somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কুর'আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো - ১৪

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ৯:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:



আল্লাহর জন্য বিশ্বস্তভাবে পবিত্র কুর’আনকে অনুসরণ করার চিরস্থায়ী ফলাফল


পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবেন যে, এই অধ্যায়ের যে অংশটুকু আমরা ইতোমধ্যে পার হয়ে এসেছি, সে অংশে আমরা এই পৃথিবীর জীবনে পবিত্র কুর’আনের প্রভাব নিয়ে মূলত আলোচনা করেছি। আরো এগিয়ে যাবার আগে, কুর’আনের সাথে লেগে থাকার ফলে আমাদের উপর এর চিরস্থায়ী প্রভাব নিয়ে আলোচনা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে এই পৃথিবীর জীবনে কুর’আনের প্রভাবের চেয়ে বরং চিরস্থায়ী জীবনের উপর কুর’আনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ - যদিও দুটো দিকই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পবিত্র কুর’আন নাযিল হয়েছে মানুষকে এই জীবনের কর্মকান্ডে দিক নির্দেশনা দিতে, যাতে সে আল্লার কাছে পছন্দনীয় হয় এবং আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের পথে পরিচালিত হয়। পৃথিবীতে কুর’আনকে অনুসরণ করার ফলে যদি উদ্দিষ্ট ও কাঙ্খিত ফলাফল না পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে যে, পবিত্র কুর’আনকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী সহকারে দেখা, বোঝা বা অনুসরণ করা হয়নি। আর ব্যাপারটা যদি সেরকমই হয়, তবে কেউ যেমন পার্থিব জীবনে কুর’আনের সুফল লাভ করতে ব্যর্থ হতে পারেন, তেমনি আরো দুঃখজনকভাবে কুর’আনের পারলৌকিক সুফল থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।

এ সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা‘আলা কুর’আনে বলেন :

“..........যে কেউ আমার দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করলে তাদের জন্য ভয়ের বা দুঃখের কোন কারণ থাকবে না। যারা অবিশ্বাসী এবং যারা আমাদের আয়াতসমূহের ব্যাপারে মিথ্যা আরোপ করে, তারা হচ্ছে জ্বলন্ত আগুনের বাসিন্দা এবং সেখানেই তারা চিরকাল থাকবে।” (সূরা বাক্বারা, ২:৩৮-৩৯)

কুর’আন অনুসরণ করার সুফল বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন যে, কুর’আনের অনুসরণকারী পৃথিবীতে যেমন পথভ্রষ্ট হবে না, তেমনি আখিরাতেও সে দুর্দশাগ্রস্ত হবে না। ঐ ব্যক্তিকে যেমন ভবিষ্যতে তার জন্য কি রয়েছে তা নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হতে হবে না, তেমনি অতীতে যা ঘটে গিয়েছে তা নিয়েও সে হাহুতাশ করবে না। পবিত্র কুর’আন হচ্ছে “নূর” (একটি আলো) যেমনটা আমরা আগেই বলেছি। অথচ, যে সে আলো অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয় তাকে পুরস্কৃত করা হয় “নার” (আগুন) দিয়ে।

ইবনে আব্বাস (রা.) আরো বলেন, “যে কুর’আন পড়বে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করবে, সে যে কখনোই বিপথগামী হবে না অথবা পরবর্তী জীবনে দুদর্শাগ্রস্ত হবে না সে ব্যাপারে আল্লাহ্ নিশ্চয়তা দিয়েছেন।” একথা বলে তিনি কুর’আনের নিম্নলিখিত আয়াতটি পাঠ করেন :

