পর্ব - ১
পর্ব - ২
৫
আচ্ছা, ব্যাপার তাহলে এই। শূন্য প্লেটটা নামিয়ে রাখল মূরাদ। এক রিকশাওয়ালাকে রিমা তার আপন চাচা বলে পরিচয় দিয়েছে। এবং সোমা যেহেতু সে সময় ঐ স্কুলেই পড়ত, সুতরাং ঘটনাটা সোমাকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়। অল রাইট.. ফাইন.. ঠিক আছে। আনমনে মাথা ঝাঁকাল মূরাদ। এটা তেমন সিরিয়াস কোন ব্যাপারটা না। অল্প বয়সে মানুষ এরকম অনেক উল্টো পাল্টা ঘটনাই ঘটিয়েই থাকে। কিন্তু এর সাথে রিমার বিয়েতে রাজী না হওয়ার কি সম্পর্ক?
ঘরের সবার দিকে তাকাল মূরাদ। মা হতাশ চেহারা নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। খালা ধীরে ধীরে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন আর সম্ভবতঃ তাকে মনে মনে বিচার বিশ্লেষণ করছেন। চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন খালা। বেশ কড়া জিনিস, ভাবল মূরাদ। ছোটন গম্ভীর হয়ে আছে আর সোমা রাগে ছটফট করছে।
‘লজ্জা লাগে না তোর একটা রিকশাওয়ালাকে চাচা বলতে?’
‘এখানে লজ্জার কি আছে?’ রিমা আগের মতই গম্ভীর।
‘লজ্জার নাই?’ বলল ছোটন। ‘লোকে কত হাসাহাসি করে ..’
‘লোকের হাসাহাসিতে আমার কিছু যায় আসে না।’ সেদিন শিরিনের সাথে কথা বলবার সময়কার রাগটা যেন আবার বুকের ভিতর পাক দিয়ে উঠল রিমার।
‘ও।’ সোমার মেজাজ এবার সপ্তমে। ‘তোর কাছে তো একটা রিকশাওয়ালার হাসিই সব। হি ই ই ই..’ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে সোমা হাসির ভঙ্গি করল।
মাথা ঘুরতে লাগল মার। কি হচ্ছে এসব? সোমা কি বুঝছে না তার বোনের বিয়েটা ভেঙ্গে যেতে পারে। ধমকে উঠলেন তিনি। ‘সোমা।’
কিন্তু ততক্ষণে রিমাও উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। ‘হ্যাঁ মন্ত্রী চাচার হাসিতে আমি যা পেয়েছি তা আর কারো হাসিতে নাই।’
অবাক হল মূরাদ। রিমাকে তাহলে যতটা নিরীহ দেখায় ততটা নিরীহ সে নয়। এটা অবশ্য এক দিক দিয়ে ভালই। এই সমস্ত মেয়েরা নিজেদের খেয়াল নিজেরাই রাখতে পারে।
‘মন্ত্রী চা-চা,’ চোখ মুখ বিকৃত করে বলল সোমা। ‘উফ, কি পেয়েছিস তুই?’
‘তোরা সেটা বুঝবি না।’ হিসহিসিয়ে উঠল রিমা।
এবার চিন্তিত হল মূরাদ। এতটা রাগী একটা মেয়েকে বিয়ে করাটা কি ঠিক হবে? ঝগড়াটা যদি তার সাথে হত?
