
হুমায়ূন আহমেদের একটা গল্প ছিল তাদের মাকে নিয়ে। তাঁর মেঝ ভাই জাফর ইকবাল তখন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে থাকেন। তাদের মা ছেলের কাছে বেড়াতে গিয়েছেন। বিকেলে তিনি একা একা হাঁটতে বের হন। অনেকটা সময় বাইরে হাঁটাহাঁটি করে সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরেন।
তাঁর ছেলে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, বিকেলে তিনি কোথায় হাঁটতে যান। তিনি বললেন, কাছেই সুন্দর একটা গোরস্থান আছে, সেখানে নির্জনে বসে তিনি মৃত মানুষদের জন্য দোয়া পাঠ করেন। শুনে জাফর ইকবাল বললেন, সেটা তো অন্য ধর্মাবলম্বীদের কবর, দোয়া কি তাদের কাজে লাগবে? মা বললেন, হোক অন্য ধর্মের, কিন্তু তাদেরও তো পরকাল আছে, অতএব দোয়া কাজে লাগবে। আমেরিকার কিছুই মায়ের পছন্দ নয়। তাঁর মনে হয়, দেশটাতে মানুষ বেশি নেই, সব জায়গা জনবিরল। শুধু সেই গোরস্থানটা তাঁর পছন্দের। আমেরিকানদের এই একটা বিষয় তাঁর ভালো লাগে - তারা গোরস্থানগুলো যত্ন করে রাখে, সেখানে নিয়মিত ফুল দেয়।
কৌতূহলী হয়ে জাফর ইকবাল আরেকটু ভালো করে গোরস্থানের বর্ণনা শুনে বুঝলেন যে, মা যেটাকে মানুষের কবরস্থান ভেবেছেন, সেটা আসলে একটা পোষা প্রাণীদের গোরস্থান বা পেট সিমেটারি। মানুষের পালিত কুকুর-বিড়াল মরে গেলে সেখানে পুঁতে রাখা হয়। এতদিন তিনি কুকুর-বিড়ালের জন্য দোয়া করেছেন এটা জানতে পেরে তাদের মা একেবারে কেঁদে ফেললেন; বললেন, "ফাজিল আমেরিকান!"
আমার গল্পটা এই গল্পটির মতো নয়; তবে ঘটনার শেষে এটার কথাই আমার মনে পড়েছিল। ঘটনাটা খুলেই বলা যাক।
ফেসবুক মার্কেটপ্লেস থেকে আমার স্ত্রী একটি গৃহস্থালি জিনিস কিনেছেন। আমি গিয়েছি সেটি নিয়ে আসতে। বিক্রেতার বাসা গাড়িতে কুড়ি মিনিটের পথ। তিনি জানিয়েছেন, চাইলে আমরা টাকা নগদে পরিশোধ করতে পারি, অথবা তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও পাঠাতে পারি। টাকার অঙ্ক বেশি নয়। ভাবলাম, ব্যাংক অ্যাপে ঢুকে টাইপ করার চেয়ে ক্যাশে পরিশোধ করাই সহজ। সেক্ষেত্রে আমাকে এটিএম থেকে আগে টাকাটা তুলতে হবে। গুগল ম্যাপে দেখলাম, বিক্রেতার বাড়ির কাছে আমার ব্যাংকের এটিএম আছে। গাড়ি চালিয়ে প্রথমে সেখানেই গেলাম।
কয়েকটি দোকান মিলে একটা বাজারের মতো জায়গা। একটা বড় মুদি দোকান, দুটি রেস্তোরাঁ, দাঁতের ডাক্তারের ক্লিনিক, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান - এরকম কতগুলো দোকান মিলে ছোট একটা বাজার। বলতে ভুলে গেছি, সেখানে একটা গাঁজার দোকানও ছিল। বাইরে থেকে দেখতে দোকানটা আলাদা কিছু নয়, তবে সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা, "ক্যানাবিস স্টোর"। আমি অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেও এটিএম খুঁজে পেলাম না। ফোন হাতে নিয়ে জিপিএস চালু করে হাঁটাহাঁটি করলাম, লাভ হলো না। অনেক সময় ছোট শহরগুলোতে মুদি দোকানের ভেতরে এটিএম থাকে। দোকানগুলো খুঁজে দেখলাম, সেখানেও এটিএম নেই। অগত্যা ক্যাশ টাকা না নিয়েই বিক্রেতার বাড়ির রাস্তা ধরলাম।
গিয়ে দেখি, বয়স্ক এক দম্পতি বাড়ির বাইরের উঠোনে জিনিসটি নিয়ে বসে আছেন।
বৃদ্ধা আমাকে দেখে বললেন, "তোমার স্ত্রীর মেসেজ পেয়েছি। দেখে নাও, জিনিসটা ঠিক আছে কি না।"
আমি বললাম, "জিনিসটা ঠিকই আছে। কিন্তু মুশকিল কী জানো, আমি তো টাকাই তুলতে পারিনি। তোমাদের এলাকার বাজারে এটিএম আছে বলে গুগল ম্যাপে দেখাচ্ছিল, কিন্তু সেটা আমি খুঁজেই পেলাম না। ব্যাংকের তথ্য দাও, আমি টাকাটা অনলাইনে পাঠিয়ে দিচ্ছি।"
বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, কোন ব্যাংকের এটিএম খুঁজেছি। সেটা জানাতেই তিনি বললেন, "সেই এটিএম আছে তো; সেটা ওই গাঁজার দোকানের ভেতরে। তুমি নিশ্চয়ই ভাবোনি যে গাঁজার দোকানের ভেতরে এটিএম বুথ থাকতে পারে, তাই না?"