“.......আমার কাছ থেকে যদি তোমাদের কাছে একটি দিক নির্দেশনা আসে, তাহলে যে তা অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না অথবা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হবে না। কিন্তু আমার বাণী থেকে যে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য থাকবে এক সংকীর্ণ জীবন, এবং তাকে আমরা শেষ বিচারের দিনে অন্ধ করে পুনরুত্থিত করবো। সে বলবে, ‘হে আমার প্রভু, আমার তো পূর্বে দৃষ্টি ছিল, তাহলে আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় পুনরুত্থিত করলেন কেন?’ আল্লাহ্ বলবেন, ‘এভাবেই তুমি আমাদের আয়াতসমূহকে অবজ্ঞা করেছিলে যখন সেগুলো তোমার কাছে পৌঁছেছিল। তাই আজকের দিনে তোমাকেও অবজ্ঞা করা হবে।’ ” (সূরা তা-হা, ২০:১২৩-১২৬)

অর্থাৎ যে বিশ্বস্ততার সাথে কুর’আনের কাছে যাবে, সঠিকভাবে তা শিখবে এবং জীবনে প্রয়োগ করবে - সেই ঐ সরল পথ অনুসরণ করে যা কিনা ইহকালে ও পরকালে আল্লাহর আর্শীবাদপুষ্ট।
আল্লাহ্ আরো বলেন :

“নিশ্চয়ই এই কুর’আন যা সবচেয়ে সঠিক তার দিকেই পরিচালিত করে এবং ঐ বিশ্বাসীদের চমৎকার পুরস্কারের সুসংবাদ দেয় যারা সৎকাজ করে। আর যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের জন্য আমরা যে বাস্তবিকই এক কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেছি, এটা তারও ঘোষণা দেয়।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯-১০)

এই কুর’আনে বিশ্বাস এবং এর অনুসরণ হচ্ছে আল্লাহর রহমতের চাবিকাঠি। আল্লাহ্ বলেন :

“এবং এটা হচ্ছে এমন একটি কিতাব, যা আমরা এক রহমত স্বরূপ তোমাদের কাছে প্রেরণ করেছি : সুতরাং এটা অনুসরণ কর ও ন্যায়পরায়ণ হও - যেন তোমরা রহমত লাভ করতে পার।” (সূরা আন্‘আম, ৬:১৫৫)

আল্লাহর রাসূল (সা.) পবিত্র কুর’আন সম্বন্ধে বলেছেন : “পবিত্র কুর’আন হচ্ছে এমন এক মধ্যস্থতাকারী যার মধ্যস্থতা গ্রহণ করা হবে এবং এমন এক সুপারিশকারী যাকে বিশ্বাস করা হবে। যে এটাকে তার সামনে রাখবে (অর্থাৎ, এর দ্বারা পরিচালিত হবে) এটা তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে, এবং যে এটাকে তার পিছনে রাখবে (অর্থাৎ, এর দিক-নির্দেশনাকে অবজ্ঞা করবে) এটা তাকে জাহান্নামের আগুনে নিয়ে যাবে।” (তাবারানী, বাইহাকী - আলবানীর মতে সহীহ)

আল মুনাওয়ী এই হাদীসের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, কোন ব্যক্তি যদি কুর’আনের দিক নির্দেশনা ও নীতি অনুযায়ী তার জীবনকে পরিচালনা না করে, তাহলে সে নিশ্চয়ই অন্য কোন নীতির ভিত্তিতে তার জীবন পরিচালনা করছে। আর সেজন্যই জাহান্নামের আগুন তার প্রাপ্য হয়ে দাঁড়ায়। অপরপক্ষে সে যদি কুর’আন অনুযায়ী তার জীবন পরিচালনা করে, তাহলে কুর’আনই তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।

