somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডুমেলা বতসোয়ানা-৫

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বতসোয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখে স্থাপিত গরুর ভাস্কর্য
আগের গুলো পড়তে চাইলেডুমেলা বতসোয়ানা

আবারও জনস্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে বহির্গমন লাউঞ্জে এসে পৌঁছুলাম। এবার দেখি আসল হ্যাপা। এই এয়ারপোর্টে অনেকগুলো প্রবেশ পথ আছে নিশ্চয়ই। আমার মনে হলো চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে ইমিগ্রেশনে জড়ো হয়েছে। পাসপোর্ট ভিসা হাতে নিয়ে মানুষজন লাইনে দাঁড়াচ্ছে। আমার তেমন তাড়া নেই। আমার হাতে আরও ৮ ঘন্টা সময় আছে। আমি এই দীর্ঘ লাইনের পেছনে দাঁড়ালে নির্ঘাৎ দুই ঘন্টা সময় ব্যয় হবে। তারচেয়ে লাইনে দাড়িয়ে না থেকে বরং এয়ারপোর্টটা ঘুরে ঘুরে দেখি। লাইনে না দাঁড়িয়ে বিপরীত দিক দিয়ে আবার বের হলাম। সামনের দিকে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে একসময় দেখি একটি গোল চত্ত্বরে ছেলে মেয়ে সবাই কফি খাচ্ছে কিংবা ধূমপান করছে। উপরে স্মোকিং জোন লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। এই জোনের ভিতরে ছেলে বুড়ো সবাই ধূমপান করছে। কি সুন্দর সুন্দর স্মার্ট মেয়েগুলো অবলীলায় ধূমপান করছে। আপাদমস্তক বোরখায় আবৃত কয়েকজন ইরানী মেয়েকে দেখলাম ধূমপান করতে।

আমারও একটু ধূমপানের তেষ্টা পেতে লাগল। তার আগে একটু চা বা কফি হলে মন্দ হয় না। চা যে পাবো সেই ভরসা ছিল না। স্মোকিং জোনের দিকে এগিয়ে যাই। একটি মিনি টাকশপ বলা যায় স্মোকিং জোনটিকে। নানান ধরনের হালকা খাবার আছে। বার্গার, স্যান্ডউইচ, সমুচা, পিজা, হরেক রকমের বিস্কুট। এছাড়াও পানীয় হিসেবে বিভিন্ন ক্যান আছে। আমাদের পরিচিত কোক পেপসি ফান্টা জাতীয় ক্যান দেখলাম না। সব অপরিচিত ঠেকছে। একটি বিশাল আয়তনের কফি মেশিন বসানো। বিভিন্ন নামের এবং রঙের কফির বাহার। তালিকা চেয়ে দেখলাম সবচেয়ে কমদামের যে কফি সেটিও ৮ ডলার। এটি তো আর ঢাকার ফুটপাথ না যে ৩ টাকায় চা খেতে পাবো। আর জীবন কি সবসময় হিসেব করে চলে। তাই ৮ ডলার দিয়ে কফি নিয়ে পরমানন্দে চুমুক দিলাম। ভেবেছিলাম একটা তিঁতকুটে মিষ্টি স্বাদ জিভে লাগবে। ওমা এতা দেখি বিষ তিতা। গন্ধটাও আমাদের পরিচিত কফির ধারে কাছেও নয়। অনেকেই এই বিষ তিতা অবলীলায় পান করছে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি এই কফি গলধঃকরণ করে আমাকে ছাড়া কারও চোখ-মুখ কুঁচকে যাচ্ছে না।

চুপি চুপি টেবিলে কফির গ্লাসটা রেখে কেটে পড়বো কিনা ভাবছি। এমন সময় কাউন্টারে তাকিয়ে দেখি এক লোক কাউন্টারের পেছনে বাক্স থেকে চিনি এবং ছোট ছোট দুধের প্যাকেট সরবরাহ করছে। দুই একজন তা চেয়ে নিচ্ছে। আগে দাম পরিশোধ করে কফির টোকেন নিয়েছি। দুধ-চিনির তো টোকেন নেইনি। এগুলোর জন্য আবার আলাদা পয়সা দিতে হয় কিনা কে জানে! ৮ ডলার মূল্যের কফিটিকে একেবারে ফেলে না দিয়ে আরও দুয়েক ডলার যায় যাবে- ভেবে সরবরাহকারীর কাছে এগিয়ে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে বিনা পয়সায় একটি চিনির প্যাকেট এবং একটি দুধের প্যাকেট এগিয়ে দিল। দুধ চিনি মিশিয়ে কফিটিকে আরও বিস্বাদ লেগেছিল। লাভের মধ্যে এটিই হয়েছিল পরবর্তী ৮ ঘন্টা আমার আর কোন ক্ষুধা লাগেনি।

