কোন বিষয় সম্পর্কে এত কম জেনে এভাবে লেখাটা হয়ত ঠিক না, কিন্তু না লিখেও পারছি না। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি আমরা চার জন; আমি,রিফাত, সিফাত আর নিশাত এটেন্ড করেছিলাম, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির “মুটকোর্ট সোসাইটি” আয়জিত “আবার ৭১” নামক এক সেমিনারে। এতে অংশ নিয়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছেচল্লিশটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত প্রায় দু’শরও বেশি শিক্ষার্থী। এর মাঝে অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল বেসকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ, আমরা যাদের নাম দিয়েছি, ”ইয়ো সম্প্রদায়”!!! যাদেরকে দেখলে স্মার্টনেসকে নতুন করে জানতে হয়। চেহারা, কথাবার্তা শুনলে আপাতত তাদেরকে পাগল বলেই মনে হবে। কিছু কিছু ছেলেমেয়েকে দেখলে মনে হয়, জীবনে এরা “ঢং” ছাড়া কিছুই চেনেনি। এই ঢং যে আসলে কোন পর্যায়ের, তা আদৌ কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পরিচয় দেয় কিনা, তা নিয়ে তাদের কোন চিন্তা ভাবনা থাকার প্রশ্নই উঠে না।
সেমিনারের শুরু থেকেই ছিলাম আমরা। আশেপাশের এই ইয়ো সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদেরকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, এদেরকে যদি এখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে হয়, তাহলে কেমন হবে?
* “ও ম্যান, তুমি জাননা আমার ডাস্ট এ্যলার্জি? এই ধুলাবালির মদ্ধ্যে আমাকে কেন নিয়ে এলে?”
* “ওহ নো! তোমার রাইফেলের ট্রিগারটা কি নোংরা! অসহ্য! টিস্যু নিয়ে আসনি কেন??”
* “ইয়ো বেবি! এত টেন্সড হচ্ছো কেন? আরে, মেশিনটা নিয়ে এভাবে দাঁড়াবে, ডাগ ডাগ ডাগ ডাগ করে চালাবে, সবকটাকে একদম শুইয়ে দেবে!”
যাইহোক, একটু দেরী হচ্ছিল শুরু হতে, তাই এসব ফাজলামি করেই সময় কাটাচ্ছিলাম আমরা। কী করব? এদের ভাবসাব দেখে অনষ্ঠানের ভারিক্কি বোঝারই উপায় নেই।
শুরু হল অনুষ্ঠান। প্রথম অংশে ছিল ১১ দফা দাবি উত্থাপন। যার মধ্যে ছিল “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার”, “মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ”, “নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি” সহ অত্যন্ত যুক্তিসংগত কয়েকটি দাবি। একেকটি দাবি পেশ করছিলেন এককে জন শিক্ষার্থী।
দাবিগুলো খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। আমার অনেক ভাল লাগছিল। তাদের বক্তব্যগুলো একদিকে যেমন ছিল যুক্তিপূর্ণ অপরদিকে ছিল তথ্যবহুল। যাহোক, বিপত্তি বাধল “ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই” এই দাবিটি উত্থাপনের সময়। যে ছেলেটি উপস্থাপন করছিল সে সম্ভবত একটু আপসেট ছিল। তাঁর বক্তব্যের মাঝেই হঠাত একটি ছেলে দর্শকদের মাঝ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়। এতে পরিবেশ কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দূর্ভাগ্য আয়োজকদের। কারন এরপর থেকেই অনুষ্ঠানের সিরিয়াসনেসটা যেন একটু কমে গেল। দাবি উত্থাপন শেষ হয়ে যাওয়ার পর শুরু হলো আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্যের পালা। অতিথিদের মাঝে রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণি সহ কয়েকজন বেশ নিরাপদ বক্তব্য দিলেন বলতে হবে। তাদের