somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "শিউলি গাছ"

০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শিউলি গাছ

- মঞ্জুর চৌধুরী

১.

"কাকু ভাল আছেন?"
অনিরুদ্ধ সেন শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়াচ্ছিলেন। তাঁর উঠানের সামনে সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি গাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। কমলা ডাঁটাগুলোকে দূর থেকে মনে হয়, কেউ যেন মাটির ওপর ছোট ছোট প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে। তিনি প্রতি সকালেই ফুল কুড়ান।
কিশোরী কণ্ঠ শুনে তাঁর পেছনে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।
তিনি চোখের চশমা ঠিক করলেন। তাঁর বয়স ষাট ছাড়িয়ে গেছে। চশমা ছাড়া কাছের জিনিসও স্পষ্ট দেখেন না। মেয়েটির বয়স চৌদ্দ পনেরো হবে। শ্যামলা, রোগা পাতলা একটি ছিপছিপে তরুণী। এই বয়সী মেয়েদের এমনিতেই মায়া কাড়া চেহারা হয়ে থাকে। এই মেয়েটিকে দেখে আরও মায়া লাগছে। চোখের কারণেই কি এমনটা লাগছে? তিনি তার চোখ লক্ষ্য করলেন। চোখেতো কাজল দেয়নি। তাহলে এই বাড়তি মায়া লাগার উৎস কি?
তিনি জবাবে বললেন "হু। তুমি ভাল আছো?"
মেয়েটি হাসিমুখে বলল "জ্বি। আমরা ঐ ফ্ল্যাটে উঠেছি।"
বলে মেয়েটি পাশের বাড়ির দোতলার দিকে ইশারা করলো। আগের ভাড়াটে দীর্ঘদিন থাকার পরে গত মাসেই বাড়ি ছেড়েছে। এরাই তাহলে তাঁর নতুন প্রতিবেশী?
অনিরুদ্ধ সেন বললেন "ও আচ্ছা।"
এইবার মেয়েটি বেশ ইতস্তত করে বলল, "কাকু আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।"
অনিরুদ্ধ সেন ফুল কুড়াতে কুড়াতে বললেন, "বল।"
মেয়েটি লজ্জায় রক্তিম হয়ে বলল, "আমি প্রতিদিন সকালে আপনার এই গাছের ফুল চুরি করি।"
মেয়েটির লজ্জা পাওয়া দেখে অনিরুদ্ধ হেসে বললেন "আমি জানি কে আমার ফুল চোর!"
মেয়েটির লজ্জা বিস্ময়ে পাল্টে গেল।
"কিভাবে?"
"ফুল কমে যায়, তাই।"
বলেই তিনি হাসলেন। মেয়েটির মন থেকে অপরাধবোধ কাটানো দরকার।
তাঁর হাসিতে কাজ হলো। সেও হেসে ফেলল। তারপরেই হাসি সামলে বলল, "আপনি রাগ করেননিতো?"
অনিরুদ্ধ সেনের ফুল কুড়ানো শেষ। তিনি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, "ফুল যদি নিজের জন্যই ফুটতো, তাহলেতো সে ফুল হতো না।"
বলেই তিনি তাঁর ঝুড়ি ভর্তি ফুল মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলেন।
"এই নাও। আজকে আর ফুল চুরি করতে হবেনা। আজকে আমি তোমাকে উপহার দিলাম।"
"আমি ঐশী।"
"আমি অনিরুদ্ধ।"
"আপনাকে সবাই চেনে।"
তিনি হালকা হেসে বললেন, "আমি কাউকে খুব একটা চিনি না।"
কথাটা বলে নিজেই চুপ হয়ে গেলেন। সত্যিই তো। মাধবী চলে যাওয়ার পর তাঁর পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে এখন এই বাড়ির চার দেয়ালে এসে থেমেছে।
মাধবী তাঁর স্ত্রী। গত আট বছর হয়েছে যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে। সে বেঁচে থাকতে খুব মিশুক স্বভাবের ছিল। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন এমন কেউ ছিল না যার সাথে সে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতো না। খুবই সাধারণ মেয়ে ছিল। দেখতে সাধারণ, গান গাইতো বেসুরো গলায়, নাচতে পারতো না। রান্নাবান্নাও যে খুব ভাল পারতো এমনও না। কিন্তু যার সাথেই সে কথা বলতো সেই মনে করতো যেন কত দিনের চেনা! মানুষদের এতটাই আপন করে নিতে পারতো।
অনিরুদ্ধ সেন ঠিক তাঁর বিপরীত স্বভাবের। নিতান্তই অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয় না হলে তিনি সেভাবে কথা বলেন না। আড়ষ্ট বোধ করেন।
গোটা জীবন স্কুলে মাস্টারি করেছেন। ছেলেমেয়েদের গণিত শেখাতেন। তাঁর জীবনের সমীকরণ সবসময়ে না মিললেও স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে গণিতের সমীকরণ ঠিকই মেলাতেন।
মাস্টারি ছাড়া তাঁর আরেকটা শখ লেখালেখির। পত্রপত্রিকার সাহিত্য পাতায় মাঝে মাঝে গল্প কবিতা লিখে পাঠাতেন। কয়েকটা বইও প্রকাশ হয়েছে। বইগুলো সেভাবে বিক্রি হয়নি, কাজেই সেগুলো অতি উচ্চমার্গের না অতি অখাদ্য সাহিত্যকর্ম সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।
প্রতি বিকালে প্রাইভেট কোচিং করাতেন। এই বাড়িটা যেখানে তিনি থাকেন, তাঁর অতি কষ্টের টাকা এবং মাধবীর স্বপ্নে একটার পর একটা ইট জুড়ে গড়ে তোলা। এই যে শিউলি গাছটি, সেটিও মাধবীরও বোনা। এই বাড়িতে ওঠার প্রথম দিন স্মরণীয় করে রাখতেই সামনের উঠানের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে ছোট্ট চারাগাছটি লাগিয়েছিল সে। এরপরে কতগুলো বছর কেটে গেছে। কত গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই গাছটির আলাদা বিশেষত্ব আজও রয়ে গেছে। তিনি গাছটিকে "মাধবী" বলেই ডাকেন। মানুষের দৃষ্টির আড়ালে গাছটির সাথে মাঝে মাঝে আলাপ শালাপও করেন।