এই করে ঘন্টাখানেক সময় কাটালাম। অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার ইমিগ্রেশনের দিকে এগুচ্ছি। ভিড় কিছুটা হালকা হয়েছে। তারপরও লাইনে দাঁড়ালে একঘন্টা ব্যয় হবে। এটিই মূল বহির্গমন পথ। সুতরাং আর কোথাও ঘুরাঘুরি না করে এখানেই অবস্থান করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভেবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বিশাল জায়গা জুড়ে লম্বা লম্বা দৃষ্টি নন্দন বেঞ্চ বসানো। অধিকতর ক্লান্ত যাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। একেকটি প্লেন নামে আর মানুষের আগমন শুরু হয়। ইমিগ্রেশনের লাউঞ্জটি ভরে যায়। কেউ কেউ বেঞ্চিতে এসে বসে। কেউ কেউ আবার উঠে যায়। আমি এরকম একটি নির্জন এবং ফাঁকা দেখে বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। চারিদিক তাকিয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষ দেখছি। আমার কাজই যেন হচ্ছে দু'চোখের ক্যামেরা দিয়ে সবার ছবি তোলা। একেবারে পূর্ণ ভিডিওগ্রাফী যাকে বলে।

চারদিক নজর বুলাচ্ছি। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার আমার এত তাড়া নেই। হাতে আরও ৭ ঘন্টা সময় আছে। আস্তে ধীরে ইমিগ্রেশন পার হবো। এখন কাজ হচ্ছে বেঞ্চে বসে থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষগুলোকে দেখা। এক জীবনে আবার কখনো এই এয়ারপোর্টে আসা হয় কীনা কে জানে! একটি জুটি দেখলাম। সাথে ফুটফুটে একটি বাচ্চা। প্যারাম্বুলেটরে বসানো বাচ্চটিকে ঠেলে ঠেলে ইমিগ্রেশনের দিকে এগুচ্ছে। স্রেফ কৌতুহল বশতঃ জুটিটিকে আমার মনে গেঁথে গেল। কোন দেশ থেকে এসেছে আর কোথায়ই বা যাবে কে জানে! কিন্তু তারপরও আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল এই জুটিটির সাথে আবার আমার দেখা হবে। জুটিটি ইমিগ্রেশনের ভিড়ে একসময় হারিয়ে গেল।

চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছি। জুতো মোজা খুলে আয়েশ করে বসবো কিনা ভাবছি। এটা আবার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের শালীনতার বাইরে চলে যায় কীনা! বেঞ্চে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা লোকজনের দিকে তাকালাম। কেউ কেউ জুতো খুলে আয়েশ করে বসে আছে। কেউ আবার সমস্ত মালপত্র এক জায়গায় জড়ো করে পুরো বেঞ্চ দখল করে আধ শোয়া হয়ে আছে। কোন কোন পরিবারের সাথে আসা চঞ্চল বাচ্চারা ছুটোছুটি খেলছে। আমার বেঞ্চের অপর প্রান্তে দুজন লোক বসা। ওরা এতক্ষণ কি যেন কাগজপত্র গুছিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে গেল। ইমিগ্রেশনের দিকে এগুচ্ছে। এই ফাঁকে পুরো বেঞ্চটা দখল করে নিলাম। আয়েশ করে আধ শোয়া হয়ে বেঞ্চের উপর পা ছড়িয়ে দিলাম। একসময় ল্যাপটপের ব্যাগটা মাথার নিচে দিয়ে বালিশ বানিয়ে পুরো বেঞ্চেই পা ছড়িয়ে দিলাম। আহ কি শান্তি! দীর্ঘ প্রায় ২০ ঘন্টা পর পিঠ ঠেকানোর সুযোগ পেলাম।

