
সামহোয়্যারইন ব্লগের পরিবেশ আলোচনার জন্য আনন্দদায়ক হয়ে উঠেছে।সহব্লগারদের সহনশীল আচরণ সত্যি প্রশংসনীয়।আজ ব্লগে আমি প্রথম পোস্ট প্রকাশ করছি।
অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞান আর বিশ্বাস বিপরীত মেরুর বস্তু।তা কি আসলেই ঠিক?বিজ্ঞানের সবকিছুরই কি প্রমাণ আছে?আসলে তা নয়।বিজ্ঞানের মূলভিত্তি বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আমি আমি আজ হাজির হয়েছি।চলুন শুরু করা যাক।
বিজ্ঞান মানবজীবনের উৎকর্ষতার অন্যতম এক হাতিয়ার।তবে এই বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পথ মোটেও কুষুমাস্তীর্ণ ছিলো না। মানব ইতিহাসে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সবচেয়ে বড় বাধার সম্মুখীন হয়েছিলো ৩০০ থেকে ৪০০ খ্রিষ্টাব্দের কনস্টানটিন কর্তৃক মডিফাইড হাইব্রিড রোমান ক্যাথলিক ধর্মের কাছে।কনস্টানটিন এই হাইব্রিডাইজেশন করেছিলেন একেশ্বরবাদী খ্রিষ্টান এবং প্যাগান ধর্মের মধ্যে।এর কারণ ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক , রোমান সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করা।পাঠকদের সাথে একটি মজার বিষয় শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না।খ্রিষ্টানরা চার্চে যায় সানডেতে বা রবিবারে।আবার খেয়াল করুন,রবিবার।খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে রবি বা সূর্যের কি কোনো সম্পর্ক আছে?না নাই।এ নামকরণ করা হয়েছিলো কনস্টানটিন এর সময় প্যাগানদের সূর্যদেবের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য।যাই হোক,এ বিষয়ে রেফারেন্স সহ বিস্তারিত তথ্য পাবেন ড্যান ব্রাউন এর দ্যা ভিঞ্চি কোড উপন্যাস এ ।
রোমান চার্চের সাথে বিজ্ঞানী মহলের দ্বন্দ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এবং একেশ্বরবাদী খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী নিউটনের সময়।এসময় যে রেনেসা আন্দোলন সংঘটিত হয়,তার ফলে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা আর চার্চের হাতে থাকে না।
এ সময় আস্তিক নাস্তিক সকল বিজ্ঞানী সংগঠিত হন ।যেহেতু চার্চ নাই,তাই বাইবেল ও নাই।তাই নতুন সমাজের মূলদর্শন নেয়ার জন্য দৃশ্যমান জগৎ বা প্রকৃতিকে নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহকতায় সেক্যুলারিজম ভিত্তিক রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা তৈরী হতে থাকে।সেই সময় থেকে ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজমকে তত্ত্ব হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলে আসছে।চলুন দেখা যাক ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজম কি।
ব্রিটানিকা মতে ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজম হল,
Naturalism, in philosophy, a theory that relates scientific method to philosophy by affirming that all beings and events in the universe (whatever their inherent character may be) are natural. Consequently, all knowledge of the universe falls within the pale of scientific investigation. Although naturalism denies the existence of truly supernatural realities, it makes allowance for the supernatural, provided that knowledge of it can be had indirectly—that is, that natural objects be influenced by the so-called supernatural entities in a detectable way.
অনুবাদঃ প্রকৃতিবাদের দর্শন হল এমন একটা তত্ত্ব,যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে দর্শনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে এবং এটা মেনে নেয় যে বিশ্বজগতের সকল বস্তু এবং ঘটনা(সেটার বৈশিষ্ট্য যাই হোক না কেন)বাস্তব।ফলস্রুতিতে এই বিশ্বজগতের সকল জ্ঞান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আওতায় পড়বে।যদিওবা প্রকৃতিবাদ সত্যিকারের অতিপ্রাকৃত বাস্তবতার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে,তবে যদি প্রাকৃতিক বস্তুর তথাকথিত অতিপ্রাকৃত সত্ত্বা দ্বারা প্রভাবিত হবার পরোক্ষ কোনো প্রমাণ শনাক্তযোগ্য উপায়ে পাওয়া যায়,তবে প্রকৃতিবাদ অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিবে।
আচ্ছা এখন আমাদেরকে থিওরি বা তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।এই শব্দটি বিজ্ঞানে বিশেষ অর্থ বহন করে।প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করার সময় বিজ্ঞানীরা অনুমানের উপর কতগুলো অনুকল্প ধরে নেন।এরপর কোনো অনুকল্পের পক্ষে যদি ইম্পেরিক্যাল এভিডেন্স বা বাস্তবিক/প্রকৃতিগত প্রমাণ পাওয়া যায়,তবেই তা তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।কিন্তু খেয়াল করুন,ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজমকে শুরুতেই থিওরি বা তত্ত্ব হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই একে বিশ্বাস করা হয়েছে তত্ত্ব হিসেবে এবং এই তত্ত্বের উপর বিশ্বাস করেই,আই রিপিট বিশ্বাস করেই গত কয়েকশত বছর ধরে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়ে আসছে।তাই যারা বলে বিজ্ঞানে কোনো বিশ্বাস নাই,চারিদিকে শুধু প্রমাণ আর প্রমাণ,তারা আসলে বিজ্ঞান বোঝে না।যারা বিজ্ঞান বোঝে,তাদের কাছ থেকে কিছু শোনা যাক চলুন।
আমেরিকার প্রতি্যশা জীববিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং প্রজননতত্ত্ববিদ স্যার রিচার্ড লিওন্টিন বলেন,
We take the side of science in spite of the patent absurdity of some of its constructs, in spite of its failure to fulfill many of its extravagant promises of health and life, in spite of the tolerance of the scientific community for unsubstantiated just-so stories, because we have a prior commitment, a commitment to materialism.
