somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

image upload problem

বাংলাদেশে একসময় খুব জনপ্রিয় একটা পরিচয়-“আমি সুশীল”, “আমি নিরপেক্ষ”, “আমি কোনো দলের না”। এই পরিচয় ছিল আরামদায়ক, নিরাপদ, সম্মানজনক। এর আড়ালে দাঁড়িয়ে কেউ সরকারকে ধমক দিত, আবার সময় বুঝে চুপও থাকত। কেউ মানবতার বুলি আওড়াত, কিন্তু মানবতা কোথায় প্রযোজ্য হবে, সেটা ঠিক করত নিজের রাজনৈতিক সুবিধা আর ব্যক্তিগত হিসাব মেনে।

এখন কেন সেই নিরপেক্ষতার বাজারে ভয়াবহ মন্দা।
কারণ বাস্তবতা এখন নির্মম। রাজনীতি আজ অনেকটাই দাঁড়িয়ে গেছে এক স্পষ্ট রেখায়-আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি-আওয়ামী লীগ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার অভিনয়, “আমি কারও না”- এই দীর্ঘদিনের নাটকীয় ভঙ্গি এখন আর টিকছে না। মঞ্চ ভেঙে পড়েছে, আলো জ্বলে উঠেছে, দর্শকও বুঝে গেছে কে বা কারা এ অভিনয় করছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এটা কি সত্যিই মুখোশ উন্মোচন? নাকি আমরা নিজেরাই সবাইকে মুখোশ পরিয়ে দিয়ে এখন তা ছিঁড়ে ফেলতে আনন্দ পাচ্ছি?
ধরা যাক একজন কবি মানবতার কথা লিখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে জেরা করা হয়- “আপনি কোন দলে?” তিনি যদি বলেন, “আমি মানুষের পক্ষে”, তখন তাকে ভণ্ড বলা হয়। একজন শিক্ষক যদি বলেন, “আমি সবার জন্য”, তখন তাকে ধূর্ত বলা হয়। অর্থাৎ এখন এমন এক সময়, যেখানে আপনি পক্ষ না নিলেও অপরাধী, আর পক্ষ নিলে শত্রু।

সমস্যা হলো, বাংলাদেশে “নিরপেক্ষতা” নামের জিনিসটা কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। বহু ক্ষেত্রে এটা ছিল সুবিধাবাদের পরিশীলিত সংস্করণ। প্রতিবাদও বাছাই করে, নীরবতাও বাছাই করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়- অবস্থানের সুবিধা দেখে অন্যায় নির্বাচন।

লোডশেডিং হলে একসময় দেশ কেঁপে উঠত। মোমবাতির আলোয় ছবি, দীর্ঘশ্বাস, লাইভ, স্ট্যাটাস- “দেশ অন্ধকারে ডুবে গেছে!” আজও বিদ্যুৎ যায়, বহু জায়গায় ভয়াবহভাবে যায়, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর উধাও। যেন অন্ধকারেরও এখন দলীয় পরিচয় আছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে একসময় আগুন জ্বলত রাস্তায়, কণ্ঠে, পোস্টারে। মনে হতো রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে। আজ মানুষ নীরবে জ্বালানির চাপে পুড়ছে, কিন্তু বাইরে সব শান্ত। আগুন আছে, শুধু সেটা মানুষের বুকের ভেতর বন্দি।

মানবিক বিপর্যয়ে একসময় আকাশ ফাটানো প্রতিবাদ হতো। আজ শত শিশু হামে মারা যায়, পরিবার নিঃস্ব হয়, মানুষ চিকিৎসাহীনতায় কষ্ট পায়- কিন্তু সেই মানবতাবাদীরা কোথায়? নাকি মানবতারও এখন প্রেসক্রিপশন লাগে?

