পর্ব-১
৩
রিমাদের প্রকান্ড দোতলা বাসাটার সামনে ঘন সবুজ ঘাসে ভরা লনে ব্যাডমিন্টন খেলছিল সোমা আর ছোটন। খেলতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই তাদের ঝগড়া লাগে। আবার মিটেও যায়। মিটে যায় মানে প্রত্যেকবারই ছোটনকে তার মেজ আপার কাছে সরি বলতে হয়। আজও ঝগড়া লাগতো। কারণ সোমা হারছিল। কিন্তু মূরাদের সাদা রংয়ের গাড়ীটা সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল। ছোটনই প্রথম দেখতে পেল গাড়ীটা।
‘আপা, দুলাভাই’।
মাথা ঘুরিয়ে দেখল সোমা মূরাদের গাড়ীটা। দেখেই তার চেহারায় একটা খুশীর ঝলক উঠল। অবশ্য এমনিতে সে খুব উচ্ছ্বল একটা মেয়ে। শুধু খেলার সময় হেরে যেতে শুরু করলেই যা একটু মুড অফ হয়ে যায়। খুশী খুশী কন্ঠে বলল, ‘আহ-হা, দুলাভাই। আর খেলব না’।
ছোটনের হাতে তার ব্যাডটা ধরিয়ে দিয়েই সোমা গাড়ী-বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। কর্কসহ ব্যাড দুটো নেটের খুঁটির কাছে নামিয়ে রেখে ছোটনও সোমার পিছু নিল।
‘কি খবর তোমাদের?’ গাড়ী থেকে বের হল মূরাদ।
‘আমার জিনিস এনেছেন?’ হাত পাতল সোমা।
গাড়ীর ভিতর থেকে একটা রিবন বাঁধা চকলেটের বাক্স বের করে আনল মূরাদ। সোমা চমৎকার করে একটা হাসি দিল। এই হাসিটা তার সব চেয়ে প্রিয় হাসি।
‘থ্যাংক ইউ’।
ব্যাপারটা পছন্দ হল না ছোটনের। ‘এত বড় হলি অথচ বাচ্চাদের মত চকলেট খাওয়াটা ছাড়তে পারলি না’।
এবার মূরাদ তার সেরা হাসিটা উপহার দিল ছোটনদের। গাড়ী থেকে আরো একটা চকলেটের বাক্স বের করে আনল। ছোটন তার দাঁতগুলোকে আর ঢেকে রাখতে পারল না। ছোঁ মেরে নিয়ে নিল বাক্সটা।
‘এবার কি? এবার? এবার কে বাচ্চাদের মত আচরণ করছে?’
সোমার কথায় ছোটন ঝট করে তার মূল্যবান দাঁতগুলো ঢেকে ফেলল। নিতান্ত অনিচ্ছায় যেন বাক্সটা ধরে আছে এমন ভঙ্গি করে বলল, ‘এটা তো আমি বড় আপার জন্যে নিলাম’।
মূরাদ আগ্রহী হয়। ‘তোমার বড় আপা চকলেট খায়?’
ভ্রূকুটি করে সোমা। ‘এখনও সেটা জানতে পারেন নাই। নাহ, আপনি মানুষটা এক্কেবারে আনাড়ী।’
অস্বস্তি নিয়ে হাসে মূরাদ। প্রসঙ্গ পাল্টায়। ‘বাসায় নেই ও?’
‘আপা আবার কোথায় যাবে?’ ছোটন বলল, ‘নির্ঘাত বই পড়ছে ঘরে বসে।’
সোমা কোমরে হাত রেখে মূরাদের উপর চড়াও হল। ‘আচ্ছা, দুলাভাই আপনি আপাকে কি বলেছেন?’
‘কেন?’ সাবধানে প্রশ্ন করল মূরাদ।
সোমা তার নিজস্ব ভঙ্গিতে হাত পা নেড়ে বলল, ‘আগে তবু আপা এখানে সেখানে বেড়াতে যেত। আপনার সাথে বিয়ে ঠিক হবার পর থেকে একেবারে সব বন্ধ। খালি আপনার সাথে যা একটু মাঝে মাঝে বাইরে যায়।’
‘হ্যাঁ,’ মাথা ঝাঁকাল ছোটন। ‘আপাটা না একেবারে ভেজিটেবল হয়ে গেছে’।
হাসে মূরাদ। ‘আমি তো তাকে ভেজিটেবল হতে বলিনি।’
সোমা কপট ভঙ্গিতে ভ্রু কুঁচকাল। ‘বিশ্বাস করব কথাটা?’
