পর্ব - ১ পর্ব - ২ পর্ব - ৩
৭
সেদিনও বুয়া ময়লা নিতে এল। বাসায় তখন নুতন বাড়ীতে উঠবার তোড়জোড় চলছে। বারিধারার বাড়ীটা কয়েক মাস আগেই তৈরী শেষ হয়েছে। শুধু রিমার এস এস সি পরীক্ষার জন্যে এতদিন পাল্টানো হয়নি। নুতন বাড়ীতে উঠবার আনন্দে রিমার মনটা ফুরফুরে হয়ে আছে। তাছাড়া পরীক্ষাও শেষ। ডাবল আনন্দ। বুয়ার দিকে হাসি মুখে টাকাটা বাড়িয়ে ধরল সে।
‘বুয়া আমরা তো চলে যাচ্ছি। আর আসব না। আপনার এ মাসের টাকাটা নিয়ে যান।’
বুয়া যেন ভীষণ একটা নাড়া খেল কথাটা শুনে। ‘চইলা যাইবেন আপা, আর আইবেন না?’
‘না বুয়া আর বোধ হয় আসা হবে না।’
টাকাটা নিতে নিতে কি যেন ভাবল বুয়া। বলল, ‘আপা আমারে একটু পানি দিবেন?’
রিমা ভিতরে যায়। এক গ্লাস পানি এনে দেয়। বুয়া সেটা দিয়ে হাত ধোয়। খুঁজে খুঁজে শাড়ির সবচেয়ে পরিস্কার প্রান্ত দিয়ে হাত মোছে। তারপর রিমার কাছে এসে মাথায় হাত রাখে।
‘আপা গো দোয়া করি, আল্লাহ আপনের ভালা করুক।’
সম্পুর্ণ অনাত্মীয় একজনের চোখে তার জন্যে পানি দেখে অবাক হয় রিমা। মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। ক্ষণিকের জন্যে মনে হয় এখানে থেকে গেলে হয় না। ওখানে গেলে এই বুয়া, মন্ত্রী চাচা এদের সাথে কি আর দেখা হবে কোনদিন?
মূরাদ ভাবতে চেষ্টা করল তার বর্তমান এলাকা ছেড়ে যদি তাকে কখনও চলে যেতে হয় তবে সে কাকে কাকে মিস করবে। যাদের কথা তার মনে এল তারা কেউই বুয়া বা রিকশাওয়ালা শ্রেণীভুক্ত নয়। প্রবলেম। রিমার সাথে তার মন মানসিকতার অনেক ফারাক। তাহলে?
‘মাগো,’ সোমার কথায় চিন্তার সুতা ছিঁড়ে গেল মূরাদের। ‘সারাদিন কি না কি নাড়ে। আর ঐ হাত দিয়ে.. ছি’। গা ঘিন ঘিন করে উঠল সোমার।
‘হাতের ময়লাটা তোর চোখে পড়ল, তার স্নেহটা চোখে পড়ল না?’ আবারও হিসহিসিয়ে উঠল রিমা।
অসহায় বোধ করল মূরাদ। তার মা বলে মেয়েদের নাকি এত রাগ থাকা ভাল না।
‘কেন? এবাড়ীর কেউ কোনদিন তোকে স্নেহ করেনি?’ সাবধানে প্রশ্ন করল ছোটন। আর কতক্ষণ এভাবে চুপ করে থাকা যায়।
‘আপার কাছে তো ডাস্টবিনের স্নেহই বেশী ভাল লাগে।’ ফোড়ন কাটল সোমা।
‘বুয়া বা মন্ত্রী চাচার আমাকে স্নেহ করার কোন প্রয়োজন ছিল না। তারপরও তারা আমাকে ভালবাসত। ওদের ভালবাসাটা নিঃস্বার্থ, অকৃত্রিম।’ শীতল কন্ঠে বলল রিমা।
‘তার মানে আমরা তোকে ঠিক মত ভালবাসি না?’ খেঁকিয়ে উঠল সোমা।
রিমাকে পাল্টা উত্তর দেবার প্রস্তুতি নিতে দেখে মূরাদের আর ধৈর্য্যে কুলালো না। যথেষ্ট হয়েছে ব্যাপারটা নিয়ে দল বেঁধে ঘাঁটাঘাঁটি করা। এবার তার রিমার সাথে একা কিছু কথা হওয়া দরকার। এবং সেটা আজকেই।
‘ও কে.. ও কে..’, হাত তুলল মূরাদ। ‘ঝগড়া কোরো না তোমরা.. আমি বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটা.. ও কে।’
এতক্ষণ পরে মূরাদের এই একটা কথা যেন মার কানে সুধা বর্ষণ করল। তিনি উৎসাহ নিয়ে বললেন,
‘হ্যাঁ বাবা, এসব নিয়ে কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করে লাভ নাই।’
