মীরার চিল্লাচিলিত্লে ঘুম ভাঙলো নয়টায়। ঈদের সকালে এর বেশি ঘুমানো নাকি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমি এত করে হাতে পায়ে ধরলাম, মেয়েটার দিলে দয়া হলো না। খুব কষ্ট করে উঠে প্রথম কাজ: ঈদের শাওয়ার। বের হতেই মীরার ঝাড়ি। তাড়াতাড়ি! পুরো রেডি হতে যতক্ষণ লাগলো, স্কার্ফ পছন্দমত পড়তে বোধ হয় তার দ্্বিগুন সময় লাগলো। এদিকে ঘড়ি দেখছে মীরা আর কটমট করছে। পোনে দশটা বাজতেই বাসার প্রধান ফটক তালা দিয়ে আমরা রাস্তায়। দশটার ট্রেইন ধরতে হবে।
ট্রেইনের টিকেট কাটতে গিয়ে মজার কান্ড হলো। লোকটা আমাকে একটা চাইলড টিকেট গছায় দিতে চাইছিল। আমি মুখ গম্ভীর করে বললাম, আই অ্যাম টোয়েন্টি। বলেই লোকটার মুখ দেখে ফিক করে হেসে ফেললাম। লজ্জা পেয়েছে বেচারা। ট্রেইনের বাকি পথ টুকু গেল আমার আর মীরার খোচাখুচি, আড্ডায়, গানে, গল্পে। সেন্ট্রাল স্টেশনে এগারোটায় বের হয়েই দেখি ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে। মাত্র এসেছে। ও একটু ভয় পাওয়া ভাব করে বলল, সব্বোনাশ, দুই দুইটা সুন্দরী মহিলা নিয়ে হাঁটছি। আমার তো এখন লোকজনকে থামায় বলতে হবে, ভাইসাহেব, ইনারা আমার বোন।
আমাদের গন্তব্য: অজানা!
সেন্ট্রাল স্টেশনের টানেলের দুই পাশে হালকা সবুজ, সোনালী আল্পনা। আর ঠিক মাঝখানে গিটার হাত গান গাইতে থাকা এক বুড়ো লোক, সামনে পয়সা রাখার হ্যাট। যতবার টানেল দিয়ে যাই, এই বিত্তহীন প্রতিভাবানদের সুখী সুখী গান শুনেই টের পাইটা মন দুম করে ভালো হয়ে গিয়েছে। হাঁটার বদলে উড়ে পার হই টানেলটুকু। সারাদিন মনে সেই ফুরফুরে ভাবটা রয়ে যায়।
অনেক হাঁটতে হাঁটতে, গল্পাতে গল্পাতে হাজির হলাম ব্রডওয়ে হয়েটস সিনেমা হলে। দেখব 'হ্যাপি ফীট'। নতুন এনিমেটেড মুভ্যি। জি রেইটেড তাই নিরাপদ।
পরের দুই ঘন্টা কাটল হাসি থামানের তুমুল চেষ্টায়। এর বেশি হাসলে পেট ফেটে যাবে। এনিমেটেড মুভ্যিগুলো ইদানিং এত চমৎকার হচেছ! পেঁয়াজের মত, খোসার পর খোসা। অনেকগুলো লেভেলে মুভ্যি উপভোগ করা যায়। তিন বছরের গুঁড়ো বাচ্চা থেকে পঞ্চাশ বছরের ইউনিভার্সিটির ইংরেজির অধ্যাপক, সবাই ভালোবাসবে। আমি শুধু এনিমেশনের ট্যালেন্ট দেখেই কাইত। কি করে একটা পেঙ্গুঈনকে যাবতীয় মানবীয় গুনাবলী দিয়েও পেঙ্গুইন রাখা যায় তা দেখলাম আর মুগ্ধ হলাম, ঈর্শান্বিত হলাম। আর কথাগুলো তো ক্লেভারের এক শেষ। আমার পছন্দের লাইন: I tried as hard as penguinly possible.
স্টেরিওটাইপ করার বিরুদ্ধে, গোবালাইজেশন সম্পর্কে, ভালো জিনিস গ্রহন করার ব্যাপারে, আলাদা অর্থ্যাৎ খারাপ এই ভাবনার বিরুদ্ধে, পরিবেশ রক্ষা সম্পর্কে শক্ত খটমট বক্তব্য ছিল পেঁয়াজের একদম ভিতরে। আমি শুধু বাইরের পরতগুলো খুলছিলাম আর হাসছিলাম পুরাটা সময়।
মুভি শেষ হওয়ার পরে হলো অভাবনীয় কান্ড। এক তলা সমান উঁচু স্ক্রীনে তখন ক্রেডিটস র্অথ্যাৎ নায়ক-নায়িকা-গায়ক-গায়িকা-পরিচালক-গাড়িচালকের নাম দেখাচ্ছে আর ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে। স্ক্রীনের এক কোনায় পেঙ্গুইনগুলো নৃত্য করে যাচ্ছে। হঠাৎ চারটা তিন চার বছরের শিশু উঠে গিয়ে নাচা শুরু করলো স্ক্রীনের সামনে। পেঙ্গুইনগুলোর সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে। ছোট্ট নরম আঙ্গুলগুলো দিয়ে হালকা তুড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রজেক্টরের আলো মুখে পড়তেই নাক কুঁচকে আলো ধরার চেষ্টা করছে আর খিল খিল করে হাসছে।
আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম... আসল জিনিস তো দেখা হলো এতক্ষণে!
(চলছে এখনও)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ রাত ১১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



