somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুসলমান ও বিধর্মীদের যুদ্ধনীতিঃ একটি তুলনামুলক চিত্র।

০১ লা নভেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৫:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(১) প্রথমেই উল্লেখ করা আবশ্যক যে, রাসূল আগমনের মূল উদ্দেশ্য হ’ল দুনিয়াবাসীকে জান্নাতের সুসংবাদ শুনানো এবং জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করা। বহুত্ববাদ ত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী করা ও মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করা এবং এর মাধ্যমে মানবতার সর্বোত্তম বিকাশ ঘটানো। মক্কাতে রাসূল (ছাঃ) সেই দাওয়াতই শুরু করেছিলেন। কিন্তু আত্মগর্বী কুরায়েশ নেতারা রাসূলের এ


দাওয়াতের মধ্যে নিজেদের দুনিয়াবী ক্ষতি বুঝতে পেরে প্রচন্ড বিরোধিতা করল এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল। পরে তিনি মদীনায় হিজরত করলেন। কিন্তু সেখানেও তারা লুটতরাজ, হামলা ও নানাবিধ চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চালাতে লাগল। ফলে তাদের হামলা প্রতিরোধের জন্য এবং অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর রাসূলকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয় (হজ্জ ৩৯)। ফলে এটাই প্রমাণিত সত্য যে, হামলাকারীদের প্রতিরোধ ও তাদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার জন্য যুদ্ধগুলি সংঘটিত হয়েছিল এবং কোথাও কখনো যুদ্ধের সূচনা মুসলমানদের পক্ষ থেকে হয়নি।

(২) সমস্ত যুদ্ধই ছিল মূলতঃ কুরায়েশদের হিংসা ও অহংকারের ফল। বনু কুরায়েশ, বনু গাত্বফান, বনু সুলায়েম, বনু ছা‘লাবাহ, বনু ফাযারাহ, বনু কেলাব, বনু আযল ও ক্বারাহ, বনু আসাদ, বনু যাকওয়ান, বনু লাহিয়ান, বনু সা‘দ, বনু তামীম, বনু হাওয়াযেন, বনু ছাক্বীফ প্রভৃতি যে গোত্রগুলির সাথে যুদ্ধ হয়েছিল, মূলতঃ এরা সবাই ছিল কুরায়েশদের পিতামহ ইলিয়াস বিন মুযারের বংশধর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজেও ছিলেন কুরায়েশ বংশের বনু হাশেম গোত্রের। ফলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে এদের যত লড়াই হয়েছে, সবই ছিল মূলতঃ গোত্রীয় হিংসার কারণে। এইসব গোত্রের নেতারা রাসূল (ছাঃ)-এর নেতৃত্ব ও প্রাধান্যকে বরদাশত করতে পারেনি। বদরের যুদ্ধে বনু হাশেম গোত্র চাপের মুখে অন্যান্যদের সাথে থাকলেও তারা রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি। কিন্তু আবু জাহল সহ বাকীরা সবাই ছিল মূলতঃ ইলিয়াস বিন মুযারের বংশধর অন্যান্য গোত্রের।

(৩) রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনকালে আরব উপদ্বীপের অন্য কোন গোত্রের সাথে তাঁর কোন যুদ্ধ বা সংঘাত হয়নি। তিনি সারা আরবে লড়াই ছড়িয়ে দেননি।
(৪) রাসূল (ছাঃ)-এর শত্রুতায় ইহুদিরা ছিল কুরায়েশদের সঙ্গে একাত্ম এবং গোপনে চুক্তিবদ্ধ।

(৫) নবুঅতের পুরা সময়কালে একজন লোকও এমন পাওয়া যাবে না, যে ব্যক্তি কেবলমাত্র ধর্মীয় কারণে মুসলমানদের হাতে নিগৃহীত হয়েছে। যতক্ষণ না সে মুসলমানদের উপরে চড়াও হয়েছে, কিংবা ষড়যন্ত্র করেছে। চাই সে মূর্তিপূজারী হৌক বা ইহুদী-নাছারা হৌক বা অগ্নিউপাসক হৌক।