‘না করার কি আছে?’ কাঁধ নাচায় মূরাদ।
‘পুরুষদের বিশ্বাস নাই’। আগের ভঙ্গিতেই হাত পা নাড়ে সোমা। ‘বিয়ের পর তারা সবাই বউদের তালা বন্ধ করে রাখতে চায়।’
‘আমাদের এখনও বিয়ে হয়নি।’ আত্মরক্ষার ভঙ্গি করল মূরাদ।
‘দুদিন পরে তো হবে।’ চোখ নাচায় সোমা। ‘বলা যায় না এখন থেকেই হয়ত রিহার্সেল চলছে।’
এবার হেসে ফেলে মূরাদ। ‘পুরুষদের সর্ম্পকে তোমার দেখা যায় অনেক জ্ঞান।’
লাফিয়ে ওঠল ছোটন। ‘কি বলেন দুলাভাই? আপার তো..’
‘ছোটন, তোকে আমি...’ ছোটনকে মারতে উদ্যত হয় সোমা। সুড়ুৎ করে ছোটন মূরাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়। তবে এতে সোমার থেমে যাওয়ার কথা না। কিন্তু দরজায় মা এসে দাঁড়াতে এ যাত্রা বেঁচে গেল ছোটন।
‘স্লামালেকুম মা।’ মূরাদ সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
‘ওয়ালাইকুম সালাম বাবা।’ মা অস্থির হন। ‘এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ? ভিতরে এস।’ এবার সোমাদের ধরলেন তিনি। ‘এই তোরা কি রে, ছেলেটাকে এতক্ষণ ধরে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস?’
সোমার রাগ এখনও পড়ে নি। ছোটনও তাই মূরাদের পিছন থেকে বের হচ্ছে না। আপাতত মার কথায় কান দেবার মত সময় তাদের নাই।
‘না, ঠিক আছে। এদের সাথে গল্প করছিলাম।’ হাসে মূরাদ।
‘আস, ভিতরে আস।’ মা মূরাদকে নিয়ে ভিতরে যান। ছোটন মূরাদের গায়ের সাথেই লেগে থাকে। সোমা গাল ফুলিয়ে সবার শেষে থপ থপ করে পা ফেলে ভিতরে ঢুকল।
রিমাদের ড্রইংরুমটা ছিমছাম এবং রুচিশীল। ঘরে ঢুকলেই মনে একটা স্নিগ্ধতা এসে ভর করে। দেয়ালের হালকা আকাশী রংটা রিমার পছন্দ করা। আসবাবও বেশীর ভাগ তার পছন্দের। সোমা হলে অবশ্য আরো অনেক কিছু দিয়ে ঘরটাকে সাজাতো। তবে তার বন্ধুরা রুমের এই ডেকোরেশনটা পছন্দ করে বলে শেষ পর্যন্ত ঘরের ছিমছাম ভাবটা এখনও থেকে গেছে।
‘বস বাবা।’ মা বলেলন।
‘জ্বী।’ মা বসার আগে তার বসা ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতে শেষে বসেই পড়ল মূরাদ।
মা আরেকটা সোফায় বসে সোমাকে বললেন, ‘যা তো সোমা, রিমাকে বল মূরাদ এসেছে।’
‘আমি পারব না’। ঝাঁঝের সাথে বলল সোমা। সে একটা ডিভানে বসেছে। ‘ছোটনকে যেতে বল।’
ছোটন মূরাদের পাশে বসেছিল। নিজের সদ্য গজানো দাড়ি গোঁফে হাত বুলাতে বুলাতে উঠে দাঁড়ালো সে। ‘ঠিক আছে। আমিই যাচ্ছি।’
ঘর থেকে বের হতে হলে সোমার ডিভানের পাশ দিয়ে যেতে হবে। ছোটন এমন একটা ভাব করল যেন সোমা স্রেফ মশা মাছি ছাড়া আর কিছুই না। ধাঁ করে একটা লাথি ঝেড়ে দিল সোমা। ছোটন প্রস্তুত ছিল। লাফিয়ে সোমার আওতার বাইরে গিয়েই এক সেকেন্ডের জন্যে ঘুরে দাঁড়ালো। তার দাঁতগুলো সব বেরিয়ে পড়েছে। সোমা কটমট করে তাকালো। পাত্তাই দিল না ছোটন। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সোমাদের আচরণে বিরক্ত হলেন মা। কিন্তু মূরাদের সামনে কিছু বলতে পারলেন না। মৃদু হাসল মূরাদ ছোটনদের ছেলেমানুষী দেখে। মা বললেন, ‘তারপর বাবা, বেয়াই, বেয়াইন কেমন আছেন?’
