আমারদেশ
১১/০৯/২০০১১
সুপ্রিমকোর্ট বারের অভিযোগ : খায়রুল খয়রাতি টাকা নিয়ে আদালতের মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দেন
স্টাফ রিপোর্টার
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত ধ্বংসের অভিযোগ এনে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক রাষ্ট্রের খয়রাতি তহবিলের ১০ লাখ টাকা নিয়ে উচ্চ আদালতের মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। ত্রাণ বা খয়রাতি তহবিলের টাকার একমাত্র হকদার হচ্ছেন ছিন্নমূল, অভাবী ও অসহায় মানুষ। অথচ ওই তহবিল থেকে বিচারপতি খায়রুল হক ১০ লাখ টাকা নিয়ে শুধু উচ্চ আদালতের মর্যাদাই ক্ষুণ্ন করেননি, একইসঙ্গে তিনি তার নিজের প্রতিও অবিচার করেছেন। খয়রাতি টাকা নিয়ে উচ্চ আদালতকে অবমাননার দায় বিচারপতি খায়রুল হককেই নিতে হবে।
বিচারপতি খায়রুল হককে বিতর্কিত ও আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক আওয়ামী লীগের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সুপ্রিমকোর্টের অতীত ঐতিহ্য, প্রথা ও সব ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এ কারণেই এখন সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীরা বিচারপতি খায়রুল হকের অপকর্মের পক্ষে সাফাই গেয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের ত্রাণের টাকা গ্রহণ ও বিচারব্যবস্থা ধ্বংসে তার ভূমিকার বর্ণনা দিয়ে আইনজীবী সমিতির সভাপতি বলেন, বিচারপতি খায়রুল হককে নিয়ে সরকারি দলের অতি উত্সাহই প্রমাণ করে তিনি তাদের (আওয়ামী লীগের) বিশেষ সুবিধা করে দিয়েছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘন, খয়রাতি টাকা গ্রহণ, বিচার বিভাগে রাজনীতি টেনে আনাসহ বিচারপতি খায়রুল হকের সব অপকর্ম সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত। গতকাল সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে বারের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট একেএম কামরুজ্জামান মামুন, দেলোয়ারা হাবিব, শহিদুল ইসলাম, আশরাফ উজ্জামান প্রমুখ।
সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন আরও বলেন, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে যারা গুরুতর অসুস্থ, কিন্তু অসচ্ছল ও চিকিত্সার ব্যয়ভার বহনে অক্ষম, তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে চিকিত্সা বাবদ অর্থ দেয়ার রেওয়াজ রয়েছে। উচ্চ আদালতের কোনো বিচারপতি গুরুতর অসুস্থ হলে নিজে থেকে চিকিত্সা-ব্যয় বহনে অক্ষম হলে সেক্ষেত্রে তিনি উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে পারেন। অনেক বিচারক এ ধরনের সুযোগ নিয়েছেনও। কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হক নিয়েছেন রাষ্ট্রের ত্রাণ তহবিলের টাকা। খয়রাতি এ তহবিলের টাকার একমাত্র দাবিদার হচ্ছেন দেশের দুস্থ ও হতদরিদ্র জনগণ। খয়রাতি তহবিল থেকে একযোগে দশ লাখ টাকা তিনি কী কারণে নিয়েছেন, তার ব্যাখ্যা তিনি আজও দেননি। আগেই যদি তিনি এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়ে দিতেন তাহলে আজকে হয়তো তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতো না। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক অসুস্থ হয়ে উচ্চ আদালত থেকে ছুটি নিয়ে চিকিত্সার জন্য কোথাও গিয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই। তবে সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীরা সাফাই গেয়ে বলছেন, তার স্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর বিচারপতি খায়রুল হক এ টাকা নিয়েছিলেন। আমরা যতটুকু জানি বিচারপতি খায়রুল হক কিংবা তার স্ত্রী দেশের স্বনামধন্য পরিবারের সদস্য। অর্থবিত্তের দিক দিয়েও তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ। রাষ্ট্রের খয়রাতি তহবিলের গরিব-কাঙ্গালের টাকা নেয়ার মতো অবস্থায় তারা নেই। অথচ সরকার তাকে খয়রাতি বা ত্রাণ তহবিল থেকে