মাধবীর প্রচন্ড আগ্রহ ছিল গাছপালা ও ফুলের প্রতি। বেঁচে থাকতে গোটা বাড়িকেই সে বাগানে পাল্টে ফেলেছিল। এমন না যে তিনি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বাড়ি বানিয়েছেন। সামান্য কয়েক কাঠা জমির উপর এক তলা বাড়ি। এরচেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ্য একজন স্কুল মাস্টারের থাকেনা। ফাঁকা জায়গা বলতে গেলে প্রায় নেইই। কিন্তু সেই জায়গাটুকুও এমনকি ছাদও সে গাছগাছালিতে ভরে ফেলেছিল।
সেগুলোর যত্ন নিতে নিতেই তাঁর সময় পেরিয়ে যেত।
মাঝে মাঝে অনিরুদ্ধ খুব বিরক্ত হতেন। বাড়িতে এত গাছ থাকলে সাপ, বিচ্ছু, পোকামাকড় ইত্যাদি আসার সম্ভাবনা বাড়ে। তিনি সেটা মুখ ফুটে বলতেই মাধবী বেশ ফিল্মি কায়দায় বলেছিল "ইট পাথরে বাড়ি বানানো যায় মিস্টার সেন, কিন্তু সেখানে সবুজ পাতা এবং ফুল না থাকলে সেই বাড়িতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় না!"
কথাটা কতটুকু সত্য কে জানে! তবে গত আট বছর ধরে অনিরুদ্ধ বুঝেছেন, বাড়ির গৃহিনী যদি বাড়িতে না থাকে, তাহলে সেই বাড়ি শ্মশান হয়ে যায়।

অনিরুদ্ধ সেনের দুই মেয়ে। মালতি ও মাধুরী। দুই মেয়েই যার যার জীবনে প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে মালতি আমেরিকায় স্বামী সংসার করছে। সে পেশায় কর্পোরেট একাউন্ট্যান্ট। স্বামী ধীরেন ইঞ্জিনিয়ার। সেই ঘরে তাঁর দুই নাতি নাতনি। প্রতিবছর দুই সপ্তাহের জন্য বেড়াতে আসে।
আরেক মেয়ে মাধুরী এ শহরেই থাকে, পেশায় ডাক্তার। স্বামী তাপসও ডাক্তার। নিঃসন্তান স্বামী স্ত্রী দুইজনই খুব ব্যস্ত সময় কাটায়। তারপরেও শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর দুই মেয়েই প্রতিদিন বাবার খোঁজ নিতে ভুলেনা। লোকে পুত্র সন্তান পুত্র সন্তান বলে হাহাকার করে। অথচ তাঁর দুই কন্যাই তাঁকে যে পরিমান যত্ন করে এবং ভালবাসে, হাজার পুত্রের পক্ষেও তা সম্ভব হতো না।

বেশ খানিক্ষন ধরে মোবাইল ফোনে রিং হচ্ছে। তিনি ছুটে এসে ফোন ওঠালেন। মাধুরী কল করেছে।
"ফোন উঠাতে এত দেরি হলো কেন?"
"কাজে ব্যস্ত ছিলাম মা।"
"তুমি জানো না তুমি একা থাকো বলে আমাদের কত টেনশন হয়! কতবার বলেছি তুমি আমার সাথে এসে থাকো।"
তিনি হাসলেন। মেয়েরা চাইলেই কি আর তাঁদের বাড়িতে গিয়ে থাকা যায়? যদিও তাপস খুবই ভাল ছেলে। কিন্তু তাঁর বাড়ি যেমনই হোক, নিজের বাড়িতে নিজের স্বাধীনতা থাকে।
মেয়ের সাথে ফোনালাপ শেষে সকালের নাস্তা বানাতে যাবেন এমন সময়ে ঐশী এসে দরজায় টোকা দিল।
"কাকু নমস্কার! আবার এলাম।"
হাতে একটা বাটি।
"মা পায়েস বানিয়েছে। আপনার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।"
তিনি বললেন "সকাল সকাল মিষ্টি!"
"মিষ্টি হলো মিষ্টি, এর কোন সকাল বিকাল নেই।"
সে বাটির ঢাকনা সরালো। ভিতর থেকে এলাচের গন্ধ নাকে এলো। তিনি চমকে উঠলেন। মাধবীও পায়েসে প্রচুর এলাচ দিত। তিনি বিরক্ত হয়ে বলতেন "এতে পায়েসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।"
মাধবী বলতেন, "মানুষ স্বাদ ভুলে যায়, কিন্তু গন্ধ অনেকদিন মনে রাখে।"
এ বাড়িতে পায়েস রান্না হয়না আট বছরতো হবেই। কী আশ্চর্য! এত বছর পুরানো স্মৃতি হঠাৎ এক গন্ধেই ফিরে এলো!
"এসো মা, বসো।"
"না কাকু, আমার তাড়া আছে। কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"তুমি কলেজে পড়ো নাকি? দেখেতো মনে হয় এখনও স্কুলই পেরোওনি।"
মেয়েটি হেসে বলল, "আমি বড় হয়ে গেছি কাকু! সেকেন্ড ইয়ার এইচএসসি!"
"বাহ্ বেশ! সায়েন্স না আর্টস?"
"কমার্স।"
"বাহ্! বেশ ভাল!"
মেয়েটি ত্বরা কন্ঠে বলল "বাটিটা রেখে যাচ্ছি। পরে এসে নিয়ে যাব।"
তারপরেই যেন প্রজাপতির মত উড়ে গেল। তিনি তাকিয়ে রইলেন তার গমন পথে। ওকে অনুসরণ করতে করতেই তাঁর দৃষ্টি পড়লো শিউলি গাছের উপর। গাছের গায়ে একটা লাল দাগ কাটা।
তাঁর বুক খোঁচা দিয়ে উঠলো।
আগামীকালই সেই দিন!

