
"আমায় ভাসাইলিরে, আমায় ডোবাইলিরে.....
অকূল দরিয়ায়ে বুঝি কুল নাই রে..."
কিংবা,
"আমার হাড় কালা করলাম রে.....
ওরে আমার দেহ কালার লাইগারে...."
এ গানগুলি শুনলে যার কথা প্রথমেই মনে আসে সে শিল্পী আলমগীর। পল্লী কবি জসিমউদ্দিনের লেখা ও সুরের এ গান গুলি আর কেউ এত দরদ দিয়ে গেয়েছেন কিনা আমার জানা নেই। এখনও বি.টি.ভি তে প্রায়ই প্রচারিত হয় এ সকল গান। কিংবা ইউ-টিউব এ সার্চ দিলে প্রথমেই পাওয়া যায় তার গান। ৭০, ৮০ ও ৯০ দশকের একজন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী। তবে বাংলাদেশের নয় পাকিস্তানের। ভাবছেন একজন পাকিস্তানী এত ভাল বাংলা গান গেয়েছে তাও আবার পল্লীগীতি। আসলে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি বাঙালি তবে বাংলাদেশী নন।
১৯৫৫ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তনে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালি পরিবারে জন্ম নেয়া এই পপ-শিল্পী পড়াশুনা করেছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, টাঙ্গাইলে এবং বি.এ.এফ শাহীন কলেজে। বাবা ছিলেন সর্ব-ভারতীয় মুসলিম লিগের একজন রাজনীতিবিদ। ১৫ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে তিনি পাডি জমান করাচি তে এবং ভর্তি হন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। উদ্দেশ্য উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে আমেরিকা পাডি জমানো তার ভাইদের কাছে।
কিন্তু ১০ বছর বয়সে যার মধ্যে ঢুকে গিয়েছে সঙ্গীত তা কি আর পিছু ছাডে। যদিও তার স্বপ্ন ছিল এয়ার ফোর্স জয়েন করা। প্রতিভাবান এই শিল্পী মাত্র ১০ বছর বয়েসেই গাইতে শুরু করেন এলভিস প্রিসলি কিংবা বিটলস ব্যান্ড এর গান। ১৯৭০ এ দিকে পাকিস্তানের মানুষ তখন বুঝেনি মডার্ন মিউজিক কি কিংবা পপ সঙ্গীত কাকে বলে। ১৯৭৩/৭৪ এর দিকে যে সকল গায়ক পাকিস্তান কে আধুনিক সঙ্গীতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন আলমগীর ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। যদিও তিনি তার সঙ্গীত জীবন শুরু করেন করাচির তারিক রোডের Globe Hotel নামের একটি ক্যাফে তে সান্ধ্য-সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে যেখানে তিনি পারিশ্রমিক হিসেবে পেতেন মাসিক ৩৫০ রুপি এবং রাতের খাবার।
পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তানী টেলিভিশনে নিয়োগ পান গিটারিস্ট হিসেবে এবং ১০৭০ এর শেষের দিকে তিনি পাকিস্তানি টেলিভিশনে গাওয়া শুরু করেন। তবে তিনি প্রথম জনপ্রিয়তা পান তার গান “আলবেলা রাহী” এর মাধ্যমে যা ৭০ এর দশকের খুব জনপ্রিয় গান। তিনি প্রচুর বিদেশী ভাষার গানের অনুকরণে পপ গান গাওয়া শুরু করেন এবং জনপ্রিয়তা পান। তিনি বেশ কিছু বাংলা গানের ও রিমেক তৈরী করেন যার মধ্যে, আমায় ভাসাইলিরে আমায় ডোবাইলিরে অন্যতম। আলমগীর প্রথমদিকে পাকিস্তান টেলিভিশনের জন্য গাইলেও পরবর্তি সময় তিনি পাকিস্তান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজ এর জন্য গাওয়া শুরু করেন। তবে ১৯৯২ এ তিনি তার শেষ এলবামটি করেন এবং ১৯৯৪ সালে তিনি পাকিস্থান ছেড়ে আমেরিকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস সুরু করেন।
মাতৃসুত্রে পাওয়া পলিসিস্টিক কিডনি রোগের কারণে তিনি অসস্থ হয়ে পড়েন এবং তার কিডনি প্রতিস্থাপন এর প্রয়োজন হয়। ২০১৪ তিনি পুনরায় পাকিস্থান ফিরে আসেন এবং বর্তমানে পাকিস্থানের কিছু টিভি চ্যানেলের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন। তবে কখনই বাংলাদেশে বাংলাদেশী হিসেবে ফিরে আসেন নি, এসেছেন অতিথি হিসেবে।
১৯৭১ এর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যে কয়েকজন হাতেগোনা লোক পাকিস্তান থেকে গিয়েছিলেন আলমগীর তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি হয়ত হেনরি কিসিন্জারের মতই বাংলাদেশ কে ভেবেছিলেন তলা বিহীন ঝুডি হিসেবে। যেখানে তার কোন ভবিষ্যত নেই। অথবা বলা যায় মাইকেল মধুসুধন দত্তের মত তিনিও পরধন লোভে মত্ত হয়েছিলেন।
তিনি তত্কালীন পাকিস্থানি যুব সমাজে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলেন এ কথা সত্যি তবে পাকিস্তান কখনো তাকে তার প্রতিভার কোন যোগ্য মূল্যায়ন করেনি। শুধুমাত্র প্রেসিডেন্ট পদক ছাড়া তেমন কোন অর্জন চোখে পড়েনি। অথচ বাংলায় মাত্র কয়েকটা গান গেয়েই তিনি আজও সবার হৃদয়ে আছেন। আমার মনে হয় তিনি যদি তখন বাংলাদেশে ফিরে আসতেন এবং বাংলায় সঙ্গীতচর্চা করতেন তবে তার মত প্রতিভাবান শিল্পী আজ উচ্চতার চরম শিখরে পৌছুতেন বলে আমার বিশ্বাস।

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