(৬) মুশরিকদের হামলা ঠেকাতে গিয়ে দারিদ্র্য জর্জরিত ও ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর মুসলিম বাহিনী ক্রমে এমন শক্তিশালী এক অপরাজেয় বাহিনীতে পরিণত হয় যে, রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় তারা কোন যুদ্ধেই পরাজিত হননি। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও খেলাফতে রাশেদাহর যুগে এই বিজয়াভিযান অব্যাহত থাকে। তৎকালীন বিশ্বশক্তি রোমক ও পারসিক শক্তি ঈমানের বলে বলীয়ান মুসলিম বাহিনীর হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়।

(৭) রাসূল (ছাঃ) যুদ্ধকে পবিত্র জিহাদে পরিণত করেন। কেননা জিহাদ হ’ল অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সে যুগের যুদ্ধনীতিতে সকল প্রকার স্বেচ্ছাচার সিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলামী জিহাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান কঠোরভাবে অনুসৃত হয়। যা মানবতাকে সর্বদা সমুন্নত রাখে এবং যা প্রতিপক্ষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। যে কারণে সারা আরবে ও আরবের বাইরে দ্রুত ইসলাম বিস্তার লাভ করে মূলতঃ তার আদর্শিক ও মানবিক আবেদনের কারণে।

(৮) যুদ্ধবন্দীর উপরে বিজয়ী পক্ষের অধিকার সর্বযুগে স্বীকৃত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নীতি এক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করে। প্রতিপক্ষ বনু হাওয়াযেন গোত্রের ১৪ জন নেতা ইসলাম কবুল করে এলে তাদের সম্মানে ও অনুরোধে হোনায়েন যুদ্ধের ছয় হাযার যুদ্ধবন্দীর সবাইকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিনা শর্তে মুক্তি দেন। এমনকি বিদায়ের সময়ে তাদের প্রত্যেককে একটি করে মূল্যবান ক্বিবতী চাদর উপহার দেন।

(৯) যুদ্ধরত কাফির বা বিচারে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত কাউকে হত্যা করার বিধান ইসলামে নেই। সেকারণ মাদানী রাষ্ট্রের অধীনে চুক্তিবদ্ধ অসংখ্য অমুসলিম নাগরিক পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে শান্তির সাথে বসবাস করত।

(১০) রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুমতি বা আদেশ ব্যতীত কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ ছিল। সেকারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বরাতে মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান হযরত ওমরের হাতে ধরা পড়া সত্ত্বেও তাঁর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি ওমর (রাঃ)-এর অটুট আনুগত্য প্রদর্শনের কারণে। অতএব রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বাইরে এককভাবে কেউ কাউকে হত্যা বা যখম করতে পারে না। এতে বুঝা যায় যে, জিহাদ ফরয হ’লেও সশস্ত্র জিহাদ পরিচালনার দায়িত্ব এককভাবে মুসলিম সরকারের হাতে ন্যস্ত, পৃথকভাবে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের হাতে নয়। রাসূল (ছাঃ)-এর পরে খেলাফতে রাশেদাহর সময়েও একই নীতি অব্যাহত ছিল।

তুলনামূলক চিত্র

খ্যাতনামা ঐতিহাসিক সুলায়মান মানছূরপুরীর হিসাব মতে মাদানী যুগে মুসলিম ও কাফিরের মধ্যকার যুদ্ধে উভয় পক্ষে ৮ বছরে সর্বমোট ১০১৮ জন ব্যক্তি নিহত হয়েছে। বিনিময়ে সমস্ত আরব উপদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামী খেলাফত এবং যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে সকল মানুষের সমান অধিকার। জান-মাল ও ইযযতের গ্যারান্টি লাভে ধন্য হয়েছিল মানবতা। বিকশিত হয়েছিল সর্বত্র মানবিক মূল্যবোধের পুষ্পকলি। তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা নাগরিক জীবনে এনেছিল এক অনির্বচনীয় সুখ ও সমৃদ্ধির বাতাবরণ। সৃষ্টি করেছিল সর্বত্র শান্তি ও নিরাপত্তার অনাবিল সুবাতাস।
খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর উক্ত ইসলামী বিপ্লবের পরে বিগত ১৩শ বছরে পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে। পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, ফ্যাসিবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাকার বহুতর মতবাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে আধুনিক পৃথিবীতে। গত প্রায় দুই শতাব্দীকাল ব্যাপী চলছে কথিত গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের জয়জয়কার। যুলুম ও অত্যাচারের ষ্টীম রোলার চালানো হচ্ছে বিশ্বব্যাপী মূলতঃ ঐ তিনটি গালভরা আদর্শের নাম নিয়েই। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে কেবল বিংশ শতাব্দীতেই সংঘটিত প্রধান তিনটি যুদ্ধে পৃথিবীতে কত বনু আদমকে হত্যা করা হয়েছে, তার একটা হিসাব আমরা তুলে ধরার প্রয়াস পাব। তবে এ হিসাব পূর্ণাঙ্গ কি-না সন্দেহ রয়েছে। বরং প্রকৃত হিসাব নিঃসন্দেহে এর চাইতে অনেক বেশী হবে।

