বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শেষ করেছি। চাকরির কথা ভেবে মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠে। আমার অধ্যাপক ডেকে বলেন, তোমার জন্য আমি "ওকে" বলে রেখেছি, তার সহকারীকে ফোন করে তুমি দেখা করো। ঢাকায় সুপ্রতিসঠিত বিদেশী এনজিও'র "কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভের" সাথে সদ্য মাস্টার্স পাশ অনভিজ্ঞ "আমি" সরাসরি সাক্ষাত করে চাকরির যোগ্যতা প্রমাণ করব-এটা অত্যন্ত উওেজনামূলক ঘটনা। রিকশা আর বাসে চলা মানুষ আমি হঠাৎ করে গাড়ীতে আর শীতাতপ নিয়নএিত অফিসে বসে কাজ করব এটা তো বিরাট পাওয়া। কল্পনা করি চাকরি পেয়ে কি কি করব। ভাবি, এখান থেকে যদি বিদেশী ডিগ্রীটা নেয়ার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে নিজের চেস্টায় আর খরচে পশ্চিমে পড়তে যাওয়ার জন্য কসরত করতে হয় না। কে জানে ভাগ্যে কি আছে ? আমার গোয়ার্তুমি ও ঘাড় ট্যারা স্বভাবের জন্য খেসারত প্রচুর দিয়েছি। সমস্যাটা হচ্ছে, তেল একদম দিতে পারিনা। জী স্যার, জী স্যার, করতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা শিক্ষক রাজনীতিকে করি ঘৃণা। শিক্ষাবিহীন শিক্ষকতার প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা। তাই বিশ্বদ্যিালয়ে যোগ দেয়ার কথাও ভাবিনি। কিন্তু সে সব কথা অন্য কোনদিন। আজ শুধু প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকারের কথা বলি।
যথারীতি চলে এলো জীবণের প্রথম চাকরির প্রথম সাক্ষাৎকারের দিনটি। কোন এক অপরাহ্নে ধানমন্ডির সুসজ্জিত অফিসে আমি মুখোমুখি হলাম "কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভের"। আমার ইন্টারভিউ তিনি ও তার উপ-পরিচালক নিলেন। সাক্ষাৎকার চলল দু'ঘন্টা ধরে। কাজটা হচেছ তার লেখা কোন এক পুস্তিকাকে ঘসে মেজে নতুন মোড়কে বের করতে হবে। বাবা কী করেন, কয় ভাই-বোন, অবসরে কী করি তার ফিরিস্তি ততক্ষণে দিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্ত, ব্যাপারটা অতি গুরূতর আকার নিল যখন তিনি প্রশ্ন করলেন: "ডাকসু নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন" ? উওর: "জী দিয়েছি"। প্রশ্ন এলো, "যাদের ভোট দিয়েছেন, তারা কী প্যানেলে জিতেছে"? সবিনয়ে বললাম, "হ্যাঁ জিতেছে"। আমার ইন্টারভিউকারীরা আশ্বস্ত হলেন, কারণ তখন জাতীয়তাবাদী ছাএদল ডাকসুতে। সাক্ষাৎকার দ্রুত গড়াতে লাগল আমি কবে কাজে যোগ দিতে পারব এ বিষয় নিয়ে।
আমিও আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে তারা জিজ্ঞাসা করেননি, "আমি কোন মিছিলে অংশগ্রহণ করেছি কি না"? প্রশ্ন করলে অকপটে বলতাম, "জী স্যার, দুবার, একবার করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গীবাদী সনত্রাসী ছাএ শিবিরের প্রবেশের বিরূদ্ধে আর আরেকবার করেছি লে.জে. হো.মো. এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরূদ্ধে"। তাই স্বৈরতন্ত্রের আওয়াজ শুনলে আবার আশংকিত হয়ে পড়ি। অবশেষে, চাকরি হলো সেখানে। তখনো জানতাম না, তৈলমর্দনে অনভ্যস্ত আমাকে প্রকল্প শেষ করে বিদায় নিতে হবে। তার কিছুদিন পরেই জানলাম, পরবতর্ী দু'বছর আমাকে মাস্টার্সের জন্য আটলান্টিক পাড়ি দিতে হবে যেখানে তেলের কোন প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন মেধা ও সাধনার। দুভর্াগ্য নিয়তি সর্বদাই অদৃশ্য, যদিও আমরা নিজ হাতে তা সবার অগোচরে নিমর্াণ করতে থাকি। নিয়তিবাদী আমরা ভবিষ্যত দেখি না, কিন্তু বর্তমানে বসে অতীতের জন্য করি অনুশোচনা, ভুলে যাই ভবিষ্যত বিনির্মাণের কথা ও সুযোগ শুধু আজকেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