আমরা আগে যেমন বলেছি - শেষ বিচারের দিনে পবিত্র কুর’আন হয় কারো পক্ষে অথবা, তার বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ কাজ করবে। রাসূলের (সা.) আরেকটি হাদীসে পৃথিবীর জীবনকে যে কুর’আন অনুযায়ী পরিচালিত করে, তার সাহায্যার্থে কুর’আন কিভাবে কাজ করবে তা তিনি বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা.) বলেন : “পুনরুত্থান দিবসে পবিত্র কুর’আনকে, যারা তা অনুযায়ী জীবন যাপন করেছে তাদের সাথে একত্রে হাজির করা হবে, যখন সূরা বাক্বারা এবং আলে ইমরান তাদের অগ্রগামী হবে।” রাসূল (সা.) তাদের তিনটি জিনিসের সাথে তুলনা করেছেন যা আমি (বর্ণনাকারী আন-নাওয়াস ইবনে সাম’আন) ভুলিনি। তিনি বলেন, “তারা হচ্ছে দুটো মেঘখণ্ডের মতো অথবা দুটো কালো সামিয়ানার মত যাদের ভিতরে আলো থাকবে, অথবা সারিবদ্ধ দুই ঝাঁক পাখির মত যারা ঐসব ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে, যারা তাদের তিলাওয়াত করেছে।” (মুসলিম)

এই প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) আরো বলেছেন : “কুর’আনের পাঠকদের বলা হবে, পাঠ কর, উন্নীত হও এবং আবৃত্তি কর যেমন তুমি পৃথিবীতে করতে, কেননা তুমি পৃথিবীতে যা আবৃত্তি করে থাকতে তার শেষ প্রান্তে তোমার অবস্থান।” (আহমাদ, তিরমিযী ও আবু দাউদে বর্ণিত - আহমাদ শাকির ও আলবানীর মতে সহীহ)

কুর’আনের সূরা আল-আন’আমের ৯২নং নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ পবিত্র কুর’আনকে ব্যাপক অর্থে আশীর্বাদপুষ্ট বলে বর্ণনা করেন। যে কায়মনে ও বিশ্বস্ততার সাথে কুর’আনের মাঝে নিহিত আশীর্বাদের সন্ধান করে, বাস্তবিকই সে এর রহমতকে, অবিচ্ছিন্ন ও উপর্যুপরি রহমত বলে অনুভব করে। তা এই জীবনে একজন ব্যক্তিকে সীরাতুল মুস্তাকিমের দিকে পরিচালনা করে তার উপর রহমত বর্ষণ করে। একজন ব্যক্তি যখন কবরেও থাকে, তখনও কুর’আন তাকে সেখানকার শাস্তি থেকে রক্ষা করে তার উপর রহমত বর্ষণ করে । আর তা কোন ব্যক্তির পরকালেও তার পক্ষে মধ্যস্থতা করে ও তার হয়ে ফরিয়াদ করে এবং তাকে শুধু এই জন্য আর্শীবাদ করে যে - সে কখনও কুর’আন পড়েছিল এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করেছিল।

অধ্যায়-সারাংশ

সালাহ্ আল খালিদির মতে, পবিত্র কুর’আনের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে এবং তা দ্বারা অনুপ্রাণিত করে - কুর’আনের রহমত ও পথ নির্দেশনার মাধ্যমে, আল্লাহ্ সুবহানাহু তা‘আলা একটি প্রজন্মকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন। আরবরা যে সারা বিশ্বের নেতৃত্বের অবস্থানে উন্নীত হবে এবং সভ্যতার এমন এক ভিত্তিতে পরিণত হবে - শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব সভ্যতার উপর যাদের প্রভাব দেখা যাবে - এসব কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। যে প্রজন্মকে আল্লাহ্ পবিত্র কুর’আনের দিক নির্দেশনার আলো দেখিয়েছিলেন, সেই প্রজন্মের নারী-পুরুষের নাম আজো সারা বিশ্বে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়ে থাকে। আজো যারা কুর’আন পড়েন, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই প্রথম প্রজন্মের মত হওয়া। আখিরাতেও আল্লাহ্ কুর’আনে বর্ণিত সেই প্রথম প্রজন্মকে, তাঁর সন্তুষ্টির নিদর্শন স্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আজো যারা পবিত্র কুর’আন পড়েন, তাদেরও চিরকালীন লক্ষ্য ও আকাঙ্খা সেটাই হওয়া উচিত।


(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)



[এই পর্বের আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:

Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×