somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মমতার বিনিময়

০১ লা এপ্রিল, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খাবারের আইটেম ভালো। তারপরও গলা দিয়ে নামতে চাচ্ছে না। শর্ষে ইলিশ, চিংড়ির মালাইকারী। হলের ডাইনিংয়ের তুলনায় রাজকীয় খাবার। তবু মুনিয়ার খাবার গলায় আটকে থাকে। ভেতর থেকে কান্না ডুকরে ওঠে। টপ টপ পানির ফোঁটা গাল গড়িয়ে ঝোল তরকারির সঙ্গে মেশে। মুনিয়া তবু লোকমা তোলে। মা কষ্ট করে রেঁধে পাঠিয়েছে- ফেলতে মন চায় না। মুনিয়া ধীরে ধীরে চিবোয়। চোখের সামনে ভাসে, আব্বা খাবারের ভারী বোঝাটা এহাত-ওহাত করছেন। কলেজ গেটের বিপরীত দিকের যাত্রী ছাউনিতে বসার জায়গা আছে, কিন্তু বসার সুযোগ নেই। সারাক্ষণ মানুষজন বসেই থাকে।

আব্বা এসেছেন অনেক আগে। এসে কলও করেছেন। মুনিয়া টের পেল পনের-বিশ মিনিট পরে। হল থেকে নামতে নামতে গেটের কাছে যেতে যেতে দশ-পনের মিনিট এমনিতেই লেগে যায়। ঘণ্টাখানেক আজিজ সাহেব মেয়ের জন্য অপেক্ষা করেছেন। মুনিয়া প্রায় দৌড়ে গেল গেটের কাছে। আব্বার কপালে ঘাম চিক চিক করছে। মেয়েকে দেখে হাসলেন। পুরুষ গার্ডিয়ানদের কলেজের ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই। এটা মহিলা কলেজ। দেখা-সাক্ষাৎ সব গেটের বাইরেই সারতে হয়। অভ্যর্থনা কক্ষ নামে অভিভাবকদের বসার একটা জায়গা আছে বটে। তবে সেটার দায়িত্বে যিনি আছেন তিনি খুবই আরামপ্রিয়। সকালে সেই কক্ষ খুলতে তার ভীষণ আলসেমি লাগে। যেদিন ভালো লাগে খোলেন, না লাগলে খোলেন না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অভিভাবকরা বেশিরভাগ সময় গেটের বাইরে থেকেই ক্লান্ত পায়ে বিদায় নেন। মুনিয়া দ্রুত খাবার শেষ করার চেষ্টা করল।

আম্মা ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ খেতে পারেন না। অ্যালার্জিটা বড্ড জ্বালাতন করে। আব্বা এ জন্য এসব মাছ ছাড়া অন্য মাছ বেশি কেনেন। পদে পদে মাছ কেনার সামর্থ্য সব সময় হয় না। মেয়ে কত দিন বাড়ি আসে না। পরীক্ষা সামনে, কত পড়াশোনা। মেয়েকে দেখতে যাবেন। মাছ কেনা দরকার। জানা সত্ত্বেও মুনিয়ার মাকে জিজ্ঞেস করেন, ইলিশ মাছ নিয়ে আসি, কী বলো? সঙ্গে আধ কেজি চিংড়ি। মেয়েটা কী খায় না খায়! তোমার জন্য কই পেলে না হয় আনব। আম্মা আব্বার সামর্থ্য জানেন। বলেন, থাক অত কিছু লাগবে না। পুঁইশাক আছে, লাগলে একটা ডিম ভেজে খেয়ে নেব। আপনি মেয়ের জন্য ভালো দেখে মাছ নিয়ে আসেন। আব্বা মাছ কেনেন, ভালো বেকারি বিস্কুট কেনেন। মেয়ের রাত জেগে পড়ার অভ্যাস। রাতে নিশ্চয়ই ক্ষুধা লাগে। তখন দুটো বিস্কুট খেয়ে পানি খাবে। আজিজ সাহেব মুড়ি কেনেন, চানাচুর কেনেন। কী মনে করে একটা তেলাপোকার ওষুধ কিনলেন। আজকাল তেলাপোকা বেড়েছে; যদি দরকার হয়। তিনি দোকান ঘুরে বেছে বেছে বড় ডিম নেন। এ সময় বেশি করে ডিম-দুধ না খেলে শক্তি পাবে না।

মুনিয়া তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে ওঠে। ছোটবোন ফোন করেছে। বলল, আব্বার শরীরটা অনেক ক্লান্ত। এতদূর আসা-যাওয়ার ধকল, একদণ্ড জিরানোর সুযোগও পায়নি। মুনিয়া হাত-মুখ ধুয়ে বই-খাতা নিয়ে রওনা হয় রিডিংরুমে। মেয়েরা দলবেঁধে যাচ্ছে টিভি রুমে। সবার মুখে একটাই গল্প। নায়িকার আজ কী হবে? কুটনি বুড়িটা আজ যেন কী করে? মুনিয়া এসব গল্পের কিছুই জানে না। তার মাথায় অন্য গল্প। একটা ভালো রেজাল্ট, আব্বার কপাল, জুড়ে চিকচিকে ঘাম, মুখে তৃপ্তির হাসি। আম্মার হাঁফ ছেড়ে ফেলা স্বস্তির নিঃশ্বাস। খুশিতে আব্বার দিশেহারা অবস্থা।

মুনিয়ার গল্পটা সত্যি হয়েছিল। তবে পুরোটা নয়। অনেক ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাস করেছে সে। কিন্তু রেজাল্ট দেখে তৃপ্তির হাসি দেওয়ার মানুষটা সেদিন ছিল না। খুশিতে কেউ আত্মহারা হয়নি। আম্মার আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা পড়েছিল, তবে সেটায় স্বস্তির বদলে মিশে ছিল আফসোস। তিনি ডুকরে ওঠা কান্নার দমক ঠেকাতে মুখে আঁচল চেপেছেন। মুনিয়া নিশ্চুপ ঘুরে বেড়ায়। বাবার পুরনো পাঞ্জাবিটা নামিয়ে দেখে। সাদা শার্টটার গন্ধ শোঁকে। পরিচিত গন্ধ। মমতার গন্ধ।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৫৩
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্বাচনী অঙ্গীকার চাই ফুটপাথ ফেরাও মানুষের কাছে

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬


ভোটের মিছিলে কথা হয় অনেক
পোস্টারে ভরা উন্নয়নের ঢাক
কিন্তু বলো তো ক্ষমতাপ্রার্থী দল
ফুটপাথ কার এ প্রশ্নের কি জবাব?

ঢাকা ছোটে না, ঢাকা পায়ে হেটে ঠেলে চলে
শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পড়ে কষ্টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালুর নিচে সাম্রাজ্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১


(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।

এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০


এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:৫৮


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×