জন্ম হয়েছিল খুব অদ্ভূত একটা সময়ে। যখন কালো আফ্রিকানরা নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমেছে আমেরিকায়। একদিকে কিছু কালো মানুষেরা সাদা চামড়ার কাছে হীনমন্যতায় নুয়ে থাকতো। কালো চামড়ার মানুষেরাও নিজেদের মধ্যে যাদের রং একটু হালকা, তাদের প্রতি নিজের অজান্তেই শ্রদ্ধা পোষণ করতো, দুই শতাব্দীর দাসবৃত্তি মনোভাবের ফসল। অন্য দিকে এমন মানুষও ছিল, যারা সাদা চামড়ার প্রতি অন্ধ ক্ষোভে পুরো অন্ধ। ম্যালকমের বাবা ছিল প্রথম দলের মানুষ। মা দ্বিতীয় দলের। কারণ ম্যালকমের মায়ের জন্ম হয় তাঁর কালো মাকে এক সাদা পুরুষের ধর্ষনের কারণে। খুব স্বাভাবিক কারণে, ভদ্রমহিলা সাদার ছিটে ফোটা সহ্য করতে পারতো না। এক দঙ্গল ভাই বোনের মধ্যে ম্যালকমের গায়ের রঙই সবচেয়ে হালকা ছিল, গাঢ় বাদামী, কুচকুচে কালো নয়। ম্যালকম নানীর ধর্ষকের রক্তের বেশি অংশটুকু পাওয়ায় মায়ের রাগের সবটুকুই পেয়েছে। অবশ্য অল্প দিনের মধ্যেই বাবা খুন হলো, মা পাগলা গারদে ঢুকলো। ভাইবোনদের সরকার ভাগাভাগি করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিল এখানে সেখানে।
এভাবেই শুরু অসাধারন মানুষটার অসাধারন জীবন কথা। ছোটবেলা থেকেই মারাত্মক ঘাড় ত্যাড়া। বাসায় টাকা ছিল না, কিন্তু চুরি করলেই খাবার জুটতো, তাই করতো। মা মারলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুললে পাড়া প্রতিবেশির ভয়ে মা মারা বন্ধ করে দিতো। এভাবেই প্রথম নিজের গলার জোড়ের সাথে পরিচিত হন, যেটা ভবিষ্যতে নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র প্রমানিত হলো।
কৈশোরে স্কুলে দারুণ রেজাল্ট করছিলো ম্যালকম। স্কুলের সাদা কালো সব বন্ধুদের ভোটে ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভও নির্বাচিত হলেন। ইংরেজিতে সবচেয়ে ভালো রেজাল্টের পরে একদিন ইংরেজি টিচার ভবিষ্যত চিন্তার কথা জিজ্ঞাসা করতেই ম্যালকম ফস করে বলে দিলো, 'আইনজীবি'।
সাদা চামড়ার ইংরেজি স্যার কিছুক্ষন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন, 'ম্যালকম, তোমাকে আমি পছন্দ করি বলেই বলছি, একজন কালো চামড়ার ছেলের জন্য সেটা কোন বাস্তবতা না। তুমি সময় থাকতে ভবিষ্যতের জন্য ভালো ভাবে চিন্তা করো, তুমি তো বুদ্ধিমান ছেলে। এই ধর, কাঠ মিস্ত্রি বা গাড়ির মেকানিকস হয়ে কিন্তু ভালো ভাবেই চলছে আরো অনেকে...'
