somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবনের লক্ষ্য-৭

১৪ ই জুন, ২০০৯ রাত ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জীবনের লক্ষ্য-৬
জীবনের লক্ষ্য-৫
জীবনের লক্ষ্য-৪
জীবনের লক্ষ্য-৩
জীবনের লক্ষ্য-২
জীবনের লক্ষ্য-১

জীবনের লক্ষ্য নিয়ে লেখতে চাইলেও অনেকটা আত্মজীবনীর মত হয়ে যাচ্ছে লেখাটা। ঠিক করে বললে শৈশব আর কৈশরের কাহিনী হচ্ছে লেখাটা। আসলে জীবনের লক্ষ্যগুলো নির্ধারিত হয় জীবনের পারিপার্শ্বিক ঘটনাসমূহ দ্বারা। আমি আমার লেখায় ফিরে যাচ্ছি।

ক্লাস সিক্সে আমি সন্ধান পাই এক অমৃতভান্ডারের। পূর্বে এই অমৃত আমাকে আচ্ছন্ন করলেও উপযুক্ত যোগানের অভাবে খাওয়ার পরিধি ছিল সংকীর্ণ। পরবর্তীতে এই অমৃতে আমি এমনই মজেছি যে আজও এর মজা আমি ত্যাগ করতে পারিনি। আমার জীবনে এই অমৃতসুধা এক আশীর্বাদ নাকি আভিশাপ তা এখনও বুঝে উঠতে পারি নাই। যাই হোক এই ভাণ্ডারটি ছিল একটা ব্রাক লাইব্রেরী। আমি এর সদস্য হওয়ার পর আমার জীবনের লক্ষ্যে একটা বিরাট ধাক্কা আসে। লাইব্রেরীটি তেমন বড় ছিল না। আলমারি ছিল তিনটা। আমি এই তিন আলমারিকে চেটে চেটে খেয়েছি। পরবর্তীতে ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমি আরেকটা মোটামুটি সাইজের বড় একটা লাইব্রেরীর সন্ধান পাই। জীবনের অনেক কাহিনী আমি সেখানে পার করেছি। তা এই ব্রাক লাইব্রেরীর সদস্য কার্ড পাওয়ার পর আমি প্রতিদিন একটা করে বই নিতে থাকি। আমার স্কুল ছুটি হয় বিকাল সাড়ে চারটার দিকে। বাসায় গিয়ে গোগ্রাসে গিলি সেই বই। বাংলা, ইংরেজী, গণিত, সামাজিক, সাধারন বিজ্ঞান, ইসলাম শিক্ষা ব্যাগেই পড়ে থাকে সযত্নে। ক্লাসের পড়া পড়াতো দূরের কথা, বইই ব্যাগ থেকে বের করতাম না। বের করতাম শুধু ঐ বিশেষ বইটা যা আউট বই হিসেবে পরিচিত। ওটাই পড়তাম রাত অবধি। তারপর ঘুম। সকালে উঠে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি তারপর স্কুলে যাওয়া একটু আগে আগে। স্কুলে যেয়ে প্রথমে বাংলা এবং ইংরেজী হাতের লেখা লেখতাম। অংক ক্লাস ছিল টিফিনের পরে। টিফিনের সময় অংক বাড়ীর কাজ করতাম। টিফিনের সময়ই আগের দিনের বইটা ফেরত দিয়ে নতুন একটা বই নিতাম। আমার যে নেশা তখন ধরেছিল আজও তা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এই