‘জ্বি, ভাল।’ সোজা হয়ে বসল মূরাদ। ‘আপনাদের সালাম জানিয়েছে। .. আব্বা বাসায় নেই মা?’
‘না। এইমাত্র বের হল।’ আলাপী ভঙ্গিতে বললেন মা। ‘ওর এক বন্ধু, সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেছে। ওকেই দেখতে গেছে।’
‘কবে ভেঙ্গেছে? আজকে?’ তার কি উতলা হওয়া উচিৎ? ভাবল মূরাদ।
‘না, সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল। বুড়ো হাড় তো বাবা জোড়া লাগবে কিনা আল্লাহই জানে। তোমার আব্বা প্রতিদিনই একবার করে দেখা করে আসে।’
সপ্তাহ খানেক আগের ঘটনা যখন তখন আর উতলা হবার দরকার নাই। তবে ভাঙ্গা হাত পা নিয়ে বোধ হয় কিছুক্ষণ আলোচনা করা উচিৎ। জানা শোনা কারো হাত পা ভাংবার কোন ঘটনা আছে কিনা মনে করতে চেষ্টা করল মূরাদ। জামাই হওয়াটা বেশ ঝামেলার কাজ।
‘আপা আসছে’। খালাকে সাথে নিয়ে ঘরে ঢুকল ছোটন।
মূরাদ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মা খালাকে দেখিয়ে বললেন, ‘মূরাদ, এ তোমাদের বড় খালা।’
‘স্লামালেকুম।’ ঝট করে উঠে দাঁড়ালো মূরাদ।
খালা হাত নেড়ে বসতে বললেন, ‘বস বাবা, বস।’
বসল না মূরাদ। খালা না বসা পর্যন্ত সে বসে কেমন করে। তবে ছোটনের তো সে সমস্যা নাই তাই সে নির্দ্বিধায় সোমার পাশে বসে পড়ল। সোমা একটা ভেংচি কেটে অন্যদিকে ঘুরে বসল। ছোটন নির্বিকার ভাবে তার দাড়ি গোঁফগুলো কবে থেকে কামানো শুরু করা উচিৎ তাই নিয়ে গবেষণা করতে লাগল।
‘আপনার সাথে আমার, খালা, এংগেজম্যান্টের দিনে পরিচয় হয়েছিল।’ আলাপ শুরু করতে চেষ্টা করল মূরাদ।
‘হ্যাঁ,’ তৃতীয় সোফাটায় বসলেন খালা। মূরাদও বসল। ‘এরপরে তো আমার আর এদিকে আসা হয়নি। তা তুমি এখন কি করছ?’
এবার সাচ্ছন্দ বোধ করল মূরাদ। এ সমস্ত বিষয়ে অনেকক্ষণ আলাপ চালানো যায়। ‘আমি খালা একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানীতে আছি। জোনাল ডিরেক্টর। হেড অফিসেই বসি আমি।’
‘গুড। অল্প বয়সেই অনেক দূর এগিয়েছো।’
‘জ্বি খালা আপনাদের দোয়া। ..খালু আসেনি, খালা?’
ছোটন আর সোমা হি হি করে হেসে উঠল। মার মুখেও হাসির রেখা দেখা দিল। খালা বিরক্ত ভঙ্গিতে সোমাদের দিকে তাকালেন। মূরাদ একটু ভড়কে গেল। জামাই হওয়াটা আসলেই বেশ কঠিন কাজ। মা উঠে দাঁড়ালেন।
‘তোমরা গল্প কর। আমি আসছি।’ চলে গেলেন মা।
‘আমি কি খালা.. মানে.. ভুল কিছু..’ মূরাদ পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা চালালো।
‘দুলাভাই,’ সোমা কলকল করে উঠল। তার মন ভাল হয়ে গেছে। ‘খালা যতবারই আমাদের বাসায় আসে ততবারই আমরা সবাই তাকে জিজ্ঞাসা করি, খালু কই, খালু কই, খালু কই? আর খালা..’
