ক.
‘‘বাংলাদেশ মৃতদের দেশ, জ্ঞানের দিক থেকে বন্ধ্যা।’’ কথাটি খুব বাজে শোনায় । শুনতে আমারও খারাপ লাগে । কিন্তু এই কথার কি কোনই যৌক্তিকতা নেই ? যারা কথার এই মালাটি গেঁথেছেন তারা কি উন্মাদ বা পাগল ? একথার বস্তুগত বাস্তবতা কি একেবারেই নেই ? আমার মনে হয়,‘ আছে’ । স্যার , তাঁর লেখায় যে উদাহরণগুলি দিয়েছেন তা দিয়ে একটি জাতির জ্ঞানগত সূচক নির্ণয় করতে গেলে সত্যিকার্থেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় । লেখায় উল্লেখিত উদাহরনে যতটা আবেগ আছে ততটা বাস্তবতা নেই । মানছি, থ্রী’র বাচ্চাদের গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়া, রোবট, ড্রোন এবং এস.এম,এস ভিত্তিক ফর্ম পূরনের ব্যাপারগুলি ভাল এবং ডিজিটাল উদ্যোগ । কিন্তু রোবট বা ড্রোনের মত যন্ত্রপাতির আবিষ্কার আরো আগে মানুষকে বিষ্মিত করেছে। এটি নতুন কিছু নয়। লেখায় গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কেও একটু বেশি বলা হয়েছে কারণ গণশত্রুদের হাতে গণজাগরণ মঞ্চের লজ্জাকর পরাজয় ক্ষানিকটা রাজনৈতিক সচেতন গণমানুষের মানসপটে এখনো উজ্জ্বল, কিছুই বিস্মৃত হয়নি। তারপরেও জ্ঞানের ঝুলিতে যখন কেবলমাত্র এমনই কিছু প্রকল্প (অনলাইনে ভর্তি, ড্রোন এবং রোবট) উদাহরণ হিসেবে স্থান পায় তখন সত্যিই জাতিগত বিকাশের একটি নিদারুন চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
.
খ.
কি এমন উন্নয়ন দেখাতে আমরা সক্ষম হয়েছি এযাবৎকালে ! কী সমস্যার সমাধান আমরা খুব ভালমত করতে পারলাম ! জ্ঞানের জগতে কী মৌলিক অবদান রাখতে পেরেছি আমরা ? ক’জন দার্শনিকের নামের আগে ‘বাঙালি’ শব্দটি যোগ করা হয় ? ক’জন সাহিত্যিক আছে আমাদের হাতে ? সাহিত্যিকের জন্ম হবে কোত্থেকে ? ‘আধুনিক কবিতা ‘ পড়ার মত বিকাশইতো জাতিগতভাবে আমাদের হলো না । ক’জন সিনেমার পরিচালক আছে যাদের কথা আর দশজন বিদেশি মানুষের কাছে গর্ব করে বলা যায় ? এক ‘এস এম সুলতান’কেই আমরা লালন করতে পারিনি। সস্তা শিল্পীত রাজনীতির ঘেরাটপে ফেলে ধীরে ধীরে হত্যার পাঁয়তারা করছি তার শিল্পকর্মকে। তাঁর বৈচিত্রময় জীবন সম্পর্কে মানুষকে অজ্ঞেয় করে রাখা হচ্ছে। জ্ঞান চর্চায় আমরা এতটাই এগিয়ে যে, নানান জাত বেজাতের জ্ঞানীদের ভীড়ে এস.এন বোস’র নামে উৎসর্গকৃত চেয়ারটি পর্যন্ত ফাঁকা রাখতে হয়। দলাদলি’র কারনে কাউকে নির্বাচন করার সাহস পর্যন্ত আমরা রাখি না। বাঙালি সংস্কৃতিটুকুও আগলে রাখতে বরাবরই হোঁচট খেয়ে পড়ছি। কতটুকু অর্জন আছে আমাদের হাতে ? যা ছিলো তা ধরেই রাখতে পারছি না, বিকাশের পথ পাবো কোথায় ? দালালিতে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হতে পারে, শিল্পের দেবী সন্তুষ্ট হয় না। তারজন্যে চাই, উর্বর ভূমি, জ্ঞানের স্বচ্ছতা যা আমাদের নেই। তবে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে অবশ্যই আমরা তা অর্জন করতে পারবো।
গ.
এটা মানতে সমস্যা কোথায় যে, আমরা জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে আছি, আমাদের শিক্ষা কাঠামো আরো আধুনিক এবং যুগোপযোগি করা দরকার ? আমাদের আরো অনেক দুরে যেতে হবে । বিশ্বায়নের ঘোড়দৌড়ে আমাদের সঠিক অবস্থান ঘোষণা করতে এত আপত্তি কেনো ?
