মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]
..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:
রাসূলের (সা.) আগমনের পূর্বের আরবগণ
ঐ সময়কার অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতই আরবদের মাঝে দোষ ও গুণ দুটোই ছিল। কিন্তু অন্য সব জাতির মত তাদের মাঝেও কিছু বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য ছিল - তাদের দোষ ছিল বহুবিধ এবং তাদের গুণগুলো ছিল বিকৃত।
আবদুল হামিদ সিদ্দিকী তাঁর বই, ‘দ্য লাইফ অফ মোহাম্মদ’ এর শুরুতে ইসলামপূর্বক জাহিলী আরবদের একটি সাধারণ পরিচয় তুলে ধরেন। ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবী কবিতাতে বর্ণিত সে যুগের আচার-আচরণ ও বিশ্বাস ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে মূর্তিপূজা, শরীরী সুখের প্রতি আসক্তি, গোত্রভিত্তিক মর্যাদা, আন্তঃগোত্র যুদ্ধ, মূর্খতা এবং মেয়েদের প্রতি অবজ্ঞা ও অসম্মান ইত্যাদির কথা এসেছে।
শরীরী সুখের প্রতি তাদের আসক্তির বর্ণনায় সিদ্দিকী লেখেন:
“মদ্যপান আরবদের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনিতে মদ্যপানের সাথে মেয়ে মানুষের একটা সম্পর্ক তো আছেই - যেজন্য অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপানের সাথে সাথে ব্যভিচার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মক্কা থেকে নিজস্ব পণ্য নিয়ে যেসব কাফেলা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য, সিরিয়া, পারস্য ও ভারতবর্ষে যেত, সেগুলো সেসব জায়গা থেকে নানাবিধ বিলাসিতা ও পাপাচার এবং সিরিয়া ও ইরাক থেকে ক্রীতদাসী আমদানী করে ঘরে ফিরতো - যারা নেচে ও গেয়ে ধনী ব্যক্তিদের শরীরী সুখের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করতো, যার সাথে স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য পাপাচারও যুক্ত হতো। ...................।
......ইসলামের আগমনের পূর্বে আরব জনগণের মদ্যপানের মহোৎসবের অনেক বর্ণনা রয়েছে পুরাতন আরবী কবিতাগুলোতে..................।
... বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতার প্রতি পৌত্তলিক আরবদের সম্ভ্রমবোধ ছিল খুবই নগণ্য। বরং বৈবাহিক বন্ধনের মর্যাদাকে অবজ্ঞা করা ও জনসমক্ষে বিবাহ-বহির্ভূত ব্যভিচার বর্ণনা করাতে তারা এক ধরনের গর্ববোধ করতো।”
আবারো প্রাক-ইসলামী যুগের আরবে মেয়েদের অবস্থান কি ছিল তা নিয়ে বলতে গিয়ে সিদ্দিকী প্রাক-ইসলামী আরবী কবিতার সূত্র ধরে বলছেন:
“মেয়ে শিশুদেরকে কেবল জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হতো তাই নয়, বরং যারা তা থেকে অব্যাহতি পেতো তাদের জীবনটা কাটতো অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্ভোগের মধ্যে। তারা অনেকটা বাজারজাত করা যায়, এমন এক ধরনের পণ্য বলে বিবেচিত হতো - খোলাবাজারে সর্বোচ্চ মূল্য প্রদানকারীদের কাছে তাদের বিক্রি করা হতো। যখন তাদের স্বামীর মালিকানায় সোপর্দ করা হতো, ততদিনে তাদের অবস্থা আরো শোচনীয় হতো। বিয়েটা তাদের জন্য এক ধরনের দাসত্ব ছিল এবং তাদের উপর স্বামীর অধিকার অনেকটা প্রভুত্বের অধিকারের মত ছিল - সে (স্বামী) ইচ্ছেমত তার সম্পত্তিকে ব্যবহার ও ত্যাগ করতে পারতো।”
আল্লাহর ইচ্ছায় পবিত্র কুর’আনের মাধ্যমে আরবদের জীবনে যে পরিবর্তন ঘটে