১. ১ম মহাযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) : মোট নিহতের সংখ্যা ৭৩ লাখ ৩৮ হাযার। তন্মধ্যে (১) রাশিয়ায় ১৭ লাখ (২) জার্মানীতে ১৬ লাখ (৩) ফ্রান্সে ১৩ লাখ ৭০ হাযার (৪) ইটালীতে ৪ লাখ ৬০ হাযার (৫) অষ্ট্রিয়ায় ৮ লাখ (৬) গ্রেট বৃটেনে ৭ লাখ (৭) তুরষ্কে ২ লাখ ৫০ হাযার (৮) বেলজিয়ামে ১ লাখ ২ হাযার (৯) বুলগেরিয়ায় ১ লাখ (১০) রুমানিয়ায় ১ লাখ (১১) সার্বিয়া-মন্টিনিগ্রোতে ১ লাখ (১২) আমেরিকায় ৫০ হাযার। সর্বমোট ৭৩ লাখ ৩৮ হাযার। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের তালিকায় ভারতীয়দের এবং ফ্রান্সের তালিকায় সেখানকার নতুন বসতি স্থাপনকারীদের নিহতের সংখ্যা যুক্ত হয়েছে কি-না জানা যায়নি। তাছাড়া যুদ্ধে আহত, পঙ্গু, বন্দী ও নিখোঁজদের তালিকা উপরোক্ত তালিকার বাইরে রয়েছে। অন্য এক হিসাবে নিহত ৯০ লাখ, আহত ২ কোটি ২০ লাখ এবং নিখোঁজ হয়েছিল প্রায় ১ কোটি মানুষ।

২. ২য় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪১-১৯৪৫) : মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। তন্মধ্যে একা সোভিয়েট ইউনিয়ন প্রায় ৮৯ লাখ সৈন্য হারায় বলে মস্কো থেকে এএফপি পরিবেশিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। এ সময় জাপানের হিরোশিমাতে নিক্ষিপ্ত এটমবোমায় তাৎক্ষণিক ভাবে নিহত হয় ১ লাখ ৩৮ হাযার ৬৬১ জন এবং ১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ধ্বংসস্তূপ ও ছাইয়ে পরিণত হয়। আমেরিকার ‘লিটল বয়’ নামক এই বোমাটি নিক্ষিপ্ত হয় ১৯৪৫ সালের ৬ই আগষ্ট সকাল সোয়া ৮-টায়। এর তিনদিন পরে ৯ই আগষ্ট বুধবার দ্বিতীয় বোমাটি নিক্ষিপ্ত হয় জাপানের নাগাসাকি শহরে। যাতে সাথে সাথে মৃত্যুবরণ করে আড়াই লাখ বনু আদম। উভয় বোমার তেজষ্ক্রিয়তার ফলে ক্যান্সার ইত্যাদির মত দুরারোগ্য ব্যধিতে আজও সেখানকার মানুষ মরছে। বংশপরিক্রমায় জাপানীরা বহন করে চলেছে এসব দুরারোগ্য ব্যাধি। হিরোশিমা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ১৯৪৯ সালের ২০শে আগষ্ট এক ঘোষণায় বলেন, ১৯৪৫ সালে ৬ আগষ্টের দিনে বোমা হামলায় মৃত্যু বরণকারীর সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ১০ হাযার থেকে ৪০ হাযারের মধ্যে এছাড়াও বর্তমানে সেখানে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের অধিকাংশ হচ্ছে পঙ্গু ও প্রতিবন্ধী। মূল ধ্বংসস্থলে আজও কোন ঘাস পর্যন্ত জন্মায়না বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ।