বক্তব্যের মাঝে বিতর্কিত দাবিটি প্রসংগে তেমন কিছু বলতে শুনলাম না। বলতেগেলে বিষয়টি নিয়ে প্রথমবারের মত মুখ খুললেন “প্রফেসর মুন্তাসির মামুন স্যার”। তিনি শুরুতেই বললেন, যতটা সময় ধরে অনুষ্ঠানটি চলছে এর মাঝে নামাজের সময় হয়েছিল দুইবার। তোমরা কেউ নামাজের জন্য আবেদন করলে না কেন?” এরপর বিপুল পরিমাণ তথ্য দেয়া শুরু করলেন। তার বক্তব্য সমর্থণ করা বা না করার জন্য ঐ বিষয়ে কিছুটা হলেও পড়াশোনা করা দরকার। না জেনে, ঐ বিষয়ে কোন মন্তব্য করা মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। অথচ আশ্চর্য হয়ে দেখলাম আমাদের ঠিক পেছনেই বসে থাকা কিছু ছেলে মেয়ে মুন্তাসির মামুন স্যারের মত একজন মানুষের কথার ভুল ধরায় ব্যস্ত! তারা চেষ্টা করছেন তাঁর প্রায় প্রতিটা কথারই সমালোচনা করতে, যার একটিরও কোন ভিত্তি নেই। যে জিনিষটা আমরা জানি না, সেটা বোঝার চেষ্টা না করে তার সমালোচনা করার মাঝে কোন ধরনের স্মার্টনেস লুকিয়ে আছে, আমি বুঝলাম না। অথচ তারা ফিসফিস করে তাদের বান্ধবীদের কানে কানে নিজের স্মার্টনেস এবং ধর্মের প্রতি আনুগত্য বোঝাতেই ব্যস্ত। অথচ ধর্মের প্রতি তাদের যে কতটা আনুগত্য তা তাদের প্রত্যেকের পোশাক আর তাদের মুখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল। ইয়ো সম্প্রদায়ের এসব ছেলেমেয়েদেরকে দিয়ে “আবার ৭১” আদৌ সম্ভব?
এমনটা বোধহয় যুগযুগ ধরেই হয়ে আসছে। রবীন্দ্রনাথের সময় রবীন্দ্রনাথের লেখার নিন্দা করা ছিল তখনকার তরুন সমাজের জন্য স্মার্টনেস। আর এখন সবকিছুর বিরোধিতা করাই হলো স্মার্টনেস।
খেটে মানুষের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই, তারা যা কিছুই করুকনা কেন মাথায় থাকে ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু, এই “ইয়ো”দের বেলায় তেমনটা ঘটে না। আমার বন্ধু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যাল্যে পড়ে। তার কাছে শুনলাম, সেখানে একবার একটা কালচারাল প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ করার জন্য ক্লাসের সবার কাছ থেকে চাঁদা নেয়া হয়েছিল পাঁচ হাজার টাকা!!! তার চেয়েও মজার ব্যপার, চাঁদা নেয়া হলেও প্রগ্রামটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। আমি জানতে চেয়েছিলাম, “চাঁদার টাকাটা তোমরা ফেরত চাওনি?” উত্তরে ও বলল, “কেউ চায় নি তাই আমিওকিছু বলিনি। একটা প্রেস্টিজের ব্যপার আছে না? কি অদ্ভুত! “প্রেস্টিজ ইস্যু”র কারণে স্যারদের কাছে ঐ চাঁদা আর কেউ ফেরত চায়নি!! বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম শুনে। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি সেখানে যে কোন সংগঠনের প্রধান সমস্যাই বলতে গেলে অর্থ। তারপরেও এখানে সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে। সামাজিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের হলেও সবারই মনটা বিপুল আশায় পরিপূর্ণ। সবাই চায় কিছু করতে। মানুষকে দেখানোর জন্য না, নিজেদের আত্মিক সুখের জন্য। আমাদের টাকা নেই, তবুও কিছু করি। আর ওদের টাকার যোগাড় হয় অনায়েসে, কিন্তু কাজটাই হয়না। হবেই বা কেন? তাদের কাছেতো মানুষকে দেখানোটাই বড় কথা। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এইসব ইয়োরা নিজেদের এই দেশের মানুষ ভাবাতো দূরের কথা, হয়ত এই গ্রহেরই একজন ভাবতে লজ্জা পায়!
