপশহর গড়ে উঠেছে সেখানের মানুষেরা হাজারো সমিতি করে নানা পন্যের উৎপাদন করেন । বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন থাকায় তাদের খুব উপকার হয়েছে আসা যাওয়ায় । কলকাতা নিউমার্কেটে যা কিছু পাওয়া যায় তার প্রায় সব এইসব ছোট সমবায়ী দলগুলো বানায় । পারিবারিক দল বেশি যেমন ভাইয়েরা , স্ত্রীগণ , ছেলেমেয়ে , তাদের জামাই বউ মিলে বড় একটি দল । ভাল লাগলো ঐ লোকটির সাথে দেখা হয়ে । ওরা সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে লোণ তুলে তা ব্যাবহার করে পন্য তৈরিতে ।
২০০৬ সালে গুয়াংচৌ শহরের পাশেই ফোঁসানে গেলাম এক মোবাইল ফোন ব্যাবসায়ির সাথে । নির্জন গ্রাম । বড় চালাঘরের নিচে গ্লাসে উকি দিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম । এখানে যে মোবাইল সংযুক্তি চলছে তা বাংলাদেশে গেলে নকিয়ার ষ্টিকার বসিয়ে বিক্রি হবে । একশ মহিলা কাজ করছে কেসিঙে মাদারবোর্ড বসিয়ে , পি ডি এফ , স্পিকার , মনিটর লাগিয়ে সেট প্যাকেট করা ইত্যাদি । এই জিনিসগুলো বিবিধ জায়গা থেকে এসেছে একইরকম কুটির শিল্পের মত তৈরি হয়ে । এরা শুধু আসেম্বলিং করে । ও বলল আরও ব্র্যান্ড তৈরি হয় অর্ডার মোতাবেক । স্থানীয় আইনে কোন বাধা নেই তবে গুয়াংচউ মেগা শহরে এটা নিষিদ্ধ । যার জন্য মোবাইল মার্কেটে পুলিশ এলে ওরা সরিয়ে ফেলে মাল গুলো । এভাবেই শত পরিবার ঘরে বসেই তৈরি করছে আর শত মহিলা এখানে তা সংযোজন করে বাজারে এবং রফতানিকারকদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে । নকিয়ার ব্র্যান্ড যারা তৈরি করে তারাই একসময় এর মোলড আর অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়ে আসে । এরপর ঘরে শুরু হয় উৎপাদন । এর পেছনের প্রতিটি মানুষের ইলেক্ট্রনিক্স সন্মন্ধে আইডিয়া আর কাজের অভিজ্ঞতা আছে । হাজার রকম ইলেক্ট্রনিক্স নকল আইটেম এভাবেই চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে চলেছে। এরপর আমি বেইজিং লু তে দোকানে গেলেই নকল আর আসল মাল চিনতে পারতাম তবে যাই বলুন হাই টেক প্রকৌশল চীনাদের সর্বময় ক্ষমতা এনে দিয়েছে প্রোডাক্ট তৈরিতে । গেস্ট হাউসে কয়েকজন বাঙালি ঐ মোবাইল চেক করে ৫৩ পিস মন্দ মাল পেলো ৩০০ পিসের মধ্যে । ওরাই আমায় পুরো পিকচার বুঝিয়ে বলল কিভাবে হ্যান্ডলিং হয় গুয়াংচৌ টু ঢাকা বিমান পথে চোরাই রুট ।
অনেক বিষয় আছে যাতে নীতিবাগীশ হলে পেটে ভাত জোটেনা , জি ডি পিও বাড়ে না ।
উপরের আলাপে বোঝাতে চাইলাম যে আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনা ছিল যা আমরা কাজে লাগাইনি এবং লাগাবওনা কখনো । আমাদের উদ্দেশ্য অসৎ । নামাজ পাচ ওয়াক্ত পড়ি আর দশ ওয়াক্ত পাপকাজ করে ব্যালান্স রাখি । শ্রমবাজারের দিকে আমাদের শানি নজর । ওখানে শারীরিক শ্রম ছাড়াই অনেক টাকা আয় করে দেশি ভাইকে দেশি মা বোনকে বিক্রি করতে আমাদের ইমান নষ্ট হয়না ।
সময় চলে যায়নি । আমরা এখনো সাইজ করতে পারি রাষ্ট্র , উৎপাদন আর স্থানীয় শিল্প বিকাশে ।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