একজন শিক্ষক একদিন গলা ফাটিয়ে বলতেন, “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।” আজ তিনি নীরব। সম্ভবত উপত্যকা বদলায়নি- শুধু তার সংজ্ঞা বদলেছে।
চারদিকে অন্যায় আছে, নিপীড়ন আছে, ভয় আছে, বৈষম্য আছে। শুধু নেই সেই পরিচিত মুখগুলো, যারা একদিন ন্যায়বিচারের পতাকা হাতে রাস্তায় নামত। তারা আজ নিখোঁজ নয়-তারা হিসেব করছে।

এই নীরবতা কাকতালীয় নয়। এটা সুসংগঠিত। এটা সুবিধাবাদী। এটা ভয় ও স্বার্থের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ কাপুরুষতা।
কারণ সত্যটা খুব অস্বস্তিকর-
আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নই,
আমরা শুধু আমাদের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তাই আজ বাতাসে স্লোগান নেই, রাস্তায় মিছিল নেই, বিবেকের কণ্ঠ নেই। আছে শুধু এক সুবিশাল, সুপরিকল্পিত, মার্জিত নীরবতা।

তবু একটা ইতিবাচক দিক আছে- মানুষ এখন এই দ্বিচারিতা চিনতে শিখছে। যারা নীতির মুখোশ পরে স্বার্থের রাজনীতি করেছে, তাদের চেনা যাচ্ছে।

কিন্তু একই সঙ্গে বিপদও আছে।
মুখোশ খসাতে খসাতে আমরা কি সহনশীলতার মুখোশটাও খুলে ফেলছি? আমরা কি এমন এক সমাজে ঢুকে পড়ছি, যেখানে “নিরপেক্ষ” শব্দটাই গালি হয়ে যাবে?

গণতন্ত্র শুধু পক্ষ নেওয়ার নাম নয়। গণতন্ত্র মানে ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা, অপছন্দের মতকেও বাঁচতে দেওয়া, দলহীন কণ্ঠকেও জায়গা দেওয়া।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই-
আমরা কি সত্যিই ভণ্ড সুশীলদের চিনে ফেলেছি,
নাকি আমরা এমন এক অন্ধকারের দরজা খুলছি, যেখানে কাল থেকে শুধু দুই রঙ থাকবে—আমার রঙ, আর শত্রুর রঙ?
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪২
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুম আর গুপ্ত

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫


খোঁজ করলে দেখাি যাবে, কুকুর-বিড়াল পালকদের অনেক কাছের আত্মীয়-পরিজন অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। তাদের প্রতি কোনও দয়া-মায়া নেই; অথচ পশুদের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫



মসজিদে বসে মদ খেতে দাও, অথবা সেই জায়গাটা দেখাও যেখানে আল্লাহ নেই।

বহুদিন ধরে গল্প লেখা হয় না!
অথচ আমার গল্প লিখতে ভালো লাগে। সস্তা প্রেম ভালোবাসা বা আবেগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯


মনে আছে ছেলেবেলায়
ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এলে,
পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে
হাঁটতাম পথে এলেবেলে।

অতীত দিনের বৃষ্টির কথা
কার কার দেখি আছে মনে?
শুকনো উঠোন ভিজতো যখন
খেলতে কে বলো - আনমনে?

ঝুপুর ঝাপুর ডুব দিতে কী
পুকুর জলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তালেবান ঢাকায়, রাষ্ট্র ঘুমায়

লিখেছেন মেহেদি হাসান শান্ত, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩২

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে অনেক কিছু নতুন হইছে। নতুন সরকার, নতুন মুখ, নতুন বুলি। কিন্তু একটা জিনিস খুব চুপচাপ, খুব সাবধানে নতুন হইতেছে, যেইটা নিয়া কেউ গলা ফাটাইতেছে না। তালেবানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

image upload problem

বাংলাদেশে একসময় খুব জনপ্রিয় একটা পরিচয়-“আমি সুশীল”, “আমি নিরপেক্ষ”, “আমি কোনো দলের না”। এই পরিচয় ছিল আরামদায়ক, নিরাপদ, সম্মানজনক। এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×