হঠাৎ কোত্থেকে যেন একরাশ কষ্ট উথলে উঠল সোমার বুকে। একেবারে ছোটবেলা থেকেই তাকে সহ্য করতে হচ্ছে আপার এই পাগলামীটা। ‘তোর জন্যে আমাকে বন্ধুদের কত ঠাট্টা সহ্য করতে হয় জানিস?’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল সোমা।
মনটা খারাপ হয়ে গেল মূরাদের। সোমার মত মেয়েদের চোখে কান্না মানায় না। রিমাও নরম হল। তবে নিজের জেদ থেকে সরলো না। মৃদু কন্ঠে বলল, ‘আমাকে তোর বোন বলে পরিচয় না দিলেই হয়।’
‘এসব কি কথা রিমা’। মৃদু ধমক দিলেন খালা।
চুপ মেরে গেল রিমা। সোমা স্যাঁৎ করে নাক টেনে তার চোখ দুটো দু হাতের ঝটকায় মুছল। তার রাগ কিছুতেই কমছে না। মূরাদের মনে হল এ পর্যায়ে তার কিছু বলা উচিৎ। সামান্য কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিল সে। চায়ের পটের দিকে হাত বাড়াতেই অস্থির হয়ে উঠলেন মা।
‘আমি দিচ্ছি বাবা’। চা ঢালতে শুরু করলেন মা।
‘ওয়েল,’ শুরু করল মূরাদ, ‘আমাদের পাড়ায় এক সেলুনওয়ালার সাথে আমার বেশ খাতির আছে। আমি রেগুলার তার কাছেই চুল কাটি। অন্য কারো কাছে কাটি না। এরকম কারো কারো প্রতি মানুষের দূর্বলতা থাকতেই পারে।’
ঘাড় কাৎ করে মূরাদের দিকে তাকালো রিমা। তার দৃষ্টি দেখে মনে হল সে যেন ঠিক বুঝতে পারেনি মূরাদ কি বলেছে। খালা তার চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে আয়েশ করে বসলেন। তার বোধহয় মূরাদকে যাচাই করা শেষ হয়ে গেছে। মা মূরাদের দিকে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে ধরলেন। তার কেন যেন মনে হতে লাগল বিয়েটা বোধ হয় আর ভাঙ্গছে না।
‘তাই বলে ময়লা ফেলা বুয়ার সাথেও?’ ছোট্ট করে বলল ছোটন। এতক্ষণ ধরে সে কথা বলার কোন সুযোগই পাচ্ছিল না।
চায়ের কাপটা মার হাত থেকে নিতে গিয়ে থমকাল মূরাদ। ঝট করে মা ছোটনের দিকে ঘুরে তাকলেন। ভড়কে গেল ছোটন। ঠিক বুঝল না কি এমন বলেছে সে। ছোট আপা তো এতক্ষণ অনেক কিছুই বলল।
‘ময়লা.. ময়লা ফেলার বুয়া?’ দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল মূরাদ। ঘরের অন্যদের দিকে তাকালো এক পলক।
‘হ্যাঁ।’ সোজা মূরাদের চোখের দিকে তাকাল রিমা। ‘কেন তারা মানুষ না?’
বিব্রত বোধ করল মূরাদ রিমার তীব্র দৃষ্টির সামনে। সোমা উপহাসের ভঙ্গিতে হেসে আনমনে ডানে বাঁয়ে মাথা ঝাঁকালো। আপাটা কোনদিনই পাল্টাবে না। নিজেকে সামলে নিল মূরাদ। সোমার হাসিটা কেন যেন তার বুকে গিয়ে বিঁধল। চায়ের কাপটা নিল মূরাদ। মৃদু কন্ঠে বলল,
‘না। মানুষ হবে না কেন?’
‘মানুষই যদি ভাবেন তাহলে মাসে মাসে তাদের মাত্র ত্রিশটা টাকা দিতে এত আটকায় কেন?’
আবারও বিভ্রান্ত বোধ করল মূরাদ। নাহ্, এই মেয়েকে বিয়ে করা যাবে না। এত প্যাঁচ সহ্য হয়? মূরাদের অবস্থা দেখে আবারও হেসে উঠল সোমা। মা সক্রিয় হলেন এবার।
‘হয়েছে বাবা, এসব আলাপ বাদ দাও তো।’
মার দিকে তাকাল মূরাদ। বাদ দেবে? কেন? খালার দিকে মাথা ঘোরাতেই তাঁর চোখে আবারও সেই পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি দেখল সে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার। আজ সে পুরো ব্যাপারটা বুঝে তবে ছাড়বে। অনেক হয়েছে, আর না। সোজা রিমার চোখের দিকে তাকাল সে এবার। কি আশ্চর্য! অন্যদিনের মত আজ আর মেয়েটা চোখ সরিয়ে নিচ্ছে না। ময়লা ফেলার বুয়া জিন্দাবাদ।
‘কিসের ত্রিশ টাকা?’ জানতে চাইল মূরাদ।
৬
এই ঘটনাটাও লালমাটিয়ায় থাকবার সময়কার। প্রতিদিন দুপুরের পর আসত ময়লা ফেলার বুয়া। দরজায় দাঁড়িয়ে বেল দিত। রিমাদের কাজের মেয়েটা তাদের সারাদিনের জমে ওঠা ময়লা ভর্তি ঝুড়িটা তার সামনে এনে রাখত। বুয়া ঝুড়িটা তুলে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো তার ভ্যান গাড়ীটাতে ময়লাগুলো সংগ্রহ করে আবার ঝুড়িটা রিমাদের ফেরত দিয়ে অন্য ফ্লাটের দিকে রওনা হয়ে যেত। পুরো ব্যাপারটা বুয়া এমন ভাবে করত যেন ময়লাগুলো যে ময়লা এটা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যাথা নাই। মাঝে মাঝে রিমার মনে হত বুয়া বোধ হয় বোঝেই না যে ওগুলো অন্যের ফেলে দেয়া খাবারের উচ্ছিষ্ট। মাসের শুরুতে শুধু টাকা দেবার সময় বুয়ার সামনা সামনি হত রিমার।
সেদিনও বুয়া ময়লা সংগ্রহ করার পর ঝুড়ি ফেরত দেবার সময় টাকাটা বাড়িয়ে ধরল সে।
‘বুয়া আপনার এমাসের টাকাটা।’
সাধারনতঃ টাকাটা নিয়েই রওনা হয়ে যায় বুয়া। সেদিন তার ব্যতিক্রম ঘটল। টাকাটা নিয়ে আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে অভিযোগের সুরে বলল,
‘আইচ্ছা আপা, ত্রিশটা টাকা কি বড়লোকগো কাছে কুনো টাকা, কন?’