সেই প্রথম শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সমাজ ব্যবস্থার প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে গেলেন ম্যালকম। প্রথম সাদাদের সাথে নিজের পার্থক্যটা হারে হারে টের পেলেন। মাস খানেকের মধ্যে বোস্টনে ফুপির কাছে চলে গিয়ে নিজেকে পুরা বদলে ফেললেন। ম্যালকম তখন মোটে ক্লাস এইট পাশ করেছেন।
এরপরের ঘটনাগুলো অদ্ভূত। সম্ভবনাময় ষোল বছরের ছেলেটার বদলের কথা। ১৯৪০ সালের আগে পিছের কথা। বোস্টনের রাতের জীবনের সাথে পরিচিত হলো ম্যালকম। ছয় ফুটের অ্যাথলেটিক শরীর, তাই আরো বড় বলে বিভ্রম হয়। সহজেই নাইট ক্লাবে কাজ পেয়ে গেল। এবং খুব দ্রুত সেই রঙিন জীবনে আপাদমস্তক মাতাল হয়ে গেল। বড় বড় হিপহপ স্টারদের দেখে রঙচঙে পোশাক পড়ে, 'হিপ হপ ব্ল্যাকদের' স্টাইলে টেনে টেনে কথা বলা শিখে নিজের গ্রাম্যতা ঝেড়ে ফেলে খ্যাতি পেল মিস্টার রেড হিসেবে। নাচতে শিখল, যেই নাচ রক্তে নাচানাচি শুরু করিয়ে দেয়। 'লিন্ডি হপের' বর্ণনা শুনলেই বুঝা যায় আসল জিনিস কি ছিল। পুরা ক্লাবকে স্তব্ধ করে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা নেচে চলতো, নাচিয়ে চলতো মেয়েদের ষোল বছরের ম্যালকম।
বেশি ট্যালেন্টেড হলে যা হয়, মন টিকে নি বেশি দিন বোস্টনে। তারপরে নিউ ওয়ার্ক। সেখানে আরেক রঙিন জগত। ওখানেই কাজ করতে গিয়ে প্রথম পরিচয় হয় পতিতাদের দালালদের সাথে। নিজেও এই কাজে নামে। তখনও বয়স ১৭! আমি পড়ছিলাম আর নিজের নিরপাদ ১৭ বছর বয়সটা সিনেমার মত দ্রুত ভেবে যাচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে ড্রাগ ডিলিঙে ঢুকে ম্যালকম।
খুব চাল্লু হতে হয় এই অন্ধকার জগতে। ম্যালকম ড্রাগ নিতো বগলের নিচে, কোটের বাইরে। পুলিশ দেখলেই আস্তে করে হাত ঢিলা করে করে ড্রাগ ঝরিয়ে সে জায়গা থেকে হাওয়া।
শেষ ঢুকলো চুরির পেশায়। রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়ি ঢুকে চুরি করতো। বাকি সময়ে ড্রাগ ডিল করতো, ড্রাগ নিতো। বিশেষত মারিজুয়ানার হেভি ডোজ। প্যান্টে বরাবর গুঁজা থাকতো পিস্তল। নিজের বাসায় কয়েকটা আনলাইসেন্সড বন্দুকের ডিপো। সমাজকে কচু দেখিয়ে ম্যালকম তখন এক বিবাহিতা শ্বেতাঙ্গিনীকে নিয়ে মজা লুটেন!
এসব বর্ণনা শেষে যা বললেন, তা আসলে তাঁর মুখেই শোনা উচিত:
'আর কিছু বলার আগে একটা কথা বলে নেই: আমার ভয়ংকর অতীতের সব কথা আমি এর আগে কাউকে বলি নি। আমি এসব এজন্য বলছি না যেন শুনে মনে হয় আমার অন্ধকার, খারাপ অতীত নিয়ে আমি গর্বিত।
মানুষ সবসময় ভাবে, প্রশ্ন করে, আমি কেন আমি? যে কারো ব্যাপারে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে জন্ম থেকে তার পুরা জীবন দেখতে হবে। আমাদের নিজেস্ব অভিজ্ঞতাই আমাদের ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলে। প্রতিটা ছোট খাট ব্যাপারই এক একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আজ, আমার হাতে প্রচুর কাজ। আমি এখন পাঠকদের সস্তা বিনোদন দেয়ার জন্য কোন কিছু লিখে এক ঘন্টা সময়ও নষ্ট করবো না। তারপরেও আমি অনেক গুলো ঘন্টা খরচ করছি সব কিছু আপনাদের জানানোর জন্য কারণ, আমি জানি এভাবে সব কিছু সামনে নিয়ে আপনারা বুঝতে পারবেন, কি করে আমি আমেরিকান সমাজের তল ছুঁয়েছি, সব দেখেছি, সব বুঝেছি এবং অবশেষে (এর কয়েক বছর পরেই) আমি তাঁকে খুঁজে পেয়েছি যা আমার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে।'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