আবার ফিরে আসি অনুষ্ঠানে। কিন্তু ফিরে এসে আর কী করব? যেটুকু ভালো ধারণা মনের মাঝে অবশিষ্ট ছিল, সেটুকুও শেষ হয়ে গেল অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরপরই যখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলো তখন। স্টেজে যখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল তখন স্টেজের পেছনে এই সেমিনার দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসা ছেলেমেয়েদের মাঝে টিএ বিতরন করা হচ্ছিল। সম্ভবত ব্র্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মহিলা এই দ্বায়িত্বে ছিলেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি মজাও করছিলেন সবার সাথে।
প্রথম আইটেমে বেশ কয়েকজন সুন্দরী মেয়ে মোমবাতি নিয়ে কোন একটা পারফরমেন্স করেছিল। অনেক গুরু গম্ভির ছিল আইটেমটা। কিন্তু মোমবাতি হাতে যখন তারা বাইরে, মানে স্টেজের পেছনে এলেন, দেখতে পেলাম তাদের আসল রূপ। তার বর্ণনা আর দিতে চাই না। শুধু এটুকুই বলতে চাই, তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, স্মার্টনেসের আরেক নাম অশ্লিলতা।
অনেক দূরে যেতে হবে আমাদের। তাই আর দেরী করতে পারিনি। দ্রুত চলে আসতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু আসার পথে মনে মনে ভাবলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মহান উদ্যোগ কি আদৌ কোন সুফল বয়ে নিয়ে আসবে? চিন্তাশীল মানুষদের কি মূল্যায়ন হবে আর কখোন? দেশের প্রাণ, ভবিষ্যত কর্ণধারদের বিরাট বড় অংশ জুড়ে থাকা এই ইয়ো সম্প্রদায় কি একটুও মোটিভেট হবে? যারা জীবনে টাকা, ঢং, ফুর্তি, ফ্যাশান(আর বলব না, কারন বলতে গেলে কিছু আপত্তিকর শব্দ লিখতেই হবে) ছাড়া জীবনে আর কিছুই চেনেনি তাদেরকে দিয়ে কি গঠনমূলক কিছু সম্ভব? বড়লোকের কিছু ন্যাকা ছেলে মেয়ে, যারা কখোন কল্পনাও করতে পারে না কষ্ট কী জিনিষ, না খেতে পাওয়ার যন্ত্রনা কেমন, যাদের কাছে জীবনের দর্শন হলো, ”খাওদাও আর ফুর্তি কর”; আর এই ফুর্তি করতে গিয়ে তারা যা করছে, প্রকৃত সভ্য সমাজে যা বলাই চলে না, তাদেরকে দিয়ে কী “আবার ৭১” সম্ভব?
সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন দেখি গরীব ঘরের অনেক ছেলেমেয়ে, বাবা মা’র কষ্টের টাকার বারোটা বাজিয়ে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেয়ে, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যলয়ে লেখাপড়া করতে গিয়ে, বড়লোকের এইসব আদুরে দুলালদের সাথে সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে নিজেদেরকেও এই ইয়ো সম্প্রদায়ভুক্ত করার প্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ধিক! শত ধিক, এইসব অপদার্থ কুলাংগারদের !!
(এখানে আমি "ইয়ো সম্প্রদায়" ভুক্ত বলতে কোন শুধুমাত্র বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের, আবার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছেলেমেয়েদের বোঝাইনি। খারাপ কোনকিছুকে বরণ করে নিতে আমরা সবাই কমবেশি ওস্তাদ)।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




