ভারতীয় স্পোর্টস চ্যানেল স্টার স্পোর্টসের জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন 'মওকা মওকা' এর বাংলাদেশ-ভারত ইন্সটলমেন্টের অফিসিয়াল কপি বের হবার আগেই ইউটিউবে জনৈক ইউটিবার কর্তৃক বানানো একটি ভিডিও এসেছে।
যেখানে দেখা যাচ্ছে বুকে ইন্ডিয়া লেখা একজন ঘরে বসে আছে। কলিংবেল বাজলো।সে দরজা খুলে দেখে বুকে বাংলাদেশ লেখা একজন এসেছে পূজার প্রসাদ, ফুল নিয়ে।এরপর ইন্ডিয়া (বুকে ইন্ডিয়া লেখা ছেলে) বাংলাদেশকে (বুকে বাংলাদেশ লেখা ছেলে) তার দেওয়ালের ক্যালেন্ডার দেখতে বললো যেখানে লেখা আছে, "1971,India created Bangladesh". তারপর বাংলাদেশ মুখ কালো করে ইন্ডিয়ার পায়ে প্রসাদ ফুল দিয়ে তাকে প্রণাম করে চলে গেলো।
এই বিজ্ঞাপন যে-ই বানাক না কেন,যে কারণে-ই বানাক না কেন,তার ধারণা এবং অধিকাংশ ভারতীয়র ও কিছু ছাগল বাংলাদেশীর ধারণা যে আসলেই আমাদের ভারতের সামনে নতজানু হয়ে থাকা দরকার আর আসলেই ভারত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো একটা রাষ্ট্র।তাদের জন্যেই এই রচনা।
বিজ্ঞাপনটি দেখে আমার মনে হলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের একটা তুলনামূলক আলোচনা করা দরকার।তার আগে একটা ইস্যু ক্লিয়ার করে নেই।
ইস্যুঃ 1971,India created Bangladesh
একাত্তরে কি হয়েছিলো সেটা বলার প্রয়োজন মনে করছিনা। একাত্তরের যুদ্ধে যে ভারতের অংশগ্রহণ ছিলো তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হলো সেই সহায়তার জন্য ভারতের বাংলাদেশের কাছ থেকে কি প্রাপ্য?
ছোট্ট একটা ধন্যবাদ।
ধন্যবাদটা কেন ছোট্ট? তার কারণ হলো,প্রথমত ভারতই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী।কেননা তৎকালীন কংগ্রেস সরকার একটা মার্জিনালাইজড মুসলিম জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করার মাধ্যমে মুসলিম লীগ নামক একটা ফ্যানাটিক সম্প্রদায়ের জন্ম দেয় যারা দ্বিজাতিত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ভারতবর্ষকে দুইভাগ করে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। এখন,ভারতীয় নেতাদের রাজনৈতিক মস্তিষ্ক যদি এতই তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে যে তারা ব্রিটিশরাজকে নতজানু করতে পারে,তারা এক জিন্নাহকে কি আটকাতে পারতো না? উত্তর হচ্ছে-পারতো! ইচ্ছা করে আটকায়নাই। কারণ তারা জনগোষ্ঠীর একটা অংশ বাদ দিয়েই দেশটা বানাতে চেয়েছিলো।
এই মহান ভারতীয়দের মধ্যেই একাংশ যারা বঙ্গভঙ্গের সময় বঙ্গ আমার জননী আমার বলে মরাকান্না কেঁদেছিলেন,তারাই নির্দ্বিধায় বঙ্গের অধিকাংশ ছেড়ে দিলেন। এবার আর তাদের বঙ্গ-ভঙ্গ হলো না। মুসলমান বিদায় হলো।
মনে রাখবেন,আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু(বি.দ্র:আমি আওয়ামী লীগ করিনা,বাংলাদেশ করি) তখনই বলেছিলেন যে এই আজাদী আজাদী না।
কাজেই এই যেসব হিপোক্রিট লিডাররা আজাদীর নামে দেশের মানুষের পেটে লাথি মেরে পাকিস্তান নামক অবাস্তব রাষ্ট্র সৃষ্টিতে বাধ্য করলো,তারা তখনই জানতো যে এই রাষ্ট্র টিকবে না,তবু তারা এই দাবি মেনে নিলো।কাজেই গণহত্যার কিছু দায় অবশ্যই তাদের।
দ্বিতীয়ত, ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে আমাদের উপর অনুগ্রহ করে না,নিজেদের পেটের তাগিদে। পাকিস্তান-ভারত দ্বন্দ তখন তুঙ্গে। অখন্ড পাকিস্তানের সাথে পেরে ওঠা কঠিন বলে নিজের তাগিদেই তারা বাংলাদেশকে সাহায্য করে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বা ন্যায্য দাবীর প্রতি সম্মানের চেয়ে এই সহায়তা ছিলো অনেকটাই শত্রুরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে দেয়ার সিদ্ধান্ত।