[Billions and Billions of Demons - JANUARY 9, 1997 ISSUE] (Good reads থেকে সংগ্রহ করা)
অর্থঃআমরা বিজ্ঞানের পক্ষ নেই এর কিছু প্রকাশ্য অর্থহীনতা থাকা সত্ত্বেও,এমনকি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যর্থতার পরও,বিজ্ঞানের অপ্রমাণিত গল্পগুলো বিজ্ঞানী মহলের সহ্য করার পরও,কারণ,আমাদের শুরু থেকেই একটি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আছে,তা হল বস্তুবাদে প্রতিশ্রুতি।
লক্ষ্য করুন,বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকেই পরিচালিত হয়,আমাদের মুক্তমনা ভাইয়েরা যাকে গোঁড়ামি বলেন আরকি,আসলে এভাবেই আধুনিক বিজ্ঞান চলে আসছে।আফসোস তথাকথিত মুক্তমনাদের জন্য,বিজ্ঞানের গোড়াতেই যখন বিশ্বাস থাকে,তখন বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে যারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসকে বলে, এটা তো না দেখে বিশ্বাস , তাদের বিজ্ঞান কপচানো যে কতটা অন্তঃসারশূন্য তা সহজেই অনুমেয়।ও হ্যাঁ,স্যার লিওন্টিন কিন্তু নাস্তিক ছিলেন।মাস খানেক আগেই তিনি পরলোক গমন করেছেন। যারা প্রমাণ ছাড়া কিছুই বিশ্বাস করতে নারাজ,তাদের দ্বারা আর যাই হোক না কেন,বিজ্ঞানের চর্চা সম্ভব না।
ব্রিটানিকার রেফারেন্স এর শেষের অংশ দেখে প্রশ্ন আসতে পারে , এতোদিন যত বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছে, সৃষ্টিকর্তা যদি সত্যিই থাকতেন,তবে তা এতোদিনে প্রমাণ হবার কথা
কিন্তু বাস্তবতা হল এই কথাটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। এটি দুইভাবে প্রমাণ করা যায়।
প্রথমত, ব্রিটানিকা তে ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজম সম্পর্কে বলা আছে,
Strictly speaking, naturalism has no ontological preference; i.e., no bias toward any particular set of categories of reality: dualism and monism, atheism and theism, idealism and materialism are all per se compatible with it.
অনুবাদঃ নিরেট বাস্তব হল, প্রকৃতিবাদের কোন সত্তাতত্ত্বীয় পছন্দ নেই; অর্থাৎ,বাস্তবতার কোন বিশেষ বিশ্বাসের প্রতি কোন পক্ষপাত নেই: দ্বৈতবাদ এবং একত্ববাদ, নাস্তিকতা এবং আস্তিকতা, আদর্শবাদ এবং বস্তুবাদ সবই এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রকৃতিবাদের যেহেতু আস্তিকতা এবং নাস্তিকতা কোনোটার প্রতিই একপেশে ভাব নেই তাই,আপনি যখন বিজ্ঞানের উদাহরণ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে নাকচ করবেন,তখন আপনার বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস নাস্তিকতার দিকে বায়াসড হচ্ছে,যা ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজম তত্ত্ব মতে হবার কথা না। তাই আপনার বিশ্বাস যেহেতু বিজ্ঞানের মূল ভিত্তির পরিপন্থি,তাই আপনার বিশ্বাস অন্য কিছু হতে পারে, বৈজ্ঞানিক না।
দ্বিতীয়ত,উপর্যুক্ত কথার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে ধ্রুব সত্য হিসেবে ধরে নেয়া হচ্ছে।কিন্তু বিজ্ঞান সবসময় পরিবর্তনশীল।স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হুমে বলেন,
"No amount of observations of white swans can allow the inference that all swans are white, but the observation of a single black swan is sufficient to refute that conclusion." ~ David Hume
অর্থাৎ আপনি শত শত বাস্তবসম্মত প্রমাণ দিয়েও যদি একটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে প্রতিষ্টা করেন,শুধু একটি বিপক্ষের প্রমাণই ঐ শত শত প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বটিকে বাতিল করারা জন্য যথেষ্ট।
ডেভিড হুমের উক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্যার নাসিম নিকোলাস তালিব ব্ল্যাক সোয়ান থিওরি প্রদান করেন।এর বক্তব্য অনুযায়ী প্রকৃতিগত পর্যবেক্ষণের ফলাফল যতবারই কোনো তত্ত্বের পক্ষে যাক না কেন,পরের বার যে ওই তত্ত্বের বিরুদ্ধে কোনো ফলাফল পাওয়া যাবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাই সারকথা হচ্ছে,যারা মনে করেন যে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করার জন্য বিজ্ঞানই যথেষ্ট তারা অন্ধবিশ্বাসী ।সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ত্বকে অস্বীকার করার জন্য বিজ্ঞানের সাথে প্রয়োজন গোমরাহি এবং সংকীর্ণমনার চর্চা করা।
বিশ্বাস আছে বলেই আপনি আমি বেচে থাকতে পারছি এই সুন্দর পৃথিবীতে ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২১ রাত ২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