এটা পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, রাসূলের (সা.) সময়কার আরবরা মদ্যপান করতে চাইতো, ফুর্তিতে মেতে থাকতো ও আন্তঃগোত্র যুদ্ধে আত্মনিয়োগ করতো। কখনো তারা তাদের কন্যা সন্তানকে হত্যা করতো। কিন্তু কেউ ভেবে দেখলে দেখতে পাবেন যে, আল্লাহর দয়া এবং পবিত্র কুর’আনের অলৌকিক প্রভাববশত, মাত্র একজন মানুষ দ্বারা সূচিত আন্দোলনের মাধ্যমে, প্রায় বিশ বছর সময়কালের ব্যবধানে প্রায় সব আরব ও আরবীয় উপদ্বীপের অনারবদের চরিত্রের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। এবং বিশ্বাস ও স্নেহ-মায়া ভিত্তিক এক ভ্রাতৃত্ববোধ তাদের এমনভাবে একত্র করেছিল যে, ঐ (মুসলিম) সম্প্রদায়ের একটি অংশ কোন অসুবিধায় পড়লে, গোটা সম্প্রদায়ের উপরেই তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলতি হতো। পূর্বেকার জাতশত্রু দু'টো গোত্রের সদস্যকেও তখন দেখা যেতো নিজেদের ভিতর সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে এবং একে অপরের জন্য জীবন দিতে এগিয়ে যেতে। এমনকি ঐ সময়ে একজন তার সম্পদের অর্ধেক এবং নিজের স্ত্রীদের একজনকে তালাক দিয়ে তার নতুন ভাইয়ের জন্য ত্যাগ করতে দ্বিধাবোধ করতো না - যদিও বা সেই নতুন ভাই এক ভিনদেশী গোত্রের সদস্য হতেন।
ইসলাম এসে তৎকালীন আরবদের জীবনে কি ধরনের পরিবর্তন সাধন করেছিল, তার সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনার একটি পাওয়া যাবে সাহাবী জাফর বিন আবু তালিবের (রা.) বক্তব্যে - রাসূলের (সা.) মিশন সম্বন্ধে আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি যখন বলেছিলেন, “হে রাজা, আমরা ছিলাম এক মূর্খ জনগোষ্ঠী, যারা মূর্তিপূজা করতো, মৃত পশুর গোশত খেত এবং যৌনসুখে গা ভাসিয়ে দিত। আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের উত্যক্ত করতাম, ভাই তার ভাইকে অত্যাচার করতো এবং সবল দুর্বলের সম্পদ আত্মসাৎ করতো। এরকম একটা সময়ে আমাদের মাঝে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল - যিনি ইতোমধ্যেই সকলের কাছে সত্যবাদী, উন্নত চরিত্রের এবং সৎ ব্যক্তি বলে পরিচিত ছিলেন। এই মানুষটি আমাদের ইসলামের পথে ডাকলেন। এবং তিনি আমাদের পাথর পূজা থেকে নিবৃত্ত হবার, সত্য কথা বলবার, রক্তপাত ত্যাগ করবার, এবং এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিলেন। তিনি আমাদের প্রতিবেশীদের ভালবাসতে শিখিয়েছেন এবং সতী নারীদের কুৎসা রটনা থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাদের সালাত আদায় করতে, রোজা রাখতে এবং যাকাত দিতে আদেশ দিয়েছেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করেছি, বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেছি এবং সকল কুকর্ম থেকে বিরত থেকেছি। এই নতুন পথ বেছে নেয়ার জন্য আমাদের মানুষজনেরা আমাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে এবং তারা আমাদের পূর্ববর্তী পথভ্রষ্ট জীবন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য করতে চায়।”
ঐ প্রজন্ম পর্যায়ক্রমে ইসলামের সেই বাণী - বাকী পৃথিবীতে পৌঁছে দেন। স্পষ্টতই তাঁরা ছিলেন এমন এক প্রজন্ম যাঁদের অন্ধকার থেকে আলোতে এবং আল্লাহর ‘সরল পথে’ নিয়ে যাওয়া হয়। পারস্য সম্রাট যখন মুসলিমদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তাঁরা কি জন্য ঐ সাম্রাজ্যে আগমন করেছেন - তখন দুজন ভিন্ন সাহাবী একই ধরনের উত্তর করেছিলেন : “যারা চাইবে, তাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে যাওয়ার জন্য ও এই পৃথিবীর সংকীর্ণতা থেকে এর প্রশস্ততায় এবং (দুনিয়ার) জীবনের অবিচার থেকে ইসলামের সুবিচারে নিয়ে যেতে আল্লাহ্ আমাদের পাঠিয়েছেন।”