‘হ্যাঁ। সেটাই ভাল।’ বলেলন খালা। পুরো ব্যাপারটা উস্কে দেবার পরে খুব একটা কথা বলেননি তিনি। তার দিকে ঘুরে তাকালেন মা। মনে মনে বললেন ভিতরে চল খালি, তোমাকে আজকে দেখাচ্ছি আমি। খালা মার চাহনি দেখেই বুঝলেন আজ তার মার সাথে ঝগড়া হবে। মৃদু হসেলেন তিনি।
মা এবার সোমাদের দিকে তাকালেন। তার আচরণে হারিয়ে ফেলা কর্তৃত্বটুকু ফিরে এসেছে।
‘এ্যাই তোরা তোদের কাজে যা তো, যা।’
কোন রকম উচ্চবাচ্য না করে বাইরে লনে চলে গেল ছোটন ও সোমা। তাদের খেলাটা এখনও শেষ হয়নি। তবে এত কিছুর পরে আর খেলা হবে কিনা কে জানে।
মূরাদ একটু নড়ে চড়ে বসল। মার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মা আমি একটু রিমাকে নিয়ে বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম। ..যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে।’
‘না, আপত্তি আর কিসের।’ বলেলন মা। ‘তবে বাবা রাত কোরো না। বোঝই তো।’
‘না, রাত হবে না। সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব।’ রিমার দিকে তাকাল মূরাদ। রিমা মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে ডাকল মূরাদ, ‘রিমা?’
মূরাদের দিকে তাকালো রিমা। ভ্রু উঁচিয়ে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে মূরাদের চেহারায় কি যেন খুঁজল ক্ষাণিকক্ষণ। শেষে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘বসুন। আমি কাপড় পাল্টে আসি।’
উঠে দাঁড়াল রিমা।
৮
মাঝারি গতিতে গাড়ী চালাচ্ছে মূরাদ। রিমা তার পাশে চুপ করে বসে আছে। দৃষ্টি গাড়ীর ভিতরে, নিজের কোলের দিকে নিবদ্ধ। মূরাদ নিজেও কথা বলছে না অনেকক্ষণ ধরে। বাইরে বের হবার আগে মনে হচ্ছিল অনেক জরুরী কথা জানবার আছে তার রিমার কাছ থেকে। অথচ এখন ঠিক বুঝতে পারছে না কি কি জানতে হবে। তবে কিছু একটা যে তাকে জানতেই হবে এটা ঠিক।
‘সো’ অবশেষে শুরু করল মূরাদ। হালকা চালে বলল, ‘আমার মা বাবা তাহলে একজন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে।’
ধীরে সুস্থে মূরাদের দিকে তাকাল রিমা। তার চোখে কোন উত্তাপ নেই। নিজেকে সামলে নিল মূরাদ। আলাপের শুরুটা ভাল হল না। প্রসঙ্গ পাল্টালো সে।
‘তোমার এরকম আরো দু একটা কাহিনী থাকলে শোনাও। একটু শুনি।’
‘এটা ইয়ার্কি করবার কোন ব্যাপার নয়।’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রিমা। তার দৃষ্টি এখনও উত্তাপহীন।
‘না,’ তাড়াতাড়ি বলল মূরাদ। ‘আমি ইয়ার্কি করছি না, রিয়েলী। ...হ্যাঁ আমার বলার ভঙ্গিতে কিছুটা ইয়ার্কি ছিল। কিন্তু আমি সিরিয়াসলি তোমার ঘটনাগুলো শুনতে চাচ্ছি। ..আসলে আমি তোমাকে জানতে চাচ্ছি।’
রিমার দিকে তাকালো মূরাদ। কথাগুলো সে আন্তরিক ভাবেই বলেছে। তবে এত ঘটনার পর এখন আর তা রিমার মাঝে কোন প্রকার প্রভাব ফেলবার জন্যে যথেষ্ট নয়। রিমা তাকালো না মূরাদের দিকে। শীতল কন্ঠে বলল,
‘নিশ্চয় এতক্ষণে জেনে গেছেন আমি আপনার যোগ্য নই।’
কথাটা বুকে গিয়ে খোঁচালো মূরাদের। কি মনে করে তাকে মেয়েটা? চামার? উফ্.. মানুষ এত বিরক্তিকর হয়? রূঢ় কন্ঠে বলল,
‘এখানে যোগ্যতার প্রশ্ন আসছে কেন? তোমার ওদের প্রতি সহানুভূতি আছে তো.. আছে।’ একটু চুপ করে থেকে অনিশ্চিত কন্ঠে আবার বলল, ‘তুমি কি এজন্যেই বিয়েতে রাজী না?’