এই ভ্রমণের অবসান কখন হবে ভাবছি। আগামীকাল সকাল ১০ টায় দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে অ্যামিরেটস এর ফ্লাইট সাউথ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে। সন্ধ্যা ৬ টায় গিয়ে জোহানেসবার্গ এয়ারপোর্টে পৌঁছুবে বলে আমার টিকেটের গায়ে লেখা আছে। সাড়ে ছয়টায় সাউথ আফ্রিকান এয়ারলাইন্সে করে বতসোয়ানা গমন। সুতরাং আজ রাতটা কোনমতে কাটিয়ে দিতে পারলে আগামীকাল রাতে বতসোয়ানা পৌঁছার আশা রাখি। নানান ভাবনা এসে মনে ভীড় করছে। বতসোয়ানা গিয়ে প্রথমে কোথায় উঠবো তার কোন ব্যবস্থা করিনি। ভরসা বন্ধু ফজলু। তবে ও থাকে রাজধানী গ্যাবরন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে মোলেপোলেলে নামক ভিলেজে। আমাকে থাকতে হবে গ্যাবরন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টা যে গ্যাবরনেই।

শুয়ে শুয়ে নানান রঙের মানুষ দেখতে দেখতে আর নানান বিষয় ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি মতো এসে গেল। ঝিমুনি ভাব থেকে একসময় ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে আসল। সারাদিন অফিস করে শেষ মুহূর্তে ছুটি অনুমোদন করিয়ে সেই যে প্লেনে চড়েছি তারপর থেকে আর বিশ্রাম নেই। প্রায় ২০ ঘন্টা একটানা বিশ্রামহীন অবস্থা। প্লেনে চোখ জোড়া একত্র করতে পারি নি। একসময় মনে হয় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি বাহ্! ইমিগ্রেশন একদম ফকফকা। সবাই বেরিয়ে গেছে। দু’চারজন কাউন্টারের আশেপাশে ঘুর ঘুর করছে। এরা ইমিগ্রেশনের লোক বলে মনে হলো। অনেকের মাথায় আরবীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী পাগড়ি। আমি চোখ মুখ কচলে হাই তুলতে তুলতে কাউন্টারের দিকে এগোই। এখান থেকেই আমার দ্বিতীয় পর্যায়ের দুর্ভোগের শুরু হলো।

চলবে...
(আগামী পর্বে বতসোয়ানায় আমার প্রথম দিন)
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=এলোরে ঐ রহমতের মাস=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৫০


রহমতের মাস চলে এলো,
নেকি করো হাসিল এবার;
দানের হাত বাড়িয়ে-করো
সাধ্য মত চেষ্টা দেবার।

পরনিন্দা করো নাকো;
গীবত হতে দূরে থাকো;
মন ক্যানভাসে আল্লাহর নাম
দিবানিশি নীরব আঁকো।

নামাজ পড়ো পাঁচ ওয়াক্ত;
সকল সময় বলো সত্য,
ভালো কর্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহিয়সী

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০২



প্রেসক্লাবের সামনে এক মেয়ে চিৎকার করে উঠলো,
আমি এক মহিয়সী কন্যা।
দুষ্টলোকেরা আমাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো!
প্রিয় নগরবাসী, আমার দিকে তাকান, আমার কথা শুনুন।
আমার বাবা আমায় এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের যৌনজীবন নিয়ে আপনার এত আগ্রহ কেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০৬


স্টিফেন হকিং একবার বলেছিলেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো নারীর মন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করলে নিশ্চিতভাবে বলতেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো বাঙালির মস্তিষ্ক — যেটি যেকোনো খবর,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র এ মাহে রমজানের শপথ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:৫৩


মানবকুল জাগ আজ, রমজানের চাঁদ ডাকে আকাশপানে
হৃদয়ে তোমাদের আগুন জ্বাল,দয়া আর প্রেমের গানে
ক্ষুধার জ্বালা বুকে নিয়ে বুঝ আজ গরিবের বেদনা
অপরের অশ্রু মুছাতেই লুকায় রবের সাধনা।

সিয়ামের আগুনে পোড়াক প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোনাল্ড ট্রাম্প শুভেচ্ছা জানালেন নাকি ডিলের কথা মনে করিয়ে দিলেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৩


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠির বাংলা

হোয়াইট হাউস
ওয়াশিংটন
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মহামান্য তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
ঢাকা।

প্রিয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আমেরিকান জনগণের পক্ষ থেকে আমি আপনার ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়লাভের জন্য অভিনন্দন জানাই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×