মামা হচ্ছেন আমাদের ভীতু পরিবারে একমাএ বীর ও সাহসী মানুষ। তাকে নিয়ে গর্বিত না হয়ে কি পারি? আমরা কখনও ভুলেও বলতাম না যে আমার নানা একমাএ মামার পেছনে কি পরিমাণ অর্থ সম্পদ অপচয় করেছেন। ক্যাডেট কলেজ থেকে শুরু করে কর্মজীবন পর্যন্ত মামার পেছনে সবচেয়ে বেশী অর্থ গুনেছেন নানা। সেটা নিয়ে অবশ্য আমার মা, খালা বা নানার মধ্যে কোন দু:খ ছিল না। বরং তারা চৌকস মামাকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন। দেশ বিদেশের সার্টিফিকেট ও মেডেল শোভ বাড়াতো নানার ড্রইং রুমের দেওয়াল। সেটা দেখে নানার পরিবার সকল দারিদ্র ও দৈন্যের শোক ভুলে থাকতো।
সেই মামার কীর্তিকলাপ নিয়েই আজকের গল্প। ঢাকার অদূরে আমার নানার একটা বাগান আছে। ঢাকা শহর বাড়তে বাড়তে এখন এই গ্রামে এসেও ধাক্কা দিয়েছে। নানার বয়স হয়েছে। আমার মা ও খালারা তাদের নিজেদের হেঁশেল নিয়ে ব্যস্ত। তারাও এখন নানার সম্পওির চেয়ে নিজেদের পেট পরিবারের ধান্ধায় ব্যস্ত থাকেন। এদিকে বাগানের যত্ন আওি নেই। আম জাম, কাঁঠাল, শিল, কড়ই, গর্জন, নিম, সেগুন গাছ একটার সাথে একটা লেগে পুরো জঙ্গল হয়ে গেছে। এমনকি সেখানকার পাড়া প্রতিবেশীরাও বলা শুরু করলো যে বাগান বাড়ী নাকি ভুত পেত্নী আর জন্তুদের খোঁয়ার হয়েছে। তারাও নানাকে এসে হুমকি ধামকি দেওয়া শুরু করলো।
মামা তার ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যস্ত থাকেন। নানার বয়স হয়েছে। নিজেও হূদরোগী। মানুষের অভিযোগ আপওি শুনে তার মনও বিষিয়ে গেছে। বাগান বাড়ীটার একটা হিল্ল্লে হলে তিনিও আনন্দ পান। আমার মা খালারা অবশ্য বাগান বাড়ী বিক্রির পক্ষে। এটা কেনার জন্য লোকজনেরও ভীঁড়। কিন্তু নানা বলেন, এই বাগান আর জমি আমার অনেক রক্তের দামে তৈরী। না খেয়ে না পড়ে এটা আমি গড়েছি কারও কাছে বিক্রির জন্য না। নানার গোয়ার্তুমিতে মামাও বিরক্ত। মামার কথা হচ্ছে দুই দিনের দুনিয়া খেলাধুলা আর মউজ কইরা যাও। তাই এবার নানা মামাকে ডেকে বললেন বাগান বাড়ীর একটা বন্দোবস্ত করতে। মামা অতি উৎসাহে বললেন, কোন সমস্যা না। আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। তিনি মোবাইল ফোনে ব্যস্ত ত্রস্ত হয়ে বললেন আমি এখনই লোক ঠিক করছি। মায়ের কাছ থেকে শোনা যে এই বাবদ খরচ হিসেবে মামা এখন নানার কাছ থেকে লাখ তিনেক টাকা নিয়েছেন। আমরা যারা মামাকে চিনি তারা প্রমাদ গণতে শুরু করেছি।
গত শুক্রবারে আমরা নানার বাগান বাড়ী দেখতে গিয়ে আমাদের আক্কেল গুড়ুম। নানা বাকরুদ্ধ। মা আর খালাও বোবা। আমরা সবাই চুপচাপ। কারণ, সাথে মামা। বুড়ো বয়সে মামার হাতে চ্যাংদোলা হওয়ার কোন খায়েশ নেই। মামা পুরা বাগান বাড়ী ফকফকে সাদা করে ফেলেছেন। কোন গাছ নেই। শখের আম জাম, সেগুন গর্জন গাছ উধাও। স্বয়ং নানার মাথায় হাত। কিন্তু করিৎকর্মা মামাকে ডেকে কেউ কিছু বলবে সেই সাহস নেই। এমনকি বাগান বাড়ী বেরোবার সময় মসজিদের হুযুরও বলে গেলেন বাগানে রাখা তার ষোল টাকা দামের লোটা উধাও। হুযুর এখন নাপাকী থেকে বাঁচার জন্য কি খালি কুলুখ করবেন?
খালি বাগানে এখন মামা সারি করে সেগুন গাছের চারা লাগিয়েছেন। বাসায় ফিরে মায়ের কাছে যা শুনলাম তাতে আমারও আক্কেল গুড়ুম। মা খালি ফিসফিস করে বলল, বাগানের পেছনের জায়গাটা নাকি মামা দোকান তৈরীর জন্য দিয়ে দিয়েছে। আর গাছগুলো বিক্রি করে কতো টাকা লোপাট করেছেন তার কোন খবর নেই। তবে আমরা এখন অপেক্ষায় আছি, জঞ্জাল পরিস্কার বাবদ মামা নানার কাছে কতো হাঁকেন। তারপরও আমরা খুশী। মামার প্রশংসায় গদগদ। কারণ, আমরা ভীষণ অথর্ব। মা আর খালারা খুবই স্বার্থবাদী। তারা যদি মনোযোগ দিতো তাহলে বাগানের এই করুণ অবস্থা হতো না। এখন তারা খালি মাথা চাপড়াচ্ছে। গুণধর ভাইকে তো আর কিছু বলা যায় না। আসুন আমরা সবাই নীরবে বন্দনা করি জলপাই মামার
।
"কোলাহল তো বারণ হলো, এবার কথা কানে কানে
এখন হবে প্রাণের আলাপ কেবলমাএ গানে গানে
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




