somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জর্জ হ্যারিসনকে বিলম্বিত অভিবাদন - শেষ পর্ব

২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ১১:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পাঁচ.
কারিন নামের জর্জ হ্যারিসনের এক ভক্ত জানাচ্ছেন, "আমার তখন আট বছর বয়স, আমার বড়ো বোনের বারো। সে যা যা করতো আমাকেও তা-ই করতে হবে। এইভাবেই আমার বীটলস-এর গানের সঙ্গে পরিচয়, আমি লুকিয়ে আমার বোনের বীটলস অ্যালবামগুলি শুনতাম। গানগুলো আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। বীটলস-এর ভাঙন আমাকে যেন একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়ে গেলো। কিন্তু আমি জর্জের প্রেমে পড়ে গেলাম 1971-এ 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এর সময়। তখন আমি পনেরো বছরের।"

জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দেশটির জন্মের সময় থেকে। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে অগাস্ট মাসে রবি শংকরের আগ্রহে জর্জ হ্যারিসন একটি কনসার্টের মাধ্যমে যুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্যে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। আজকাল মানবিক ইসু্যতে বেনিফিট কনসার্টের আয়োজন হরহামেশা হয়ে থাকে। কিন্তু 1971-এর অগাস্টে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে এই ধরনের কনসার্ট সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিলো 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নামে। বাংলাদেশ সেই ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গেলো। এই কনসার্টের ফলেই পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশকে জানলো। সন্দেহ নেই, জর্জ হ্যারিসনের বিশ্বব্যাপী তারকা-খ্যাতি এই আয়োজনে ও তার সাফল্যে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছিলো।

2005-এ 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' প্রথমবারের মতো ডিভিডি-তে প্রকাশ করা হয়েছে। সঙ্গে নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে অ্যালবামটিও। মৃতু্যর আগে হ্যারিসন এটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সমাপ্ত দেখে যেতে পারলেন না। কাজটি সম্পন্ন হলো স্ত্রী অলিভিয়া ও পুত্র ধ্বনির উদ্যোগে। রবি শংকর এ উপলক্ষে লিখেছেন:

"আমি আনন্দিত যে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নতুন করে মুক্তি পাচ্ছে। বাংলা অঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্যে আমার টান তো ছিলোই। তার ওপরে সেই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহারা শরণার্থী ও শিশুদের সাহায্যের জন্যে কিছু একটা করার তাগিদ আমার স্বাভাবিকভাবেই ছিলো।

"জর্জ হ্যারিসনকে বিষয়টি জানালাম। সে আমার অন্তরের আকুতি ও উদ্বেগটি সে বুঝলো এবং একটি কনসার্টের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হলো। বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিলো তাতে। আমার প্রিয় জর্জের সহায়তা ছাড়া তা কিছুতেই সম্ভব হতো না। যা ঘটেছিলো, তা এখন ইতিহাস। এটি গত শতাব্দীর সবচেয়ে তীব্র ভাবাবেগপূর্ণ সঙ্গীত-অভিজ্ঞতাগুলোর অন্যতম।

"অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন কোনটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কনসার্ট। উত্তরটি আমার জন্যে কঠিন, কারণ পঁচাত্তর বছরের বেশি সময় ধরে সঙ্গীত পরিবেশন করে আসছি আমি। কিন্তু 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' খুবই উল্লেখযোগ্য আমার জন্যে। এর ধারণাটি আমার উদ্ভাবন এবং কনসার্টটি করা হয় আমার আত্মার কাছাকাছি সব মানুষদের সাহায্যের জন্যে, এর মধ্যে আমার অনেক দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনও নিশ্চয়ই ছিলেন। কনসার্টের প্রথম অংশে আলী আকবর খান ও আল্লারাখা খান মঞ্চে উঠেছিলেন আমার সঙ্গে। দ্বিতীয় অর্ধে জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে ছিলেন বব ডিলান ও এরিক ক্ল্যাপটন। সবশেষে জর্জ এই উপলক্ষে তার লেখা 'বাংলাদেশ' গানটি পরিবেশন করে।