২.

সরকার তাঁর শিউলি গাছটার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেছেন।
রাস্তা সম্প্রসারণ হবে। এক লেন বাড়ানো হবে। তাঁর সীমানা প্রাচীর ও উঠানের একটি অংশ চলে যাবে রাস্তার পেটে। সেই অংশেই শিউলি গাছটা আছে।
সরকারি কর্মকর্তা খুবই নির্বিকারভাবে তাঁকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।
"চিন্তা নেই, আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে!"
তিনি হাহাকার করে উঠেছিলেন।
"আমার গাছটা কেটে ফেলবেন?"
তারা নিরাসক্ত গলায় বললেন, "গাছতো যাবেই। বাড়ি যে যাচ্ছেনা সেটার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করুন। ১১৭ নম্বর বাড়ির পুরোটা চলে যাচ্ছে। ১১৪ নম্বরের অর্ধেকটা।"
তাঁর কাছে মনে হলো এরা সরকারি কর্মচারী নন, জল্লাদ। তাঁর মাধবীর ফাঁসির রায় কার্যকর করতে এসেছে। আট বছর আগে স্ত্রীকে একবার হারিয়েছিলেন, এবার দ্বিতীয়বার একই কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হবে!
তিনি আপিল করেছিলেন। পরদিনই তিনি সড়ক বিভাগের অফিসে গেলেন।
অফিসটা শহরের পুরানো অংশে, একটা তিনতলা ভবন। নিচতলায় ঢুকতেই একটা টেবিলের পেছনে বসা লোকটা তাঁর দিকে না তাকিয়েই বলল, "কি দরকার?"
"আমার বাড়ির সামনের গাছ কাটার নোটিশ পেয়েছি। এটা নিয়ে কথা বলতে চাই।"
"তিন তলায় যান। রুম নাম্বার ৩০৪।"
তিন তলায় গিয়ে দেখলেন রুম ৩০৪ তালাবদ্ধ। পাশের রুমের একজন বলল, "স্যার আজ আসেননি। কালকে আসেন।"
পরদিন আবার গেলেন। এবার রুমটা খোলা, কিন্তু ভেতরে কর্মকর্তা নেই। এক পিয়ন বলল, "স্যার মিটিংয়ে গেছেন। বসেন, আসবেন।"
দুই ঘণ্টা বসে থাকার পর কর্মকর্তা এলেন। তাঁর সমস্যাটা শুনে একটা ফাইল খুললেন, তারপর বন্ধ করে দিলেন।
"দেখুন স্যার, প্ল্যান পাশ হয়ে গেছে। এখন এটা পাল্টানো আমার হাতে নেই।"
"তাহলে কার হাতে?"
তিনি উপরের মহলে দরখাস্ত করতে বললেন।
উপর মহলে যাওয়ার জন্য আরেকটা দরখাস্ত লিখতে হলো। সেই দরখাস্ত জমা দেওয়ার জন্য আরেকটা লাইনে দাঁড়াতে হলো। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মধ্যবয়সী লোক তাঁকে ফিসফিস করে বললেন, "ভাই, শুধু দরখাস্ত জমা দিলে হবে না। একটু ব্যবস্থা করতে হয়।"
"মানে?"
লোকটা তাঁর দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালেন, যেন এত সহজ জিনিস কেউ না বুঝলে সেটা অবাক হওয়ার বিষয়।
"স্যার, খামে করে কিছু দিতে হয়। নাহলে ফাইল টেবিলের নিচে পড়ে থাকবে।"
অনিরুদ্ধ সেন কিছু বললেন না। চল্লিশ বছর মাস্টারি করে এসে এখন তাঁকে ঘুষ দেওয়ার পরামর্শ শুনতে হচ্ছে। তিনি ফিরে এলেন, দরখাস্তটা জমা দিয়েই।
সাতদিন পরেও কোনো উত্তর এলো না। তিনি আবার গেলেন। এবার যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা হলো বটে, কিন্তু মাত্র চার মিনিটের সাক্ষাৎ।
"স্যার, আমি আপনার সমস্যাটা বুঝি। কিন্তু প্ল্যানটা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত। এটা বদলাতে হলে অনেক ধাপ পেরোতে হবে। এমপি সাহেবের সুপারিশ লাগবে।"
"আমার কাছে এমপি সাহেবের কাছে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।"
তিনি একটা মৃদু হাসি দিলেন, যে হাসিতে করুণা আছে, কিন্তু সাহায্যের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
"চেষ্টা করে দেখুন স্যার। আমার হাতে আর কিছু নেই।"

