তিনজন বাঙালি অত্যন্ত সম্মানজনক নোবেল পুরস্কার পেয়ে নিজেরাই শুধু সম্মানিত হননি, বিশ্ব সভায় সম্মানের আসনে বসিয়েছেন সব বাঙালিকে। সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, অর্থনীতিতে অমর্ত্য সেন এবং শান্তিতে ড. মোহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পেয়ে এটাই যেন জানিয়ে দিয়েছিলেন- তৃতীয় বিশ্বের অধিবাসী হলেও তারা মেধা-মননে উন্নত বিশ্বের অধিবাসীর চেয়ে কম নন।
তবে বেদনার সঙ্গে বলতে হয় যখনই এই বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিগণ জনসেবায় নেমেছেন তখনই ধরা খেয়েছেন। বিশ্বনন্দিত কবি রবিঠাকুরও জনসেবা করতে গিয়ে তেমন প্রশংসা কুড়াতে পারেননি বরং সমালোচিত হয়েছেন। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের সমস্ত টাকা পতিসরে কৃষি ব্যাংকে রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ঋণের বিপরীতে নামমাত্র সুদের ব্যবস্থা ছিল সেই টাকার। যাতে তার প্রজারা ঋণ নিয়ে হয়রানির শিকার না হয়। অথচ অমিতাভ চৌধুরী লিখেছেন-'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সামন্তবাদী প্রজাপীড়ক জমিদার ছিলেন। তার দফায় দফায় খাজনা বৃদ্ধি এবং জোর-জবরদস্তি করে তা আদায়ের বিরুদ্ধে ইসমাইল মোলস্নার নেতৃত্বে শিলাইদহে প্রজা বিদ্রোহ ঘটেছিল।'
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন_'রবীন্দ্রমনোলোক সামুদ্রিক গভীরতা, আসমানী বিশালতা থাকলেও তার শিল্প সাহিত্য সৃষ্টি বিপুল কলেবর হলেও গুণেমানে স্বরূপমাত্রায় হিমালয়বৎ সুউচ্চ হলেও, রূপে রসে বৈচিত্র্যে হলেও, তাতে গণমানব প্রত্যাশিত বাস্তব জীবনে কেজো, প্রাত্যহিক জীবনের সংঘর্ষ-সমস্যা সমাধানের কিছু মেলে না। এমনকি তার সত্তরোত্তর জীবনেই কেবল কমিউনিস্ট প্রভাবে দুস্থ-দুঃখী-চাষী-মজুরের কথা পরিব্যক্ত হয়েছে মাত্র করগণ্য কয়েকটি কবিতায়। এ যেন দায়সারা কৃত্রিম অনুশীলনেরই ফল। ঃআজ শিলাইদহ, সাজাদপুর, পতিসর কুঠি ভক্তের তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু তিনি কবিতা-গল্প-নাটক-উপন্যাস লিখতে আসেননি এখানে। বজরার কুঠিতে বাস করেছিলেন প্রজা শাসন-শোষণের জন্যই। একথা ভুললে চলবে না। এসব তীর্থ আদতে প্রজা শাসনের-শোষণের-পীড়নের ও উৎখাতের কেন্দ্রীয় দফতর মাত্র। রাজশাহী গ্যাজেটিয়ারে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের আমলেও দুস্থ প্রজা দায়ে ঠেকে জমি বিক্রি করলে জমিদারও বিক্রয়লব্ধ অর্থের বখরা নিতেন।' ঃএকজন অজ্ঞ অনক্ষর দুস্থ প্রজা রবীন্দ্রনাথকে দেখে খাজনাখোর প্রজাপীড়ক শোষক নাছোড়বান্দা নির্দয় ধনীমানী অভিজাত ব্যক্তিরূপে।'
সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের আফসোস- 'দুনিয়ায় এত জায়গায় রবির আলো পড়ে কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের ঘরে সেই আলো পড়ে না।' এতো গেল রবীন্দ্রনাথের কথা। এবার আসা যাক, প্রফেসর ড. ইউনূস প্রসঙ্গে। তিনি নোবেল পুরস্কার পাবার আগেই দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠাতে গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে হতদরিদ্রদের বেঁধে ফেলেন ঋণের কিস্তি ফাঁদে। একবার যে ঋণ নিয়েছে সে জানে ক্ষুদ্রঋণ তার জীবনে কত বৃহৎ বেদনার বোঝা হয়ে এসেছে। ঋণের কিস্তি শোধ দিতে তার জান-প্রাণ ফালাফালা। নিজের শ্রম বিক্রি করা ছাড়াও গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, ঘটিবাটি বিক্রি করেও সে ঋণের ফাঁদ থেকে বের হতে পারে না। ঋণের কিস্তি শোধ দিতে সে হতদরিদ্র থেকে নিচে নেমে যায়। বেঁচে থাকে আধমরা অবস্থায়।
ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর যারা ঋণ নিয়ে (ক্ষুদ্রঋণ) সবচে বেশি আশান্বিত হয়েছিল তারা গ্রামের দরিদ্র-বিত্তহীন মহিলা কিন্তু তাদের আশার আলো নিভতে সময় নিলো না। ঋণের সুদ পরিশোধ করতে না পারায় তারা হয়ে গেল ঋণখেলাপী। তাদের উপর শুরু হলো ঋণ পরিশোধের তাগিদ। যারা অক্ষম হলো তাদের উপর চললো_ মানসিক চাপ এবং শারীরিক নির্যাতন। অনেকে নির্যাতন থেকে চির মুক্তির জন্য আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসলো। উচ্চহারে ঋণ আদায়ের জন্য বিতর্কিত হতে শুরু করলো গ্রামীণ ব্যাংক এবং 'পুওর ম্যানস বাংকার্স' ড. ইউনূসও এর থেকে বাদ পড়লেন না।
৩০ নভেম্বর ২০১০-এ নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্র 'ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ' ড. ইউনূসকে নিয়ে বিতর্ককে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। ১ ডিসেম্বর ১০ এ দেশের প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রের শিরোনামে এসে দাঁড়ান ড. মোহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের জনগণ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান এই ভেবে যে, যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে দেশবাসির মাথা সম্মানের সোনালী দিগন্তে পেঁৗছে দিয়েছিলেন, তিনি কি করে পারলেন দেশবাসির মাথাকে এমনভাবে নোয়াতে!
কিন্তু নরওয়ের দাতা সংস্থা এমনকি নরওয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী এরিখ সলহীন যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে মনে হয় না তারা ব্যাপারটাকে সহজভাবে নিচ্ছেন। মন্ত্রী মহোদয় বিবিসিকে বলেছেন, উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক না কেন সাহায্য যে কারণে দেয়া হয়েছে সে সাহায্যের অর্থ যদি অন্য কোন খাতে ব্যয় হয় তা নরওয়ে সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