‘তোমার খালুরও আসার কথা ছিল।’ সাফাই গাইলেন খালা। ‘কিন্তু হঠাৎ করে অফিসের কাজের চাপ..’
খালাকে শেষ করতে দিল না ছোটন। ‘খালুর কাজের চাপ তো সব সময়ই থাকে।’
‘কেন এংগেজম্যান্টের অনুষ্ঠানে তো খালু এসেছিলেন।’ খালাকে সাহায্য করতে চাইল মূরাদ।
ছেলেটার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলেন খালা। ‘পারিবারিক কোন অনুষ্ঠান সে কখনই মিস করে না, বাবা। কিন্তু এর বাইরে কোথাও তাকে নিয়ে যাওয়া? অসম্ভব।’
‘দুলাভাই,’ সোমার চোখে মুখে কৌতুক খেলে গেল। ‘এখন তো খুব আসছেন এ বাড়ীতে। বিয়ের পরে আপনিও খালুর মত হয়ে যাবেন না তো?’
‘ঠিক বুঝতে পারছি না।’ হাসল মূরাদ।
‘আপনি বোঝেনটা কি?’ ছোটন বলল। ঝগড়া শেষ। তাই ছোটন আর সোমা এখন একাট্টা। সোমা উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘আপাকে বোঝেন?’
মূরাদ ছোট্ট করে ডানে বাঁয়ে মাথা ঝাঁকালো। তাতে সোমার উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। ‘আপাকে বুঝতে হলে আপনাকে.. হি হি হি..’
‘রিকশাওয়ালা, ফকির, মিসকিন এদের সাথে গিয়ে থাকতে হবে।’ ছোটনও হাসছে।
‘জ্বী?’ মূরাদ হতভম্ভ হয়।
‘হি হি হি..’ সোমা যেন পণ করেছে আজ বড় আপার একটা হেস্তনেস্ত সে করেই ছাড়বে। ‘আপনি জানেন আপার এক চাচা রিকশা চালায়।’
‘মানে?’
‘শোনেন,’ সোমা বলে, ‘এক দেশে ছিল এক রিকশাওয়ালা ..’
ছোটনও সোমার সাথে সুর মিলাল। ‘সে সারা দিন ধরে শুধু রিকশা চালাতো।’
‘আর কপালের ঘাম মুছত।’ সোমার আরো বলার ইচ্ছা ছিল কিন্তু বলা হল না। রিমা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার চেহারা রাগে থম থম করছে।
‘সোমা, ছোটন সব কিছুর একটা সীমা থাকে।’
‘সেটা তো তুই-ই বুঝিস না।’ সমান তেজে বলল সোমা।
‘সোমা।’ ধমক দিল রিমা।
‘ব্যাপারটা কি?’ মূরাদ এবার রিমার কাছে জানতে চাইল।
মা ঘরে ঢুকলেন। সাথে খাবারের ট্রে হাতে কাজের মেয়ে। ঘরের পরিস্থিতি দেখে নিজেকে অভিশাপ দিলেন মা। কেন যে তিনি ভিতরে গিয়েছিলেন? আর আপাটাও যে কি, সে কি থামাতে পারত না সোমাদের। কাজের মেয়েটা টেবিলে ট্রে রাখতেই মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
‘কিছু না বাবা। তুমি নাস্তা কর।’ তারপর কড়া গলায় বললেন, ‘সোমা, ছোটন ভিতরে যা।’
‘আমরা আবার কি করলাম?’ ভ্রু কুঁচকে বলল সোমা। মা তার দিকে কড়া চোখে তাকালেন।
‘না, ঠিক আছে। ওদের আবার তাড়াচ্ছেন কেন?’ মূরাদের কথায় থেমে গেলেন মা এক মুহূর্তের জন্যে।
বিব্রত বোধ করল মূরাদ। তার কন্ঠস্বরটা কি একটু বেশী রূঢ় হয়ে গেল। কিন্তু রিমা সেদিন বলেছিল বিয়েতে তার মতামতে নাকি কিছুই যায় আসে না। কেন বলেছিল?
