somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সখী তুমি কার?

১১ ই এপ্রিল, ২০১৯ দুপুর ১২:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




গত শুক্রবারের ঘটনা। সকাল ১১টার দিকে এক দেশী ছোটভায়ের এন্ট্রি ঘটলো আমার অফিসে। মুখ-চোখ শুকনা, উদভ্রান্ত চেহারা।
বললো, ভাই, ভীষণ বিপদে পড়ছি। আপনে ছাড়া এই বিপদ থেকে কেউ আমারে উদ্ধার করতে পারবে না।
আমি বললাম, আমি তো উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা না। তবে ঘটনা বলো দেখি, আমার সাধ্যে যদি কুলায় অবশ্যই সাহায্য করবো।

অফিসের বাইরে গিয়ে ধুমপান করতে করতে ওর কাহিনী শুনলাম।

মাস তিনেক আগে এক ডেটিং সাইটের মাধ্যমে জনৈক রোমানীয়ান মেয়ের সাথে ওর বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। একপর্যায়ে ওরা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার। সিদ্ধান্ত মোতাবেক মেয়ে ইংল্যান্ডে আসার টিকেট করে এখন বুখারেস্টের হেনরী কোয়ান্ডা এয়ারপোর্টে বসে আছে। কেন? কারন মেয়ের কাছে কোন টাকা-পয়সা নাই। রোমানীয়ান ইমিগ্রেশান ওকে আটকে দিয়েছে, এই বলে যে, কোন টাকা ছাড়া সে কোন বুদ্ধিতে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে উড়াল দিতে চায়?

মজনু ছোটভাই তার লাইলীর সাথে কথা বলেছে, ইমিগ্রেশান অফিসারের সাথেও কথা বলেছে। ইমিগ্রেশান অফিসারের কথা অনুযায়ী ওকে ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়নের মাধ্যমে ৮০০ পাউন্ড পাঠাতে হবে। তাহলে মেয়েকে অনুমতি দেয়া সম্ভব হবে। এখন টাকা পাঠাতে ফটো আইডি লাগবে যেটা ওর নাই (ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই, পাসপোর্ট হোম অফিসে)। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ওর কাছে ৮০০ পাউন্ডও নাই, ২০০ আছে। এদিকে হাতে সময়ও নাই। এতো এতো 'নাই' এর মধ্যে আমার কাছে ওর সবিনয়ে নিবেদন, আমি যেন আমার ফটো আইডি এস্তেমাল করে, আমার টাকা পাঠিয়ে ওই মেয়েকে এখানে আনার ব্যবস্থা করি।

ওকে অবশ্য আমার টাকা দিতে কোন সমস্যা নাই। সে একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। তাছাড়া একজন 'মফিজ' হিসাবে আমি এমনিতেই সবাইকে বিশ্বাস করি।
ওকে বললাম, দেখো ছোটভাই, টাকা পাঠাইতে আমার কোন সমস্যা নাই। কিন্তু তুমি যেই কাহিনী আমারে শুনাইলা, তাতে আমি মোটামুটি ৯০ ভাগ নিশ্চিত যে, তুমি প্রতারকের খপ্পড়ে পড়ছো। এই মেয়ে তোমার টাকা নিবে, কিন্তু তোমার কাছে আসবে না। তাছাড়া কোন ইমিগ্রেশান অফিসার তার কাজ-কাম ফালায়া ওই মেয়ের হয়া তোমার সাথে কথা বলবে না।

ছোটভাই দার্শনিকের মতো উত্তর দিলো, কতো টাকা কতোখানে যায়, কিছু টাকা না হয় রোমানীয়া গেলই! তবে ও আসবে, আমি নিশ্চিত। আমাকে খুব ভালোবাসে। এক দাদী ছাড়া এই দুনিয়াতে ওর কেউ নাই। সেই দাদীর সাথেও আমার কথা হইছে। দাদীই তার নাতনীর দায়িত্ব আমারে নিতে কইছে। তাছাড়া, আমারে বোর্ডিং পাসের ছবিও একটু আগে পাঠাইছে।
আমি বললাম, শোনো টেলিফোনে আমিও তোমার আব্বা হইতে পারি, অসুবিধা কি? কই দেখি বোর্ডিং পাসের ছবি? আর আমারে মেয়ের ছবিও দেখাও।