টাকা দিয়ে উচ্চ আদালতকেই অপমানিত করেছে। উচ্চ আদালতকে অবমাননার দায়দায়িত্ব বিচারপতি খায়রুল হক ও সরকারকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা যেখানেই যান, এ বিষয়ে তারা জনগণের প্রশ্নের মুখে পড়েন। জনগণ বলছেন, উচ্চ আদালতের বিচারপতিরাই যদি ত্রাণ বা খয়রাতি তহবিলের টাকা নিয়ে নেন, তাহলে দেশের গরিব-কাঙ্গাল মানুষগুলোর কী অবস্থা হবে? সরকারের দলীয় মন্ত্রী ও নেতারা এখন এ বিষয়টিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছেন। বিচারপতি খায়রুল হকের খয়রাতি টাকা নেয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকারই বেশি মাত্রায় প্রচারণা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের অতিমাত্রায় উত্সাহ দেখে জনগণের মনে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
বিচারপতি খায়রুল হককে বিতর্কিত ও উচ্চ আদালতের মর্যাদা ধ্বংসকারী হিসেবে উল্লেখ করে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন আরও বলেন, উচ্চ আদালতে সাংবিধানিক জটিল বিষয়গুলো তিনি নিজে থেকে টেনে এনে দেশ ও জাতিকে এক গভীর সঙ্কটে ফেলে দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ বলে এক বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ রায় দিয়েছেন। এখন রায় লেখার আগেই সরকার রায়ের আলোকে সংবিধান ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। তিনি বিদায় নিয়েছেন, অথচ এখনও রায় না লিখে তিনি অনৈতিক কাজ করেছেন। তার সময়েই টিআইবি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, দেশের বিচার বিভাগই হচ্ছে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি ঘনঘন মিডিয়ায় বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে বিচার বিভাগকে কলুষিত করেছেন, বিচার ব্যবস্থার ভাব-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। দেশের অধস্তন আদালতগুলোর বিচারকদের ডেকে এনে বলেছেন, ‘আপনারা তোলা বা ঘুষ নেবেন না। আপানাদের মধ্যে যারা তোলা নেন তাদের বিষয়ে আমার কাছে খোঁজ-খবর আছে।’ বিচারকদের সম্পর্কে তার এ মন্তব্য বিচার বিভাগের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার সমান। অথচ তিনি অভিযুক্ত ও চিহ্নিত বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি।
অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর রাজনৈতিক মামলায়ও আগাম জামিনের বিধান রহিত করেন। তিনি উচ্চ আদালতসহ প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাংচুরকারী ও হত্যা মামলার আসামিকে বিচারপতি হিসেবে শপথ দেন। এ উপলক্ষে তিনি প্রথমবারের মতো উচ্চ আদালতে র্যাব ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেন। মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, টিআইবি যখন বিচার বিভাগকে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করে রিপোর্ট দিয়েছে তখন আপনারা চুপ করে বসে ছিলেন কেন? বিচারপতি খায়রুল হক যখন বলেছেন, বিচারকরা তোলা নেন, তখন আপনারা কোথায় বসে ছিলেন? তিনি বলেন, বিচারপতি খায়রুল হকের পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে রক্ষা করা যাবে না। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমেই তার বিচার হওয়া উচিত।
বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, উচ্চ আদালতকে আওয়ামী লীগ কলুষিত করেছে। এই আদালত ও বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠিমিছিল করে ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, জেগেছে আজ সেই জনতা’—এ বক্তব্যও দিয়েছেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতারাই। উচ্চ আদালত ভাংচুর, প্রধান বিচারপতির এজলাস তছনছ করে সুপ্রিমকোর্ট অঙ্গনে গাড়িতে আগুন লাগিয়েছে আওয়ামী লীগই। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও দেশের জনগণ এগুলো ভুলে যাননি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


