আমি শুনতে শুনতে জমে যাচ্ছিলাম। তাকাতে পারছিলাম না। বাস্তবে, মানে সত্যি সত্যি... বইয়ে না... আমার সামনের চেয়ারে বসে এত টুকু দৃঢ়তা নিয়ে একজন কথাগুলো বলে যাচ্ছে? আমি যে কাঁদছি দেখতে পাচ্ছে না? না পাক, না পাক।
ইন্দোনেশিয়ান মেয়েটার খুব হাসিখুশি দিকটাই চোখে পড়েছে এত দিন। এত প্রান শক্তি একজন মানুষ কোথা থেকে পায় ভেবেছি অনেক। আমি তো জোরে কথা বলতে পারি না। সাধারন কথাই আস্তে বলি। রাগ বা প্রয়োজনেও গলা তুলতে পারি না। ও আসার পরে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। উঁচু গলায় গড়গড়িয়ে কথা বলিয়ে মেয়েটার নেতর্ৃত্ব অসাধারন। কি সহজেই এক গাদা মেয়েকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। কি করে সবার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে যায় সমস্যায় যাচ্ছে। সমস্যার গভীরতাও আন্দাজ করে ফেলে। ধরে লেকচার দিয়ে দেয়, সবাইকে আশ্রয়ের জন্য নিজের কাঁধ পেতে দেয়।
আমাকেও ধরল একদিন। মন খারাপ ছিল সত্যিই। অনেক সময় আমরা পিছলে পড়ে যাই। উঠতে পারি না। অনেকটুকু উঠে এসে আবারও পিছলে পড়ি। এতদিনের চেষ্টা সব মাটি। তেমনই একটা অনুভূতি হচ্ছিল তখন। তখনই ধরেছে আমাকে। আমি পুরোপুরি অপরিচিতদের কাছে যত সহজে সমস্যার কথা বলি, পরিচিতদের কাছে তত সহজে বলি না। আমার দুনিয়া উলটে যাবে, কিন্তু আশে পাশের মানুষেরা টের পায় না। ও কি করে বুঝে ফেলল। বলি নি অবশ্য। ক্লাস এসাইনমেন্টের দোহাই দিয়ে ছুটে আসলাম।
এর মাঝে সপ্তাহব্যপী অনুষ্ঠানের কাজ করে যাচ্ছি পুরাদমে। প্রতিদিন শ'য়ে শ'য়ে মেইল পড়া এবং সেগুলোর প্রয়োজনে জবাব দেয়া। কাজ ভাগা ভাগি ঠিক আছে কি না তা দেখা। মেয়েটার সাথেও কথা হচ্ছে ফোনে নিয়মিত।
শুক্রবার রাতে আবারও ফোন করল। একটু বললাম... ও প্রচুর কথা বলে। পুরো এক ঘন্টা শুনলাম ওর কথা... জীবনের কথা...
কাল আবারও মুখোমুখি কথা বললো ঘন্টাখানেকের বেশি।
তখনই বুঝতে পারছিলাম না কি করব।
বলে যাচ্ছিল ও...
বয়স মোটে বাইশ। কিন্তু জীবনকে এতটুকু চিনেছে, যাতে জোড় গলায় বলতে পারে, জীবনে চলার পথটুকুতে পিচ্ছিল। একবার পিছলে পড়লে উঠে দাঁড়াতে হবেই। সময় লাগবে, কিন্তু দাঁড়ানো সম্ভব জেনেই দাঁড়াতে হবে। আর যার যতটুকু ক্ষমতা, সে পিছলে পড়লে ঠিক সেই ম্যাগনিচুডের প্রচন্ড আছাড় খেয়ে পড়ে।
আর, পিছলে না পড়লে উঠে দাঁড়ানো কাকে বলে চেনা যায় না। নিজেকে চেনা যায় না!
কত কম জানি মানুষ সম্পর্কে আমরা!
খুব অল্প বয়সেই মানুষের কুৎসিততম চেহারা চিনেছে নিজের জন্মদাতাকে দিয়ে। লোকটা ওকে ধর্ষন করতো...
আঠারো হতেই ঘর ছেড়েছে। তারপরে বিশে বিয়ে এবং একুশে ডিভোর্স!
মাঝে সব হারিয়ে আবার সেই পুরানো বাবার ঘরে ফিরে যেতে হয়েছিল। শূণ্য থেকে সব শুরু করতে হয়েছে।
এখন বাইশে সেই তিনি এত প্রানবন্ত, স্বপ্ন দেখতে ভালবাসা, স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারা একজন চমৎকার মানুষ!
আমি সত্যিই বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সব সমস্যা, সব ভাবনাকে বিলাসিতা মনে হচ্ছিল। হতাশাকে চিনি বলতেই লজ্জা লাগছিল। সিদ্ধান্তহীনতা, থমকে যাওয়া সব খুব দূরের কিছু মনে হচ্ছিল।
মানুষের কষ্ট সম্পর্কে কত কম জানি আমরা... কি ঠুনকো আমাদের জানা, আমাদের কষ্ট!
কথা শেষ করে আমার হাত ধরে বলছিল, তোমাকে আমি পড়তে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার সাথে ভাবনায় মিল আছে। আয়নার মত। তাই বলেছি এত কথা। অনেক ক্ষমতা তোমার। খুব ছোট্ট জীবনে এত টুকু নষ্ট করার মত সময় তোমার হাতে নেই। স্রষ্টার কাছে কি জবাব দিবে, হুম?
[99 তম পোস্ট। লিখায় মন বসছে না। 100 তম কবে হবে জানি না।]
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৬ রাত ২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