৩. ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৩) : আগ্রাসী মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে আক্রান্ত ভিয়েতনামীরা দীর্ঘ ১৮ বছর যাবৎ এই যুদ্ধ করে। এতে এককভাবে আমেরিকা ৩৬ লাখ ৭২ হাযার মানুষকে হত্যা করে ও ১৬ লাখ মানুষকে পঙ্গু করে এবং ৯ লাখ শিশু ইয়াতীম হয়।
সম্প্রতি মার্কিন আদালতে ‘ভিয়েতনাম এসোসিয়েশন, ফর ভিকটিম্স অফ এজেক্ট অরেঞ্জ/ডায়োক্সিন’-এর পক্ষ হ’তে নিউইয়র্কের একটি আদালতে মামলা দায়ের করা হ’লে আদালত তা খারিজ করে দেয়। বাদীগণ এই রায়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রর সুপ্রীম কোর্টে আবেদন জানাবেন। বিবরণে বলা হয় যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় রাসায়নিক অস্ত্র হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এই ‘এজেক্ট অরেঞ্জ’ স্প্রে করেছিল। যাতে ক্যান্সার ও বিকলাঙ্গ শিশু জন্মসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। ‘এজেক্ট অরেঞ্জের’ ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ভিয়েতনামে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ রোগাক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়।

এতদ্ব্যতীত বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, সোমালিয়া, সার্বিয়া, কসোভো, সূদান, শ্রীলংকা, কাশ্মীর, নেপাল, ইরাক, আফগানিস্তান ও অন্যান্য দেশ সমূহে এইসব কথিত গণতন্ত্রী ও মানবাধিকারবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা নিত্যদিন নানা অজুহাতে যে কত মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে, তার হিসাব কে রাখে?

জন ডেভেনপোর্ট তার An Apology for Muhammad and Koran বইয়ে কেবলমাত্র খৃষ্টান ধর্মীয় আদালতের নির্দেশে খৃষ্টান নাগরিকদের নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ বলেছেন। স্পেন সরকার ৩ লাখ ৪০ হাযার খৃষ্টানকে হত্যা করে। যার মধ্যে ৩২ হাযার লোককে তারা জীবন্ত পুড়িয়ে মারে।

এছাড়াও রয়েছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় এডলফ হিটলার কর্তৃক জার্মানীতে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ৬০ লাখ ইহুদীকে হত্যা করার মর্মান্তিক বিভীষিকা এবং অন্যান্য নৃশংস হত্যার কাহিনী।
(৪) ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) : আমেরিকার উসকানিতে প্ররোচিত হয়ে ইরাকী নেতা সাদ্দাম হোসেন ইরানের উপরে হামলা করেন। যাতে আট বছরে দুই পক্ষে কমপক্ষে দশ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধের দীর্ঘ বিশ বছর পরে গত ২রা মার্চ ’০৮ আহমেদিনেজাদই প্রথম ইরানী প্রেসিডেন্ট, যিনি ইরাক সফর করেন। পরের দিন ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সাথে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসের বীজ বপন করেছে’।

ইহুদী-খৃষ্টানদের যুদ্ধনীতি :

ইহুদী-খৃষ্টানদের এই ব্যাপক নরহত্যার পিছনে রয়েছে তাদের কথিত ধর্মীয় নির্দেশনা সম্বলিত যুদ্ধনীতি। যেমন বাইবেলে যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষদের, বিশেষ করে সকল পুরুষ শিশুকে এবং সকল বিবাহিত নারীকে নির্বিচারে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র কিশোরী ও কুমারী মেয়েদেরকে ভোগের জন্য জীবিত রাখার নির্দেশ রয়েছে। কোন দেশ যুদ্ধ করে দখল করতে পারলে তার সকল পুরুষ অধিবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করতে হবে এবং নারী ও পশুদেরকে ভোগের জন্য রাখতে হবে। আর সেই দেশ যদি ইহুদীদের দেশের নিকটবর্তী কোন দেশ হয়, তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তথাকার সকল মানুষকে হত্যা করতে হবে।