মা মূরাদের হাতে নাস্তার প্লেটটা তুলে দিলেন। ভরা প্লেট। যেন প্লেট ভর্তি করে নাস্তা দিলে ব্যাপারটা আর আগে বাড়বে না। মা আবার বললেন, ‘তুমি বাবা ওদের কথায় কান দিও না। ওরা তো সারাক্ষণই ..’
‘নাঈমা,’ এবার মুখ খুললেন খালা। ‘মূরাদ যখন শুনতে চাচ্ছে তখন তাকে শুনতে দে।’
নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না মা। বলে কি আপা? হতবুদ্ধের মত খালার দিকে ঘুরে তাকালেন মা। খালার মাঝে কোন অস্থিরতা নেই। ধীর স্থির কন্ঠে বললেন, ‘বিয়েটা সারা জীবনের ব্যাপার।’
আর কিছু বললেন না মা। বলতে পারলেন না। পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সোফার উপর তার শরীরের ভার ছেড়ে দিলেন তিনি। এই মেয়েটা ছোট বেলা থেকেই তাকে জ্বালিয়ে মারল। এত ভাল পাত্র। তার বোঝা হয়ে গেছে, এই বিয়েটা আর হচ্ছে না। আর আপা, তোমার আমি কি ক্ষতি করেছিলাম যে.. আর ভাবতে পারলেন না মা।
খালার পাশে বসেছে রিমা। চিবুক উঁচু করে বসেছে। কিন্তু দৃষ্টি মেঝের দিকে। থমথম করছে তার সারা মুখ। মূরাদ নাস্তার প্লেটটা হাতে নিয়ে এক দৃষ্টিতে রিমার দিকে তাকিয়ে থাকল। কি এমন ব্যাপার যা নিয়ে এরা সবাই এত উত্তেজিত?
রিমার ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে বোধহয় এমন পাথর হয়েই বসে থাকবে। তবে সোমা নিশ্চিত জানে আপা মুখ খুলবেই। তাই সে মজা দেখবার জন্যে রিমার দিকে তাকিয়ে আপন মনে পা ঝাঁকাতে লাগল। ছোটন পালা করে মূরাদ, রিমা আর সোমার দিকে তাকাচ্ছে। এরপর কি হয় বুঝতে চেষ্টা করছে সে।
অবশেষে ধ্যান ভাঙ্গল রিমা। মুরাদের দিকে তাকালো। তার চোখে মুখে বেপরোয়া ভাব। কেন জানে না রিমার এই ভাবটা হঠাৎ করেই ভাল লেগে গেল মূরাদের। এতক্ষণ পরে তার খেয়াল হল সে খাবার প্লেট হাতে নিয়ে আছে অথচ খাচ্ছে না। খেতে শুরু করল মূরাদ। রিমা বলতে শুরু করল।
৪
রিমা তখন বেশ ছোট। ক্লাশ এইটে পড়ে। তখনও তারা বারিধারায় নিজেদের এই বাড়ীটায় এসে ওঠেনি। লালমাটিয়ায় ভাড়া থাকত। রিমা আর সোমা দু’জনেই লালমাটিয়া স্কুলে পড়ত। সোমাকে বাবা অফিস যাবার সময় স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যেতেন। তারা দুজনে বেশ সকালে বাসা থেকে বের হত। এদিকে সোমারা বেরিয়ে যাবার পর ঘুম ভাঙ্গত রিমার।
গল্পের বইয়ের নেশা তার ছোট বেলা থেকেই। কিন্তু মা সারাক্ষণ নাকের সামনে গল্পের বই নিয়ে পড়ে থাকাটা একদম সহ্য করতে পারেন না বলে প্রায়ই ঘরের দরজা লাগিয়ে রাত জেগে গল্পের বই পড়ত রিমা। আর তাই সকালে স্কুলে যাবার সময় তার তাড়াহুড়া লেগে যেত। কোন রকমে নাস্তা সেরেই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে ছুটে বেরিয়ে যেত।
সেদিনও সে প্রায় ছুটতে ছুটতে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালো রিকশার আশায়। ডানে বাঁয়ে তাকালো। রাস্তার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত কোথাও কোন রিকশা নাই। সারা রাস্তা হাহাকার করছে। ঘড়ি দেখল রিমা। আজ নির্ঘাত সময় মত স্কুলে পৌঁছাতে পারবে না। ইতিমধ্যেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। আবার ডানে বাঁয়ে তাকালো রিমা অস্থিরভাবে। নাহ্, আজ আর রিকশা পাওয়া যাবে না। সুতরাং এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না। হাঁটতে শুরু করল রিমা। এমন সময় একটা রিকশাকে দেখা গেল। মোড় ঘুরে হেলে দুলে এগিয়ে আসছে।
