somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শ্রাবনী (২য় পর্ব)

২০ শে মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৩:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আলকিতো চোখমুখ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন মা বাবা, দরজা বন্ধ করে খাবার টেবিলের কাছে এগিয়ে যায় নোবেল। এক গ্লাস পানি খেয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দেয়। চোখে পড়ে একটা বিয়ের কার্ড, টেবিলের ওপর রাখা। খামের উপর প্রেরকের ঠিকানায় সেই দশতলা বাড়ীর নাম লিখা। হৃৎপিন্ডের অবস্থান এখন নোবেলের গলার খুব কাছে। দ্রুত হাতে খাম থেকে বের করে কার্ডটা, সুন্দর হরফে লিখা বধূর নামের উপর চোখ আটকে যায়। এই নামটা নোবেলের খুব পরিচিত। শামিমা আক্তার চৈতী, শ্রাবণীর বান্ধবী, রুমমেট।

পরদিন সকালে একটু দেরি করেই ঘুম থেকে ওঠে নোবেল। নাস্তা করে বেড়িয়ে পরে, মাথায় একটাই চিন্তা, কি করে শ্রাবণীর সাথে দেখা করা যায়। একবার মনে করে, সোজা ওই বাসায় গিয়ে হাজির হবে। তার আগে একবার ফোনে ট্রাই করে দেখবে নাকি? বের হবার আগেই ফোন নম্বরটা টুকে নিয়েছিল সে। হাজারটা চিন্তা মাথায় নিয়ে রাস্তার মোড়ের দোকানে গিয়ে হাজির হয় নোবেল। অপলক তাকিয়ে থেকে দশতলার বারান্দাটার দিকে, কিন্তু শ্রাবণী আর সেই বারান্দায় এসে দাড়ায় না। একে একে নোবেলের বন্ধুরা এসে হাজির হয়, গল্পে গল্পে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়।

সন্ধাবেলায় হঠাৎ করেই একটা সুযোগ পেয়ে যায় নোবেল। মা বাবা যাবেন চৈতীর বৌভাতে, মা কে অবাক করে দিয়ে তাদের সাথী হয় নোবেল। কমিউনিটি সেন্টারে পৌছেই তার চোখ খুঁজতে থাকে শ্রাবণীকে, এক সময় পেয়েও যায়। অসম্ভব সুন্দর লাগছে আজ শ্রাবণীকে, চারপাশের সব মেয়েকে ম্লান করে দিয়ে যেন হীরের মত জ্বলছে মেয়েটা। ঠিক কতক্ষন শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে ছিল সে জানেনা, তার সম্বিত ফিরে আসে যখন একটা ছেলে তার কাছে এসে বলে “ভাইয়া, চৈতী আপু আপনাকে স্টেজে ডাকছেন”। ধীর পায়ে স্টেজের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় নোবেল, চৈতী তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় অনেকের সাথেই, এক ফাঁকে নোবেল বলে ফেলে তার স্কলারশিপের কথাটা। তাকে কনগ্রাচুলেট করে পাশে দাঁড়ানো সবাই। চৈতীর চোখে হঠাৎ দুস্টুমির ঝিলিক দেখে স্বচকিত হয় নোবেল, সেই মুহুর্তে পিঠে একটা চিমটি অনুভব করে বুঝতে পারে শ্রাবণী এসে দাড়িয়েছে তার পাশে। চৈতী শ্রাবণীর সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয় নোবেলকে, “শ্রাবণী, এ হচ্ছে নোবেল - আমার বন্ধু, আর নোবেল, ইনি হচ্ছেন আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী শ্রাবণী”। চৈতীর দুষ্টুমি তখনো শেষ হয়নি। শ্রাবণীকে লজ্জায় লাল করে দিতেই বুঝি ওদের দুজনকে নতুন করে তার বরের সাথে পরিচিত করে দেয় চৈতী, বলে “ইনারা হচ্ছেন মিস্টার এন্ড মিসেস নোবেল”। চৈতীর কথায় লজ্জা পেয়ে যায় নোবেল নিজেও। বৌভাতের ব্যাস্ততা শেষ করে ক্লান্ত শ্রাবণীকে একটু একা পেয়ে আগামী দিনের প্লানটা করে ফেলে নোবেল।

মেয়েদের কিছু জিনিস কখনই বুঝতে পারেনা নোবেল। নিউ মার্কেটে যেতে স্কুটার নেয়াই পছন্দ করে সে, কিন্তু শ্রাবণীর কথায় রিক্সা নিতে হয় তাকে। রিক্সায় উঠেই তার মনে হয় আজকের দিনটাই অন্যরকম। টুকটাক কথার ফাকে ফাকে শ্রাবণীকে অনেকবার ধন্যবাদ দেয় সে মনে মনে। দুজন মিলে রিক্সায় চড়ার মজাটা স্কুটারে পাওয়া যেতোনা।

মার্কেটে মেয়েদের সাথে যাওয়াটা সবসময়েই বিরক্তিকর লাগতো নোবেলের। কিন্তু আজকে শ্রাবণীর চেয়ে তাকেই দোকানে দোকানে বেশী ঘুরতে দেখা গেল। শ্রাবনীও যেন একটু বদলে গেছে আজকে। বিয়ের আগেই নিজেকে যেন বউ বউ লাগছে তার, লজ্জাও পাচ্ছে একটু একটু। তাদের এত দিনের স্বপ্ন পূরন হতে যাচ্ছে আর দুমাসের মধ্যেই।