এই নিয়ে আজ দ্বিতীয়বারের মত কথাটার সম্মুখীন হল রিমা। সবাই ব্যাপারটাকে এভাবে দেখছে কেন? মূরাদের দিকে তাকাল সে। ‘রাজী না, একথা তো বলিনি।’
গম্ভীর হল মূরাদ। গোমরা মুখে বলল, ‘রাজী যে আছো একথাও তো বলছ না।’
এরা কেউই তার আসল সমস্যাটা বুঝতেই পারছে না। সে স্পষ্ট করে রাজী আছে বললেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে। অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল পর্যায়ে চলে আসবে। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল রিমা।
‘সংসার বাঁধতে গেলে দুজনের মাঝে মনের মিল থাকতে হয়।’
রিমার কন্ঠে বোধহয় একটা বেদনার সুর ছিল। সে সুর মূরাদকেও প্রভাবিত করল। হ্যাঁ, নির্ঝঞ্ঝাট সংসারের জন্যে মনের মিলটা জরুরী। আর তাদের দুজনের মধ্যে মানসিকতার দূরত্বটা অনেক। কমানো যায় না দূরত্বটা? কি জানি।
কথা থেমে গেল দুজনেরই। কিছুক্ষণ গাড়ী চালাবার পর মূরাদের মনে হল এই নিরবতা তাকে খুন করে ফেলবে। রিমাকে বাড়ী পৌঁছে দিয়ে তারও বাড়ী চলে যাওয়া উচিৎ। এমন সময় আবার কথা বলে উঠল রিমা।
‘আমাদের লালমাটিয়া স্কুলের সামনে কাদের ভাই নামে একজন চানাচুর বিক্রি করত।’
আচ্ছা, তাহলে এরকম আরো কিছূ ঘটনা আছে। এই মেয়ের তো দেখা যায় ঘটনাবহুল জীবন। ও কে, শোনা যাক তাহলে তার ঘটনা। স্টিয়ারিং হাতে নড়ে চড়ে বসল মূরাদ।
‘আমি রোজ তার কাছে চানাচুর খেতাম। শেষে অবস্থা এমন হল যে দূর থেকে আমাকে দেখেই কাদের ভাই চানাচুর বানানো শুরু করে দিত। একদিন তাকে বললাম,
“আচ্ছা কাদের ভাই আপনি যে চানাচুর বানাচ্ছেন, আমার কাছে যদি টাকা না থাকে?”
হাসল কাদের ভাই। বলল, “তয় কি হইছে, একদিন ফ্রি খাইবেন।”
আমি বললাম, “বলেন কি, আপনার লস হবে না?”