‘এই রিকশা। .. যাবেন?’ চেঁচালো রিমা।
রিকশাটা তাকে লক্ষ্য করে এগুতে লাগল বটে কিন্তু তার চলার গতিতে কোন পরির্বতন আসল না। আগের মতই হেলে দুলে আসছে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল রিমার। নিশ্চয়ই যেতে রাজী হবে না। কোন কোন রিকশাওয়ালা এত নবাব হয় না যে পিত্তি জ্বলে যায়।
‘কই যাইবেন?’ কাছে এসে থামল রিকশাটা।
‘লালমাটিয়া স্কুল।’
‘ওঠেন।’
যাক, যেতে রাজি হয়েছে তাহলে। লাফ দিয়ে উঠে পড়ল রিমা। চলতে শুরু করল রিকশা। কিছুদূর যাবার পরে রিমার খেয়াল হল সে ভাড়া ঠিক না করেই রিকশায় উঠেছে। চিন্তায় পড়ে গেল রিমা। এখন কি হবে? রিকশাওয়ালা নির্ঘাৎ নামবার সময় ভাড়া নিয়ে ঝামেলা পাকাবে। রিকশাওয়ালাগুলো এতো বদ, মহিলা বা কমবয়সী কোন যাত্রী পেলেই বেশী করে ভাড়া আদায় করে ছাড়ে। তাই উঠবার সময় ভাড়া ঠিক করে না নিলে মহা বিপদ।
ঝামেলার পরিমাণ কতখানি হতে পারে সেটা যাচাই করবার জন্যে রিকশাওয়ালার দিকে ভাল করে তাকাতেই রিমার বুকটা শুকিয়ে গেল। ওমা, রিকশাওয়ালা তো বুড়া। আজকে আমার কপালে দুঃখ আছে। নাইনটি নাইন পার্সেন্ট বুড়া রিকশাওয়ালা ঝামেলাবাজ হয়।
রিকশা থামল স্কুলের গেটে। রিমা নামল। মুখ শক্ত করে ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিয়ে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে ধরল রিকশাওয়ালার দিকে। রিকশাওয়ালা ঝামেলা করল না, গাঁই গুঁই কিচ্ছু করল না। বরং বিনয়ে বিগলিত একটা হাসি দিয়ে টাকাটা নিল। যেন পাঁচ টাকা নয় পাঁচশ টাকা দেয়া হয়েছে তাকে।
আর যাই হোক এটা অন্ততঃ আশা করেনি রিমা। হতভম্ব চোখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়োর রিকশা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যাওয়া দেখতে লাগল। ঘন্টার শব্দ কানে যেতে দ্রুত গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকল রিমা। ক্লাস রুমের দিকে হাঁটা দিল। কিন্তু ব্যাপারটাকে সারাদিন মাথা থেকে সরাতে পারল না। অবশ্য ঐ বয়সে মাথায় একটা কিছু ঢুকলে সহজে সেটা বের হতেও চায় না।
পরদিন সকালে মোড়ে এসে দাঁড়াতেই বেশ কয়েকটা রিকশার মাঝ থেকে গতকালকের বুড়ো তার রিকশাটা টেনে এনে রিমার সামনে এসে দাঁড়াল। হাসি মুখে বলল,
‘আসেন। ..স্কুলে যাইবেন তো?’
‘হ্যাঁ।’ উঠে পড়ল রিমা। আজকে আর ভাড়া ঠিক করার তাগিদ অনুভব করল না। বোঝা হয়ে গেছে, এই বুড়ো ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করবে না।
‘তুমি কোন কেলাসে পড় মা?’ কিছু দূর যাবার পরে প্রশ্ন করল বুড়ো।
‘এইটে।’
‘আমার মাইয়াটা কেলাস ফাইব পর্যন্ত পড়ছে। তারপরে আর পড়াইতে পারি নাই। দুই বছ্ছর হইল বিয়া দিছি।’
কিছু বলল না রিমা। কিছু বলবার নাই এই জাতীয় কথাবার্তার প্রেক্ষিতে। বুড়ো আবার প্রশ্ন করল, ‘তুমি বড় হইয়া কি হইবা মা?’