সেদিনই তিনি যখন করিডোরে হতাশ দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন এক যুবক তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়।
"স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন?"
তিনি ঠিক মত তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর ছাত্র, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছুতেই নাম বা চেহারা মনে করতে পারলেন না।
"স্যার আমি তোফায়েল। তোফায়েল হোসেন সিদ্দিকী! ২০০১ এসএসসি ব্যাচ। এখন মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে বলে হয়তো চিনতে অসুবিধা হচ্ছে। তাছাড়া স্কুলে পড়ার সময়ে আমার দাড়িও ছিল না। হাহাহা।"
যুবকটা হোহো করে হাসছে। স্যারকে সামনে পেয়ে সত্যি সত্যিই আনন্দিত হয়েছে।
তিনি শুধু "ও আচ্ছা" বললেন। কণ্ঠ শুনেই বুঝা গেল তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না।
"ক্লাস সেভেনে থাকতে আমি অংকে লাগাতার ফেল করতাম। অনুপাতের অংক কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকতো না। এলজেব্রাও না। ষান্মাসিক পরীক্ষায় একশোতে সতেরো পাওয়ায় আপনি আমার খাতায় বড় করে লাল কালিতে "গরু" লিখে দিয়ে বলেছিলেন বাবার সিগনেচার নিয়ে আসতে। এখন মনে পড়েছে?"
তিনি বিব্রত হাসি হেসে বললেন "এখন মনে পড়েছে।"
তোফায়েলও হেসে বলল "সেই আমিই এসএসসিতে সাধারণ গণিতে এ প্লাস পেয়েছিলাম। হায়ার ম্যাথেও এ প্লাস ছিল।"
"বাহ্! বাহ্! বেশ ভাল! তা তুমি এখন কোথায় আছো?"
"স্যার এখন আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি। সড়ক বিভাগে।"
বলেই সে স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করলো। অনিরুদ্ধ সেনের বুকটা হুহু করে উঠলো। খাতায় ওভাবে "গরু" লেখাটা উচিত হয়নি। বেচারা এখনও ভুলতে পারছে না। শিক্ষকরা শাসন করেন, ভুলেও যান। কিছু শাসন ছাত্রদের মনে আজীবন দাগ কেটে রাখে।
"গরু লেখাটা উচিত হয়নি বাবা। কিন্তু তুমি কিছুতেই অংক প্র্যাকটিস করতে না। গোটা ক্লাস ভাল মার্ক্স্ পেয়ে পাশ করলো, শুধু তুমিই ফেল।"
ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল "তাও যেই সেই ফেল না স্যার, একেবারে ফেল নিয়ে নিচের ক্লাসে ডিমোশন হয়ে যাওয়ার মত ফেল। হাহাহাহা!"
তোফায়েল হোহো করে হাসছে। তাঁর হাসি দেখে অফিসের অনেকেই এদিকে ঘুরে তাকাচ্ছে। হেড ক্লার্ক নড়েচড়ে বসেছে। চেহারায় কাচুমাচু ভাব চলে এসেছে। ইঞ্জিনিয়ার স্যার যার পা ছুঁয়ে সালাম করে, তাঁকে অবহেলা করা মনে হয় ঠিক হয়নি।
"ছাত্ররা ফেল করলে আমার নিজের উপর খুব রাগ হয়। নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়। সেই রাগ সামলাতে পারিনি। তুমি কিছু মনে রেখো না।"
তোফায়েল সাথে সাথে জিভ কেটে বলল "স্যার! সেদিন যদি আপনি শাসন না করতেন তাহলে আজকে কি আমি এই চাকরি পেতাম?"
তারপরে কণ্ঠস্বর পাল্টে বলল "বলেন স্যার, হঠাৎ কি কাজে এখানে এসেছেন? আমাকে দেখতে যে আসেননি সেটাতো অনুমান করতেই পারি। আমার পক্ষে যদি কিছু করার থাকে, তাহলে হুকুম করেন।"
তিনি তাঁর সমস্যার কথা বললেন। তোফায়েল খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তারপরে বলল "আমি আমার লেভেলে যা করা সম্ভব চেষ্টা করবো স্যার!"
তিন দিন পর তোফায়েল নিজেই তাঁর বাড়িতে এলো। মুখটা থমথমে।
"স্যার, একটা কথা বলি। আপনি রাগ করবেন না তো?"
"বল।"
"মূল প্ল্যানে রাস্তাটা যেদিক দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই পথে কমিশনার সাহেবের বাড়ি পড়ে। তাঁর বাড়ি বাঁচাতে প্ল্যান বদলে আপনাদের দিকে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি আমার স্যারকে এটা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি সরাসরি বলে দিলেন, 'এইসব প্রশ্ন করার তুমি কে? তোমার কাজ ড্রয়িং বানানো, নীতি ঠিক করা না।' আমাকে সাবধানও করে দিলেন, বেশি খোঁজাখুঁজি করলে চাকরিতে সমস্যা হতে পারে।"

অনিরুদ্ধ সেন চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ।
"তুমি আর কষ্ট কোরো না বাবা। তোমার চাকরির ক্ষতি হোক, এটা আমি চাই না।"
"স্যার, তাও আমি একবার এমপি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখি। হয়তো...."
"না। থাক।"
তোফায়েল চলে যাওয়ার পর তিনি বুঝলেন, এটা আর শুধু কাগজপত্রের লড়াই নয়। ক্ষমতার একটা চাকা তাঁর গাছটার ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, আর সেই চাকা থামানোর সাধ্য একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলমাস্টারের নেই। এক স্কুল মাস্টারের হাত অত দূর পর্যন্ত পৌঁছে না।