‘কেন, কি হয়েছে?’
‘এই কয়ডা টাকার লাইগা যদি বাড়ী বাড়ী ধরনা দেওন লাগে, তয় যাই কই?’ বুয়ার কন্ঠে আক্ষেপ। ‘আমি ডেইলি দিন হেগো বাড়ীর ময়লা ডাষ্টবিনে নিয়া ফালাই। আর হেরা আমারে মাসে মাত্র ত্রিশটা টাকা ঠিক মত দিবার পারে না। এইডা কুনো কথা হইল আপা। আর আমি তো আপা হেগো কাছে ভিক্ষা চাইতাছি না। আমার খাটনির টাকা। আপনিই কন আপা আমি যদি আপনাগো ময়লা না টানতাম তাইলে কি আপনারা এত আরাম কইরা থাকতে পারতেন। গন্ধেই তো পাগল হইয়া যাইতেন।’
বুয়া আর দাঁড়ায় না অসহায় একটা ভঙ্গি করে সামনে এগিয়ে যায়। সেদিন থেকে রিমার ময়লা ফেলার বুয়া সম্পর্কে ধারণা পাল্টে গেল। এরপর থেকে মাস শেষ হবার সাথে সাথে সে মাকে স্মরণ করিয়ে দিত বুয়ার টাকার কথা। এবং যথারীতি মা বেশ বিরক্ত হতেন তার এই বাড়াবাড়ীতে।
চা-টা বেশ সুস্বাদু ছিল। কিন্তু আয়েশ করে খেতে পারল না মূরাদ। ভাবছে, বেগম রোকেয়া নারী জাগরণের জন্যে মেয়েদের স্কুল করেছিল, মুন্নুজান তার ভাই হাজী মোহাম্মদ মহসিনের হাতে তার সব সম্পত্তি তুলে দিয়েছিল দান দক্ষিণা করার জন্যে, চাঁদ সুলতানা তার রাজ্য রক্ষার জন্যে হাতে তলোয়ার তুলে নিয়েছিল, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মোমবাতি হাতে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা করেছিল, মাদার তেরেসা গরীব দুঃখীদের জন্যে আশ্রম বানিয়েছে। তার হবু বউ ঠিক কি করতে চায়? ময়লা ফেলার বুয়া ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নাকি রিকশাওয়ালা উন্নয়ন সংস্থা?
চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল মূরাদ। বোঝা গেছে এই মেয়েকে বিয়ে করলে কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু মুশকিল হল এই কদিনে মেয়েটাকে যে তার ভাল লেগে গেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মূরাদ।
‘হ্যাঁ। এটা আমরা ঠিক করি না। তাদের পারিশ্রমিকটুকু আমাদের টাইমলি দিয়ে দেয়া উচিৎ। দে ডিজার্ভ দ্যাট।.. কিন্তু এই বুয়ার প্রতি তোমার দূর্বলতা কেন? মানে, বুড়ো রিকশাওয়ালা না হয় এক সময় মন্ত্রী ছিলেন কিন্তু বুয়া..’
রিমার চোখে উষ্মা দেখে থেমে গেল মূরাদ। সোমা ও ছোটন হা হা করে হেসে উঠল। মা বিরক্ত হয়ে তাদের দিকে তাকালেন। খালা মূরাদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন। পুরোপুরি যেন সন্তুষ্ট হতে পারছেন না তিনি নিজের বিচার বিশ্লেষণ নিয়ে।
কাজের মেয়েটা এসে ট্রে গোছাতে লাগল। রিমা তখনও চুপচাপ। মূরাদের মনে হল রিমা বোধ হয় তার সাথে আর কোন দিনই কথা বলবে না। মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। সে বরাবরই নির্ঝঞ্ঝাট একটা সংসার কামনা করেছে। রিমাকে তার পছন্দও হয়েছিল। মা বাবাও পছন্দ করে মেয়েটাকে.. কিন্তু মেয়েটা যদি এমন পাগলাটে হয় তো..
‘আমরা যেদিন বাসা পাল্টাই,’ অবশেষে মুখ খুলল রিমা। ‘সে দিন..’
শেষ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১১ রাত ৯:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