‘এখনও ঠিক করি নাই।’
‘ডাক্তার না হয় মাস্টার হইও মা। ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটা মাইয়া গো লাইগা কঠিন।’
হেসে ফেলে রিমা। ‘আমি চাচা ইঞ্জিনিয়ারই হব।’
‘তা হইও। আইজকাল দিন পাল্টাইছে। মাইয়া আর পোলাতে তেমন কম বেশ নাই। ..জানো মা আমি কিন্তু আগে মন্ত্রী আছিলাম।’
‘হি হি হি..’ বেশ মজা পায় রিমা। সেই সাথে এই বুড়ো মানুষটাকে তার ভাল লেগে যায়।
‘না মা সত্যি কইতাছি। আমি আগে মন্ত্রী আছিলাম। সবাই আমারে সালাম দিত।’
‘হি হি হি.. ঠিক আছে, আপনাকে তাহলে আমি মন্ত্রী চাচা বলে ডাকব.. হি হি হি।’
সারাটা রাস্তা রিমার এমনি করে বুড়োর মজার মজার কথা শুনতে শুনতে পেরিয়ে গেল। সেই সাথে দুই জনের মধ্যে যেন একটা অকথিত চুক্তি হয়ে গেল। প্রতিদিন রিমা মন্ত্রী চাচার রিকশা করে স্কুলে যাওয়া আসা করতে লাগল। বুড়োও ঠিক সময় মত রিমাকে নেবার জন্যে এসে হাজির হয়ে যেত। কোনদিন যদি মন্ত্রী চাচার সাথে দেখা না হত, তার সেই বিগলিত উদার হাসি না দেখতে পেত তবে সারাটা দিন কেমন যেন নিরানন্দ যেত রিমার।
মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে মন্ত্রী চাচাকে না পেয়ে শেষে হয়ত অন্য রিকশা ভাড়া করে ফেলেছে, এমন সময় দেখা গেল মন্ত্রী চাচার রিকশা আসছে। সাথে সাথে রিমা ঐ রিকশাকে বাদ দিয়ে মন্ত্রী চাচার রিকশায় উঠেছে। ভাড়া করা রিকশাওয়ালা চেঁচামেচি করেছে। কিন্তু রিমা মন্ত্রী চাচার রিকশাতেই উঠেছে। শেষে অবস্থা এমন হল যে মন্ত্রী চাচা উপস্থিত থাকলে ঐ মোড়ের আর কোন রিকশাওয়ালাই রিমাকে তাদের রিকশায় উঠবার জন্যে ডাকত না।
প্রত্যেকদিনকার মত মন্ত্রী চাচার গল্প শুনতে শুনতে স্কুলের গেটে নেমে ভাড়া দিয়ে রিমা বলল, ‘আসি চাচা। আস্লামালেকুম।’
‘ওয়ালাইকুম সালাম মা’।
হেসে রিকশা ঘোরালো মন্ত্রী চাচা। রিমাও ঘুরল ভিতরে ঢুকবার জন্যে। তার ক্লাসের সনিয়া সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘উনি কি তোর চাচা?’
সনিয়ার হাবভাবে বেশ মজা পেল রিমা। হালকা চালে বলল, ‘হ্যাঁ।’
রিমা ব্যাপারটাকে যতই মজার হিসাবে নিক, ব্যাপারটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর মজার থাকল না। দুদিন পরে তাদের ক্লাসের শিরিন তাকে টানতে টানতে বারান্দার নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে এল। তারপর কন্ঠে কিছুটা অবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করল,
‘তোর কোন চাচা নাকি রিকশা চালায়?’
কিছুক্ষণ শিরিনের দিকে তাকিয়ে থাকল রিমা। ব্যাপারটা নিয়ে যে সবার মাঝে এরকম প্রতিক্রিয়া হবে ভাবেনি সে। কেন যেন হঠাৎ করে খুব রাগ হল তার। যদিও জানে ব্যাপারটা আরো খারাপ চেহারা নিতে পারে তারপরও খুব নির্বিকার কন্ঠে সে বলল,
‘হ্যাঁ, আমার আপন চাচা’।
পর্ব - ৩
শেষ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১১ রাত ৯:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



