শেখ মুজিবুর রহমান, জন্ম ১৭ই মার্চ, ১৯২০। শুধু বাংলাদেশই নয় বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা এক নাম।
শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা'র নাম সায়েরা খাতুনের চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। ১৯৩৮ সনে আঠারো বছর বয়সে তিনি ফজিলাতুন্নেসার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ঘরে দুই কন্যা এবং তিন পুত্রের জন্ম হয়। কন্যারা হলেন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। আর পুত্রদের নাম শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেল।
"শেখ সাহেব" নামক মহান এই বাঙ্গালীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। সে বছর স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী। ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪২ সনে এনট্র্যান্স পাশ করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন। এই কলেজ থেকেই সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে তিনি বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং বাঙালি মুসলিম নেতা হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪৭ সনে অর্থাৎ দেশবিভাগের বছর মুজিব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রী লাভ করেন। পাকিস্তান-ভারত পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের ৪ই জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে তিনি পূর্ব প্রদেশের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন।
১১ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করসর ঘোষনায় ঢাকা ধর্মঘটে সচিবালয়ের সামনে থেকে গ্রেফতার হন মুজিব, এর জনরোষানোলে তাকে ছেড়ে দেয় প্রশাসন। কিন্তু ১৯ মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি আন্দোলন পরিচালনা করায় ১১ই সেপ্টেম্বর আবারও আটক হন এবং ঢাবি থেকে বহিষ্কৃত হন। (২০১০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর হৃত ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়।)
শেখ মুজিব ১৯৬৬ এর ছয়দফা প্রনোয়ন ও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় মুজিব ঘোষণা করেন যে এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে "বাংলাদেশ" নামে অভিহিত করা হবে:
" একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে "বাংলা" শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। "বাংলা" শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে 'পূর্ব পাকিস্তানের' বদলে 'বাংলাদেশ' ডাকা হবে"।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।পূর্ব পাকিস্তানের কোটার ২ টি আসন ছাড়া বাকি সবগুলোতে জয়ী হওয়ার জন্য জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শেখ সাহেবের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে রাজি ছিলেন না। এর পরের ইতি আপনাদের জানা থাকারই কথা।
২৫শে মার্চ,১৯৯৭১ এ পাকিস্তান আর্মির হাতে গ্রেফতার হলে তিনি দেশ স্বাধীনের পর ১০ই জানুয়ারী ১৯৭২ এ বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। দায়িত্ব নেন স্বাধীন বাংলার। গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনজনদের নিয়োগ দেয়ার জন্য মুজিবের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতিরও অভিযোগ আনা হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ খাদ্য সংকট, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতার কারণে মুজিবকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সংঘাতের মাত্রা বাড়তে থাকায় মুজিবও তাঁর ক্ষমতা বাড়াতে থাকেন। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মুজিব জরুরি অবস্থা জারি করেন। ১৯৭৫ এ কয়েকটি দল মিলে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক দল গঠন করে। সংক্ষেপে বাকশাল নামে পরিচিত। মুজিব সরকার বাকশাল বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ও ৪টি বাদে দেশের সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। দলটি প্রত্যন্ত জনসাধারণ, কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের বিবেচিত করে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। দলটি বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করে। সরকারি বাহিনীর সাথে সমর্থকদের নিয়ে গঠিত জাতীয় রক্ষী বাহিনীর সহায়তায় মুজিব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করেন এবং সারাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। সে সময় রক্ষী বাহিনী এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যাচার ও রাজনৈতিক হত্যার অভিযোগ ওঠে।
এই অবস্থায় ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ শেখ মুজিব তার ধানমন্ডির ৩২নং বাসায় সপরিবারে নিহত হন।
ভালো খারাপ মিলিয়ে মানুষ হয়। বাংলাদেশ গড়তে একজন মুজিবের থাকা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। তবে তার শেষ জীবনে নিজের কিছু মানুষের কারণেই তিনি মানুষের ঘৃণার পাত্র হয়েছিলেন। তবুও শত বিতর্কের বাংলাদেশের জন্য মাঝে শেখ মুজিবের কৃতত্ব অসীম। হয়তো তিনি না থাকলে আজ বাংলাদেশই হতো না। সকল দোষ ভুলে গিয়ে তার কৃতীত্বটুকু মনে রাখার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ রইল।
২০০৪ সালে বিবিসি'র বাংলা রেডিও সার্ভিসের পক্ষ থেকে সারা বিশ্বে যে জরিপ চালানো হয়, তাতে মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিবেচিত হন
***সকল তথ্য উকিপিডিয়া ও গুগল থেকে নেওয়া এবং সংকলিত
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ৯:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




