somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মৃন্ময়ীর কথা- ৩য় পর্ব

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরের বছর হেমন্তের এক বিষন্ন বিকেলে মৃন্ময়ীদের দক্ষিন ভিটের কোণে ছোট্ট মাটির একচালা ঘরে, খড় বিচুলির মেঝেতে হাসু একটি ছেলে সন্তান ভূমিস্ঠ করল। পটলু খুশিতে বড়বাজারের সাহা মিস্টান্ন ভান্ডার থেকে এক হাড়ি গরম রসগোল্লা কিনে আনল আর সেই রসগোল্লা খেতে খেতে মৃন্ময়ী কতকিছু ভাবছিলো ওদের বাংলা ঘরের দাওয়ায় বসে! সেইদিনের আমবাগানের ঘটনার পরে কি ভয়াবহ রেগেছিলো মা! ভাবতে এখনও গা হীম হয়ে আসে---হাসুর শরীরে মাতৃত্বের চিহ্ন আসার সাথে সাথে মা বাবা অসহায় হয়ে পড়লেন, কাকাদের সহোযোগিতায় হাসু আর পটলুর তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে, দক্ষিন ভিটের এক কোণে মাটির একচালা বানিয়ে দেয়া হলো। তখনকার মানুষজনের মনে বোধহয় দয়ামায়া বেশী ছিল, কেউ তেমন মাথা ঘামালো না। শুধু এক পড়শী দাদী যে কিনা মা কে একটু অপছন্দ করত, সেই দাদী এসে দু চার কথা শুনিয়ে যেত--"ও মলি (বড়পা)র মা, ঘরের মইধ্যে এসব ছেনালীপানা হইল আর তুমি টেরই পাইল্যানা, এডা কেমন কথা? ছিঃ ছিঃ এ্যহন এই নিজের চাইর মেয়া গুলা মানুষ কইরব্যা কেমন কইরা?" মা শুধু চোখের জল মুছত আর আমি বুড়ীকে মনেমনে শ্বাপশ্বাপান্ত করতাম!
হাসুদের ছোট্ট ছেলেটি খুব স্বাস্থ্যবান, শান্ত আর আবলুস কাঠের মত গায়ের রং।মা আশ্চর্যজনক ভাবে শিশুটিকে খুব আদর করতেন আর পটলু কৃতগ্গতায় গলে পড়ে মায়ের রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে মায়ের জন্য নাড়কেল চেঁচে দিতো। সবকিছু বেশ সহজ হয়ে আসছিলো, শুধু মেজোআপা আরোও কঠোর হয়ে উঠল আমার প্রতি।একটু উপন্যাস পড়লেই দৌড়ে এসে ছোঁ মেরে বই কেড়ে চেঁচিয়ে মাকে বলত--"আম্মা দেখেন, মৃন্ময়ী পড়াশুনা বাদ দিয়ে বাজে গল্পের বই পড়ছে!--" না না অশান্তিতে জর্জরিত মা এসে আমাকে দুটা কিল মেড়ে, পড়ার বই দিয়ে বসিয়ে দিতো। সামনে মেট্রিক পরীক্ষা, অথচ একটুও পড়তে ইচ্ছে করতনা! জগতের রহস্য নিয়ে ভাবতাম, মাঝেমাঝে হাসুকেও হিংসে হত, ঐ ঘোর কালো মেয়েটিরও এক প্রেমিক আছে, যে কিনা এখন তার স্বামী!
হাসু-পটলুদের নিঁখূত মায়াময় এক সংসার--- ছোট্ট মাটির নিকানো দাওয়া, এককোণে শীম আর লাউ গাছ ওদের ছোট্ট কূটিরের খড়ের চালায় ডালপালা ছড়িয়ে দিযেছে, সব্জীগাছ গুলোর পাশে দুটো মাটির চুলা, তার একটিতে ভাত ফুটছে টগবগ করে আর অন্যটিতে কড়াইতে ছ্যাতছোঁত শব্দে হেলেন্চা শাক রসুনে বাগার দিচ্ছে হাসু! ইস্‌ এ্যতো মায়া, এ্যতো সুখ আমার চেয়ে একটু বড় মেয়েটির কপালে? এই ভয়াবহ অবৈধ প্রেম করেও কেমন পার পেয়ে গেলো হাসু! এখন মনের সুখে ছেলেকে কোলে বসিয়ে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে শাক-ভাত রান্না করছে হাবাগোবা প্রেমিক স্বামীটির জন্য, আর আমি মুখের সামনে ফিজিক্সের কঠিন সূত্র ধরে মুখস্ত করছি! অথচ একটু বিনোদনের জন্য "বিবর" উপন্যাস পড়লেও দোষ---মনে মনে খুব হাসু হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে!