তিনি আবার এলেন শিউলি তলায়। গাছটির গায়ে হাত রাখলেন।
"আমাকে ক্ষমা করো মাধবী।"
গাছটি মৃদু দুললো। বাতাসে। তাঁর মনে হলো মাধবী তাঁর কথার উত্তর দিয়েছেন।
লাল দাগটিতে আঙ্গুল বুলালেন। ইচ্ছে হলো মুছে দেন। দাগতো সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব, কিন্তু এর ভাগ্যে যা লেখা হয়ে গেছে, সেটা কি মোছা যাবে?
তিনি দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে দিলেন।
সন্ধ্যায় ছোট মেয়ে এসে উপস্থিত।
"বাবা, তুমি ঠিক আছো?"
তিনি বললেন "বেঠিক থাকবো কেন?"
"কালতো গাছটা কেটে ফেলার দিন।"
তিনি কিছু বললেন না। বড় মেয়ে কিছুক্ষন আগেই ফোনালাপ। তারও একই কথা, আগামীকাল গাছটি কেটে ফেলার দিন। তিনি যেন মন খারাপ না করেন।
মাধুরী বলল, "আমি চেষ্টা করেছিলাম পরিচিতদের ধরে যদি কিছু করা যায়। লাভ হলো না। প্ল্যান পাল্টাতে হলে সরকারের নাকি আরও অনেক অনেক বেশি টাকা খরচ হবে।"
"হু।"
মাধুরী জানে গাছটা বাবার কাছে কতটা প্রিয়। মায়ের অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে এই গাছটিই প্রধান। মা চলে যাওয়ার পর বাবা এই গাছটির মধ্যে মায়ের ছায়া খুঁজে নেন।
"আজকে এক কাজ করলে কেমন হয় বাবা? যেহেতু গাছটা কেটেই ফেলবে, আমরা নাহয় এই গাছটাকে আনন্দের সাথেই বিদায় দেই?"
তিনি কন্যার দিকে ফিরে বললেন, "কিভাবে?"
"ধরো আজকে গাছের নিচে বসে পিকনিক করলাম। মায়ের প্রিয় কিছু গান শুনলাম। মায়ের গল্প করলাম। আপাকেও ফোনে রাখলাম।"
তিনি মৃদু হেসে বললেন "মন্দ হয়না।"

কিছুক্ষনের মধ্যেই মাধুরী একটা বিছানার চাদর এনে শিউলি তলায় বিছিয়ে দিল। আলোর ব্যবস্থা করলো। চিকেন স্যান্ডুইচ, ডিমের স্যান্ডুইচ, বিস্কিট, চা নিয়ে এলো। মোবাইল ফোনে কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত, হেমন্ত, লতা, আশার গান ছেড়ে দিল। ফোনে মালতি ভিডিও কলে যুক্ত। তাঁর দুই নাতিকেও দেখা যাচ্ছে। ওরা ব্যস্ত, "হাই নানা ভাই" বলেই চলে যেতে যাচ্ছিল। মা ধমক দিয়ে ওদের বসিয়ে দিল।
তিনি বললেন "আহা বেচারাদের ধমক দিস না।"
মালতি বলল, "ধমকাতে হবে বাবা। নাহলে একেকটা বেয়াদব হবে। সারাদিন ট্যাব খুলে বসে থাকা - এদের নিয়ে কি যে যন্ত্রনায় আছি!"
মালতির বড় ছেলেকে মাধুরী বাবু ডাকে। সে তখন "এই বাবু, তুই এখন কোন ক্লাসে পড়িসরে?"
ছেলেটা আমেরিকান এক্সেন্টে বলল "ক্লাস কি?"
পাশ থেকে মালতি বলল, "গ্রেড।"
বাবু জবাব দিল "থার্ড গ্রেড।"
মাধুরী বলল "শুনলাম তোর ক্লাসের কোন এক ব্লন্ড মেয়েকে নাকি তোর ভাল লেগেছে? বড় হয়ে ওকে বিয়ে করতে চাস?"
বাবু লজ্জায় লাল হয়ে গেল। "তোমাকে এইসব কে বলেছে?"
"খবর পাই! আমার অনেক স্পাই আছে আমেরিকায়। ওরাই আমাকে খবর দেয়। মেয়েটার নাম কি বলে দিব?"
বাবু আতঙ্কিত স্বরে বলে "না! এখানে না!"
সবাই এক সাথে হেসে উঠে।
অনেক বছর আগে, যেন আগের জন্মের কথা, এ বাড়িতে এমন পারিবারিক আড্ডা জমতো। হয়তো কোন ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা ঘিরে, বা কোন নাটক দেখার সময়ে সবাই টিভির সামনে এইভাবে হাসিমুখে বসতো। মাধবী ব্যস্ত থাকতো রান্নাঘরে। চুলায় খাবার বসিয়ে যোগ দিত, এবং কিছুক্ষন পরপর রান্নাঘরে ছুটে যেত।
আজকেও মনে হচ্ছে সে পাশেই আছে। শিউলি গাছটা বাতাসে দুলছে, ফুল ঝরাচ্ছে।

রাতে তাঁদের আড্ডা দিতে দেখে কিছুক্ষনের মধ্যেই ঐশী এসে যুক্ত হলো। তার সাথে তার বাবা মাও এসে পরিচিত হলেন। সকালে পাঠানো পায়েসটা সবাই মিলে খেলেন। রাতে তাপস চলে এলো। হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট। ঐশীদের দেখে জিভ কেটে বলল "আহা! আমি জানতাম না যে আপনারাও থাকবেন! তাহলে আরও কয়েক প্যাকেট নিয়ে আসতাম। আমাকে একটু সময় দেন, আমি যাব আর আসবো।"
ঐশীর বাবাকে মনে হলো ফুর্তিবাজ মানুষ। তিনি সেই কণ্ঠেই বললেন, "আরে বাদ দেন! মিল মিস করে দিব্যি খাওয়া যাবে। কথায় আছে না, যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় নয়জন!"
তাপস একই স্বরে জবাব দিল, "তারপরে বাড়িতে গিয়ে বলবেন কিপ্টা জামাই তিন প্লেট বিরিয়ানি ছয়জনকে খাইয়েছে। নারে ভাই, সে সুযোগ আমি দিব না! হাহাহা।"
চমৎকার হৈহুল্লোড়ে রাত গভীর হলো।
গাছটার জীবনের শেষ রাত্রি আনন্দেই কাটলো বলা চলে।

৩.