বোর্ডিং পাস দেখি ঠিকই আছে, তবে প্রতারকরা কাচা কাজ করবে এটা আশা করাও ঠিক না। মেয়ের ছবি দেখে তো আমার নিজেরই চোখ ট্যারা হয়ে গেল, ছোটভায়ের অন্ধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না! এই মেয়েকে দেখে প্রেমে না পড়াটা ফৌজদারী অপরাধ বলে গন্য হওয়া উচিত। আমারই তো ইচ্ছা করছে প্রেমে পড়ি! বুকের ভিতরে কেমন একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলাম। মনের মধ্যে লক্ষ লক্ষ প্রজাপতি উড়াউড়ি শুরু করে দিল! মনে হলো যেন শরীরে বসন্তের বাতাসের মৃদু-মধুর স্পর্শ অনুভব করলাম। আমার চেহারা দেখে ও পরিস্থিতি সম্ভবতঃ আচ করতে পারলো। আমার হাত ধরে বললো, ভাই, হাতে সময় নাই। একটু সাহায্য করতেই হবে আপনের এই ছোটভাইরে।

এই ছেলের আবার ইউকেতে রেসিডেন্ট স্ট্যাটাসে সমস্যা আছে। ইউরোপিয়ান বিয়ে করতে পারলে তার সেই সমস্যারও সমাধান হয়। আমাকে জানালো গতসপ্তাহেই ও মেয়েকে ৩০০ পাউন্ড পাঠিয়েছে ইমার্জেন্সী পাসপোর্ট আর টিকেট করার জন্য। আমি বললাম, ওকে। সাহায্য করতে আমার আপত্তি নাই। কিন্তু এই মেয়ে ভুয়া, আমি নিশ্চিত। টাকা নিয়া উধাও হয়ে যাবে। তারপরে ওর করুণ চেহারার দিকে তাকিয়ে বললাম, ঠিক আছে, চলো। টাকা পাঠাই। কিন্তু মনে রাইখো, আমি তোমারে সাবধান করছিলাম।

ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়নের মাধ্যমে আমি অনেকবারই এদিক-সেদিক টাকা পাঠিয়েছি। শেষবার পাঠিয়েছি প্রায় বছর দুয়েক আগে। আইডি, টাকা, ফিলআপ করা ফর্ম দিয়ে কাউন্টারে অপেক্ষা করছি। কাউন্টারের মেয়েটা বললো, তোমার টাকা যাচ্ছে না, 'অন হোল্ডে' আছে। তোমার নাম্বারে কল আসবে, কথা বলো; কিছু সিকিউরিটি চেকআপের ব্যাপার-স্যাপার আছে। এটা আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, এমনটা আগে কোনবারই হয়নি। ফোন নাম্বার দেয়া ছিল ছোটভায়েরটা। কল আসলো, ও কথা বললো এবং আল্লাহর কি রহমত, টাকা পাঠানো গেল না। ওরা নাকি এতো টাকার ট্রান্জেকশানের জন্য যে কারন প্রদর্শিত হয়েছে তাতে সন্তুষ্ট না।

এর মধ্যেই ছোটভাই মিনিটে মিনিটে সেই মেয়ে আর ইমিগ্রেশান অফিসারের সাথে কথা বলছে। মেয়ে ওদিক থেকে কান্নাকাটি করে বলছে, এখন সে কোনমুখে দাদীর কাছে ফিরে যাবে! কাউন্টারের মেয়েটা আমার পরিচিত। আমাকে বললো, ঘটনা কি? তুমি রোমানীয়ায় কাকে টাকা পাঠাও? আমি ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম।
সে বললো, দাড়াও, আমার এক রোমানীয়ান বান্ধবী আছে, তাকে কল দেই। সব শুনে ওই বান্ধবী যা বললো, তাতে আমি যেসব পয়েন্টে সন্দেহ করছিলাম তা বহুলাংশে মিলে গেলো।