ইসলামের যুদ্ধনীতি

ইসলামের দেওয়া যুদ্ধ নীতিতে যোদ্ধা ও বিচারে দন্ডপ্রাপ্ত ব্যতীত কাউকে হত্যা করার যেমন কোন অনুমতি নেই। তেমনি শরী‘আতের দেওয়া নিয়মনীতির বাইরে কোনরূপ স্বেচ্ছাচারিতার অবকাশ নেই। যেমন-
(১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيْحَهَا تُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ أَرْبَعِيْنَ عَامًا- ‘যদি কোন ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিকে অর্থাৎ রাষ্ট্রের অনুগত কোন অমুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করে, তবে সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধি ৪০ বছরের দূরত্ব হ’তে লাভ করা যাবে’।
(২) অন্য হাদীছে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন,
لاَ تَغْدُرُوْا وَلاَ تُمَثِّلُوْا وَلاَ تَغَلُّوْا وَلاَ تَقْتُلُوْا الْوِلْدَانَ وَلاَ أَصْحَابَ الصَّوَامِعِ
‘তোমরা যুদ্ধে চুক্তিভঙ্গ করবে না, মৃতদেহ বিকৃত করবে না, বাড়াবাড়ি করবে না, শিশু-কিশোরদের হত্যা করবে না, গীর্জার অধিবাসী কোন পাদ্রী-সন্ন্যাসীকে, কোন মহিলাকে এবং কোন অতি বৃদ্ধকে হত্যা করবে না। খাদ্যের প্রয়োজন ব্যতীত কোন উট বা গাভী যবেহ করবে না ...। যুদ্ধের প্রয়োজন ব্যতীত কোন ভৌতকাঠামো বিনষ্ট করবে না বা কোন বৃক্ষ কর্তন করবে না। তোমরা দয়া প্রদর্শন কর। আল্লাহ দয়াশীলদের পসন্দ করেন’। আর সেকারণেই মক্কা বিজয়ের পর দুশমননেতা আবু সুফিয়ানকে, তার স্ত্রী হেন্দাকে যিনি ওহোদ যুদ্ধে শহীদ হযরত হাসান (রাঃ)-এর নাক-কান কেটে গলার হার বানিয়েছিলেন ও তার কলিজা চিবিয়েছিলেন, অন্যতম নেতা আবু জাহলের ছেলে ইকরিমা প্রমুখ শত্রুনেতা সহ সকলকে ক্ষমা করেছিলেন। কারু প্রতি সামান্যতম প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেননি। আর এই উদারতার কারণেই তারা সবাই ইসলাম কবুল করেন ও শত্রুতা পরিহার করে রাসূল (ছাঃ)-এর দলভুক্ত হয়ে যান।

(৩) তিনি সর্বদা সৈনিকদের বলতেন, يَسِّرُوْا وَلاَ تُعَسِّرُوْا وَسَكِّنُوْا وَلاَ تُنَفِّرُوْا ‘সহজ করো, কঠিন করো না। শান্ত থাক, ঘৃণা করো না’। তিনি কখনো রাতে কাউকে হামলা করতেন না। কাউকে আগুনে পোড়াতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলতেন, কোন আহতকে আক্রমণ করবে না, পলাতককে ধাওয়া করবে না, বন্দী এবং কোন দূতকে হত্যা করবে না, লুটতরাজ করবে না। তিনি বলতেন, গণীমতের মাল মৃত লাশের ন্যায় হারাম’।

(৪) মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিনের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, اِرْفَعُوْا اَيْدِيْكُمْ مِنَ الْقَتْلِ، فَلَقَدْ كَثُرَ الْقَتْلُ اِنْ نَفَعَ ‘তোমরা হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত হও। কেননা এর দ্বারা কোন লাভ হ’লে এর সংখ্যা বেড়ে যেত’। অতএব এরপরে যদি কেউ হত্যা করে, তবে তার উত্তরাধিকারীদের জন্য দু’টি এখতিয়ার থাকবে। তারা চাইলে হত্যার বদলে হত্যা করবে, অথবা রক্ত মূল্য গ্রহণ করবে’।

(৫) বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,فَإنَّ دِمَاءَكُمْ وَأمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِيْ بَلَدِكُمْ هَذَا فِيْ شَهْرِكُمْ هَذَا ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের ইযযত পরস্পরের উপরে এমনভাবে হারাম, যেমন এই দিন, এই শহর ও এই মাস তোমাদের জন্য হারাম’।