"এর ফলে রাতারাতি সারা পৃথিবী বাংলাদেশ নামের দেশটির কথা জানলো। লক্ষ লক্ষ ডলার ইউনিসেফের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হলো। এই ঘটনা যে বিস্মৃত হওয়ার নয়, এ আমার পরম পরিতৃপ্তি। এটি জেনেও ভালো লাগছে যে এই ছবি এবং অ্যালবামটি নতুন করে প্রচারিত হচ্ছে। আমি নিশ্চিত 1971-এর এই সাড়া-জাগানো কনসার্টটি আজকের শ্রোতাদেরও মুগ্ধ করবে।"

ছয়.
আমেরিকায় বাংলাদেশের পরিচিতি খুব বেশি নেই। অধিকাংশ মানুষ নামও শোনেনি দেশটির, কেউ কেউ আজও জিজ্ঞাসা করে বাংলাদেশ জায়গাটা ঠিক কোথায়? অপেক্ষাকৃত বয়স্করা বাংলাদেশকে জানে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এর কারণেই। তাদের কাছে বাংলাদেশ এবং জর্জ হ্যারিসন এক স্মৃতিময় ব্যঞ্জনার সমার্থক। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জন্যে হ্যারিসন যে কতোটা করেছিলেন, তার বিচার আমরা কোনোদিন করিনি। শত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যা করা সম্ভব হতো না, দুটি মাত্র কনসার্ট করে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তিনি।

সেই প্রথম পৃথিবীর মানুষ জানলো, বাংলাদেশ নামে একটি দেশের অভু্যদয় ঘটছে, তারা স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছে, সে দেশটিতে নির্বিচার গণহত্যা ও নারীলাঞ্ছনার ঘটনা ঘটছে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশছাড়া হয়েছে। জর্জের উদ্যোগ ও অংশগ্রহণ ছাড়া এটি এতো দ্রুত ঘটানো কিছুতেই সম্ভব হতো না। যতোদূর জানি, ওই একবারই জর্জ হ্যারিসন তাঁর তারকাখ্যাতি ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করেছিলেন এবং তা করেছিলেন বাংলাদেশের জন্যেই।

অথচ বাংলাদেশ তাঁকে মনে রাখেনি, ধন্যবাদ জ্ঞাপনটিও করেনি। তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এমনকি, তাঁকে বাংলাদেশে আসার জন্যে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, এমন কথাও কখনো শুনিনি। আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধের যথার্থ নমুনা বটে। রাষ্ট্রীয়ভাবে না পারি, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে স্মরণ করবো। মনে মনে আমাদের অক্ষমতা ও অকৃতজ্ঞতার জন্যে মার্জনা চাইবো।

এই সেদিন ট্র্যাভেলিং উইলবেরি-র অ্যালবামে 'হ্যান্ডল মি উইথ কেয়ার' গানে জর্জের গীটারবাদন শুনতে শুনতে আচমকা মনে হলো, শুধু বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে এমন হৃদয় নিংড়ে নেওয়া আবেদন যিনি সৃষ্টি করতে জানেন, তাঁকে মরে যেতে হয় কেন? আমাদের মতো অকিঞ্চিৎকরদের আয়ু সঞ্চারিত করেও যদি এই ধরনের সৃষ্টিশীল মানুষদের অমর করে দেওয়া যেতো!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম: আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত ইশতেহার।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০১




​ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের খতিয়ান নয়, ইতিহাস মূলত লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকা কিছু অবিনাশী কণ্ঠস্বরের গল্প। আজ ২৬ জুন। ১৯৯৪ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের এক হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দাওয়াত দিয়েছে

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭

দাওয়াত দিয়েছে
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এক পছন্দের মানুষ দাওয়াত দিয়েছে
তার ‍সুন্দর জেলা দেখার জন্য
আমিও বলেছি চলে আসবো হঠাৎ-
একদিন দেখতে, দেখবো ঘুরে ঘুরে
তার পুরো শহর , তার গ্রাম, তার বাড়ি
বিশেষ করে তাকে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মোহমায়া

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬



খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।

ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।


হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই  ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙালি মুসলমান সম্বন্ধে ChatGPT র মূল্যায়ন !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:০৯

ChatGPT কে "বাঙালি মুসলমান বনাম প্রকৃত ইসলাম" এর উপর একটা প্রবন্ধ লিখতে বলেছিলাম, কয়েক সেকেন্ডে যা লিখেছে হুবুহু তুলে দিলাম ! আপত্তি থাকলে চ্যাটজিপ্ট দায়ী !!

বাংলার মুসলমান সমাজকে দেখলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

×