ডুমেলা বতসোয়ানা-৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
বতসোয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখে স্থাপিত গরুর ভাস্কর্য
আগের গুলো পড়তে চাইলেডুমেলা বতসোয়ানা
আবারও জনস্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে বহির্গমন লাউঞ্জে এসে পৌঁছুলাম। এবার দেখি আসল হ্যাপা। এই এয়ারপোর্টে অনেকগুলো প্রবেশ পথ আছে নিশ্চয়ই। আমার মনে হলো চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে ইমিগ্রেশনে জড়ো হয়েছে। পাসপোর্ট ভিসা হাতে নিয়ে মানুষজন লাইনে দাঁড়াচ্ছে। আমার তেমন তাড়া নেই। আমার হাতে আরও ৮ ঘন্টা সময় আছে। আমি এই দীর্ঘ লাইনের পেছনে দাঁড়ালে নির্ঘাৎ দুই ঘন্টা সময় ব্যয় হবে। তারচেয়ে লাইনে দাড়িয়ে না থেকে বরং এয়ারপোর্টটা ঘুরে ঘুরে দেখি। লাইনে না দাঁড়িয়ে বিপরীত দিক দিয়ে আবার বের হলাম। সামনের দিকে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে একসময় দেখি একটি গোল চত্ত্বরে ছেলে মেয়ে সবাই কফি খাচ্ছে কিংবা ধূমপান করছে। উপরে স্মোকিং জোন লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। এই জোনের ভিতরে ছেলে বুড়ো সবাই ধূমপান করছে। কি সুন্দর সুন্দর স্মার্ট মেয়েগুলো অবলীলায় ধূমপান করছে। আপাদমস্তক বোরখায় আবৃত কয়েকজন ইরানী মেয়েকে দেখলাম ধূমপান করতে।
আমারও একটু ধূমপানের তেষ্টা পেতে লাগল। তার আগে একটু চা বা কফি হলে মন্দ হয় না। চা যে পাবো সেই ভরসা ছিল না। স্মোকিং জোনের দিকে এগিয়ে যাই। একটি মিনি টাকশপ বলা যায় স্মোকিং জোনটিকে। নানান ধরনের হালকা খাবার আছে। বার্গার, স্যান্ডউইচ, সমুচা, পিজা, হরেক রকমের বিস্কুট। এছাড়াও পানীয় হিসেবে বিভিন্ন ক্যান আছে। আমাদের পরিচিত কোক পেপসি ফান্টা জাতীয় ক্যান দেখলাম না। সব অপরিচিত ঠেকছে। একটি বিশাল আয়তনের কফি মেশিন বসানো। বিভিন্ন নামের এবং রঙের কফির বাহার। তালিকা চেয়ে দেখলাম সবচেয়ে কমদামের যে কফি সেটিও ৮ ডলার। এটি তো আর ঢাকার ফুটপাথ না যে ৩ টাকায় চা খেতে পাবো। আর জীবন কি সবসময় হিসেব করে চলে। তাই ৮ ডলার দিয়ে কফি নিয়ে পরমানন্দে চুমুক দিলাম। ভেবেছিলাম একটা তিঁতকুটে মিষ্টি স্বাদ জিভে লাগবে। ওমা এতা দেখি বিষ তিতা। গন্ধটাও আমাদের পরিচিত কফির ধারে কাছেও নয়। অনেকেই এই বিষ তিতা অবলীলায় পান করছে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি এই কফি গলধঃকরণ করে আমাকে ছাড়া কারও চোখ-মুখ কুঁচকে যাচ্ছে না।
চুপি চুপি টেবিলে কফির গ্লাসটা রেখে কেটে পড়বো কিনা ভাবছি। এমন সময় কাউন্টারে তাকিয়ে দেখি এক লোক কাউন্টারের পেছনে বাক্স থেকে চিনি এবং ছোট ছোট দুধের প্যাকেট সরবরাহ করছে। দুই একজন তা চেয়ে নিচ্ছে। আগে দাম পরিশোধ করে কফির টোকেন নিয়েছি। দুধ-চিনির তো টোকেন নেইনি। এগুলোর জন্য আবার আলাদা পয়সা দিতে হয় কিনা কে জানে! ৮ ডলার মূল্যের কফিটিকে একেবারে ফেলে না দিয়ে আরও দুয়েক ডলার যায় যাবে- ভেবে সরবরাহকারীর কাছে এগিয়ে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে বিনা পয়সায় একটি চিনির প্যাকেট এবং একটি দুধের প্যাকেট এগিয়ে দিল। দুধ চিনি মিশিয়ে কফিটিকে আরও বিস্বাদ লেগেছিল। লাভের মধ্যে এটিই হয়েছিল পরবর্তী ৮ ঘন্টা আমার আর কোন ক্ষুধা লাগেনি।