জাফর ইকবাল স্যার যদি যৎসামান্য উদাহরন দেবার সাথে সাথে তরুনদের উৎসাহিত করতেন এবং আমাদের সঠিক অবস্থানটি তুলে ধরতেন তবেই আমরা বেশি উপকৃত হতাম। নিজের সঠিক পরিচয় না জেনে আমরা কি করে সামনে আগাবো ? বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তাঁর স্বীকার করা উচিৎ যে, নিজের অবস্থান সঠিকভাবে না জেনে অন্যের অবস্থান ঘোষণা করা যায় না, ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা বা সামনের রাস্তার খোঁজ পাওয়া যায় না। এখন আর সেই দিন নেই যে, আমাদের অবস্থানকে সঠিক ধরেই বাকি সবাই নিজেদের অবস্থান জেনে নেবে । এমনটা প্রত্যাশা করতে হলে সেই প্রাচীন গ্রীসে ফিরে গিয়ে ইতিহাসের গতিধারার পরিতর্বন করে আনতে হবে--থেলিজ, সক্রেটিস, আরেস্ততল, প্লেটোতের গ্রীসিয় নাগরিকত্ব বাতিল করে প্রাচীন বাংলার নাগরিকত্ব দিতে হবে কারণ সেই প্রাচীন কাল থেকেই জ্ঞানের জগতে অবস্থান ঘোষনা শুরু হয়েছে। তবে এই জ্ঞানের মেরুকরণ যে পরিবর্তন হয়নি তা নয়, ফরাশি বিপ্লবের কালে ফরাসিরা জ্ঞানদণ্ডের প্রভূত্ব করেছে, কখনো জার্মানরা করেছে, ইতালিয়ানরা করেছে। এমন আরো দু’চার দশটি মেরু পরিবর্তনের উদাহরণ দেয়া যাবে। এবং ‘বাঙালি’রা সেই রাজ্যে নিষিদ্ধ নন। আমরাও পারবো;যদি সঠিক সুযোগ এবং পরিবেশ তৈরি করা যায়। তবে সবার আগে দরকার আত্ম পরিচয়, নিজেদেরে সঠিক মূল্যায়ন। স্যারের লেখায় সেই ‘সঠিক মূল্যায়ন’টি পেলাম না। যা পেলাম তা অনলাইন এবং প্রিণ্ট মিডিয়ায় উপ-সম্পাদকীয় ছাপার মত ২য় শ্রেণির একটি ‘আবেগী আকাঙ্খা’, যা বাস্তবতার প্রথম আঘাতেই ধরাশায়ী হবে।
ঘ.
শেষের প্যারায় অবশ্য তিনি নানান সমস্যার সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি দিয়েছেন কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। স্যারের উচিৎ ছিলো, আমাদের বর্তমান অবস্থানটি বৈজ্ঞানিকভাবে (আবেগ দিয়ে নয়) ব্যাখ্যা করে ভবিষ্যতের দিকনির্শেনা দেয়া। নিজের দুরাবস্থা স্বীকার করতে লজ্জাবোধ করাটা খুব স্বাস্থ্যকর কাজ না । মানছি বাংলাদেশ মারা যায় নি কিন্তু বাংলাদেশ খুব ভাল নেই, দারুন পীড়াগ্রস্ত, ভয়াবহ সব মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে তার শরীরের কন্দরে কন্দরে। কোন বিদেশি বন্ধুর লোভনীয় অফারে নয় বরং নিজেদের মেরুদণ্ডের উপর ভর করেই আমরা তা সাড়াতে পারবো বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু তরুনদেরকে যেমন নিরাশ হতে দেওয়া চলবে না তেমনি তাদেরকে সুস্থতার ঘুম পাড়ানির ঔষুদ সেবনও করতে দেয়া ঠিক হবে না। তাদের সামনে সঠিক মূল্যায়নটাই হাজির হওয়া চাই।
.
বি:দ্র: বিশ্বাস করুন আর না করুন কিন্তু আমি স্বীকার করছি, লেখাটি লিখতে আমার খুব ভাল লাগেনি। যদি দু’চারজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী বা দার্শনিকের আগে ‘বাঙালি/বাংলাদেশি’ শব্দটুকু যোগ করতে পারতাম তাহলে আমারও খুব ভাল লাগতো । এবং বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ,বিজ্ঞানী এসএন বোস এবং দার্শনিক অতীশ দীপঙ্করদের নাম আমিও জানি এবং তাঁদের নাম মনে রেখেই লেখাটি লিখেছি। ঐ নামগুলির উপর দিয়ে ঝক্কিঝামেলা কম যায়নি এবার নতুনদের আগমনের পথ পরিষ্কার করুন সে পথ দারুন ভয়ঙ্কর.............................
জাফর ইকবাল স্যারের মূল লেখা
জাফর ইকবাল স্যারের মূল লেখা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


