somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসলাম কি নারী নেতৃত্ব বিরোধী?

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েজ কিনা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় মূলক বেশ কিছু পোষ্টও আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো নারী নেতৃত্ব কেনো ইসলামে থাকবে না? এমন জাতীয় মন্তব্য ইসলাম করে না। তবে ইসলামে নারী ও পুরুষ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আয়াত নাজিল করা হয়েচে। সেই আয়াত গুলো নিয়ে অনেকে অনেক মন্তব্য করে। আমি আজ এ বিষয়ে পক্ষে বিপক্ষে দুই পক্ষে বলবো? যোগ্য নারীরা কেনো ইসলামে নেতৃত্ব পদ পাবে না এটি সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য প্রশ্ন?

ইসলামে নারী নেতৃত্ব নিয়ে কী বলা আছে? ইসলামে নারী নেতৃত্ব আসলেই কি নিষেধ করা হয়েছে? এই নিষেধাজ্ঞা বোঝাতে গিয়ে কিছু কিচু আলেম কোরানের একটা আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। তা হলো- 'আল-রিজালু ক্বাওয়্যামূনা ‘আলান্-নিসা' "পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল, যেহেতু আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং যেহেতু তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৪) এটা কি নারী নেতৃত্বের বিষয়ে স্পষ্ট করার জন্য। আয়াতটিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আয়াতটি পূরুষ ও নারীর সাংসারিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য বর্ননা করা হয়েছে? যে সংসারে শুধুমাত্র পূরুষ একা আয় করে উপার্জন করে সেই সংসারে কি পূরুষের প্রধান্য পাওয়ার অধিকার আছে? তাকে পরিবারের কর্তা হিসেবে নারীর মেনে চলা উচিত। বিভিন্ন তাফসির থেকে বা ইতিহাস থেকে যা পাওয়া যায়৷ এক সাহাবি তার স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।এক পর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে আঘাত করেন। স্ত্রী বিষয়টি নিয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে স্ত্রি গিয়ে অভিযোগ করার পর এই আয়াতটি নাজিল হয়। খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করুন আয়াতটি নারী পূরুষের সাংসারিক ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে। এটা সম্পূর্ণভাবে পারিবারিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। এটার সঙ্গে রাজনীতি বা ক্ষমতার কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ এর দ্বারা কোনোভাবেই বোঝা যায় না যে, ইসলামে নারী নেতৃত্ব নিষেধ করা হয়েছে । আবার আয়াতটির শেষে অংশে লক্ষ্য করুন বলা হচ্ছে-“অতঃপর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তাহলে তাদের উপর নির্যাতনের বাহানা খোঁজ করো না, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ।” এই আয়াতের দ্বারা বোঝানো হয়েছে, সংসারে বিশৃঙ্খলা হলে পুরুষ দায় এড়াতে পারবে না এবং ভরণ–পোষণ ও ন্যায়ের ভার তার ওপরই তার জন্য ইচ্ছে হলেই বাহানা তুলে নারী নির্যাতন করা যাবে না। পুরুষকে শুধুমাত্র আধিপত্য দেওয়া হয়েছে সংসার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।কারন পুরুষের আধিপত্য না দিলে নারী পুরুষের আভ্যান্তরীর দ্বন্দ সংসার ভাঙ্গার কারন হযে পড়বে। সন্তানের জীবন দুবীষহ হযে পড়বে। কিন্তু নারী নেতৃত্ব নিয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা যেমন নেই, তেমন সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত হয়েছে এমন আয়াত নেই।