এই করে ঘন্টাখানেক সময় কাটালাম। অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার ইমিগ্রেশনের দিকে এগুচ্ছি। ভিড় কিছুটা হালকা হয়েছে। তারপরও লাইনে দাঁড়ালে একঘন্টা ব্যয় হবে। এটিই মূল বহির্গমন পথ। সুতরাং আর কোথাও ঘুরাঘুরি না করে এখানেই অবস্থান করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভেবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বিশাল জায়গা জুড়ে লম্বা লম্বা দৃষ্টি নন্দন বেঞ্চ বসানো। অধিকতর ক্লান্ত যাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। একেকটি প্লেন নামে আর মানুষের আগমন শুরু হয়। ইমিগ্রেশনের লাউঞ্জটি ভরে যায়। কেউ কেউ বেঞ্চিতে এসে বসে। কেউ কেউ আবার উঠে যায়। আমি এরকম একটি নির্জন এবং ফাঁকা দেখে বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। চারিদিক তাকিয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষ দেখছি। আমার কাজই যেন হচ্ছে দু'চোখের ক্যামেরা দিয়ে সবার ছবি তোলা। একেবারে পূর্ণ ভিডিওগ্রাফী যাকে বলে।
চারদিক নজর বুলাচ্ছি। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার আমার এত তাড়া নেই। হাতে আরও ৭ ঘন্টা সময় আছে। আস্তে ধীরে ইমিগ্রেশন পার হবো। এখন কাজ হচ্ছে বেঞ্চে বসে থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষগুলোকে দেখা। এক জীবনে আবার কখনো এই এয়ারপোর্টে আসা হয় কীনা কে জানে! একটি জুটি দেখলাম। সাথে ফুটফুটে একটি বাচ্চা। প্যারাম্বুলেটরে বসানো বাচ্চটিকে ঠেলে ঠেলে ইমিগ্রেশনের দিকে এগুচ্ছে। স্রেফ কৌতুহল বশতঃ জুটিটিকে আমার মনে গেঁথে গেল। কোন দেশ থেকে এসেছে আর কোথায়ই বা যাবে কে জানে! কিন্তু তারপরও আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল এই জুটিটির সাথে আবার আমার দেখা হবে। জুটিটি ইমিগ্রেশনের ভিড়ে একসময় হারিয়ে গেল।
চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছি। জুতো মোজা খুলে আয়েশ করে বসবো কিনা ভাবছি। এটা আবার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের শালীনতার বাইরে চলে যায় কীনা! বেঞ্চে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা লোকজনের দিকে তাকালাম। কেউ কেউ জুতো খুলে আয়েশ করে বসে আছে। কেউ আবার সমস্ত মালপত্র এক জায়গায় জড়ো করে পুরো বেঞ্চ দখল করে আধ শোয়া হয়ে আছে। কোন কোন পরিবারের সাথে আসা চঞ্চল বাচ্চারা ছুটোছুটি খেলছে। আমার বেঞ্চের অপর প্রান্তে দুজন লোক বসা। ওরা এতক্ষণ কি যেন কাগজপত্র গুছিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে গেল। ইমিগ্রেশনের দিকে এগুচ্ছে। এই ফাঁকে পুরো বেঞ্চটা দখল করে নিলাম। আয়েশ করে আধ শোয়া হয়ে বেঞ্চের উপর পা ছড়িয়ে দিলাম। একসময় ল্যাপটপের ব্যাগটা মাথার নিচে দিয়ে বালিশ বানিয়ে পুরো বেঞ্চেই পা ছড়িয়ে দিলাম। আহ কি শান্তি! দীর্ঘ প্রায় ২০ ঘন্টা পর পিঠ ঠেকানোর সুযোগ পেলাম।