বাইরে এসে ছোটভাইকে বললাম, তুমি মিলাদ দিও একটা। বড় বাচা বাইচা গেলা আজকে। আমার তো এখনও বুঝে আসে না ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়ন টাকা আটকায় দিল কি মনে কইরা? মনে করো, এইটা আল্লাহ তোমারে সরাসরি রহমত করছে।

সর্বশেষ ঘটনা হলো, ওই মেয়ে ওকে জানিয়েছে, এয়ারপোর্ট থেকে ওর বাসা প্রায় ৪ ঘন্টার পথ। বাসায় ফেরত যাওয়ার ট্যাক্সি ভাড়া ওর কাছে নাই। সেজন্যে ১০০ পাউন্ড যেন পাঠায়!!

শুনে আমার মনে একটা কথাই আসলো, সখী তুমি আসলে কার? ছোটভায়ের, নাকি অন্য কারো, নাকি অন্য আরো অনেকের?

(ঘটনা কিন্তু আমার বানানো না, ১০০% সত্যি। আমি শুধু ছোটভায়ের নামটা বলি নাই! পুরো ঘটনা ঘটার পর মনে হলো এটা আপনাদের না জানালে আমার পেটের ভাত হজম হবে না, তাই লিখে ফেললাম।)


ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০১৯ রাত ১২:৩৫
৩১টি মন্তব্য ৩১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালোবাসিতে লজ্জা পেতে নাই ...

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ১১:৩১

অপেক্ষা— সেতো নিষ্ঠুরতম এক উপখ্যান
যদি না হয় সাক্ষাৎ চিরো কাঙ্ক্ষিত
সেই ক্ষণের —প্রেমের বৃন্দাবনের
এ সবই মিছে অথবা ভ্রম;
ক্ষণিকের অহমিকা শেষ হয়ে যায়
মিশে যায় হাওয়ায়—... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ স্বৈরাচারিণী

লিখেছেন নীল আকাশ, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:৪৬



সঙ্গদোষে নাকি লোহাও ভাসে! চরমতম এই সত্যটা আর কেউ না হোক ফাহিবের বাবা মা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করেন। তা না হলে, যেই ছেলে বুয়েট থেকে এত ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মহান আল্লাহ সব কিছু দেখেন=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৫:৩৩



©কাজী ফাতেমা ছবি

সিসি ক্যামেরা দেখলেই নড়ে চড়ে উঠো
হয়ে যাও সাবধানী,
পাপগুলো দূরে ঠেলে হেঁটে যাও আপন গন্তব্যে,
ভয় পাও, তোমরা সিসি ক্যামেরা ভয় পাও
তাই না?

কিছু লুকোচুরি খেলা যখন খেলো বা খেলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইন্টারভিউ

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩৯



শাহেদ জামাল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
সে বাকি জীবনে কোনো কাজকর্ম করবে না। জীবনের অর্ধেক সে পার করে ফেলেছে। তার বয়স এখন পঁয়ত্রিশ। আগামী পঁয়ত্রিশ বছর কি সে বাঁচবে? সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন ভালো করা কিছু খবর

লিখেছেন মা.হাসান, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ রাত ১০:৩২

তাহাজজুদ পড়িস ব্যাটা?



ও ছার, ঝাড়ুদার পদে লিয়োগ পাইতে কত দিতে হবে?



আবার মারধোরের কি দরকার ছিল



আপনারা মন মতো মন্তব্য বসাইয়া নিন, আমি গলায় ফুলের মালা না... ...বাকিটুকু পড়ুন

×