পরদিন ভোরটাও সাধারণ ভোরের মতোই শুরু হলো। শিউলি গাছটি কিছুই জানে না। রাতভর ফুল ঝরিয়েছে। সাদা পাপড়ির নরম বিছানায় উঠোন ঢেকে গেছে।
অনিরুদ্ধ ঝুড়ি হাতে বেরিয়ে এলেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। মস্তিষ্ক সহজে মনে রাখতে পারে, শরীর ভুলে যায়।
আজ তিনি ফুল কুড়োতে পারলেন না।
ঝুঁকে বসে শুধু হাত রাখলেন মাটির ওপর।
মনে হলো, আজ ফুলগুলো কুড়িয়ে নিলে যেন বিদায়ের প্রস্তুতি হয়ে যাবে।
তিনি প্রস্তুত নন।
সকাল আটটার দিকে প্রথম ট্রাকটি এল। তারপর আরেকটি। ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দে ঘুম ভাঙা পাখিরা এক ঝাঁকে উড়ে গেল শিউলি গাছটা থেকে। অনিরুদ্ধর মনে হলো, পাখিরাও যেন জেনে গেছে আজ কী ঘটতে চলেছে।

কয়েকজন শ্রমিক নামলো। একটা চেইন স, মোটা দড়ি, একটা মই। একজন লোক গাছের গোড়ায় গিয়ে মাপজোক করতে লাগল। খাতায় কী যেন লিখলো। গাছটাকে দেখলো এমনভাবে, যেন এটা শুধু একটা সংখ্যা, একটা বাধা, যেটা সরাতে হবে।
পাড়ার মানুষজন ধীরে ধীরে জড়ো হতে লাগল। কেউ কেউ ফিসফিস করছে। একজন প্রবীণ প্রতিবেশী এসে অনিরুদ্ধর কাঁধে হাত রাখলেন, কিছু বললেন না, শুধু কাঁধটা একবার চাপলেন।
ঐশী কলেজে যায়নি। সে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে, হাত দিয়ে গাছের গায়ে সেই লাল দাগটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে, যেন হাত দিয়ে ঢেকে রাখলে দাগটা মুছে যাবে।
অনিরুদ্ধের দুই পাশে তাঁর মেয়ে এবং মেয়ের জামাই। তাঁরা রাতটা এ বাড়িতেই ছিল। এখনও অফিসে যায়নি।
একজন কর্মকর্তা কাগজ দেখে এগিয়ে এলেন।
"মিস্টার অনিরুদ্ধ সেন?"
"জি।"
"আমরা দুঃখিত। কাজটা আজই করতে হবে।"
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লেন। রাগ না। অভিমানও না। মন হয়তো মেনে নিতে শুরু করেছে।
তোফায়েলকেও দেখা গেল। বেচারা কেমন চোরের মত মুখ করে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। স্যারকে সাহায্য করতে না পারার ব্যর্থতার গ্লানি তাঁর চোখে মুখে। যেন স্যার আবারও তাঁর খাতায় লিখে দিয়েছেন "গরু।"
শ্রমিকদের একজন সিঁড়ি বেয়ে গাছের ওপরের দিকে উঠলো। প্রথম আঘাতটা এলো একটা ডালে। চেইন সয়ের প্রথম শব্দ শোনার সাথে সাথে অনিরুদ্ধের শরীরটা কেঁপে উঠলো, যেন আঘাতটা গাছে নয়, তাঁর নিজের শরীরে পড়েছে।
একটা ডাল কেটে নিচে পড়লো। তারপর আরেকটা। প্রতিটা ডাল পড়ার সাথে সাথে অজস্র সাদা ফুল ঝরে ঝরে পড়তে লাগলো, যেন গাছটা নিজের সবটুকু সৌন্দর্য এক মুহূর্তে বিলিয়ে দিতে চাইছে, কারো কাছে কিছু জমিয়ে না রেখে।

