somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অনিশ্চয়তার দিনলিপি

০১ লা নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৪:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পথের শেষ প্রান্তে পৌঁছে অবুঝ কষ্টগুলো বড্ড বেশি তাড়া করে ফেরে। এখন বুঝি কষ্টগুলো এভাবেই ছিল, এভাবেই থাকবে। জীবনের এলগ্নে এসে দু‘চোখের সীমানায় ভেসে বেড়ায় সেইসব দিনলিপি। শৈশব বলতে যা বুঝায় তা আমার ছিল না। সবসময় একটা চাপের মধ্যে ছিলাম। কৈশোরে পা দিতেই কখন যে সে পথ শেষ হয়ে গেল টেরই পেলাম না। কৈশোরে আমি ছিলাম সব পাওয়া পাখীর মতো খাঁচাবন্দী। যেখানে সীমাবদ্ধ সীমার বাইরের কিছুই দেখা যেত না। শৈশব আর কৈশোরের অবহেলা কাটিয়ে তোলার জন্য যৌবনের এসে আমার আশ্রয়ের প্রয়োজন হল। আর সে কারণেই ওকে আমার খুবভাবে দরকার ছিল।
তাছাড়া আমার নিম্ম-মধ্যবিত্ত বাবা, ক্ষুদ্র আয় নিয়ে যিনি মাস শেষে বাজেট প্রনয়নের দীর্ঘপথ হেঁটে এসে ভীষণ অবসন্ন আর আমার মাঝবয়েসী মা, যিনি অসুখের সাথে অ-ঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেও পারিবারিক দায়ভারে দিনভর হাড় ভাঙা পরিশ্রমে মত্ত। আমার ছোট ভাইয়ের উচ্চভিলাষী চাহিদা, যুগের সাথে নিজেকে প্রকাশ করার নিত্য প্রার্থনায় বিষণœ মায়ের মুখ, কখনও কখনও মাঝরাতে ঘুমন্ত পৃথিবীর অলক্ষ্যে মা-বাবার তুমুল কলহ আর প্রথাগত মফস্বলের তরুণের মত আমার ক্লান্ত পায়ের পদচিহ্নের প্রশ্নের জাল বুনন, এ সকল সুকঠিন বাস্তবতা আমার ভিতর প্রচন্ড উত্তেজনার সৃষ্টি করতো। আমি যেন নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারি যাবতীয় সবকিছু। তখনই অক্ষমতার অস্তিত্ব ষ্পষ্ট হতো, চুপসে যেতাম আমি পরাজিত সৈনিকের মত আত্মবর্ষণে। আমার অসহায়ত্ব পূঞ্জীভূত হয়ে আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। আর এসব জীবনের অনিয়ম হতে নিজেকে একটু আড়াল রাখতেই তাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। তাকে দেখলেই মনের গহীনে যেন উষ্ণদিনে বৃষ্টি হতো। ইচ্ছে হতো পাশে গিয়ে দাঁড়াই, পথ চলি কিছু স্বপ্নের আহবানে। তখনই ঘিরে ধরত অনিশ্চয়তা। আমার ভাঙাচোরা গল্পই অনিশ্চয়তার পশ্রয়দায়িনী।
এইসব পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কষে সৃষ্টিশীলতার ব্রতে হাত ধরি এক স্বপ্নবান তরুণের। নিজেকে অন্যভাবে গড়ে তোলার সাহস সঞ্চরিত হয় অবিশ্বাসের দোলাচলে। কবিতার চাষাবাদ শুরু হয় লিটল ম্যাগের প্রয়োজনে। বিশ্বাসহীন জীবনের বারতায় তরুণ কবির বুক পকেট ভারী হয়ে উঠে। নব প্লাবণের আর্বিভাবে নিজেকে যুক্ত করি একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে। এভাবেই চলছিল দিন ব্যস্ততায়, বিষণœতায়।