ওই সময় ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য না করে কি যে হতো সেটা ভেবে কম্পিত না এইভাবে ভাবা উচিত-ওই সময় ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য না করলে ভারতের কি এই বিরাট লাভটা হতো? আজকে কাশ্মীর যখন ভারত থেকে সরে আসতে চায়-পাকিস্তান তাদের সমর্থন করে। কাশ্মীরের জন্য করেনা,নিজের জন্যই করে।
সেই তাগিদেই তাদের সহায়তা। যুদ্ধটা আমাদের,জীবনটা আমাদের,সম্ভ্রমটা আমাদের, সহায়তাটা ওদের।একটি অপারগ ভারতের অপারগ সহায়তা। কারণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে তখন এইটা করা ছাড়া ভারতের আর কোন উপায় ছিলোনা।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের পরোক্ষ অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য যতটা লাভজনক ছিলো,ভারতের জন্যেও ততটা লাভজনক ছিলো। একটা কমন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানে এই না যে সারাজীবন সেইটার জন্য নতজানু থাকতে হবে।
৭১ পরবর্তী ভারতের কর্মকান্ড পাকিস্তানি শোষকদের চেয়ে কোন অংশে কম না। একটা নিও-কলনোনিয়ালিজম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তারা তখনও করেছে এখনও করছে। কাজেই ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার প্রশ্নই আসে না। ৭১ এর কারণে একটা ধন্যবাদ তাদের দেবো। কিন্তু ফেলানীর জন্য আর মঙ্গাপিড়ীত হাজার মানুষের জন্য তাদের তিনটা গালিও দেবো।
এবার মূল রচনা
||ভারতের খয়রাতী জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশীত্ব||
ধরেন আমি বাসের টিকেট কেনার জন্যে লাইনে দাঁড়ায়ে আছি। এইবার আমি যদি চিৎকার চ্যাঁচামেচি করি,যে মামা তাড়াতাড়ি,ফাস্ট হাত চালাও হ্যানোত্যানো,তাহলে হয়তো লাইনটা একটূ দ্রুত আগায়ে আমি একটু দ্রুত টিকেট পাবো। এইটুকুই। কিন্তু আল্টিমেটলি আমি টিকেট পাইতামই।
এখন আমাকে বুঝতে হবে ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটিশ এম্পায়ারের অবস্থা কি ছিলো? ১৯৪৭ থেকে ১৯৮০ এর মধ্যে তারা পুরা এম্পায়ার গুটায়ে আনলো নিজেদের রিসোর্স এর অভাবে। এগুলোর মধ্যে প্রথম ছিলো ভারতীয় সাবকনটিনেন্ট। তাহলে টিকেট আগে পাওয়া আর স্বাধীনতা আগে পাওয়ার মাঝে তফাত কি থাকলো?
মনে করবেননা আমি তিতুমীর,মাস্টারদা সূর্যসেন,প্রীতিলতা,ক্ষুদিরামদের অবদানকে ছোট করছি। মনে করবেননা যে আমি হাজার স্বদেশী শহীদ আর সুভাষ বোসের অবদানকে ছোট করছি। আমি তাদের পক্ষে কথা বলছি দেখেই বলছি যে ভারত কতটা ব্যর্থ একটা জাতীয়তাবাদ। এরা প্রত্যেকে যুদ্ধ করেছেন অখন্ড স্বাধীন ভারতের জন্য। যেই মুহুর্তে আপনি ভারতের একটা অংশকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা মেনে নেন,সেই মুহুর্তে আপনি স্বাধীনতার জন্যে জীবন দেয়া প্রত্যেকটা শহীদকে অপমান করে ফেলেন।
নেহেরু সাহেব,দেশটাকে যে ভাগ করে ফেললেন ৪৭'এ,একবার আমার মাস্টারদাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলেন যে তার জন্মভূমিকে ভেঙ্গে ফেলে-দাঙ্গার মুখে ঠেলে দিয়ে-নেয়া স্বাধীনতার জন্যে তিনি জীবন দিয়েছিলেন কিনা?আমার স্বদেশী জোয়ান ছেলেগুলো অখন্ড বাংলার জন্য রক্ত দিয়ে দিলো,অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করলো,তাদের অনুমতি কে নিয়েছিলো?
