somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশি দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা

২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কাল থেকে দুই ধাপে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা ও মতাদর্শ দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তেমনি এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও প্রতিফলিত হয়। ভারতে যখন হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী শক্তি প্রবল হয়, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তা প্রভাব ফেলে এবং প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সক্রিয় করে তোলে।

ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা সহিংসতা বাড়লে একদিকে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো এসব ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করে। ভারতে গণতন্ত্র দুর্বল হলে এবং হিন্দুত্ববাদী শক্তি আরও আগ্রাসী হয়ে উঠলে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর তৎপরতাও বেড়ে যায়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদীরা রাজ্য ক্ষমতায় আসেনি। তবে এবার সেখানে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে যেমন জামাত জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল - যদিও তা বাস্তবে ঘটেনি, একইভাবে পশ্চিমবঙ্গেও ক্ষমতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জরিপে দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস এখন পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। তবে ভোটার তালিকা সংশোধন ও প্রপাগাণ্ডা দিয়ে বিজেপি তার সমর্থন বাড়াচ্ছে । জরিপ অনুযায়ী, ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ১৬১টি, বিজেপি ১২৪টি এবং কংগ্রেস ৯টি আসন পেতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে জামাত ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো যে ধরনের ভীতি ও ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেছিল, নির্বাচন ঘিরে পশ্চিমবঙ্গেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বয়ানে বিভাজন ও আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বিকৃত করে "মমতাজ বেগম" নাম দেওয়া হয়েছে। এমন প্রচার চালানো হচ্ছে যে, বিজেপি ক্ষমতায় না এলে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা উত্তর প্রদেশে চলে যেতে বাধ্য হবে।

নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে। বাংলাভাষী মুসলিম মাত্রই ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী - এমন একটা ধারণা প্রচার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশভীতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিজেপি সীমান্তবর্তী জেলা যেমন মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা ও মালদায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পরবর্তীতে তারা নির্বাচনী সীমানা পুনর্গঠন করে মুসলিম-প্রভাবিত আসন সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করেছে। এই আসনগুলো ভেঙে হিন্দু-প্রধান আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে অনেক জায়গায় মুসলিম ভোটের ঘনত্ব কমে গিয়েছে।

এই নির্বাচনটি মূলত ধর্মীয় পরিচয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। এখানে এই ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে মুসলিম ভোটাররা বিজেপির বিরোধিতা করছে, তার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু ভোটারদের তৃণমূলকে নির্বাচনে মোকাবিলার জন্য একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

বিজেপি বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যার পরিবর্তন, ভোট জালিয়াতি এবং সীমান্তে নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সমাবেশে বারবার ব্যবহার করে "বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের" বিতাড়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের একজন। বাংলাদেশ নিয়ে শুভেন্দু বলেছেন, ‘ইসরায়েল যেমন গাজাকে শিক্ষা দিয়েছে, সেভাবে বাংলাদেশকে শিক্ষা দিতে হবে"। তিনি বলেন, "বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে ভারতের চার-পাঁচটা ড্রোনই যথেষ্ট"।

ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি শক্তিশালী হলে তা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের আন্দোলিত করে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) মতাদর্শে পরিচালিত বিজেপি কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসার পরে সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষমূলক রাজনীতি ভারতের মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলাদেশে যে ইসলামপন্থী উগ্রধারা আগে প্রান্তিক, বিচ্ছিন্ন ও অবদমিত অবস্থায় ছিল, ভারতের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন তা নতুন করে বাংলাদেশের উগ্রপন্থীদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। ফলে এখন বাংলাদেশের উগ্রপন্থীদের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। বাংলাদেশের গত নির্বাচনে দেখা গেছে, জামাতের অনেক প্রচারনাই বিজেপির প্রচারণা থেকে নকল করা।

ভারতে রাজনীতির বাইরেও অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে আরএসএসের প্রভাব যেভাবে গভীর হয়েছে, বাংলাদেশেও জামাত ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে প্রভাব বিস্তারে সফল হয়েছে। ভারতীয়দের চিন্তাজগতে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের প্রভাব যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে, বাংলাদেশেও ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের প্রভাব সেভাবে বেড়েছে।

আরএসএসের লক্ষ্য ছিল ভারতে হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরণ। হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের ধারণাটি শুরু থেকে আরএসএসে যুক্ত ছিল। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। ভারতের প্রায় ১৯টি রাজ্যে একক বা জোটে বিজেপি ক্ষমতায়, লোকসভায় তাদের আসন সংখ্যা ২৪০, সেখানে কংগ্রেসের মাত্র ৯৯ টি।

আরএসএসের প্রতিষ্ঠাকালীন গুরু গোলওয়ালকর জার্মান নাৎসিদের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে রূপান্তরের ধারণা তাঁর দ্বারাই বপিত হয়েছিল। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে লিকুদ পার্টি নতুন নাৎসি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, এবং নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপিও নাৎসি-অনুরাগী থেকে ইসরায়েলপন্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

জায়নবাদীরা যেমন "ঈশ্বরের মনোনীত জাতি" তেমন হিন্দুত্ববাদীরাও বর্ণশ্রেষ্ঠ জাতি। ইসরায়েল যেমন একটি "ইহুদীরাষ্ট্র" এবং অইহুদীরা "গয়িম", হিন্দুত্ববাদীরাও তেমন ভারতে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিয়োজিত আছে।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম বিজেপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই রাজ্যগুলো থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করার দুরভিসন্ধি বিজেপির আছে। মুসলিমদেরকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হলে তা ব্যপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। তাই যদি এই জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা যায়, তাহলে তারা নিজেরাই একসময় বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হবে।

এটাই হিন্দুত্ববাদী পরিকল্পনা, যার সাথে ইসরায়েলের গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও অধিগ্রহনের মিল আছে। এর সাথে যদি ১৯৫১ সালের মত ইরাকের ইহুদিদের প্রার্থনালয়ে বোমা হামলার সম্ভাব্য ফলস ফ্লাগের ঘটনা ঘটে, তবে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে বহুদূর এগিয়ে যাবে। নরেন্দ্র মোদীর বর্ণিত “ইসরায়েল পিতৃভূমি এবং ভারত মাতৃভূমি” এই কথার সার্থকতাও তখন প্রতিষ্ঠিত হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯
১৬টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাতছানি

লিখেছেন আহমেদ রুহুল আমিন, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:২২

বাঁশবনের উপরে গোধূলীর আকাশে
কি'যে অপরুপ লাগে একফালি চাঁদ,
কাশবনের দুধারে মৃদুমন্দ বাতাসে
ঢেউ খেলে যায় সেথা জোৎস্নার ফাঁদ-
আহা..., কী অপরুপ সেই 'বাঁশফালি চাঁদ' ।

পাখিদের নীড়ে ফেরা কল-কাকলীতে
শিউলী-কামিনী যেথা ছড়ায় সুবাস,
আজানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিচ্ছু চাই না আমি, আজীবন ভালোবাসা ছাড়া!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১১:৫১



অতি তুচ্ছ বিষয় গুলোতে আমি আনন্দ পাই।
পথে ঘাটের সব রকম দৃশ্য আমি উপভোগ করি। পথে হেটে যাচ্ছি, একসাথে অনেক গুলো কাক কা কা করতে করতে উড়ে গেলো! এটা দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যতের স্পষ্ট বার্তা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:১৭



কারিনা ইস্যুতে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের আত্মপক্ষ সমর্থন না- এটা জনমতের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। যদি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই হেটস্পিচ আসতো, তাহলে কারিনার মা জানাজার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

×