সব বাবুদের আনা হলো না বটে, কিন্তু যেই বাবুকে আনা হলো, তাকে নিয়েই সে অস্থির। মামনি বলেছে ও এখন থেকে 'ভাইয়্যুন'। দায়িত্ববান বড় ভাই ও, আপুনিকে না পারতেও জোড় করে কোলে নিবে, সারাদিন আপুর পাশে বসে থাকবে। 'আমাল আপু'। এই আপুটাই আমি।
মা তো পুরা অবাক। এই পিচ্চি ছেলে, মাত্র দু'এক দিনের মধ্যে কথা বলতে না পারা, দেখতে না পারা পোটলাটাকে কি সত্যিই ভালবেসে ফেলল নাকি? একদিন ভালবাসার অগি্ন পরীক্ষা নেয়ার জন্য পোটলা আমিকে লুকিয়ে রাখা হল।
ভাইয়া ঘুম থেকে উঠেই নিয়ম মাফিক ছোট্ট আপুর কটের কাছে আসল। কিন্তু আপু তো নেই! এ ঘর সে ঘর করে কোথাও আপুকে খুঁজে পাওয়া গেল না। একটু পরে মা দেখে ও চোখ মুছছে, 'মামনি, আমি আপুকে পাই না'!
মা তখন বিদেশ বিভঁূইয়ে, পরিবারের সবার থেকে অনেক দূরে। দুই বছরের ভাইয়া যখন দেখল মামনি ওকে প্র্যামে বসিয়ে, আপুকে কোলে নিয়ে একা একা মাইলের পর মাইল হেঁটে ক্লাস করে, তখন সে আপুকে প্র্যাম ছেড়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে হাঁটে মায়ের হাত ধরে টু শব্দটা না করে। এক একবার নাকি খুব ক্লান্তিতে প্র্যামের গায়ে হেলান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘুমিয়ে পড়ত।
এই 'বড় বড়' ভাব নিয়ে ছোটবেলা থেকে আগলে রাখত আমাকে। আমি বরাবরই সহজ সরল বোকাসোকা মেয়ে, কিছু হলে ঝগড়া না করে সরে এসে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ কাঁদতাম। নার্সারীতে একবার ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলেটা টিফিন টাইমে আমার অজান্তে আমার ব্যাগ থেকে চকচকে 'সোনামনিরা লেখা শেখো' বইটা পালটে ওর পুরানো দাগওয়ালা বইটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। পরের দিন ক্লাসে ঢুকে ভাইয়া সেটা উদ্ধার করে দিল। আমার বুক দশ হাত ফুলে গেল।
ক্লাস টু'তে সে একই সাথে ক্লাসের থার্ড বয় আর পুরা মাস্তান। টিফিন টাইমে কাঠের স্কেলটা বের করে মারামারি করে। মেলা থেকে বাবা কাঠের তলোয়ার কিনে দিল, সেটা শার্টের তলে লুকিয়ে ক্লাসে নিয়ে যায়। একদিন ধরা পড়লো ক্লাস টেস্টের খাতা জমা না দিয়ে। ছুটির পরেও টিচার ধরে রেখেছে, কিছু একটা হবে আর কি। আমি তো বরাবরের মত ভয়ে অস্থির, 'ভাইয়্যুন, কি হবে এখন?' টিচার অন্য দিক ফিরতেই ও আমার হাত ধরে দিল দেঁৗড়। দেঁৗড়াতে দেঁৗড়াতে একদম স্কুলের বাইরে। আমার জীবনের অন্যতম থ্রিলিং ঘটনা!
তখন থেকেই বহু অন্যায়ের সাক্ষী আমরা একে অপরের। বইয়ের নিচে লুকিয়ে চাচা চৌধুরী, টিনটিন থেকে শুরু করে সমরেশ সুনীল পড়ার দিনগুলোতে একজন আরেকজনের পিঠ বাঁচিয়ে গেলাম। ড্রাইভিং শুরু করার পরে, লাইসেনস পাওয়ার আগেই ও যখন লুকিয়ে চুরিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হতো, আমার মুখে তখন স্কচটেইপ।
এত সব বান্দ্রামি করেও ওর নাম বরাবর ভালো ছেলেদের খাতায় লেখা ছিল। কি অন্যায়! আত্মীয় স্বজন থেকে সবাই ওর নাম বলতে অজ্ঞান। এখনও! ক্লাস এইটে রীতিমত টিভিতে বিতর্ক আর কুইজ অনুষ্ঠানে যায় ও। মানে 'পপুলার' ছেলে। টিফিন টাইমগুলা ওখানেই কাটতো, আড্ডাবাজি কম করেছে ও। তো ক্লাস টেনে সবাই বিদায় নিচ্ছে। ডায়রীতে প্রিয় রং, প্রিয় বই, প্রিয় গানের পাশাপাশি প্রিয় (মেয়ে) বন্ধুর নাম লেখার সময় আসল। ও আমার নাম লিখে দিয়ে আসল। সব মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়লো, অহংকারী 'পপুলার' ছেলেটার থেকে এতদিনে একটা বিশেষ এবং সুনির্দিষ্ট মেয়ের নাম বের হলো তবে! আসল ঘটনা জানার পরে সবাই চুপসে গেল!
ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষার সপ্তাহ খানেক আগে জ্যামিতি পরীক্ষায় 27 এ 3 পেলাম। বাসায় এসে মা বাবাকে লুকিয়ে হাপুশ কান্না। 'ভাইয়্যুন' সব জেনে প্রথম যা করল সেটা হলো, খাতাটা ছিঁড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিল। তারপরে দশ মিনিটের একটা লেকচার দিল। আমি নিশ্চিত, সেদিন সেভাবে টেনে না তুললে আমি আজকে এখানে থাকতাম না।
পনের বছরের জন্মদিনে মনে আছে, বাসায় জন্মদিন নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই। আমি সারাদিন মুখ শুকনা করে ঘুরে বেড়ালাম। সন্ধ্যার সময় ভাইয়ুু্যন ঘরে ফিরল পনেরটা লাল গোলাপ নিয়ে। আমার জীবনের প্রথম গোলাপ। গোলাপগুলোর শুকনো পাঁপড়ি সাত সমুদ্দর তের নদী পার হয়ে আজও আমার দ্্বিতীয় ড্রয়ারে সংরক্ষিত। এরপরে আরও অনেক গোলাপ পেয়েছি, কিন্তু সেদিনের মত খুশি করতে পারে নি একটাও। তাই বোধ হয় আর একটাও রাখা হয় নি।
বরাবর বলে এসেছি আমার ছন্দজ্ঞান খুব কম। খুবই। নেগেটিভের কাছাকাছি। ভাইয়ার সতেরতম জন্মদিনে, মাত্র সিডনী এসে আমি পুরা ফতুর। মরিয়া হয়ে খাতা কলম নিয়ে বসে গেলাম আর 9 প্যারার একটা রম্য ছড়া লিখে ফেললাম। আমার প্রথম ও শেষ ছড়ার প্রথম প্যারা:
ঢ্যাঙা এক ছোঁড়া আছে,
ছোট তার মুখ,
সারা মুখে ছড়িয়ে থাকে,
ভাব সুখ সুখ।
দেড় বছর বয়সের বড় ভাই বড় ভাই ভাবটা কবে কমে গেছে জানি না। এখন পুরা দোস্তি। তুই তোকারি। মারামারি। এক একটা দিন আসে যখন গভীর রাত পর্যন্ত টুক টুক গল্প চলে। ফাইজলামি থেকে সিরিয়াস গল্প। পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যার মূল নির্ণয় এবং উৎপাটন হয়ে যায় তর্কে তর্কে। ইউনিভার্সিটিতে এক সাথে যাওয়া আসার ট্রেইন ভ্রমনটুকু কচিত যখন এক সাথে হয়, ব্যাপারটা খুবই উপভোগ করি। বাংলাদেশে কোচিং থেকে ফেরার পথে রাতের বেলা এক সাথে রিকশায় কত গল্প হতো, মনে পড়ে যায়। এখনও মাঝে মাঝে 'ছোট বোন' ফলিয়ে কফি কিংবা লাঞ্চের পয়সা খসাই, আমার খুব প্রিয় কাজগুলোর একটা।
একটাই খারাপ দিক, আবেগী হয়ে ভাইয়ার সাথে কথা বলা যায় না। ক্ষেপিয়ে টেপিয়ে জ্বালিয়ে মারে। আজকে, ওর বাইশতম জন্মদিনে শহরের বাইরে ও। তবু ছোট্ট একটা ম্যাসেজে কাজ সারতে হলো ব্যাটার এই স্বভাবটার জন্য। ব্লগ করে না, কিন্তু আমার ব্লগ পড়ে নিয়মিত। এই পোস্ট পড়ে জ্বালাবে খুব, আমি নিশ্চিত।
আমি টের পাই, ভাইয়্যুন এখনও আমাকে সেই প্রথম দিনের মতই আগলে রাখতে চায় সব কিছু থেকে। বাইশ বছর হয়ে যাওয়া ভাইটার জন্য আজকে অনেক মায়া লাগছে হঠাৎ! এত অসাধারন একটা ছেলেকে ভাই হিসেবে পাওয়ার জন্য নিজেকে মহা ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে। অনেক দূর যাবে ভাইয়্যুন, আমি নিশ্চিত জানি। দোআ করি, অনেক।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ১১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