এই হচ্ছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। ভাইয়ের বুকে ছুরি মারা জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদ স্বার্থের জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদে জাতির সংজ্ঞা স্বার্থের সাথে পরিবর্তনশীল।
কাশ্মীর,আসাম,নাগাল্যান্ড,ত্রিপুরার সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পতাকা যখন বুলেট দিয়ে ছিড়ে দেয়া হয়-তখন বোঝা যায় ঐ জায়গাগুলোতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ঠিক কতোটা ভেগ।
আমি নিশ্চিত আজ দিল্লির কোন ছেলেকে ভারতের ম্যাপ আঁকতে বললে সে সেভেন সিস্টারস অংশটি আকবে না কারণ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তনশীল ভারতীয় সংজ্ঞায় আজ তাদেরও ভারতীয় বলে খুব একটা গোনা হয়না। কাশ্মীরের কথা আর না-ই বলি।
ভারত রাষ্ট্রটি আজ দিল্লি,মুম্বাই,চেন্নাই,কলকাতা শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ।তার বাইরে পুরো ভারত একটা আস্ত ভাগাড়।
রিভানা খুব সুন্দর একটা কথা বলে- ভারত হলো অসম উন্নতির রোল মডেল।
হাসি পায় যখন এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সাথে তুলনা করতে আসে।এমনকি অবমাননা করার সাহস রাখে তারা। অপারেশন জ্যাকপটের গল্প শুনলে তোমার রাহুল গান্ধীর প্যান্ট থেকে গন্ধ বের হবে।
বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের দিকে তাকাও।লোকগুলো রক্তের দামে জাতীয়তাবাদ কিনেছে। যুদ্ধের ময়দানে সংগ্রামে জেতা জাতী্যতাবাদ। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পেন্সিল কলমে আঁকা রাষ্ট্র নয় এটা।লাল সবুজের লালের মাঝে তিরিশ লক্ষ শহীদের থকথকে রক্ত জমে আছে।
এরপরও বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদকে নিয়ে প্রশ্ন করবার আগে,চিন্তা করে আসা উচিত। নিজের রক্তে অর্জন করা এক সুঁই জমিও খয়রাতে পাওয়া জমিদারীর চেয়ে বেশি গৌরবের। বাংলাদেশী পৃথিবীর সবচেয়ে বীর জাতি এতে কোন সন্দেহ নাই।এই জাতি মুখের ভাষা অর্জন করেছে রক্তের দামে, জাতীয় পতাকা অর্জন করেছে রক্তের দামে এমনকি গণতন্ত্র অর্জন করেছে রক্তের দামে। এই জাতি নিজের জাতীয়তাবাদ সাদা চামড়ার খয়রাতে পায়নাই।
এই বাংলাদেশকে যখন ভারতের সাথে তুলনা করা হয় তখন ওরা বলে ভারত নাকি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি উন্নত।কোনদিন না। মানব উন্নয়ন সূচকের সবগুলো দিক থেকে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। বাংলাদেশে কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নাই। বাংলাদেশের উন্নয়ন সুষম উন্নয়ন।ভাই,তোমাদের গণতন্ত্র ছয় দশকের-আমাদের মাত্র দুই দশক।তাতেই আমরা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি 'সুখী' রাষ্ট্র।সেখান থেকে দাঁড়ায়ে বাংলাদেশকে অপমান করতে আসো কোন সাহসে?
বীর জাতির সাথে লাগতে আসা ভালো না। অনেকদিন ধরে আমরা কাউকে ধরে 'দেওয়া'র উছিলা খুজতেসি।পায়া গেলে কিন্তুক খবর হয়া যাবে!সাথে সাথে সবডি মিল্যা এক। বীর বাঙ্গালির হাতিয়ার গর্জায়ে উঠলে কিন্তুক যেই সামনে আসুক না কেন-'ধরে দিবানে'
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




