
বাংলাদেশকে নিয়ে আমেরিকা আর চীন নাকি টানাহ্যাচড়া করছে! আপনাদের কি মনে হয়, ঘটনা সত্যি? পরিস্থিতি দেখে তো মনে হচ্ছে, বিশ্ব-মোড়ল আমেরিকা বাংলাদেশকে চাপে রাখতে চাচ্ছে। কেন? চলেন তো কিছু ঘটনা বিচার বিশ্লেষণ করে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি!
কিছুদিন আগে (ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখে) বাইডেন ভাইয়া ১১০টা দেশকে নিয়ে একটা গণতান্ত্রিক সম্মেলন করেছিল। বস্তুতঃ তিনটা বিষয়ের উপর সেখানে ফোকাস করা হয়। একটা দেশে কোন সরকারের জোরপূর্বক ক্ষমতায় থাকা, দূর্ণীতি আর মানবাধিকার লঙ্ঘন। আপনাদের অনেকের কাছেই আমেরিকার ধার্যকৃত এই বিষয়গুলি মাছের মায়ের পুত্রশোকের মতো শোনাতে পারে…...বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টা। যেই দেশটায় কালোরা অহরহ নির্যাতিত হয়; ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্থানে সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে যেই দেশটা জড়িত; ইয়েমেনে সৌদিদের আর ফিলিস্তিনে ইজরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনে এইভাবে কিংবা ওইভাবে যারা মদদদাতা, তাদের মুখে একি শুনি! যেন কোন শরাবখোর শরাবের বোতল হাতে বলছে…….ভাইসব, শরাব খাওয়া খুবই খারাপ! আপনারা খাবেন না। মাঝেমধ্যে শুধু আমি চেখে দেখবো। মজার না ব্যাপারটা!!
এই সম্মেলন টেইক অফ করার আগেই ঘটে যায় একটা মর্মান্তিক ঘটনা। আমি এমনিতেই আম্রিকার উপর নাখোশ; এই ঘটনায় আমি একদম বজ্রাহত। ঝেড়ে কাশি…….উক্ত সম্মেলনে বাংলাদেশকে ডাকা হয় নাই। কোন কথা হলো!!! এর সোজা অর্থ, আমেরিকার মতে বাংলাদেশে উল্লেখিত উপাদানগুলো বিদ্যমান। সে আমরা, বাংলাদেশের যদু-মধু'রা সবাই বহু আগে থেকেই জানি; কিন্তু এতোদিন পরে এই বিষয়গুলোর সাথে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনের ঘুম ভাঙ্গার কারন কি? কি কারনে হঠাৎ ওয়ান ফাইন মর্নিং চোখ খুলে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! ও মাগো! বাংলাদেশে তো দেখছি সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে!! বিষয়টা সন্দেহজনক, তাই না! যতোদূর জানি, আমেরিকা ইতোপূর্বে খুব সিরিয়াসলি বাংলাদেশের এসব নিয়ে তেমন একটা উচ্চবাচ্চ্য করে নাই, রুটিন স্টেইটমেন্ট দেয়া ছাড়া। ভুল বললাম কি?
আরেকটু পিছনে যাই।
গত ১৫-১৬ জুলাই তাসখন্দে অুনষ্ঠিত হয়ে গেল ''মধ্য ও দক্ষিন এশিয়া আন্চলিক যোগাযোগ চ্যালেন্জ ও সম্ভাবনা'' শিরোনামে একটা সম্মেলন। সেই সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতি চীনের সবরকমের সহায়তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। সেটা তারা সবসময়েই বলে কিন্তু সেবারের ভাষাটা ছিল একটু অন্যরকমের। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের উপরে জোর দেয়। তার কিছুদিন আগে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি আর সেনা প্রধানের সাথে বৈঠক করেন। সেখানেও চীনামন্ত্রী একই কথা বলেছিলেন। বারে বারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই বার্তা দেয়া কিন্তু কাকতালীয় না। চীন মনে করে, বাংলাদেশ সরকারের কোন ভুল পদক্ষেপের কারনে তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হতে পারে। কি সেই ভুল পদক্ষেপ? সেটা হলো ''কোয়াড'', অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি কোয়াডে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। এটা নিয়ে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত তো রীতিমতো হুমকিই দিয়ে দিল বাংলাদেশকে।
