মেয়েরা একটু কম বয়সেই অনেক কিছু বুঝতে পারে। ক্লাস ফাইভ থেকেই আমি মোটামোটি নিজের মত করে ভাবা শুরু করেছি, মনে আছে। ছোটবেলায় যেমন পরিবেশেই থাকা হোক, কৈশোরে বাসার চেয়ে বাসার বাইরেই সময় বেশি কাটানো হয়। ক্লাস নাইনে একটা হিসাব করেছিলাম। ক্লাস, স্কুলের পরে প্র্যাকটিকেল, কোচিং, সব মিলিয়ে বন্ধুদের সাথে কাটতো ১২ ঘন্টা, বাসায় বাকি ১২ ঘন্টার ৮ ঘন্টা ঘুম, আর ৪ ঘন্টা খাওয়া, গোসল, পড়াশোনা। সব মিলিয়ে বাসার প্রভাব তখন খুবই নগন্য।
মোটামোটি বুঝতে শিখেছি যখন থেকে, ক্লাস ফাইভ থেকেই মুহাম্মাদ জাফর ইকবাল আর শাহরিয়ার কবিরের প্রবল ভক্ত আমি। লেখকরা খুব সাবধানে কিছু প্রশ্ন জাগিয়ে দেন কচি পাঠকদের মনে। আমার মনে তখন সেই প্রশ্নগুলো জাগা শুরু করেছে। আস্তে আস্তে সমরেশ, সুনীল, তসলিমা নাসরীন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এরাও উঠল আমার প্রিয় লেখকের লিস্টে।
একই সাথে, সেই সময়টাতেই আমি কিছু নিজেস্ব কষ্টে ডুবে আছি। টিনেজারদের স্বভাব থাকে, সব কিছু নিজের মধ্যে রাখা। আমি কুলুপ এঁটে ছোট্ট বুকে বয়ে বেড়াচ্ছিলাম এক পৃথিবী সমান কষ্ট। মহাসাগরে মিশিয়ে দিলে কি মহাসাগরের রং পাল্টে যেত না? আমার একেবারেই নিয়ন্ত্রন ছিল না শিশু বয়সের কিছু ঘটনার উপর। আশ্চর্য, সেগুলো কেন আমার জীবনে হতে হলো? আল্লাহ কেন সেটা হতে দিল? আল্লাহ না সুবিচারক? তাহলে আরেকজনের পাপের ফল আমাকে কেন বহন করতে হবে? আল্লাহ কি তাহলে ভালবাসার ক্ষেত্রে হিসাবে ভুল করেন? আল্লাহর প্রতি তীব্র, তীব্র অভিমানবোধ তখন আমার। এই অভিমানবোধের ম্যাগনিচুড ভয়াবহ। এর প্রভাব পড়ছিল আমার ব্যক্তিগত জীবনে। আমার বিশ্বাসে।
আল্লাহ এবং ইসলাম নিয়ে মোটামোটি বেশ ভালো রকমের সিনিক্যাল আমি তখন বাবার সাথে লম্বা সময় ধরে কথা বলতাম। তর্ক করতাম। বাবা খুব ধৈর্য্য ধরে জবাব দিত, আর মাঝে মাঝে কেবল হেসে বলতো, কুরআন পড়ো মা! জবাব পাবে! (আল্লাহ বাবাকে উত্তম প্রতিদান দিক)। বাসায় কুরআনের চারটা ভিন্ন অনুবাদ আছে, যেটা খুশি পড়ো! কিন্তু স্বীকার করছি, কুরআন সম্পর্কে যতটুকু আগ্রহ জাগলে একজন নিজে নিজে কুরআন পড়ে, আমার মনে তখনও ততটুকু আগ্রহ জাগে নি।
সেই সময়টাতেই তিনজনের সাথে পরিচয় হলো, যারা আমাকে অন্য ভাবে পৃথিবী দেখালো। নূহা, মুজাহিদা আন্টি আর আন্টি ফারিদা।
নূহার আমার চেয়ে মাত্র আট দিনের বড়। প্রথম দিন কথা বলেই দারুণ ভালো লেগে গেল মেয়েটাকে। নূহা, মুজাহিদা লান্সফোর্ড আন্টির মেয়ে। নূহার বাবা বাংলাদেশী। মা, মুজাহিদা আমেরিকান। খ্রীষ্টান ছিলেন, ধর্মান্তরিত করে এখন মুসলিম। ইতিহাসের ছাত্রী ছিলেন আমেরিকায়, সেই সূত্রেই ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা, আকর্ষিত হওয়া, জামাল বাদাওয়ীর সাথে আলোচনার পরে ইসলাম গ্রহন।
প্রায় বিশ বছর বাংলাদেশে থেকে সাদা চামড়ার ছয় ফুটি মুজাহিদা আন্টি তখন পুরাদস্তুর বাংলা পারেন, ব্রিটিশ কাউন্সিলে টিচিং করেন। মায়ের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে, সেই সূত্রে আমার সাথে নূহার পরিচয়। এই প্রথম আমি কোন 'কনভার্টকে' কাছ থেকে দেখলাম। যাওয়া আসা বেশ ঘন ঘন হতো আমাদের বাসায়। খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম এমন একজন মানুষকে যিনি ইসলামকে 'খুঁজে' পেয়েছেন। গায়ের রং, পাসপোর্টের রং, রক্ত, নিজেস্ব ঐতিহ্য, শিক্ষা সব কিছু ছাপিয়ে শুধু মাত্র বিশ্বাসই পুরো জীবন পাল্টে দিয়েছে। প্রতিটা কথা শুনে বুঝা যায়, কি প্রবল বিশ্বাস থাকলে একজন আমেরিকান স্বাধীনচেতা মহিলা নিরাপদ ভবিষ্যতের চিন্তা হেলায় ফেলে দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশে চলে আসতে পারেন। বাংলাদেশ, একটা মুসলিম দেশ বলেই সর্বক্ষেত্রে ইসলামের ব্যবহার নিয়ে খুব চিন্তিত কিন্তু হতাশ নন তিনি। নিজের ক্ষমতায় যতটুকু কুলাচ্ছে তাই দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন অবস্থার পরিবর্তনে।