আউট বই পড়ার নেশা বড়ই খারাপ নেশা। পুলাপানের জীবনের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেয় এই নেশা। বৃহস্পতিবার খুব খারাপ লাগত কারন শুক্রবার বই ছাড়া কাটাতে হত। আমি ভাবতাম আমার যদি একটা লাইব্রেরী থাকত তাহলে কতই না ভালো হত। বাবা বইয়ের নেশাকে খারাপ চোখে দেখতেন না। হয়ত ভাবতেন বাইরে বাজে পোলাপানের সাথে ঘোরাঘুরি করার থেকে ঘরে বসে বই পড়া অনেক ভাল। বই পড়তে পড়তে আমার ঘোর লেগে যেত। কল্পনায় লাগত রঙ্গীন ছোয়া। বিচিত্র অনুভুতিতে ভরে উঠত মন। শুরু করেছিলাম রুপকথা, কিশোর ক্লাসিক এইসব দিয়ে। বাবা আমাকে একদিন উপদেশ দিলেন বই পড়ার ব্যাপারে। উহা ছিল বড়ই কৌতুকময় ডন কুইজোট, রবিন্সন ক্রুসো এদের কথা কখনই ভোলার নয়। ডন কুইকজোটের কথা মনে পড়লে এখনও কষ্ট হয়। গ্রিম ভাইদের রুপকথা বইটা একদিনে শেষ করতে পারিনি। সকালে উঠে ঘুরাঘুরি বাদ দিয়ে একদিন এই গ্রিম ভাইদের কাহিনী পড়তে হল। ধীরে ধীরে আমার পাঠে পরিপক্কতা আসতে লাগল। মনে হল, আচ্ছা আমি কি লেখতে পারি না এই রকম একটা গল্প। অথবা ফয়েজ আহমেদের মত ছড়া। লেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু লেখার মান দেখে আমার নিজের লেখাকে নিজেই বাতিল করে দিলাম। বুঝলাম এখনও সময় হয়নি। উপেন্দ্রকিশোরের ঠাকুরমার ঝুলি পড়তে বেশ কষ্ট হল। কঠিন সাধু ভাষায় লেখা। বিদ্যাসাগরের গোপালকে দেখে আমার হাসি পেল। বিদ্যাসাগর নিজেই যা ছিলেন! আমি ততদিনে জীবনী সমগ্র পড়ছি। বিরাট বিরাট বিজ্ঞানি, লেখক, সমাজসেবক, প্রযুক্তিবিদ এদের জীবনী পড়ে যা বুঝলাম তা হল এদের মত না হতে পারলে জীবনের কোন অর্থ নেই। এক একজন বিজ্ঞানীর জীবনী পড়ি আর ভাবি আমাকে আম্পিয়ার, ম্যাক্সওয়েল, গে লুসাক, গাউস, আইনষ্টাইন,নিউটন, কুরি, পাস্তুর, ফ্লেমিং, ফ্যারাডে এদের মত হতে হবে। ফ্যারাডে আর তার গুরু হাম্ফ্রে ডেভি আমাকে চরম আকৃষ্ট করেছিল। ফ্যারাডে আমার ভাবগুরুদের একজন। আমার লক্ষ্য তখন দ্বিমুখী। লেখক আর বিজ্ঞানী হওয়া। বুঝলাম না কি করব। যে কোন একদিকে যাব নাকি দুটোই আকড়ে থাকব। কোনটাই আমার কাছে কম লোভনীয় মনে হয় না। ভিঞ্চি দেখা যাচ্ছে শিল্পী ও বিজ্ঞনী দুটোই ছিলেন। অতএব দুটোই হওয়া সাব্যস্ত করলাম। যা আছে কপালে।


