রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বলা হয় "দ্রোহ ও প্রেমের কবি।" তাঁর কবিতা আমার অসম্ভব ভালোলাগে। বিশেষ করে তাঁর রোমান্টিক কবিতাগুলো। রুদ্র কবির লিখা আমার ভীষণ প্রিয় কয়েকটি কবিতা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।
(১) এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন?
বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-
দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে
স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি,
কোন বেদনার বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত?
সহজেই আমি ভালোবেসে ফেলি, সহজে ভুলিনা কিছু-
না-বলা কথায় তন্ত্রে তনুতে পুড়ি,
যেন লাল ঘুড়ি একটু বাতাস পেয়ে
উড়াই নিজেকে আকাশের পাশাপাশি।
সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি
সহজে থাকি না কাছে,
পাছে বাঁধা পড়ে যাই।
বিস্মিত তুমি যতোবার টানো বন্ধন-সুতো ধ’রে,
আমি শুধু যাই দূরে।
আমি দূরে যাই-
স্বপ্নের চোখে তুমি মেখে নাও ব্যথা-চন্দন চুয়া,
সারাটি রাত্রি ভাসো উদাসীন বেদনার বেনোজলে…
এতো সহজেই ভালোবেসে ফ্যালো কেন?
(২) এ কেমন ভ্রান্তি
আমার !
এলে মনে হয় দূরে স’রে আছো, বহুদূরে,
দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে আকাশ।
এলে মনে হয় অন্যরকম জল হাওয়া, প্রকৃতি,
অন্য ভূগোল, বিষুবরেখারা সব অন্য অর্থবহ-
তুমি এলে মনে হয় আকাশে জলের ঘ্রাণ।
হাত রাখলেই মনে হয় স্পর্শহীন করতল রেখেছো চুলে,
স্নেহ- পলাতক দারুন রুক্ষ আঙুল।
তাকালেই মনে হয় বিপরীত চোখে চেয়েআছো,
সমর্পন ফিরে যাচ্ছে নগ্ন পায়ে একাকী বিষাদ- ক্লান্ত
করুণ ছায়ার মতো ছায়া থেকে প্রতিচ্ছায়ে।
এলে মনে হয় তুমি কোনদিন আসতে পারোনি..
কুশল শুধালে মনে হয় তুমি আসোনি
পাশে বসলেও মনে হয় তুমি আসোনি।
করাঘাত শুনে মনে হয় তুমি এসেছো,
দুয়ার খুললেই মনে হয় তুমি আসোনি।
আসবে বললে মনে হয় অগ্রিম বিপদবার্তা,
আবহাওয়া সংকেত, আট, নয়, নিম্নচাপ, উত্তর, পশ্চিম-
এলে মনে হয় তুমি কোনদিন আসতে পারোনি।
চ’লে গেলে মনে হয় তুমি এসেছিলে,
চ’লে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভূবনে আছো।
(৩) পৃথিবী কি আয়তনে যাচ্ছে বেড়ে
অথবা ক্রমাগত হয়ে আসছে সীমিত
আমি তার কিছুই বুঝতে পারিনা!
এদেশ থেকে ওদেশে যাওয়া যেন
বিকেলে পার্কে বেড়াতে এলাম-
কিন্তু একজন মানুষের মনের কাছাকাছি
যেতে আমার অ-নে-ক
সময় লেগে যায়।
পৃথিবী কি ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে
অথবা সীমিত হয়ে আসছে আয়তনে
আমি তার কিছুই বুঝতে পারি না!
তোমার কাছে
পৌঁছাতে আমার এক যুগ কেটে গেল।
(৪) শেষমেষ যে যার সন্ধ্যার কাছে ফিরে যায়,
যে যার অন্ধকারের কাছে।
তবুও শেষমেষ,
একটি নীলাভ প্রজাপতির জন্যেও,
যে যার স্মৃতির ফ্রেমে কষ্টকে বাধিয়ে রাখে।
হাত বাড়ালেই ফুটে থাকা রক্তিম গোলাপ,
তবুও যে যার কাঁটার কাছে ফিরে যায় একদিন। একদিন যে যার নিঃসঙ্গতার কাছে.........।।
(৫) আমাকে জড়াও তোমার সবুজ ফুলে,
আমাকে জড়াও তোমার শিকড়ে ডালে।
স্বপ্নের রেণু মাখাও সারাটি দেহে,
আমাকে বাজাও তোমার নিভৃত সুরে...