তাদের নিজেদের রসিকতা শুনেই হোক, কিংবা আমার হতভম্ব চেহারা দেখেই হোক, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই প্রাণখুলে হেসে উঠলেন।
গাঁজার দোকানের ভেতরে এটিএম রাখার যৌক্তিকতা কী? নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানের ভেতরে এটিএম থাকলে কেউ হয়তো টাকা তুলে এক ডজন ডিম বা এক পাত্র দুধ কিনবেন, অথবা এক প্যাকেট বিস্কুট বা চিপস কিনবেন। এখন গাঁজার দোকানিরা কী ভেবেছে যে, তাদের দোকানের ভেতরে এটিএম থাকলে বাড়ি ফেরার পথে মানুষ এক প্যাকেট গাঁজা কিনে ঘরে ফিরবে? ফাজিল কানাডিয়ান!
এবার শোনা যাক সিরিয়াস কানাডিয়ানের গল্প।
কানাডার একজন ভদ্রমহিলা বেশ ভালো রাঁধুনি। তিনি বাসায় সরিষা-মুরগি রান্না করেছেন। তাঁর রান্না করা এই পদ বাড়িতে সবসময় হিট। স্বামী-সন্তানরা একেবারে চেটে-পুটে খেয়ে শেষ করে ফেলে। কিন্তু সেদিন হলো কী, তাঁর রান্না করা সুস্বাদু সরিষা-মুরগি কেউই খেল না, সবটাই পড়ে থাকল। তিনি মহাচিন্তায় পড়ে গেলেন। এতদিনের সুপারহিট রান্নার কী এমন হলো যে হঠাৎ এমন ফ্লপ করল? তিনি তো একই দোকান থেকে কেনা মুরগি, একই সরিষার সস - সবকিছু আগের মতোই ব্যবহার করেছেন। তাহলে ঘটনা কী?
তিনি ভেবে দেখলেন, একমাত্র পার্থক্য হলো নতুন কেনা সরিষার জারটা। বোতল খুলে একটু সরিষা চেখে দেখলেন - সরিষাটা খুবই ঝাল! সরিষার জারটা নতুন হলেও এই একই ব্র্যান্ডের সরিষা তিনি বহুদিন ধরে ব্যবহার করেন; কিন্তু এমন ঝাল আগে কখনো সরিষায় পাননি। তাহলে হঠাৎ করে সরিষাটা এত ঝাল হলো, রহস্য কী?
ঝালের রহস্য আবিষ্কারের জন্য সরিষার বোতলটা ব্যাগে নিয়ে প্রথমে তিনি টরন্টোর নামকরা একজন খাবারের স্বাদ পরীক্ষকের কাছে গেলেন। স্বাদ পরীক্ষকের কাজের কথা শুনলে আমাদের দেশের খাদকের কথা মনে পড়ে। তবে এই খাদক ভিন্ন ধরনের - তাঁর খাওয়াটা পরিমাণে নয়, গুণ বিচারে। কোনো রেস্তোরাঁ বা খাদ্যপণ্য উৎপাদন কোম্পানির বেচা-বিক্রি কমে গেলে তারা স্বাদ পরীক্ষকের কাছে যান, অন্য কোম্পানির বা রেস্তোরাঁর তুলনায় তাদের খাবার কেন মানুষ পছন্দ করছে না, সেটার কারণ জানতে।
স্বাদ পরীক্ষক ভদ্রমহিলার বোতলের সরিষার সাথে পুরনো বোতলের সরিষা খেয়ে দেখে বললেন," নতুন সরিষাটা প্রায় ১০ গুণ বেশি ঝাল; সেটা মুখে দিতেই যেন আগুন জ্বলে উঠল।" কিন্তু একই ব্র্যান্ডের এক সরিষার সাথে আরেক সরিষা কীভাবে ১০ গুণ বেশি ঝাল হতে পারে, সেটা তিনি ব্যাখ্যা করতে পারলেন না। বললেন, সরিষা নিয়ে বই লেখা একজন বিশেষজ্ঞকে তিনি চেনেন, তিনি চাইলে তাঁর সাথে দেখা করতে পারেন।
ভদ্রমহিলা এই সরিষা বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করে জানলেন, বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে স্বাদের মান বজায় রাখে এবং স্বাদে এত পার্থক্য হওয়ার কথা নয়। বোতলের গায়ে লেখা উৎপাদন কোড পরীক্ষা করে তিনি বের করলেন যে, নতুন জারের সরিষার বয়স অল্প কয়েক দিন মাত্র, তুলনায় পুরনোটা কয়েক মাস আগের সরিষা। তিনি জানালেন, "সরিষা যত তাজা হবে, ঝাল তত বেশি!"