(৬) খ্যাতনামা খৃষ্টান পন্ডিত ‘আদী বিন হাতেম যখন মদীনায় এসে ইসলাম কবুল করেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাকে বলেন, يَا عَدِيْ، هَلْ رَأَيْتَ الْحِيْرَةَ؟ فَإِنْ طَالَتْ بِكَ حَيَاةً فَلْتَرَيَنَّ الظَّعِيْنَةَ تَرْتَحِلُ مِنَ الْحِيْرَةِ حَتَّى تَطُوْفَ بِالْكَعْبَةِ لاَ تَخَافُ أَحَدًا إلاَّ اللهَ ‘আদী তুমি কি (ইরাকের সমৃদ্ধ শহর) হীরা দেখেছ? যদি তোমার জীবন দীর্ঘ হয়, তবে তুমি দেখবে যে, একজন পর্দানশীন মহিলা হীরা থেকে এসে কা‘বাগৃহ ত্বাওয়াফ করবে, অথচ সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করবে না...।

এতে বুঝা যায় যে, একমাত্র ইসলামী খেলাফতের অধীনেই রয়েছে মুসলিম-অমুসলিম সকল নাগরিকের জান-মাল ও ইযযতের গ্যারান্টি। অতএব ইসলামী জিহাদ-এর মূল উদ্দেশ্য হ’ল, মানুষকে শয়তানের দাসত্ব হ’তে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনা এবং সর্বত্র আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা। আর এর মধ্যেই রয়েছে মানবতার মুক্তি ও কল্যাণের স্থায়ী নিশ্চয়তা।

সুত্রঃ
[1]. দৈনিক আমার দেশ, ঢাকা ৬ আগষ্ট ২০০৭, পৃঃ ৭।
[2]. আবুল হাসান আলী নাদভী, মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো? ৩য় মুদ্রণ ২০০৪, পৃঃ ২৬৩।
[3]. দৈনিক আমার দেশ, ঢাকা ১৮ই মে ২০০৭, পৃঃ ৬।
[4]. ইত্তেফাক ২৫/২/০৮, ৭ম পৃঃ ৩-৪ ক।
[5]. আমার দেশ, ৪ঠা মার্চ ২০০৮ পৃঃ ৫/২-৫ কলাম।
[6]. The Bible, Numbers 31/17-18; The Bible, Deuteronomy 20/13-16.
[7]. বুখারী হা/৩১৬৬; মিশকাত হা/৩৪৫২।
[8]. বায়হাক্বী, আহমাদ হা/২৭২৮, হাসান লি গাইরিহী।
[9]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৭২৩।
[10]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৬৫৯।
[11]. বুখারী, মিশকাত হা/৫৮৫৭।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৫:২৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'মেটিকুলাসলি ডিজাইন' করে সিলেটকে অশান্ত করে তোলার অর্থ কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১৫

সিলেটে এন,সি,পি সাংগঠনিক ভাবে দূর্বল।
দলের ভিতরে কোন্দল মারাত্মক তা ফেসবুকে দলীয় নেতা কর্মীদের পোস্ট দেখে বুঝা যায়।
অথচ, সামনে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন।
এই পরিস্থিতিতে, দলের মানুষদের 'গরম' করে তোলার একটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২৮

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।
================================
ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। যে জাতি তার মানুষের কান্না, আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ভুলে যায়, সে জাতির ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আজ এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকস্বাধীনতা নাকি বাকসন্ত্রাস?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩২

বাকস্বাধীনতা নাকি বাকসন্ত্রাস?

বাকস্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাকস্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই বলা নয়; অন্যের সম্মান, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে উপেক্ষা করারও নাম নয়।

কোনো ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবার সমস্যা, ব্লগ আমাকে কেন ভোগাচ্ছে?

লিখেছেন মেহবুবা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

আবার সমস্যা ব্লগ ঠিকমত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে এমনটি হয়েছিল। ব্লগার সুলাইমান সহজ করে সমাধান বের করে দিয়েছিল। এবার একই সমস্যা হচ্ছে তবে সেই একই উপায়ে কাজ হচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ইরানের নতুন শত্রু হতে চলেছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৬


মরুভূমির গরম বাতাস আর লোহিত সাগরের নোনা জলীয় বাষ্প যেখানে এসে মেশে, বাব এল মানদেব প্রণালীর সেই জায়গাটায় রাতের অন্ধকার নামলেই একটা অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×