মেট্রিক পরীক্ষা শেষ করলাম কোনমতে, বাড়ীতে খুশীর আমেজে আর পড়া হয়? বড়পা'র বিয়ে র কথা পাকা হয়েছে, ছেলে ওর মতোই ডাক্তার! বড়পা এখন ফোর্থ ইয়ারে মেডিকেলে, মেজোআপা ইন্টার পাশ করে মনোবিদ্যায় চান্স পেয়েছে উত্তরবঙ্গের এক ভালো কলেজে। খুব আনন্দের সাথেই বড়পা'র বিয়ে হয়ে গেলো, খুব কেঁদেছিলাম চার বোন! পুরান ঢাকায় দাদার বাড়ীতে বিয়ের অনস্ঠান হলো, দু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভালোভাবেই সব হলো, তবুও সেই ঘটনা গুলোই মায়ের বুকে শেলের মতো বাধল। ঘটনার মূলটা আমাকে নিয়েই! দাদার বাড়ীতে জয়েন্ট ফ্যামিলী, বাবা ছারা ওনার বাকি সব ভাইরাই ঐ দোতলা বাসায় থাকে। বড়পা,র বিয়ে উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি থেকে আমরা সবাই, বাবার কাকাতো ভাইরা, এমনকি হাসু-পটলুরাও আমাদের সাথে গিয়েছিলো ঢাকায়। বড়কাকার অনেকগুলো ছেলে, সেজো কাকার ছেলে মিলে বাসায় ছেলেভর্তি !ষোড়সী বয়সের আমাকে মা আর মেজোপা চোখেচোখে রাখতো সবসময়, ওর মধ্যৈই সবার চোখে ধূলো দিয়ে বড়কাকার চতুর্থ ছেলে আমারই সমবয়সী অয়ন আমাকে খুব জ্বালাতো--কখনো গাল টিপত, কখনো ইচ্ছে করে গা ঘেষে দাড়িয়ে চুলে মুখ ডোবাতো, ভয় পেলেও অজানা আনন্দে বেশী বাধা দেইনি! বিয়ের দিনে লাল স্যাটিন কামিজে অয়ন আমাকে দেখে পাগল হয়ে গেলো, চিলেকোঠায় নিয়ে জোর করে আমার গালে চুমু, হতবিহবল আমি ওপাশে তাকাতেই বড়কাকী কে দেখলাম রাগে ফুঁসছেন! বিশ্রী একটা ব্যাপার হয়ে গেলো--আপা বরসহ বিদায় হবার পরে রাতে কাকী চিল্লামিল্লি শুরু করলেন, সদ্য বিয়ে দেয়া মাবাবার মনের অবস্থা কেমন থাকে? মা কেঁদে চললেন অবিরত, বাবার মাথা নিচু, আর চোরের মতো লাল স্যাটিনের কামিজে লজ্জা, অপমানে জড়সর; এমনকি আমার দারোগাসম মেজোআপাও আমাকে আকড়ে ধরে আছেন! বড়কাকী বলেই চলছেন--"এটা ষড়যন্ত্র, তোমরা মৃন্ময়ীকে আমার রাজপুত্রের মতো (অয়ন খুব ফর্সা, আমার বিপরীত!) ছেলের সাথে গছিয়ে দিতে চাও না?"
সেজকাকা সেদিন না এগিয়ে আসলে কি যে হত! মনে মনে প্রতিগ্গা করলাম অনেক বড় হব, মায়ের অসহায় কান্না মুছে দেব!
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ ভোর ৪:১১
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের শক্তি, ভাষার মাধুর্য....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫২

এমিরেটস, কাতার এয়ার লাইন্স ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রিক্রুটমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে গ্রুপ ডিসকাশন। গ্রুপ ডিসকাশনের সারমর্ম হচ্ছে—৬-৮ জন কয়েকটি গ্রুপে একটি নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

×