একদিন আমার ঠিকানায় একটি চিঠি এসে দরজায় কড়া নাড়ল। চিঠিটি একটি মেয়ের লেখা, যার নাম অনিন্দিতা। খুব গোছানো এই চিঠির মূল বক্তব্যে ছিল, আমার কবিসত্তার প্রশংসা আর বন্ধুত্বের জোড়ালো আমন্ত্রণ। তরুণ কবির প্রশংসায় পঞ্চমুখ এক তরুণীর চিঠি পড়ে আমিও আপ্লুত হয়ে তার ঠিকানায় উত্তর পাঠালাম। সেই শুরু আরেক অধ্যায়ের। চিঠি আদান প্রদান বাড়তে থাকল ক্রমশঃ। কাগজের ডানায় চেপে আসা এইসব মনের কথাগুলোই সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের মাঝে সৃষ্টি করল একটি সেতুবন্ধন। যে বন্ধনের নাম বন্ধুতা। যেখানে বিশ্বাস আছে, নির্ভরতা আছে, আছে পারষ্পরিক সহমর্মিতা। এভাবেই যুগল বিনিময় একদিন দৈনন্দিনে রুপ নিল। আমাকে স্থির রেখে যেসব কথাগুলো তার দরজায় কড়া নাড়ে, তাদের ফেরবার অপেক্ষায় আমি ঘরবাহির করি। ভিন্ন এক অনুভূতিতে নেচে উঠে মন এই দাহকালের আষ্ফালনে। সাথে সাথে বেড়ে চলে সম্পর্কের দায়বদ্ধতা। কখনো কেউ কাউকে দেখিনি, হয়নি কোন কথোপকথন তবুও আমরা এক অপরকে অনেক বেশি চিনি, জানি।
তারপর অনিন্দিতাই একদিন বিপরীতে ভাবতে শুরু করল। আমাকে কেন্দ্র করে সে ভালোবাসার সুঘ্রাণ নিতে চাইছে। কিন্তু আমি আটকা ছিলাম আমার সীমারেখায়। আর আমার মধ্যে অনিন্দিতাকে বন্ধুত্বের বাইরে রেখে কোন ভাবনা জন্ম দেওয়ার মানসিকতা কখনোই ছিল না। অনিন্দিতার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই ভীষণভাবে মনে পড়ছে অন্য একজনকে, যার মধ্যে আমি আশ্রয় চেয়েছিলাম। যদিও এখন আর জানি না সে এখন কোথায়, কোন শহরে থাকে। তবুও আমি ঐ বলয় হতে বের হতে পারছি না কিংবা বের হচ্ছি না। অতপর সূক্ষ্মভাবে, নিপুণভাবে অনিন্দিতাকে দূরে সরিয়ে দিলাম। অভিমানী অনিন্দিতাও একদিন দূরত্বকে মেনে নিল। বন্ধ হয়ে গেল যাবতীয় যোগাযোগ। সমাপন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক বন্ধুত্বের।
প্রায় দু’মাস পর অনিন্দিতার একটি চিঠি পেলাম। সে লিখেছে- “তুমি ভেবো না, তোমাকে এরপর হতে আর কখনও লিখব না। কখনোই না। এটিই শেষ চিঠি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি, আগামী ২৮ফেব্র“য়ারী.... আমার বিয়ে। আমি চাই না তুমি আমার বিয়েতে উপস্থিত থাক। কিন্তু আমি তোমাকে একবারের জন্য একটু দেখতে চাই।”
আমিও অনিন্দিতাকে দেখব বলে গন্তব্যে আসি আর আবিষ্কার করি, এই সেই অনিন্দিতা, যাকে একদিন আমার আশ্রয় ভেবেছিলাম। আমার আকাশটা বিষণœ হয়ে আসে। আমার স্বপ্নমানবীই ছিল আমার প্রিয় বন্ধু! যে আমার প্রথম রাত জাগা, প্রথম কষ্ট ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি থমকে আছি। নিজের ভিতর একটি প্রচন্ড ঝড় বয়ে যায়- একাকী বিহনে। অপরিমেয় কষ্টে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে অনিন্দিতার কথার প্রেক্ষিতেই কথা বলে আমি ফিরে আসি আমার চিরাচরিত পথে। শুধু নির্বাক হয়ে ভেবেছি- এ কোন দুঃস্বপ্নের আরাধণা আমার। এতোদিন তো ভালোই ছিলাম, আমার নিজস্ব আমিতে। আজ কেন আবার দেখা হলো? এরকম অপ্রত্যাশিত ভাবনাগুলো প্রচন্ড কষ্ট দিচ্ছে, এলোমেলো করে দেয় আমার আমিকে। সুপ্ত যন্ত্রণাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শুধু টের পাচ্ছি আমার প্রাচীর ভেঙে যাচ্ছে, আমি হেরে যাচ্ছি...
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×