দুপুরে লাঞ্চ করে শ্রাবনীকে নিয়ে ধানমন্ডি লেকের ধার ঘেঁসে হাটছে নোবেল। এত ঘোরাঘুরির পরেও আজ একটুও ক্লান্ত লাগছেনা কারোই। কেন যেন ওরা আজ ফিরে গেছে পূরোনো দিনগুলোতে। সেই প্রথম পেন ফ্রেন্ডসিপ করতে গিয়ে পরিচয়, তারপর প্রেম, প্রথমবার দেখা করার অনুভুতি, মজার সব গল্পে কাটছে সময়টা। বাসায় ফেরার জন্য রিক্সা নিতে যাবে ওরা, এমন সময় ওদের প্রায় গা ঘেষে থামলো একটা ঝকঝকে নীল টয়োটা। গাড়ী থেকে বেড়িয়ে এলো সানগ্লাস পড়া এক তরুন। “শোয়েব ভাই” – শ্রাবনীর গলায় উচ্ছাস। এক ছুটে শ্রাবনী গিয়ে দাড়ালো ছেলেটার মুখমুখি। শ্রাবনীর চোখেমূখে অদ্ভুৎ এক আলো লক্ষ্য করে মনটা একটু খারাপই হয়ে গেল নোবেলের। দশ মিনিট পেরিয়ে যাবার পরেও শ্রাবনী যখন একবারের জন্যেও ফিরে তাকালোনা তার দিকে, তখন মন খারাপ ভাবটা অভিমানের রুপ নিতে লাগলো। তারও কিছুক্ষন পর শ্রাবনী হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো নোবেলকে। পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললো “এ হচ্ছে নোবেল, আমার বন্ধু, নোবেল চলো, শোয়েব ভাই আমাদেরকে বাসায় নামিয়ে দেবেন”। নীল টয়োটার পেছনের সীটে একা বসে থেকে নোবেলের অভিমানটা ক্রমেই গাঢ় হতে লাগলো। বাসার কাছে এসে পথেই নেমে পরলো নোবেল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলো সে।

নোবেল বাসায় ঢুকেই ফ্রেস হয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। অভিমান জিনিসটা খুব খারাপ। মানুষ রাগের মাথায় যে কাজটা করতে পারে না, অভিমান করে তা অনায়াসে করতে পারে। সে ভেবেছিলো আজই মা কে বলবে শ্রাবনীর কথা। আগামীকাল শ্রাবনীকে নিয়ে আসবে তাদের বাসায়। মা কে কিছুই না বলে ঘুমিয়ে পরলো নোবেল। ঘুম ভাংলো অনেক রাতে। ভাত খেয়ে বারান্দায় ইজি চেয়ারটা টেনে বসলো সে। হঠাৎ করেই মন খারাপ ভাবটা কেটে গেল তার। নিজের মনেই হেসে উঠলো সে। মনে মনে বললো “নোবেল, তুমি কি জেলাস?” শ্রাবনী তাকে ভালবাসে, এর চাইতে বড় সত্য আর কিছু কি আছে? শ্রাবনীওতো একটা মানুষ, তারও তো ফ্যামিলি আছে, দায়বধ্যতা আছে, সমাজ আছে। নিশ্চই এমন কনো কারন ছিল যার জন্যে শ্রাবনী তাকে সে ভাবে প্রেজেন্ট করতে বাধ্য হয়েছে। শ্রাবনীর জন্যে আবারো ভালবাসায় বুকটা ভরে ওঠে নোবেলের। মনে হতে থাকে – এই মুহুর্তে শ্রাবনীকে না দেখলে আর চলবেনা তার। ব্যাগ থেকে শ্রাবনীর ছবিটা বের করে অনেক বার তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় নোবেল।

পরদিন শ্রাবনীকে নিয়ে চারুকলায় এক্সিবিশন দেখতে যাবে বলে সকাল সকাল বেড়িয়ে পরে নোবেল। নির্দিস্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে মনে মনে আজকে কি কি বলবে শ্রাবনীকে, তার একটা ছক করতে থাকে নোবেল। দশটায় আসার কথা শ্রাবনীর। সাড়ে দশটার দিকে শ্রাবনীকে দেখা যায় সেই নীল টয়োটায়। গাড়ী থেকে নেমে এসে শ্রাবনী বলে “আমি শোয়েব ভাই এর সাথে একটু কুমিল্লায় যাচ্ছি, তুমি আজ বাসায় চলে যাও, আমাদের ফিরতে দেরি হবে, কিছু মনে কর না প্লিজ। আর আমি কাল বাসাই ফিরে যাচ্ছিনা, আর দুই তিন দিন থাকবো, পরে কথা হবে, ঠিক আছে?”।

ওরা চলে যাবার পরেও কিছুক্ষন সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে নোবেল। তারপর বাসায় এসে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা চলে যায় বাস স্ট্যান্ডে, টিকেট কেটে সেদিন সন্ধা বেলাতেই ফিরে আসে তার হলে।

~ দ্বিতীয় পর্ব শেষ ~

শ্রাবনী (প্রথম পর্ব)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০০৯ রাত ৮:০৮
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×