এই ভ্রমণের অবসান কখন হবে ভাবছি। আগামীকাল সকাল ১০ টায় দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে অ্যামিরেটস এর ফ্লাইট সাউথ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে। সন্ধ্যা ৬ টায় গিয়ে জোহানেসবার্গ এয়ারপোর্টে পৌঁছুবে বলে আমার টিকেটের গায়ে লেখা আছে। সাড়ে ছয়টায় সাউথ আফ্রিকান এয়ারলাইন্সে করে বতসোয়ানা গমন। সুতরাং আজ রাতটা কোনমতে কাটিয়ে দিতে পারলে আগামীকাল রাতে বতসোয়ানা পৌঁছার আশা রাখি। নানান ভাবনা এসে মনে ভীড় করছে। বতসোয়ানা গিয়ে প্রথমে কোথায় উঠবো তার কোন ব্যবস্থা করিনি। ভরসা বন্ধু ফজলু। তবে ও থাকে রাজধানী গ্যাবরন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে মোলেপোলেলে নামক ভিলেজে। আমাকে থাকতে হবে গ্যাবরন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টা যে গ্যাবরনেই।
শুয়ে শুয়ে নানান রঙের মানুষ দেখতে দেখতে আর নানান বিষয় ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি মতো এসে গেল। ঝিমুনি ভাব থেকে একসময় ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে আসল। সারাদিন অফিস করে শেষ মুহূর্তে ছুটি অনুমোদন করিয়ে সেই যে প্লেনে চড়েছি তারপর থেকে আর বিশ্রাম নেই। প্রায় ২০ ঘন্টা একটানা বিশ্রামহীন অবস্থা। প্লেনে চোখ জোড়া একত্র করতে পারি নি। একসময় মনে হয় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি বাহ্! ইমিগ্রেশন একদম ফকফকা। সবাই বেরিয়ে গেছে। দু’চারজন কাউন্টারের আশেপাশে ঘুর ঘুর করছে। এরা ইমিগ্রেশনের লোক বলে মনে হলো। অনেকের মাথায় আরবীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী পাগড়ি। আমি চোখ মুখ কচলে হাই তুলতে তুলতে কাউন্টারের দিকে এগোই। এখান থেকেই আমার দ্বিতীয় পর্যায়ের দুর্ভোগের শুরু হলো।
চলবে...
(আগামী পর্বে বতসোয়ানায় আমার প্রথম দিন)
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
আমরা জানিনা কেমন আছি

"আমি কেমন আছি জানতে চাইলে না, তুমি কেমন আছো আমিও—
তুমিও হতে চাইলে না জুলিয়েট, আমিও হলাম না রোমিও।
তুমি সরে গেলে লিফট ধরে, আমি খুঁজছিলাম সিঁড়িটা—
তখনও হয়নি চেনা কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন
খালাশ

জোর জবরদস্তি,
উঠিত লিঙ্গের দুই মিনিটের সুখ
তারপর ???
গরম, মাথা গরম।
কোপ, কল্লা মাথা আলাদা,
শেষ, নিথর নিশ্চুপ দেহ,
খণ্ডিত ছিন্নভিন্ন।
লাল রক্ত কালচে হওয়ার আগেই... ...বাকিটুকু পড়ুন
রাষ্ট্র কেন রামিসাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে যে গভীর ও দমবন্ধ করা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কোনো কাল্পনিক ভীতি বা বিচ্ছিন্ন অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন
এ দেশে ন্যায় বিচার!? = ডাইনোসরের দুধ.. /#) :#| :-ls ।
আমরা বাঙালি বা বাংলাদেশীরা আজীবনই লোভী, স্বার্থপর.. প্রতিবারই কোন না কোন একটা জঘন্য ঘটনা ঘটে সারা দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে বিচারের দাবিতে.. কিছুদিন পর অন্য কোন একটা ঘটনায় আগের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাদ্রাসার শিশু আবদুল্লাহর হত্যার বিচার কি হবে?

একটা ১০ বছরের বাচ্চা, যে মাত্র একদিন আগে ফোনে মায়ের কাছে ২৫০ টাকার চকলেট খাওয়ার আবদার করেছিল, সে হুট করে বাথরুমের ভেণ্টলেটরে ঝুলে আত্মহত্যা করতে পারে এই গল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।