নবীর জীবদ্দশায় ঐ মানুষগুলো কিভাবে আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার আশা করে পরহেজগার এক প্রজন্মে রূপান্তরিত হয়েছিলেন সেটা সবার জানা। এমনকি মানুষ হিসাবে তাঁদের কেউ যখন কোন ভুল করে কোন পাপের রাস্তায় পা রেখেছিলেন, তাঁরা যথাশীঘ্র সম্ভব সেজন্য তওবা করেছেন এবং আল্লাহর ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। আল্লাহর কাছে পাপপূর্ণ আমল নিয়ে যাবার চেয়ে তাঁরা বরং এই পৃথিবীতে, এমনকি, মৃত্যুদণ্ডের মত কঠোর শাস্তি বরণ করে নেয়াটা অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। মায়িয ইবনে মালিক আল আসলামী এবং আল গামিদিয়াহ্ নামক অপর একজন মহিলার ক্ষেত্রে আমরা এ ধরনের ব্যাপার দেখতে পাই। তাঁরা দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় রাসূলের (সা.) কাছে এসেছিলেন তাদের ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি নিয়ে এবং দুজনেই আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রস্তর নিক্ষেপে মৃত্যুর মাধ্যমে পার্থিব শাস্তির আবেদন করেছিলেন - যাতে আখিরাতে তাঁরা পাপের বোঝা সমেত আল্লাহর সামনে উপস্থিত না হন। আল গামিদিয়াহর বেলায় রাসূল (সা.) তাঁকে তাঁর স্বীকারোক্তির পর বলেছিলেন যে, তিনি যেন তার গর্ভস্থ সন্তান প্রসবের পরে রাসূলের (সা.) কাছে ফিরে আসেন। এরপর তিনি তাঁর পাপের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে, সন্তান কোলে ঠিকই রাসূলের (সা.) কাছে ফিরে এসেছিলেন। নবী তখন তাঁকে তাঁর সন্তানের স্তন্য পানের সময়কাল অতিবাহিত করে পুনরায় তাঁর কাছে ফিরে আসতে বলেন। কিছুকাল পরে মহিলা ঠিকই ফিরে এলেন এবং তাঁর সন্তানের আর মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজন নেই - এই তথ্য সমেত তিনি রাসূলের (সা.) কাছে তাঁর গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ হবার আবেদন জানালেন। এমতাবস্থায় শেষ পর্যন্ত নবী(সা.) তাঁর দণ্ডপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করলেন এবং আল গামিদিয়াহ্ প্রস্তর নিক্ষেপে মৃত্যুবরণ করে তাঁর ব্যভিচারের শাস্তি গ্রহণ করলেন। রাসূল (সা.) তাঁর প্রায়শ্চিত্তের পদক্ষেপকে প্রশংসা করে গেছেন। (মুসলিম)
সাহাবীদের ভিতর ইসলাম যে আমূল পরিবর্তন সাধন করেছিল, তার ধারা রাসূলের (সা.) মৃত্যুর অনেক পর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সাহাবীরা বাকী গোটা পৃথিবীর কাছে ইসলাম পৌঁছে দিতে যেভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন, তার একটা বর্ণনা আমরা নীচে তুলে দিচ্ছি, যেখান থেকে পাঠক ইসলামের পথে তাঁদের অব্যাহত যাত্রার একটা ধারণা লাভ করতে পারবেন :
একজন রোমান কর্মকর্তা মুসলিম সৈন্যদের নিখাদ চরিত্র ও গুণাবলীর বর্ণনা করেছিলেন এই বলে : ‘রাত্রে তাদের ইবাদতরত অবস্থায় দেখা যাবে, দিনে রোজা রাখা অবস্থায়। তারা তাদের ওয়াদা রক্ষা করেন, সৎকাজের আদেশ করেন, মন্দ অনুভূতি দমিয়ে রাখেন এবং নিজেদের মাঝে পূর্ণ সাম্য বজায় রাখেন।’ আরেকজন সাক্ষ্য দেয় : ‘তারা দিনে অশ্বারোহী, রাতে দরবেশ। তারা অধিকৃত এলাকায় যা কিছু আহার করে, তার মূল্য পরিশোধ করে; কোথাও পৌঁছালে তারা আগে অভিবাদন জানায় এবং তারা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ যোদ্ধা যারা শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করে।’ তৃতীয়জন বলেছে : ‘রাতের বেলা মনে হবে তারা যেন এই দুনিয়ার কেউ নয় এবং ইবাদত ছাড়া তাদের কোন কাজ নেই। আর দিনের বেলা যখন কেউ তাদের ঘোড়ার পিঠে দেখবে ; তখন মনে হবে সারাজীবন তারা এ (যুদ্ধ) ছাড়া আর কিছুই করে না। তারা হচ্ছে চৌকস তীরন্দাজ ও দুর্ধর্ষ বর্শা নিপেকারী, তথাপি তারা অত্যন্ত বিশ্বস্ত ধার্মিক এবং তারা সার্বক্ষণিকভাবে ঈশ্বরকে এমনভাবে স্মরণ করতে থাকে যে, তাদের সাহচর্যে, কেউ তাদেরকে অন্য কোন বিষয়ে প্রায় কথা বলতেই শোনে না।’
(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)
[এই পর্বের আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