আমার হাব-ভাব দ্রুত বদলে গেল। বিরাট বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী ভাব। বিরাট উদাসীন এক ব্যাক্তি হয়ে গেলাম আমি। প্রায় সকল বড় মনীষীরা প্রথাগত শিক্ষাকে বর্জন করেছেন। আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথাগত শিক্ষাকে বর্জন করতে হবে। ক্লাসের ফার্ষ্ট বেঞ্চ ছেড়ে জায়গা নিলাম লাষ্ট বেঞ্চে। স্যারেরা কি বলে তা তারাই জানেন। আমি চেয়ে থাকি জানালা দিয়ে স্কুলের কাছের সবুজ বিশাল মাঠে অথবা আকাশের দিকে। এই পর্যায়ে অব্দুল্লাহ আল মুতী, দেবদাস দাসগুপ্ত প্রভৃতি লেখকের লেখা পপুলার সাইন্সের বইগুলি পড়া আরম্ভ করি।বিজ্ঞানের বিশ্বকোষ একটানা গিলি। ক্লাসের সাধারণ বিজ্ঞান বইটা উলটে পালটে যা বুঝলাম যে এই বইটা কোন জাতের না। আমার স্তর আরো উপরে। আইনষ্টাইন ভাব আসা শুরু হয় আমার মধ্যে। ফলাফল হাতে নাতে। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় সাধারণ বিজ্ঞানে হাইষ্ট উঠল ৭৫, আমি পেলাম ৬৩। কারন আমি নিজের জ্ঞান দিয়ে নিজের মত করে লিখেছি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর। যাই হোক মন খারাপের কোন কারন নেই। বিখ্যাত ব্যাক্তিরা এইসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামান না। আমার দিন কাটতে থাকে। বাংলা জীবনে নোট করে প্রশ্নের উত্তর পড়ি নাই। খালি গল্প পড়তাম আর পরীক্ষার হলে যেয়ে বানিয়ে বানিয়ে উত্তর লেখতাম। কিন্তু হাতের লেখা ধীর হওয়ার কারনে পরবর্তী জীবনে বাংলাতে ধরা খাই। স্কুলের স্কাউট দলে যোগ দিয়েছিলাম। আমার স্কাউট জীবন বড়ই আনন্দময় ছিল। দিন কাটতে থাকে। একসময় ফাইনাল পরীক্ষা এসে পড়ে। ফাইনাল তো না অগ্নি পরীক্ষা। দেই পরীক্ষা কোনভাবে। কিছুতেই আমার কিছু যায় আসে না। পুরোই উদাস এক বালক যার চোখে স্বপ্ন ম্যাক্সওয়েলের মত গাউসের মত অল্প বয়সে ব্যুৎপত্তি দেখানো। কুরির মত রেডিয়েশনে ব্লাড ক্যান্সারের মৃত্যু যার পরম আকাংক্ষিত। ফাইনাল পরীক্ষায় খারাপ করি নাই তারপরেও। এটা আমার কৃতিত্ত্ব না। আমাদের স্কুলটাই একটা হাড় হাভাতে স্কুল। এখনও এটা একটা হাড় হাভাতে স্কুল রয়ে গেছে। মোটামুটি ক্যাটাগরির ছাত্র হলেই এখানে পরীক্ষায় ভাল করা যায়। এই বছর এ+ পাওয়া ছাত্র আমাদের স্কুলে দুইজন। এবার বুঝে নিন এটা কোন ক্যাটাগরিতে পড়ে। তবুও আমার স্কুলকে এককালে ঘৃণা করলেও এখন খুব মমতা বোধ করি। আমার মহাপুরুষ হবার স্বপ্নের যে সেখানেই শুরু।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:২৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদিক হাসনাতের প্রোগামে রাজাকার মঈনুদ্দীন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



এই ছবিটি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া নিজেস্ব অর্থায়নে সাদিক হাসনাতের প্রোগামের। অসংখ্য আঙ্কেল আন্টিদের মাঝে একজন বিশেশ লোককে দেখা গেল সেখানে। লোকটাকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ছবিতে। এই লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেয়ে চেয়ে দেখুন

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩১


আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ; স্বাভাবিকভাবেই তারা অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল করে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

রাজনীতিতে সক্রিয় বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি গং। বিএনপি ও জামায়াত আগে জোটবদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



'এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল-চোখের উপরে
তার শান-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাম্বা/খাল তারেক কে কিছু উপলব্ধি শেয়ার করছি

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪২

আজ আর মনের মাধুরী মিশিয়ে বকাঝকা করব না। আজ কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা শেয়ার করব।



খাল খনন বা ঢাকার বাসস্ট্যান্ড সরানোর চেয়ে কি কি গুরুত্বপূর্ন কাজ এই অর্থবছরে করা যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×