নূহা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তো বটে, কিন্তু ও দেখি বাংলা বইয়ের খুব ভক্ত। চিন্তাশীল বাবা মায়ের সন্তান, মায়ের পরিষ্কার এবং গভীর চিন্তাধারার প্রভাব নূহার উপরেও পড়েছে। ওর সাথে কথা বলে খুব মজা পেতাম, আমার বয়সী একটা মেয়ে এত ভাবে? এত সুন্দর করে পৃথিবীকে দেখে! এখনও যোগাযোগ আছে নূহার সাথে। ওর সাথে বন্ধুত্ব আসলে পৃথিবীকে অন্য আলোতে দেখালো। একই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো, প্রতিটা মানুষকে আল্লাহ এক দিকে দিয়ে অন্য দিকে অপূর্ণ রেখেছেন। যেই দিক আমাকে কষ্ট দেয়, সেটা পূর্ণ করে দেয়ার জন্য অন্য সব দিকে আল্লাহ উপচে দিয়েছেন।
একই সময়ে পরিচয় হলো আন্টি ফারিদার সাথে। ফারিদা, একজন মালয়শিয়ান মহিলা। এবারও মায়ের বান্ধবী। আমি প্রথম বারের মত দেখলাম, এত চটপটে, দারুন সুন্দরী, স্মার্ট, দুষ্টু, দুই সন্তানের জননী কিন্তু একই সাথে ইসলাম সম্পর্কে খুব ভালো জানা একজন মহিলা। সারাক্ষনই সবার সাথে খুনসুটি করছেন। ঘরে লাফালাফি করে বেড়াচ্ছেন অথচ বাসা থেকে বের হলেই একেবারে কালো বোরখা, নিকাব দেয়া, হাতে পায়ে মোজা। আমি আমার জীবনে অত পর্দানশীল আর আরবি জানা কোন মহিলাকে কাছ থেকে দেখি নি। এই প্রথম বার দেখলাম আর অভিজ্ঞতা খুবই ভালো।
আন্টি ফারিদা আমার মনে বেশি ছাপ ফেলেছেন একটা ওয়ার্ক শপের মাধ্যমে। মালয়শিয়ায় তিনি স্কুল টিচিঙ করেন, বিভিন্ন ওয়ার্ক শপ করেন টিনেজারদের নিয়ে। দেশেও একটা করলেন, যেটাতে আমি ছিলাম। মূল টার্গেট সেই সব টিনেজ মেয়েরা যারা সাধারনত রূপ চর্চা আর পরচর্চার বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। বিভিন্ন রকমের ফান গেইমসের মাধ্যমে একটা প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিলেন সবার মনে, আল্লাহ যদি সুবিচারকই হবেন, তাহলে শুধু মুখে বলা কয়েকটা শব্দের জন্য কেন আমাদের জান্নাত দিবেন আর অমুসলিমদের জন্য আছে অন্য কিছু? আমরা শাহরুখ, সালমান, ঐশ্বরিয়ার মত হতে চাই সব দিয়ে, তবু কোন সাহসে মুহাম্মদ (সা) এর প্রতিশ্রুত পরকাল আশা করি?
আসলে বই হাজার বার পড়লেও, একজন রক্ত মাংসের মানুষে জীবন্ত বিশ্বাস না দেখলে বুঝা যায় না 'বিশ্বাস' অর্থ কি, বিশ্বাস কি করে মানুষকে ভালো কাজ করায়। বিশ্বাসের সাথে নিজের ব্যবহারকে প্রশ্ন করা, যৌক্তিকতাকে প্রশ্ন করা তখন শুরু। মোটামোটি একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে দেশ ছেড়েছি আমি।
এক দিকে দেখলাম এরকম কিছু মানুষ যাদের ক্ষেত্রে 'বিশ্বাস' টাই সব পাল্টে দিয়েছে, পুরোপুরি পরিশুদ্ধ করে দিয়েছে, কাছে থাকলেই বুঝা যায় নিজের আখের গোছানোর চিন্তা নাই, যাদের আর যাই হোক 'অন্ধ' মনে হয় না। অন্য দিকে, মিডিয়ায় সেই সব মুখ আসা, যাদের দেখে 'বিশ্বাসী' মনে হলেও মিডিয়ায় ডাকা হচ্ছে 'ধর্মান্ধ'। আমি কৃতজ্ঞ, অবিশ্বাসী, অভিমানী, স্কেপটিকেল মনটা তখন এই মানুষগুলোকে খুঁজে পেয়েছিল, তাই।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