কিন্তু শুধু সরিষাটা তাজা হওয়ার কারণে ঝাল এত বেশি - এই ব্যাখ্যাটা মহিলার মনে ধরল না। তিনি ঠিক করলেন, এই লাইনের আরও ওস্তাদদের সাথে যোগাযোগ করে এর কারণ অনুসন্ধান করবেন।
তিনি যোগাযোগ করলেন ফ্রান্সের বার্গান্ডির ঐতিহ্যবাহী সরিষা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সাথে। সব শুনে সেই ভদ্রলোক বললেন, সরিষা একটি জীবন্ত কৃষিপণ্য, তাই এক ফসল থেকে আরেক ফসলে তার স্বাদে পার্থক্য হতে পারে। কিন্তু সেই ফরাসি কোম্পানির সদ্য তৈরি সরিষা চেখে তিনি বুঝলেন যে, তাঁর বোতলের সরিষাটা শুধু তাজা হওয়ার জন্যই ঝাল নয়, এর অন্য কোন কারণ আছে।
এরপর ঝালের কারণ খুঁজতে সরিষার বীজ কোথা থেকে এসেছে তার অনুসন্ধান শুরু করলেন। কানাডা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরিষার বীজ রপ্তানিকারক দেশ, যার বড় অংশ উৎপাদিত হয় এখানকার সমতল, বিস্তীর্ণ তৃণভূমির প্রদেশগুলোতে। সরিষার বীজ নিয়ে গবেষণা করেন এমন লোকদের সাথে দেখা করে তিনি জানতে পারলেন, আমরা যেটাকে ঝাল বলি, তার বৈজ্ঞানিক কারণ গ্লুকোসিনোলেট নামের একটি প্রাকৃতিক যৌগ।
এরপর তিনি কানাডার কৃষি বিভাগের গবেষকদের সাথে যোগাযোগ করলেন, গ্লুকোসিনোলেট নামের যৌগটি কোন কারণে বাড়ে-কমে কী না, সেটা জানতে। গবেষকদের একটি দল দেখতে পেয়েছিলেন, বেশি গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় এই যৌগের মাত্রা বাড়ে। কানাডার প্রেইরি অঞ্চলে প্রায় পাঁচ বছর ধরে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া চলছে। গবেষকরা জানালেন, কানাডার সরিষার ফসলে ঝালের মাত্রায় "উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি" ঘটেছে। এই চরম আবহাওয়ার কারণেই সরিষার বীজ এমন ঝাল হয়ে উঠেছে।
সেই বোতলের অস্বাভাবিক ঝালের পেছনে পরিশেষ তিনি দুটি কারণ খুঁজে পেলেন: সরিষাটি ছিল খুবই তাজা, আর সেটি তৈরি হয়েছিল সাম্প্রতিক গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় জন্মানো ঝাল সরিষার বীজ থেকে।
কয়েকবার চেষ্টার পরে তাঁর বোতলজাত সরিষার উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার, ভদ্রমহিলার উদ্ঘাটিত ব্যাখ্যাটি নিশ্চিত করলেন। তারা জানালেন, একদিকে খুব বেশি তাজা সরিষা, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরম ও শুষ্ক হয়ে ওঠা কানাডার প্রেইরিতে জন্মানো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝাল সরিষার বীজ - এই ছিল প্রচণ্ড ঝাল সরিষার রহস্য।
ভদ্রমহিলা বুঝলেন, তাঁর রান্নায় কোনো ভুল ছিল না; এর পেছনে ছিল একটি জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