আবারও হাসল কাদের ভাই। বলল, “কথা নি কইলেন আফা? আন্নে আরে বাই কইছেন, আই বুঝি বইনেরে কদ্দুর চানাচুর খাওয়াইতাম হইত্তাম না।”
থামল রিমা। কি যেন ভাবল কিছুক্ষণ। মূরাদের কেন যেন মনে হল রিমার বোধ হয় কষ্ট হচ্ছে। অসহায় ভঙ্গিতে ডানে বাঁয়ে মাথা ঝাঁকাল রিমা।
‘আমি জানি না আমার সাথেই এদের এত খাতির হয় কেন। স্কুলে আরো তো অনেক মেয়ে আছে। আরো অনেকেই তো কাদের ভাইয়ের কাছ থেকে চানাচুর খায়। তবে আমার সাথে কেন?’ অসহায় এক ক্রোধ রিমার বুকে উথলে উঠল। ‘আমার জন্যে বাড়ীর সবার কত.. আমি তো.. আমি তো শখ করে সবাইকে কষ্টের মধ্যে রাখি।’
কান্না পাচ্ছে দেখে নিজের উপরই রেগে গেল রিমা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। মূরাদকে তার কান্না দেখাতে চায় না সে। হয়ত আর সবার মত মূরাদও বুঝবে না এসব।
মনটা খারাপ হয়ে গেল মূরাদের। সোমা কি জানে রিমা তাদের জন্যে কতখানি ফিল করে। হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে খুব কাছে টানতে ইচ্ছা করল মূরাদের। কিন্তু মেয়েটা যদি আবার রাগ করে। যা মেজাজ। হঠাৎ করে মূরাদের খুব অভিমান হল। রিমা তো নিজেই তার কাছে ধরা দিতে পারত। দুদিন পরে তাদের বিয়ে হচ্ছে। পরক্ষণেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরুল মূরাদের বুক চিরে। বিয়ের ব্যাপারটা এখনও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।
‘তারপর?’ প্রশ্ন করল মূরাদ। ‘কাদের ভাইয়ের কি হল?’
‘আমাদের ফেয়ারওয়েলের দিন, সবাই মিলে আমরা ছবি তুললাম। স্যার-ম্যাডামদের উপদেশ শুনলাম। পরীক্ষা কেমন হবে তাই নিয়ে আলাপ করলাম। আমার খুব ইচ্ছা হল কাদের ভাইয়ের সাথে আমার একটা ছবি তুলে রাখি। আমার এক বান্ধবী তুলে দিল ছবিটা। কাদের ভাই তার জামা কাপড় ঠিকঠাক করে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।’
সেদিনকার কথা মনে করে আনমনে হাসল রিমা। তাকে কখনও এভাবে হাসতে দেখেনি মূরাদ। একই দিনে দ্বিতীয়বারের মত মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেল সে। মেয়েটাকে বেপরোয়া হলেও ভাল লাগে, হাসলেও ভাল লাগে। পরক্ষণেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই মেয়ে কোথাকার কোন কাদের ভাইয়ের কথা মনে করে প্রাণের ভিতর থেকে হাসে অথচ আমার সাথে কথা বলবার সময় যেমন তেমন করে হাসে। কাদেরভাই, তোমারে যদি একবার পাইতাম আমি..।
‘তখনও আমাদের পরীক্ষা শুরু হয়নি। ম্যাডামদের সাথে মাঝে মাঝেই দেখা করতে যেতাম পড়াশুনার ব্যপারে। একদিন কাদের ভাইকে আমাদের দুজনের তোলা ছবিটা দিলাম।’
এক মুহূর্ত থামল রিমা। হয়ত নিজেকে গুছিয়ে নিল। ‘ছবিটা দেখে কাদের ভাইয়ের চেখে পানি চলে এল। হাত বাড়াল কাদের ভাই আমাকে দোয়া করার জন্যে। তারপর কি মনে করে যেন আমার মাথায় আর হাত রাখল না। দূর থেকেই দোয়া করল। কি বলল বুঝলাম না। শুধু ঠোঁট নড়ল তার।’
গলাটা কেঁপে উঠল রিমার। তার চোখের পাড় উপচে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে গিয়েও পড়ল না। ‘বোধহয় যা বলতে চাইল তা স্পষ্ট করে বলতে পারল না। মানুষ যখন খুব আবেগপ্রবণ হয় তখন সব কথা ঠিক মত বলতে পারে না।’
নাক টানল রিমা। তার চোখের কোলে জমে ওঠা অশ্রুগুলোও কোথায় যেন হারিয়ে গেল। রিমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল মূরাদ। একটা মানুষের বুকে কতখানি অভিমান চাপা থাকলে তার চোখের পানি চাওয়া মাত্র শুকিয়ে যেতে পারে তা অনুভব করবার মত মনের ক্ষমতা নেই তার।
‘স্কুলের পড়া শেষ হল।’ রিমার কন্ঠ এবার সংযত। ‘আমরা লালমাটিয়ার বাসাটাও ছেড়ে দিলাম। মন্ত্রী চাচা, কাদের ভাই, ময়লা ফেলার বুয়া এদের কারো সাথে আমার আর দেখা হয় না। এদের মুখের সেই হাসি, তাদের স্নেহ এসব যদি আমি মন থেকে মুছে ফেলতে না পারি তো কার কি এমন ক্ষতি হয়?’ আবারও কন্ঠ ভারী হয়ে এল তার। ডানে বাঁয়ে মাথা ঝাঁকাল রিমা। ‘আমি পারব না এদের ভুলে যেতে।’
সামনে ট্রাফিক সিগন্যাল। গাড়ী থামাল মূরাদ। সে জানে সে বড় মাপের কোন মানুষ নয়। কিন্তু সে কি রিমার কষ্টের বিন্দু মাত্র উপশমও হতে পারে না? রিমা তার কাছে ধরা দিচ্ছে না কেন? এতটা কষ্ট মানুষ কি করে বুকের মাঝে চেপে রাখে। আসলে তাকেই বোধ হয় রিমা নিজের যোগ্য বলে মনে করছে না।
‘স্যার, একটা মালা লন না। আপারে দিবেন। স্যার’। বকুল ফুলের মালা হাতে এক কিশোরী মূরাদের জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘কত?’
‘পাঁচ টাকা’।
‘দে একটা’।
মালা নিয়ে দশ টাকার একটা নোট বের করে দিল মূরাদ। মেয়েটা বাকি টাকা ফেরত জন্যে জামার মাঝে গুঁজে রাখা খুচরা টাকা বের করতে উদার কন্ঠে বলল মূরাদ,
‘রেখে দে। দিতে হবে না।’
মেয়েটার কালো চেহারার মাঝে সাদা দাঁতগুলো যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। ‘সালামালেকুম স্যার।’
অন্য গাড়ীর জানালায় ছুটল মেয়েটা। রিমার দিকে তাকাল মূরাদ। মালাটা বাড়ীয়ে ধরল।
‘আসলেই এদের হাসির মাঝে আলাদা একটা.. আঁ.. সজীবতা আছে।’
মালার দিকে হাত বাড়াল না রিমা। তাকালও না। শীতল কন্ঠে বলল, ‘যেটা মন থেকে আসে না সেটা করার কি কোন দরকার আছে?’
‘কেন? মেয়েটা তো মন থেকেই হাসল।’ মূরাদের দিকে তাকাল রিমা। উত্তাপহীন দৃষ্টি। ‘ও কে, কাজটা আমি মন থেকে করিনি।’ স্বীকার করল মূরাদ। রিমা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ‘তোমাকে খুশি করার জন্যে করেছি। আর আজীবন কাউকে জোর করে খুশি করা যায় না। জানি।’
সিগন্যাল পোস্টে সবুজ বাতি জ্বলে উঠল। মালাটা গাড়ীর ড্যাশর্বোডে রেখে গাড়ী চালাতে শুরু করল মূরাদ। তার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে সে মরিয়া হয়ে বলল,
‘রিমা আমি তোমার মত করে ওদের আপন করে নিতে পারি না, এটা ঠিক। কিন্তু আমি কখনও তাদের জন্তু জানোয়ারও মনে করি না।’ জানালা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মূরাদের দিকে তাকাল রিমা।
‘অনেকেই করে।’ সাফাই গাওয়ার ভঙ্গিতে বলল মূরাদ। ‘আমাদের অফিসের সুলতান সাহেব তার পিয়নের সাথে কুকুরের মত ব্যবহার করে। আমি করি না। শুধু অফিসের পিয়ন কেন, আমি কখনও কারো সাথে পারতঃপক্ষে অন্যায় আচরণ করি না।’
রিমা এখনও তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ‘হ্যাঁ আমি কখনও তাদের ঘাড়ে হাত রেখে খোশগল্প করব না। পারব না এটা আমি। তাদেরকে মাথায় তুললে তো আমার অফিস চলবে না।’
মূরাদের চেহারায় কি যেন খুঁজল রিমা। মৃদু কন্ঠে বলল, ‘আপনাকে সেটা কেউ করতেও বলছে না।’
চুপচাপ গাড়ী চালাতে লাগল মূরাদ। মেজাজ খাট্টা হয়ে গেছে তার। তার বন্ধুরাও তো বিয়ে করেছে। কোল ভর্তি বউ আর ঘর ভর্তি বাচ্চা নিয়ে ভালই আছে। বউ তাদের নিয়ে কি ভাবে না ভাবে তা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথাই নাই। সে কেন অযথা মরতে রিমার মন বুঝবার চেষ্টা করছে। পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হয়েছে। মেয়েটা একবারের জন্যেও সরাসরি না বলে নাই। দেখতেও বেশ সুন্দর। অন্তত তার বন্ধুদের বউদের চেয়ে সুন্দর। সবাইকে সে বলে বেড়াতে পারবে দেখেছিস আমার বউটা কত সুন্দর। আছে তোদের ঘরে এমন সুন্দর জিনিস?
