কামরান ভাইয়া মানুষটা খুব মজার। আমি হলাম বুক-স্মার্ট পাবলিক। বই পড়ে পড়ে, বইয়ের গন্ধ শুঁকে জীবনকে চেনার চেষ্টা করি। আর ও স্ট্রীট স্মার্ট। বই তালাক দিলেও, রাস্তাকে বুকে টেনে নিয়েছে। ছোট বেলা বুঝিনি। এবার যাওয়ার পরে বেশির ভাগ সময়ই ওর সাথে কেটেছে। রাস্তায় রাস্তায়, রিকসায়, লোকাল বাসে, শীতলক্ষ্যার বুকে নৌকায় বা নদীর তীরে শিশির ভেজা ঘাসে বসে। অথবা গভীর রাত পর্যন্ত গ্রামের রাস্তায় জোছনার ভেজা পথ পথে। অথবা পুকুর পাড়ে বসে কোরাস গেয়ে, মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর দরদ ভরা আনট্রেইনড গলায় গান শুনে, হঠাৎ সুমন বা তাহসানকে আবিষ্কার করে। রাত বাড়লে নিজেরাই বন ফায়ার তৈরি করে হাত পা গরম করতে করতে। গল্প শুনলাম ওর জীবনের অনেক। ঢাকার খুব সাধারন একটা কিশোরের জীবনকে দেখলাম কাছ থেকে। ও বড় হয়েছে পাড়ার ছেলেদের সাথে মারপিট, দলাদলি করে। প্রেম করে। অনেক কিছু, যা বইয়ের বাইরে কল্পনা করতে পারে না আমার মত মেয়েরা, কৈশোরের গোপন পৃথিবীতে সেগুলোকে কাছ থেকে দেখে বড় হয়েছে ও। একটু পাগলাটে মানুষটা আমার খুব প্রিয়।
প্রিয় মানুষ হলেই কেমন অধিকার বোধ জন্মে যায় আমার। সেই থেকেই, ঢাকায় যখন যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হত, যে কোন ছোট খাট প্রয়োজনে ওকে ডাকতাম। মাথা গরম পাবলিক। দেরি হলে 'কেন দেরি' জিজ্ঞাসা করা যাবে না। প্রথম দিন বুঝি নাই। দুই ঘন্টা দেরি হওয়ার পরে মহা রাগান্বিত আমি কথা বলছিলাম না বলে ব্যাটা চলে গেছে, 'আমারে ঢেউ টিন পাইছস?!' ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম, 'ভাইয়া, ঢেউ টিন মানে কি?'
এর পর থেকে যখন যেতে হবে তার দুই ঘন্টা আগে সময় দিতাম।

একবার বন্ধুর বাসায় নিয়ে যাওয়ার সময় বলছে, আমি হইলাম তোর ট্রান্সপোরটার। ট্রান্সপোরটার মুভ্যিটা দেখছস? মাথা নাড়লাম, দেখি নি। ও বুঝিয়ে বলল, সে মুভিতে, 'ট্রান্সপোর্টার' এক লোকের নাম, যার মূল দায়িত্ব হল, এক জনের কাছ থেকে অন্য জনের কাছে জিনিস ট্রান্সপোর্ট করে নিয়ে যাওয়া। যাই হোক সে জিনিস, পিজ্জা হোক, কি বোমা হোক, ডেলিভারি 100% নিশ্চিত। সেই থেকে ও আমার ট্রান্সপোর্টার ভাইয়া।
ঢাকার রাস্তায় আমাকে হাঁটা শিখিয়েছে ট্রান্সপোর্টার ভাইয়া। বেপরোয়া রিকশাগুলোর সামনে দিয়ে, 'ভীতুর ডিম, হাত ধর!' বলে টেনে রাস্তা পার করিয়ে দিত। দোকানে গিয়ে কি পছন্দ শুধু দেখিয়ে দিতাম। ও দামাদামি করে আমার কল্পনার বাইরে সব দামে কিনে দিত। বিনিময়ে আমার সাথে রিকসায় বসে সিগারেট ফুঁকার অনুমতি দিতে হত!
আসার দুই দিন আগে যথা রীতি বললাম, বসুন্ধরা সিটিতে যাব। আমাকে সকাল আটটায় এসে নিয়ে যেও। যেতে যেতে প্রশ্ন করল, কি করবি? বললাম, ভাইয়ার জন্মদিন আসছে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে, একটা ফর্মাল শার্ট কিনে দিব। কিন্তু তোমার পছন্দ করে দিতে হবে। আমি আজ অব্দি কোন ছেলের জন্য কোন গিফট কিনি নাই। বুঝই তো, বুঝি না ব্যপার স্যপার।
ক্যাটস আই বুলস আই যত দোকান আছে সব চষে আমার কামরান ভাইয়া দুইজনেরই মারাত্মক পছন্দের একটা শার্ট কিনলাম। আসার জাস্ট দুই দিন আগে, মানিব্যাগ খালি করে টাকা দিয়ে আসলাম।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