অনিরুদ্ধর চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠলো। আঠাশ বছর আগে, এই একই জায়গায়, মাধবী হাঁটু গেড়ে বসে মাটি খুঁড়ছেন, হাতে কাদা, চুলে রোদ পড়ে চিকচিক করছে।
"এই দেখো, একদিন এই ছোট্ট চারাটা এত বড় হবে যে তুমি ওর ছায়ায় বসে বই পড়বে।"
তিনি তখন হেসেছিলেন, বলেছিলেন, "তুমি বড্ড বেশি স্বপ্ন দেখো মাধবী।"
এখন সেই গাছের ডালগুলো একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।
মূল কাণ্ডে করাত বসলো। শব্দটা এবার অন্যরকম। গভীর, ভারী, একটানা। কাঠের গুঁড়ো উড়ছে বাতাসে। অনিরুদ্ধর মনে হলো তাঁর নিজের বুকের ভেতর কিছু একটা কাটা হচ্ছে, স্তরে স্তরে, ধীরে ধীরে।
মাধুরী বাবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে নিঃশব্দে।
ঐশী আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না। মুখ ঘুরিয়ে নিলো, তারপর নিজের মায়ের কাঁধে মুখ গুঁজলো।
করাতের শব্দ একসময় থেমে গেল। একজন শ্রমিক চিৎকার করে বললো, "সবাই সরে যান!"
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর একটা মড়মড় শব্দ। কাণ্ডের ভেতরের তন্তুগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ। আর গাছটা ধীরে ধীরে কাত হতে শুরু করলো। প্রথমে ধীরে, তারপর দ্রুত। শেষে বিশাল একটা শব্দ করে মাটিতে আছড়ে পড়লো।
মাটি কেঁপে উঠলো, এমনটাই মনে হলো অনিরুদ্ধর।
ধুলো আর ছড়িয়ে পড়া ফুলের একটা মেঘ কিছুক্ষণের জন্য বাতাসে ভেসে রইলো। সেই মেঘের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল অদ্ভুতভাবে, যেন কেউ ইচ্ছে করেই একটা শেষ দৃশ্য সাজিয়ে দিয়েছে।
চেইন স'র শব্দ থামার পর অনিরুদ্ধ বাড়ির দিকে ফিরলেন না। তিনি দাঁড়িয়েই রইলেন। এবার তাঁর পা দুটো নড়লো না। তিনি এগিয়ে গেলেন কাটা গুঁড়িটার কাছে। হাঁটু গেড়ে বসলেন। বছরের পর বছরের বলয়গুলো দেখা যাচ্ছে কাটা অংশে। প্রতিটা বলয় একটা বছর, একটা বসন্ত, একটা শরৎ।
তিনি হাত রাখলেন কাটা কাণ্ডের ওপর। কাঠটা তখনও উষ্ণ, যেন এইমাত্র প্রাণ চলে গেছে এমন কারো শরীর ছোঁয়ার মতো অনুভূতি।
"আমাকে ক্ষমা করো মাধবী," তিনি আবার বললেন, এবার ফিসফিসিয়ে, শুধু নিজেকে শোনানোর মতো করে।
শ্রমিকরা ডালপালা টুকরো টুকরো করে ট্রাকে তুলতে লাগলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু একটা তাজা কাটা গুঁড়ি আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শুকিয়ে যেতে থাকা সাদা ফুল ছাড়া আর কিছু রইলো না।
মাধুরীর মনে হলো যেন মা শেষ বিদায়ের আগে আশীর্বাদ দিয়ে গেলেন। কী আশ্চর্য্য! সেও কি গাছটির মাঝে মাকে খুঁজতো?
অনিরুদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন। অদ্ভুত কারনে তাঁর মনে হচ্ছে না যে মাধবী চলে যাচ্ছে। উল্টো মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কোন দরজা যেন নীরবে খুলে গেল।
মাধুরী কাঁদছে। তিনি মেয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।
সন্ধ্যার দিকে, যখন সবাই চলে গেছে, তিনি একা এসে দাঁড়ালেন খালি জায়গাটায়। গাছের শিকড় যেখানে ছিল সেই মাটিতে এখনও গোলাকার একটা দাগ। তিনি সেই দাগের মাঝখানে বসলেন, ঠিক যেখানে গাছটা একদিন দাঁড়িয়েছিল।
আকাশে তখন শেষ বিকেলের আলো। তিনি বসে রইলেন অনেকক্ষণ, কিছু না বলে, কিছু না ভেবে শুধু বসে থাকলেন, যেভাবে একজন মানুষ কারো কবরের পাশে বসে থাকে।

৪.