কিচু কিচু মুহাদ্দিসগণ একটি হাদীস অনুসারে নারীকে নেতৃত্ব থেকে অপসারন করতে চান। বোখারী শরীফের একটি হাদিসের উপর ভিত্তি করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদীসই কি এই বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা দেয়? "ঐ জাতি কখনোই সফল হবে না, যারা তাদের শাসনের দায়িত্ব কোনো নারীর হাতে ন্যস্ত করে।" সহীহ : বুখারী ৪৪২৫ এবং ৭০৯৯, নাসায়ী ৫৩৮৮, তিরমিযী ২২৬২, সহীহাহ্ ২৬১৩, ইরওয়া ২৪৫৬। ঘটনার বর্ননা থেকে জানা যায় আল্লাহর রাসুল (সা.) তৎকালীন বৃহৎ শক্তি পারস্যের সম্রাট কিসরার কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অহংকারী কিসরা সেই চিঠি ছিঁড়ে ফেলে। এ খবর শুনে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, তার সাম্রাজ্যও এভাবেই টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিছুদিন পর কিসরা তার নিজের ছেলের হাতে নিহত হয়। এরপর সেখানে চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত কিসরার কন্যাকে সিংহাসনে বসানো হয়। যখন মদিনায় এই সংবাদ পৌঁছায় যে পারস্যবাসী একজন নারীকে শাসক বানিয়েছে, তখন রাসুল (সা.) সেই নির্দিষ্ট বিশৃঙ্খল ও অভিশপ্ত সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্যটি করেছিলেন। যদি বনর্নাকারী হাদীসটি সত্য হয়ে থাকে তাহলে বলা যায় এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ফয়সালা, কোনো স্থায়ী ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নয়। একটি কথা মাথায় রাখতে হবে রাসুলের মৃত্যু প্রায় ২৫০ বৎসর পর বোখারী (সাঃ) হাদীস সংগ্রহ শুরু করেন। রাসুলের জীবদ্দশায় তার মুখের কথা বা হাদীস কেউ যেনো লিখিত না করে তার জন্য তার কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় চার খলিফার কেউ হাদীস সংগ্রহ করেন নাই। বরং যে হাদীস গুলো সংগৃহিত করা হয়েছিলো তা আবু বক্কার (আঃ) এবং ওমর (আঃ) পুড়িয়ে দিয়েছিলেন কারন হাদীস নিয়ে রাসুলের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও লানতের নিদের্শ এর কারনে। ফলে লুকিয়ে লুকিয়েও হাদীস সংগ্রহ একেবারেই থেমে যায়। পরবর্তীতে উমাইয়া শাষন আমলে বোখারী (আঃ) প্রায় পাঁচ জেনারেশন অতিবাহিত হবার পর হাদীস সংগ্রহ করা শুরু করেন। এই কারনে হাদীস নিয়ে সংশয় থাকায় সহী ও জাল জইফ নিয়ে বিতর্ক চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন দেখা দেয় রাসুলের মৃত্যুর এত বৎসর পর তার মুখের কথা সত্যতা কতটুকু গ্রহনযোগ্য হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় আল কোরআনের সাথে সংগতিপূন হাদীস অবশ্যই গ্রহন করা যায়। কিন্তু নারী নেতৃত্ব নিয়ে উল্লেখিত হাদীসটির সাথে আল কোরআনের কোন আয়াতের সংগতিপূর্নতা পাওয়া যায় না। আল কোরআনে উল্লেখিত রানি বিলকিসের আয়াতগুলো দ্বারা প্রমানিত হয় নারী নেতৃত্ব দিতে পারে যদি সে ঈমানদার হয়ে থাকে। সাবা'র রানি বিলকিসের শাসনকে কোরানে নিষেধ করা বা নিন্দা পর্যন্ত করা হয় নি। বরং তাকে বিচক্ষন এবং আল্লার প্রতি ঈমান আনাতে তাকে ইমানদার বলে অভিহিত করা হয়।

এবার আসি হাদীসটির বর্ণনাকারী আবূ বকরাহ (রা.) এর ঐতিহাসিক বিতর্ক নিয়ে আলোচনায়। এই হাদিসটির একমাত্র বর্ণনাকারী হলেন সাহাবী আবূ বকরাহ (রা.)। ইসলামি ইতিহাসে তাঁকে নিয়ে একটি বিশেষ কারণে একাডেমিক আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাকে অনেকে মিথ্যাবাদী বলেও অভিহিত করেন। খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে মুগীরা ইবনে শুবা (রা.)-এর বিরুদ্ধে একটি ব্যভিচারের অভিযোগ ওঠে। এটি ‘কাজফ বা অপবাদ মামলা নামে অভিহিত। এই মামলায় আবূ বকরাহ (রা.) সহ চারজন ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে আসেন। কিন্তু সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। ফলে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। ফলশ্রুতিতে খলিফা উমর (রা.) ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, ‘কাজফ (মিথ্যা অপবাদ) এর দায়ে দণ্ডিত করা হয়।আবূ বকরাহসহ তিনজনকে ৮০টি বেত্রাঘাত প্রদান করেন। সাক্ষ্যযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকার এবং কুরআনের বিধান অনুযায়ী, যারা মিথ্যা অপবাদের দায়ে দণ্ডিত হয়, তাদের সাক্ষ্য পরবর্তীকালে গ্রহণ করা হয় না (সুরা নূর: ৪)। ফলে একটি পক্ষ মনে করে যেহেতু তিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, তাই রাজনৈতিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর একক বর্ণনাকে চূড়ান্ত আইন হিসেবে গ্রহণ করা অনুচিত হবে। যেহেতু একটি জাতি বা নারী জাতির অধিকারের প্রশ্ন থাকায় একজন মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার বর্ণিত হাদীসের উপর ভিত্তি করে এতবড় সিদ্ধান্ত কখনই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২
৪টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৯


তিন শ' তিন
মুমিন তো নই, তবু খোদা টিকিয়ে রেখেছে!
প্রেমিক তো নই, তবু প্রেম বিকিয়ে রেখেছে!

তিন শ' চার

ভীষণ একাকী আমি, অপেক্ষায় কেটে যায় বেলা।
হতাশার মাঝে শুধু, পাশে আছে তার অবহেলা ! ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম কি নারী নেতৃত্ব বিরোধী?

লিখেছেন রাশিদুল ইসলাম লাবলু, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২



ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েজ কিনা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় মূলক বেশ কিছু পোষ্টও আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×