1955 সালে কলম্বিয়ার এল এসপেকটাডর পত্রিকায় 14 খন্ডের সিরিজ হিসেবে একটা সত্য ঘটনা বের হয়। একজন নাবিকের মৃতু্য ঠেকিয়ে রাখার প্রবল চেষ্টার বিবরণী হিসেবে।
সে সময় গুস্তাভো পিনিলার সামরিক সরকার দের্াদন্ড প্রতাপে শাসন করছে দেশ। লেখক হলেন র্নিবাসিত।
---------------------------------------
1955
আমেরিকার ফ্লোরিডা উপকূলের মবিল বন্দর থেকে মেরামতের কাজ শেষ করার পর কলম্বিয়ান ডেস্ট্রয়ার ক্যালডাস (নৌবাহিনীর সামরিক নৌযান) দেশের উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়েছে। দূরত্ব সামান্যই । দেশে ফেরার অধীর আগ্রহে নাবিকেরা। ক্যারিবিয়ান সমুদ্্র পাড়ি দিচ্ছে ক্যালডাস। খুব কাছাকাছি এসে ঝড়ের কবলে পড়ে ক্যালডাস। জাহাজের ডেক থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আট জন নাবিক, জাহাজ এ যাত্রায় ডুবার হাত থেকে উদ্ধার পেল। চারদিন খোঁজাখুঁজির পর মৃত ঘোষণা করা হল আটজন নাবিক কে।
গল্পের শুরু এখানেই।
ভেসে যাওয়া আটজনের একজন বিশ বছর বয়সী ভেলাস্কো । অবিশ্বাস্য ঘটনার শুরু এখানেই। সমস্ত প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে দশ দিন পর ভেলাস্কো র্নিধারিত গন্তব্যের সত্তুর মাইল দূরে র্অধমৃত অবস্থায় মাটি সর্্পশ করল।
সরকারী ভাবে ভেলাস্কো বীর হিসেবে ঘোষিত হল। অঢেল উপঢৌকন আর করতালির মাঝে ভেসে গেল ভেলাস্কো। দশদিন ধরে বেঁচে থাকার অমানুষিক প্রচেষ্টার র্নিদশন বাণিজ্য লক্ষী হয়ে আসা শুরু করল পকেটে। দুটো উদাহরণ দিই।
ভেলাস্কোর হাতে যে ঘড়িটা পরা ছিল সেটা দশদিন নোনা পানি খেয়েও নষ্ট হয়নি, ঘড়ির এ্যাড হল ভেলাস্কোকে পুঁজি করে।
ক্ষিধের জ্বালায় ভেলাস্কো জুতোর সোল খাওয়ার চেষ্টা করেছিল খেতে পারেনি। দশদিনের ক্ষুধর্াত একজন মানুষের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়া জুতার বাজার হয়ে গেল রমরমা।
ক্যামেরার ক্লিক , কাট আর হাততালির মাঝে হারিয়ে যাওয়া ভেলাস্কোর সত্যিকার বীরত্ব শুরু হল এরপর। বের করে নিয়ে আসলেন পত্রিকার রিপের্াটার গ্যাব্রিয়েল গর্াসিয়া মর্াকেজ ।
.......................................................................................
মর্াকেজ এর ধারাবাহিক রিপের্াটে বের হয়ে আসল সত্যি ঘটনা।
মবিল থেকে জাহাজ র্ভতি করে আমেরিকান টিভি, ফ্রিজ , ওয়াশার নিয়েছিল বড় র্কমর্কতারা। মাঝসমুদ্্রে সাধারণ মাপের ঝড়ের কবলে পড়ে কাবু হয়ে গেল ডেস্ট্রয়ার ক্যালডাস , শুধুমাত্র মালপত্রের কারণে। তবুও মালপত্র ফেলেনি বড় র্কমর্কতারা সেটার ফলাফল ছিলো ডেক থেকে ভেসে যাওয়া আটজন নাবিক। সামরিক সরকার তথ্য বিকৃত করলো ঝড় কে হারিকেন বলে এবং ভেলাস্কোর বেঁচে যাওয়াকে তার বীরত্ব হিসেবে।
ভেলাস্কোর সত্যিকার বীরত্ব শুরু হয় এখান থেকেই । সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারের প্রতিটি কথা মিথ্যা এই স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য প্রবল চাপ আসল। চাপের মুখে উৎরে গেল ভেলাস্কো।
সমস্ত অসম্মান, সামরিক র্মযাদা কেড়ে নেওয়ার ভয়, জীবনের ভীতি উপেক্ষা করে তার সাক্ষাৎকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেল ভেলাস্কো।
এরপরের জীবন তাঁর তীব্র কষ্টের।
সে কথায় আর গেলাম না। কারণ এর পর তীব্র প্রতিরোধের মুখেও ভেলাস্কোর মুখে ছিল হাসি, কারণ সে খুঁজে পেয়েছিল নিজেকে সাক্ষাৎকারটার পর। কারণ সে জানে দশ দিন বেঁচে থাকাটা নয়, এর পরর্বতী জীবন যেটা সে বেছে নিয়েছিল সব প্রতিকূলতার মুখে সেটাই বীরত্বের।
মর্াকেজ ও দেশ থেকে র্নিবাসিত হয়েছিলেন এই লেখার পর।
........................................................................................
আমাদের প্রচলিত ধারনার মুখে এক দলা থুতু হতে পারে ভেলাস্কোর বীরত্বের ধারণা।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে পত্রিকার পাতা ফেনিয়ে তোলা বড় বড় মানুষদের কাহিনীগুলো।
12 টাকার চাল , 28 টাকায় কিনে খাওয়া মজুরদের বেঁচে থাকাটাও একটা বিস্ময়। বেঁচে থাকায় ভীষণ প্রচেষ্টা মাত্র, জীবন উপভোগ নয়। সিংহভাগ , বেঁচে থাকার প্রচেষ্টারত মানুষের দেশে স্টিলের ইলিশ মাছ বানিয়ে শহরের শোভা উন্নয়ন, কিংবা এমপিদের বিএমডবি্লউ কেনার র্ভতুকি সবই আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় আমরা কত ভালো জুতোর সোল বানাই।
আমাদের দেশে বিনিয়োগের জোয়ার, বসুন্ধরা কমপ্লেক্স কিংবা বেগম জিয়ার শিফন শাড়ী সবই আমাদের জুতোর সোলের মাপের উন্নয়নের মাপকাঠি দেখায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর ফি বাড়ানো, বুয়েটে র্ভতি র্ফমের দাম বৃদ্ধি , শিক্ষকদের বেতনের জন্য রাস্তায় অনশন, সাকা চৌধুরীর মেজবান সবই আমাদেরকে নোনা জলে ডুবেও টিকে থাকা ঘড়ির টিক টিক করার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এরপরও মানুষ বাঁচে, কিন্তু হিরো হয় তারেক , জয় আর দেলোয়ার হোসেন সাঈদী । কারণ জুতোর উপরে এদের অবস্থান , নীচে সারা দেশ ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