কয়েক বছর পরের কথা।
অনিরুদ্ধ সেন এখনও সেই বাড়িতেই আছেন। বাড়ির সামনের উঠোন ছোট হয়ে গেছে। সেটা এখন নতুন রাস্তার গর্ভে। তাঁর সীমানা প্রাচীর মূল ভবনের একদম কাছাকাছি এসে গেছে।
তাঁর মাথার চুল আরও পাতলা হয়েছে। কালো চুলের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত।
তিনি এখনও খুব ভোরে ওঠেন। এলার্মের প্রয়োজন হয় না। তবে আর উঠোনে যান না। উঠোনই নেই, সেখানে যাবেন কী? বরং ছাদেই কিছুটা সময় কাটান। শহর এদিকটায় এখন পর্যন্ত নিজের আগ্রাসন বিস্তার করতে পারেনি। আশপাশের বাড়িগুলো এখনোও আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় শামিল হয়নি। তাঁর ছাদ থেকে আকাশের বিশালত্ব অনায়াসে চোখে পড়ে। দৃশ্যটা তাঁর ভালো লাগে।
মাধবীর বানানো ছাদবাগান না থাকলেও আজও ছাদে কিছু গাছপালা টিকে আছে। বেশিরভাগই ফুলের গাছ। এরই মাঝে একটি হচ্ছে শিউলি গাছ। সেই ঘটনার পরে ঐশী এসে ছাদের টবে নতুন চারা লাগিয়ে গিয়েছিল, এখন দিব্যি বেড়ে চলেছে। এখন আর চারা নয়, বেশ পোক্ত একটা গাছ, ছাদের রেলিং ছাড়িয়ে মাথা তুলেছে।
ঐশী এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, অন্য শহরে। বছরে দুই-একবার আসে। এবার এসেছে পুজোর ছুটিতে, সাথে তার পাঁচ বছরের ভাইঝি তিতির। ভীষণ মিষ্টি স্বভাবের। তাঁর বাগানে এসে গল্প করতো। গাছগুলোতে পানি দিত। বেচারির বাগানের খুব শখ ছিল কিন্তু ভাড়া বাড়িতে সেই সুযোগ কখনই পায়নি।
আগের গাছটি কেটে ফেলার দিন তিনি একটি সত্য আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি গাছটির মধ্যে মাধবীকে খুঁজতেন। গাছটি চলে যাওয়া না পর্যন্ত টেরই পাননি যে মাধবী কোন নির্দিষ্ট গাছে নয়, মাধবী মিশে আছে তাঁরই মাঝে। গাছটি তাঁকে মাধবীর স্মৃতি মনে করিয়ে দিত কেবল। এখন মাধবীকে স্মরণ করতে তাঁর কোন মাধ্যম লাগে না।
ভোর। আকাশে হালকা কুয়াশা। সূর্য ঠিকঠাক জেগে উঠেনি। অনিরুদ্ধ সেন ছাদে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন।
শিউলি গাছটার নিচে ছোট্ট একটা মূর্তি বসে আছে। পিঠ তাঁর দিকে ফেরানো। ছোট্ট দুটো হাত সন্তর্পণে মাটি থেকে ফুল কুড়িয়ে নিজের কোলে জমাচ্ছে।
তিথি।
তিনি গলা খাঁকারি দিলেন। মেয়েটি চমকে ঘুরে তাকালো। ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় তার মুখ লাল।
"দাদু, আমি... আমি ফুল নিচ্ছিলাম।"
অনিরুদ্ধ সেনের মুখে সেই পুরনো হাসিটা ফিরে এলো, যে হাসিটা তিনি বহু বছর আগে আরেকটা লজ্জা পাওয়া মুখের সামনে দিয়েছিলেন।
"চুরি করছিলে বুঝি?"
মেয়েটি আরও লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো। "স্যরি দাদু।"
তিনি ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসলেন তার পাশে। হাতের ঝুড়িটা মাঝখানে রাখলেন।
"শোনো তিথি। ফুল যদি নিজের জন্যই ফুটতো, তাহলেতো সে ফুল হতো না।"
কথাগুলো তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, অথচ মনে হলো যেন অন্য কারো কণ্ঠ ধার নিয়ে বললেন। ঠিক একই বাক্য, একই উঠোন থেকে অনেক বছর আগে আরেকজনের উদ্দেশ্যে বলা।
তিথি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। বুঝলো না ঠিক, কিন্তু কথাটার মধ্যে কিছু একটা আছে যা তার ছোট্ট মনেও নাড়া দিলো।
তিনি ঝুড়িভর্তি ফুল তার কোলের দিকে ঠেলে দিলেন।
"এই নাও। আজকে থেকে আর চুরি করতে হবে না। এই গাছের ফুল এখন থেকে তোমার।"
মেয়েটি খুশিতে ঝলমল করে উঠলো, ছোট্ট হাতে ফুলগুলো আঁকড়ে ধরলো, তারপর ছুটে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
অনিরুদ্ধ সেন একা রয়ে গেলেন গাছের নিচে। নতুন চারাটির নিচে আরও কয়েকটা শিউলি ফুল পড়ে আছে, যেগুলো তিথির চোখ এড়িয়ে গেছে। এ বছরের প্রথম ফুল। আজও কমলা ডাঁটাগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন মাটির ওপর ছোট ছোট প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে।
তিনি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে একটি ফুল তুলে নিলেন। চোখ বন্ধ করলেন। ফুলটি নাকে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
"ধন্যবাদ।"
কাকে বললেন?
গাছকে?
মাধবীকে?
নাকি জীবনকে?
তিনি নিজেও জানেন না।
নিচ থেকে তিথির উত্তেজিত গলা ভেসে এলো, "মা মা দেখো, দাদু আমাকে এত্তগুলা ফুল দিয়েছে!"
অনিরুদ্ধ সেন চোখ খুললেন। ছাদের রেলিং ধরে নিচের দিকে তাকালেন না। শুধু কান পেতে রইলেন সেই কণ্ঠস্বরের দিকে, যতক্ষণ না সেটা বাড়ির ভেতর মিলিয়ে গেল।
শিউলির গন্ধ ভেসে আসছিল। সূর্য উঠছিল ধীরে ধীরে। নতুন গাছের পাতায় শিশির ঝিলমিল করছিল।
তিনি বুঝলেন, গাছ কেটে ফেলা যায়। মানুষ চলে যায়। কিন্তু একটা বাক্য, একটা ভঙ্গি, একটা ভোরবেলার অভ্যাস, এসব কখনো সম্পূর্ণ হারায় না। এক প্রজন্মের হাত থেকে আরেক প্রজন্মের কোলে গড়িয়ে পড়ে, ঠিক যেভাবে ফুল ঝরে পড়ে মাটিতে, নতুন কারো হাতে কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য।
শোক একদিন স্মৃতি হয়। স্মৃতি একদিন কৃতজ্ঞতা হয়। আর কৃতজ্ঞতা, যদি ভাগ্য ভালো থাকে, একদিন আবার কারো কাছে উপহার হয়ে ফিরে আসে, ঠিক একটা ঝুড়িভর্তি সাদা ফুলের মতো।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বৃষ্টি দিনের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৫



টিভি বা পত্রপত্রিকায় আবহাওয়া'র খবর নিয়ে নিউজ হয়-
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইন দ্যা শ্যাডোস অব ইল্যুশন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৮



রাজধানীর নিঝুম আবাসিক এলাকার তিনতলা ফ্ল্যাটের শোবার ঘরটি তখন ক্রাইম সিন টেপে ঘেরা। ধুলো জমে থাকা এয়ার কন্ডিশনারের শব্দের মাঝে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রক্তের হালকা সোঁদা গন্ধ।

পিবিআই ইনভেস্টিগেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১০


‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

গুমের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ভুক্তভোগীকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭


মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

একসময় কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে মানুষকে ভাবতে হতো। বই খুলতে হতো, লাইব্রেরিতে যেতে হতো, কারও সঙ্গে আলোচনা করতে হতো, ভুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্বাবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ৪

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১৬


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/3039397|১ম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×