২.
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের পাশ ঘেঁষেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এর ঘন সবুজ আরণ্যক প্রকৃতির মুখোমুখি হয়েছি শত শত বার। গুচ্ছ গুচ্ছ অনেক ভাবনায় নিজের মধ্যে ডুব দিয়েছি তখন। দুঃখ, হতাশা, ব্যর্থতা অথবা সুখ, আনন্দ, উচ্ছ্বাস প্রভৃতি অনুভূতির মাঝে ডুবে থেকেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। মস্তিস্কের কোষগুলো ছুঁয়ে প্রবাহিত পদ্মার ঢেউ যেন বয়ে গেছে তখন এমন সব আরণ্যক নীরবতার মাঝে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান Ñ আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি বনভূমি। বছরের পর বছর ধরে দুর্লভ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীবৈচিত্র্য নিয়েই এই বনটির ঐতিহ্য। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বনায়ন করে এখানে। ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৭৪০ হেক্টর আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের আওতাধীন মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই ন্যাশনাল পার্কটি।
৩.
এখন প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি লাউয়াছড়া। সংঘবদ্ধ বনদস্যুর হাতে শেষ হয়ে গেছে আমাদের দেশের এই মহামূলবান বনজ সম্পদ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন রক্ষায় বনবিভাগের সাথে নিয়োজিত ‘আইপ্যাক’ ও ‘বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ’ এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদ রয়েছে ওই সব সংঘবদ্ধ গাছচোর সাথে। এরাই রাতে পর রাত ধরে লুটেপুটে খেয়েছে, খাচ্ছে আমাদের জাতীয় এই উদ্যানটিকে। যে সব বৃক্ষগুলো এখনও কাটা পড়েনি চোরদের হাতে Ñ তারাও তাদের প্রিয় বন্ধুদের কথা অর্থাৎ গাছ চোরদের হাতে নিহত বন্ধুদের কথা স্মরণ করে ব্যথিত হয় Ñ কাঁদে।... ভাগ্যক্রমে হয়তো বেঁচে যাবে পাকা রাস্তার দু’ ধারের গাছগুলো। কিন্তু বনের ভেতরের মূল্যবান গাছগুলো প্রায় শেষের পথে। লাউয়াছড়ার বিশাল অভয়ারন্যের বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং বন্যপ্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। আর যে কয়টি বন্যপ্রাণী ও বৃক্ষগুলো এখনও টিকে রয়েছে তাও হুমকির সম্মুক্ষীন। গভীর বনের ভেতর পড়ে আছে শত শত মোথা ও সদ্য কাটা গাছের ছাল-বাকল। শত শত বৃক্ষগুলোর কান্না আর উৎকণ্ঠা আহত করেছে তখন আমাকে। গত ২ জুলাই ২০১১, শনিবার প্রায় ৩ ঘন্টা দুর্গম বনের ভেতর ঘুরে নিজ চোখে পড়ে থাকা গাছের মোথা আর ছাল-বাকল দেখলাম। লাউয়াছড়া ধ্বংসের সংশয় গভীরভাবে প্রকাশ পেল মনে।
৪.
লাউয়াছড়াকে বরাবরই আমি তুলনা করি ‘বনদেবী’ সাথে। সবুজ বনভূমির পরতে পরতে ছড়ানো রয়েছে প্রকৃতিময় বনদেবী অকৃপণ স্নেহাশীষ। সৌষ্ঠব্য শরীরিক সৌন্দর্যের কাল্পনিক সেই বনদেবী যেন আশীর্বাদস্বরূপ প্রতিটি বৃষ্টি ফোঁটার দানা। লাউয়াছড়ার শরীর জুড়ে ঘন বৃষ্টির অসংখ্য ফোঁটা নামে। বাতাসের পাখায় ভর করে বৃষ্টিরা এসে শুদ্ধ করে আগত পর্যটকদের। বর্ষা মৌসুমটি তাই লাউয়াছড়াকে জলজ আভায় দেখার বিরল দৃশ্যপট। এমন বৃষ্টিতে বহুবার মাখামাখি হয়েছি আমি। সতেজ এক চমকানোভূতি! ভেজা ভেজা শীতল অনুভব।...এমন পরিবেশে কল্পনার পাখায় ভর করে পৌঁছে গেছি তার কাছে।... যার জন্য আমার হৃদয়ের ব্যাকুলতার কোনো শেষ নেই।... তার কোমল গালে ভেজা অনুভূতির সতেজ পরশগুলো তখন ভাগাভাগির অনুপ্রেরণা।... আবগঘন স্বর্গীয় প্রেমময় পরিবেশ।... বৃষ্টিমুখর ও বাতাসময় প্রাকৃতিক পরিবেশ স্বাগত জানায় প্রিয়াকে সাথে নিয়ে বৃষ্টিভেজা হতে বারবার। বৃক্ষের ঘন সবুজ পাতা ছুঁয়ে শীতল জলজ রাশি টুপ-টাপ করে রাঙিয়ে আমাদের।... কখনো কখনো বিষন্ন মনে আহত হয়ে গেছি লাউয়াছড়ার মাঝে। সতেজ, সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছি কাজে। অনেক জমানো ব্যথা দূর করেছি লাউয়াছড়ার কাছে গিয়ে। শুধু বর্ষার অপরূপ সৌন্দর্যই নয়। শীত-বসন্তসহ বিভিন্ন ঋতুতেই স্নিগ্ধ লাউয়াছড়া সর্বদা যেন প্রস্তুত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানাতে। প্রকৃতির চারপাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিষ্পাপ শত-সহস্র বৃক্ষ আর লতাগুল্ম আমার বিশ্বস্ত বন্ধুর দল।
৫.
সময় পেলেই ছুটে যাই লাউয়াছড়ায়। পশুপাখী, বৃক্ষ ও লতাগুল্মের সাথে সময় ভাগাভাগি করি নীরবে। আমার কত শত স্মৃতি রয়েছে এই শ্যামলিমা লাউয়াছড়াকে নিয়ে। তবে আমাদের চরম দুর্ভাগ্য, লাউয়াছড়া আর আগের মত তন্বী-রূপসী নেই। লাবন্যপ্রভায় তাকে আর ডাকা যাবে না। তার লাবন্যকে, রূপযৌবনকে ধ্বংস করা হয়েছে। তার অপূর্ব আরণ্যক সৌন্দর্যের শ্লীলতাহানি ঘটানো হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে শত শত সংঘবদ্ধ দাঁতল দানব এসে ছিঁড়ে খেয়েছে লাউয়াছড়া শারীরিক তুলতুলে সুষমাকে। একবার-দু’বার নয় Ñ অসংখ্যবার। সে এখন রিক্ত, শূন্য এবং এক মৃত্যুপথযাত্রী।... আমি এখন শুধু লাউয়াছড়ার বিরামহীন কান্না শুনতে পাই।... সে ক্রন্দন ধ্বনি আমার চেতনা নাড়া দেয় গভীর করে। অসংখ্যবার।...
নির্জনতার মাঝে এমন বিষন্ন, গুমোট কান্না কী আমাদের আগামীর প্রকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস? তাই যদি হয়ে থাকে Ñ তবে লাউয়াছড়াকে বাঁচায়ে এ দুর্যোগ ঠেকাবে কে? কারা?
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০১১ সকাল ৯:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


