somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক আছে, আপনাকে প্রতিনিধি পাঠাতে হবে। এখন স্বাভাবিক বুদ্ধিতে কাকে পাঠাবেন? এমন কাউকে যার সাথে পাশের বাড়ির লোকজনের অন্তত মুখ দেখাদেখি আছে, কথাবার্তা চলে। নাকি এমন কাউকে পাঠাবেন যে গত দশ বছর ধরে পাশের বাড়ির গৃহকর্তার নামে কড়া সমালোচনা করে বেড়িয়েছে মানুষের কছে , তার পরিবারের লোকজন নিয়ে তামাশা করেছে, এমনও বলেছে পাশের বাড়িকে ভয় দেখাতে হলে রাইফেল ভাড়া করে রাখতে হবে । বিএনপি দ্বিতীয় অপশনটা বেছে নিয়েছে।

গত রবিবার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দিল্লি গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান। ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে জেরা করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বিরক্ত হয়ে পাসপোর্ট ফেরত চেয়ে দেশে ফিরে আসেন। দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসে রইলেন, ইমিগ্রেশন থেকে অনুরোধ করা হলো, কিন্তু তিনি আর ফেরেননি। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা খুবই বিব্রতকর। জাহেদ ভাইয়ের এমন পরিণতি কি আসলেই অপ্রত্যাশিত ছিল ?

জাহেদ উর রহমান বাংলাদেশের পরিচিত মুখ এবং তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু ভারতের সাথে তার সম্পর্কের ইতিহাসটা একটু ঘাঁটলেই বোঝা যেত এই সফর কোথায় গিয়ে ঠেকবে। তিনি বছরের পর বছর ধরে নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির কট্টর সমালোচনা করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে নিয়ে একাধিক ভিডিওতে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে নিয়ে প্রকাশ্যে তামাশা করেছেন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, যেটা ভারতের চোখে তাদের বিশ্বস্ত মিত্রকে উৎখাতের আন্দোলনের সমান । এবং একটা পর্যায়ে বলেছেন ভারতকে চাপে রাখতে হলে দরকার হলে পাকিস্তান থেকে পারমাণবিক অস্ত্র এনে বাংলাদেশে রাখতে হবে।

এই কথাগুলো ভারত ভুলে গেছে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এই অঞ্চলের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য কণ্ঠস্বর ট্র্যাক করে । তার ইউটিউব চ্যানেল ভারত থেকে ব্লক, যা কোনো ছোট বিষয় না। ভারত সরকার কারো কন্টেন্ট ব্লক করে যখন সেটাকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে। যে মানুষের চ্যানেল তারা ব্লক করেছে সেই মানুষকে দিল্লিতে স্বাগত জানাবে, এই প্রত্যাশা কোন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে করা হয়েছিল সেটা সত্যিই বোধগম্য না।

কূটনীতিতে একটা পুরনো সত্যি কথা আছে, আপনি কাকে পাঠাচ্ছেন সেটা কখনো কখনো আপনি কী বার্তা দিচ্ছেন তার চেয়েও বড় হয়ে যায়। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা যাদের কথায় কান দেন তারা হলেন প্রতিষ্ঠিত কূটনীতিক, অভিজ্ঞ আমলা, অথবা এমন রাজনীতিবিদ যাদের সাথে আগে থেকে কাজের সম্পর্ক আছে। জাহেদ উর রহমান এই তিনটির কোনোটিই না। ভারতের কাছে তিনি পরিচিত একটি সমালোচক কণ্ঠস্বর হিসেবে, কোনো বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক চ্যানেল হিসেবে নয়। ফলে তাকে পাঠিয়ে যে বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা হোক না কেন, সেই বার্তা দিল্লির দরজায় পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যেত।

এরপর আসে পাসপোর্টের প্রশ্ন, যা আরো অবাক করে দিবে আপনাকে । জানা গেছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সাধারণ পাসপোর্টে গেছেন। একজন সরকারি উপদেষ্টা সরকারি সফরে সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন, এটা কূটনৈতিক প্রোটোকলের একেবারে প্রাথমিক পাঠ উপেক্ষা করা। কূটনৈতিক পাসপোর্ট শুধু সুবিধার জন্য না, এটা পরিচয় ও মর্যাদার দলিল। সেটা ছাড়া গেলে ভারতের ইমিগ্রেশনে তিনি সরকারি উপদেষ্টা না, একজন সাধারণ যাত্রী। তার পাসপোর্ট রেস্ট্রিক্টেড থাকলে আটকানোটাই স্বাভাবিক পরিণতি।

ভারত কি ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছে? সম্ভবত হ্যাঁ। কিন্তু সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে বাংলাদেশ নিজেই। যে মানুষকে ভারত বছরের পর বছর ধরে তাদের কট্টর সমালোচক হিসেবে চেনে, যার চ্যানেল তারা ব্লক করেছে, তাকে দিল্লিতে পাঠিয়ে তারপর অভিযোগ করা যে ভারত অপমান করেছে, এই যুক্তি অনেকটা আগুনে হাত দিয়ে পুড়ে গেলে উলটো আগুনকেই দোষ দেওয়ার মতো।

তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটা সতর্ক চেষ্টা চলছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলে দিল্লি গেছেন, জয়শঙ্করের সাথে বৈঠক হয়েছে, সেটা ছিল পরিকল্পিত এবং যৌক্তিক পদক্ষেপ। সেই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝে জাহেদ উর রহমানকে দিল্লি পাঠানো এবং এই পরিণতি ডেকে আনা সেই অগ্রগতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে কূটনীতিতে কখনো খুব স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল না, কিন্তু এই একটা সিদ্ধান্তে তিনটা ভুল একসাথে হয়েছে। ভুল মানুষ, ভুল পাসপোর্ট, ভুল সমন্বয়। তিনটা ভুলের ফলাফল একটাই, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিব্রত হয়েছে এবং ভারতকে একটা বার্তা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে যেটা না দিলেই ভালো হতো। তারেক রহমানের প্রেস সচিব বা অন্য যেকোনো নিরপেক্ষ ইমেজের কর্মকর্তাকে পাঠালে এমন ঘটনা ঘটতো না।

দিল্লির বিমানবন্দরে তথ্য উপদেষ্টার সঙ্গে কী ঘটেছিল-বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
https://www.banglatribune.com/951893


সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫৪
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিসাব বিষয়ক ভাবনা

লিখেছেন করুণাধারা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩



সংখ্যাওয়ালা কোনো লেখা দেখলে হিসাব ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা আমার অভ্যাস। ইদানিং বিভিন্ন রকম সংখ্যাওয়ালা কিছু বিজ্ঞাপন সামনে আসছে, এগুলো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে যেসব সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুনাফেকি নাকি Diplomatic situationship?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০


গত শনিবার (৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উদযাপিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরো জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আরেকটা পদ্মা সেতু না বানিয়ে দেশ উন্নয়নের নিনজা টেকনিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৪৫




আগে জানতাম উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ লাগে, চাহিদা অনুযায়ী শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় - তারপর দেশের উন্নতি হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনতা ২.০-এ এসে উন্নয়নের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে।

এখন উন্নয়নের নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭১-কখনোই ৫০/৫৫বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা নয় ।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:০১




৭১-হলো আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি জাতির প্রতিদিনের এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা । ৭১ আমাদের অস্তিত্ব,একাত্তর আমাদের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস । একাত্তর যদি মলিন বা বিলীন হয়,তখন আমি আর আমি,আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×