অসহায় বোধ করল মূরাদ। সে জানে সে এমনটা করতে পারবে না। যারা নির্ঝঞ্ঝাট সংসার চায় তারাই কেন যে এই সব ঝঞ্ঝাটের মধ্যে পড়ে তা এক উপরওয়ালাই জানে। এটা তোমার অবিচার খোদা। ঠিক না। অন্যায় এটা।
‘এভাবে হয় না রিমা।’ মনের ক্ষোভ মুখেও এল মূরাদের। বিরক্ত কন্ঠে বলল, ‘তোমার যদি আমাকে পছন্দ না হয় তো বিয়েটা ভেংগে দাও না। আমি মা বাবাকে বুঝিয়ে বলব।’
‘কি বলবেন?’ ঘাড় কাৎ করে তাকাল রিমা।
‘বলব,’ মূরাদের বিরক্তি কমছে না। ‘তোমার হাতেম তাঈ অথবা হাজী মোহাম্মদ মহসিন মার্কা কাউকে দরকার। আমি তাদের কারো মত না।’
মূরাদের ছেলেমানুষী দেখে সুক্ষ্ম একটা হাসি ফুটল রিমার ঠোঁটে। খালা তখন জানতে চেয়েছিল সে মূরাদকে ভালবাসতে রাজী আছে কিনা। প্রশ্নের উত্তরটা এখন রিমা জানে। হাসিটা তার চেহারায় একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
তবে মূরাদ সেটা দেখতে পেল না। সে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। ড্যাশর্বোডে রাখা মালাটার দিকে হাত বাড়াল রিমা।
‘কে বলেছে আমার হাতেম তাঈ বা হাজী মোহাম্মদ মহসিন মার্কা কাউকে দরকার?’
‘বলার আর বাকি রেখেছটা কি?’ এখনও মূরাদ সামনের দিকে তাকিয়ে।
মালাটা আঙ্গুলে প্যাঁচাতে লাগল রিমা। ‘ঠিক আছে তাহলে কথা বলেন বাবা মার সাথে।’
ঝট করে রিমার দিকে তাকাল মূরাদ। খুব রাগ হল তার। কেন যেন মনে হচ্ছিল হয়ত শেষ পর্যন্ত বুঝবে তাকে রিমা।
‘তবে পুরো না হোক আধা হাতেম তাঈ হলেও আমার চলবে।’ চোখে কৌতুক নিয়ে বলল রিমা।
বিভ্রান্ত বোধ করল মূরাদ। হাসছে কেন মেয়েটা? আর তার হাসিটা মনে হচ্ছে যেন প্রাণ থেকে আসছে। এখানে গাড়ীর ভিতর কাদের ভাই, মন্ত্রী চাচা এরা কেউ নেই। তবে?
রিমার হাসিটা আরো বিস্তৃত হল, ‘তোমার মত।’
কয়েক মুহূর্ত মূরাদ ঠিক বিশ্বাসই করতে পারল না রিমা কি বলেছে। বোঝা মাত্রই চেঁচিয়ে উঠল বাচ্চা ছেলের মত, ‘ইয়েই-ই-ই-ই..’
মূরাদের এমন ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় প্রথমটায় ভড়কে গেল রিমা। পরক্ষণেই তার মনটা ভরে গেল মূরাদের সরলতা দেখে। সে নিজেও হো হো করে হেসে উঠল।
(একটি পত্রিকায় প্রকাশিত জনৈক পাঠিকার স্মৃতিকথা থেকে এই গল্পের কিছু উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে)
রচনা কালঃ ০৯/১১/২০০৬(রাত ১১টা ৩৮মিঃ) থেকে ২১/১১/২০০৬(রাত ১২টা ২০মিঃ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