(৬) পেছনে তাকালে কেন মূক হয়ে আসে ভাষা!
মনে পড়ে সেই সব দুপুরের জলাভূমি,
সেই সব বেতফল, বকুল কুড়ানো ভোর,
আহা সেই রাঙাদির আঁচলতলের উত্তাপ,
মনে পড়ে...
মনে পড়ে, বন্দরে সেই সব কালোরাত,
ঈগলের মতো ডানা সেই বিশাল গভীর রাতে,
একটি কিশোর এসে চুপি চুপি সাগরের কূলে
দাঁড়াতো একাকী
তন্ময় চোখে তার রাশি রাশি বিস্ময় নিয়ে।
কবে তারে ডাক দিয়ে নিয়ে গেলো যৌবন সুচতুর,
কবে তারে ডেকে নিলো মলিন ইটের কালো সভ্যতা!
সবুজ ছায়ার নিচে ঘুমে চোখ ঢুলে এলে
মা যাকে শোনাতো সেই তুষারদেশের কথা,
তার চোখে আজ এতো রাতজাগা ক্লান্তির শোক!
পেছনে তাকালে কেন নিরবতা আসে চোখে!
মনে পড়ে- জ্যোৎস্নায় ঝলোমলো বালুচর,
একটি কিশোর- তার তন্ময় দুটি চোখে
রাশি রাশি কালোজল- সুদূরের মাস্তুল
মনে পড়ে..।
(৭) এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে,
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে, কতোটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়
তুমি জানো নাই– আমি তো জানি
কতোটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে, এতো গান, এতো হাসি নিয়ে বুকে
নিশ্চুপ হয়ে থাকি
বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এই তো জীবন,
এইতো মাধুরী, এই তো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত।
তুমি জানো নাই– আমি তো জানি
মাটি খুঁড়ে কারা শষ্য তুলেছে,
মাংসের ঘরে আগুন পুষেছে
যারা,কোনোদিন আকাশ চায়নি নীলিমা চেয়েছে শুধু।
(৮)এতোদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই
পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত
পারিজাতহীন কঠিন পাথরে
প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা_
এই খেলা আর কতোকাল আর কতোটা জীবন!
কিছুটা তো চাই- হোক ভুল হোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই।
আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন– আর কতোদিন?
ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতোটা বিলাবে?
কতো আর এই রক্ততিলকে তপ্ত প্রণাম!
জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারণাময়?
(৯) ভালোবাসার সময় তো নেই
ব্যস্ত ভীষণ কাজে,
হাত রেখো না বুকের গাড় ভাজে।
ঘামের জলে ভিজে সাবাড়
করাল রৌদ্দুরে,
কাছে পাই না, হৃদয়- রোদ দূরে।
কাজের মাঝে দিন কেটে যায়
কাজের কোলাহল
তৃষ্ণাকে ছোয় ঘড়ায় তোলা জল।
নদী আমার বয় না পাশে
স্রোতের দেখা নেই,
আটকে রাখে গেরস্থালির লেই।
তোমার দিকে ফিরবো কখন
বন্দী আমার চোখ
পাহারা দেয় খল সামাজিক নখ।
তাঁর তিনটি গুচ্ছ কবিতাও দিয়ে দিলাম।
১.
থাকুক তোমার একটু স্মৃতি থাকুক
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটি ঘুঘু ডাকুক
২.
দিচ্ছো ভীষণ যন্ত্রণা
বুঝতে কেন পাচ্ছো না ছাই
মানুষ আমি, যন্ত্র না!
৩.
চোখ কেড়েছে চোখ
উড়িয়ে দিলাম ঝরা পাতার শোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