এশিয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে গুরুত্ব দেয়া আমেরিকার আফগানিস্থান থেকে তার রিসোর্স মবিলাইজ করার অন্যতম প্রধান কারন, সে আমেরিকানরা যতোই তাদের সৈন্যদের ঘরে ফেরানোর কথা বলুক না কেন। বিভিন্ন জায়গাতে ফ্রন্ট খুলে রাখার বিলাসিতা আমেরিকানদের বর্তমানে আর নাই। ওদিকে চীনকে ঠেকানোর জন্যও তারা এখন মরিয়া। কি আর করা…...অগত্যা!! এদিকে আমেরিকা বাংলাদেশকে কোয়াডে পাওয়ার জন্যও মরিয়া। সেজন্যে যেই আমেরিকা এক সময়ে বাংলাদেশের কাছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্র বিক্রি করতে ততোটা উৎসাহী ছিল না, তারাও এখন দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছে। কে না জানে, বাংলাদেশ সমরাস্রের জন্য মূলতঃ চীনের উপর নির্ভরশীল; সেই নির্ভরতা তারা কমাতে চাইছে এখন। সেজন্যে আমেরিকাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের দোহাই দিচ্ছে। কি তামাশা, তাই না? তাছাড়া, চীন বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান আর শ্রীলংকাকে নিয়ে যে দু'টি সহযোগিতামূলক এলায়েন্স গড়ে তুলছে; যেটাকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সার্ক কিংবা বিমসটেকের বিকল্প হিসাবে দেখছে…...সেটার প্রতিও নজর রাখছে আমেরিকা। তাই প্রলোভনের সাথে সাথে তারা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে এই বার্তাও দিচ্ছে…….খবরদার, বেশী বাড়াবাড়ি কইরো না কইলাম। ১/১১ এর কথা মনে আছে তো!!! তাই প্রতিষ্ঠান হিসাবে র্যাব আর তার বর্তমান ও সাবেক ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্যাঙ্কশান দিয়ে তারা সেই সাবধানবানী মনে করিয়ে দিচ্ছে।
আমরা যদি ১/১১ এর ঘটনাবলীতে একটু সংক্ষেপে চোখ বুলাই তাহলে দেখবো, ভারতকে সাথে নিয়ে আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে বাংলাদেশে পট-পরিবর্তন হয়েছিল। আমেরিকা যদি তখন এটা করতে পারে, এখন পারবে না কেন? র্যাবের এই স্যাঙ্কশানের ফলে বাংলাদেশের সেনা-পুলিশদের বিদেশে মিশনে যাওয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এই বাহিনীগুলোর মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে। তখন তারা রাজনৈতিক দলগুলোর দমন-পীড়নে আর সরকারের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করতে নাও চাইতে পারে। আরও কতো কিছুই তো হতে পারে, তাই না! আম্রিকার চাওয়া বলে কথা।
বাংলাদেশ যতো চীনের দিকে ঝুকবে, তারা ততোই বিভিন্ন রকমের চাল চালতে থাকবে। কে বলতে পারে, শেষ পযন্ত তারা আবার ১/১১ এর মতো শেষ চালটাও চেলে ফেলে কিনা!! কে না জানে, স্বার্থে অন্ধ হলে আমেরিকার পক্ষে সব কিছুই করা সম্ভব।
বলা বাহুল্য, আমেরিকা হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে ঝোকের মাথায় এই নিষেধাজ্ঞা দেয় নাই। তাদের একটা সূদুঢ়প্রসারী চিন্তা-ভাবনা এবং লক্ষ্য রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রথম পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলার সামর্থ সরকারের রয়েছে। অতি উত্তম কথা। কিন্তু কথার পরেও কথা থাকে। সেই কথা হলো, আমেরিকা কি এখানেই থামবে? আমেরিকার কথা না শুনলে পরবর্তী ধাক্কা রিখটার স্কেলে কতো মাত্রায় হতে পারে কিংবা সেই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা সরকারের কতোটা রয়েছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। নতুন ধাক্কা সামলানোর মতো চানক্যীয় দক্ষতা আমাদের রাজনীতিবিদদের যে নাই, সেটা জানা কথা। এরা আদপে কুয়ার ব্যাঙয়ের মতো; কুয়াটাকেই দুনিয়া ধরে নিয়ে হুদাই লাফালাফি করে। তবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সামলানো আমলাদের কতোটা আছে, সেটাই দেখার বিষয়।
কথায় বলে, আম্রিকার কামড় কচ্ছপের কামড়ের মতো। যাকে একবার কামড় দিয়ে ধরে, তাকে নাকি আর ছাড়ে না। কিংবা যখন ছাড়ে, তখন একেবারে ছ্যাড়াবেড়া করে ছাড়ে। তো সেই কামড়কালীন সময়ে আমাদের বর্তমান সময়ের মিত্রদেরকে কি বাংলাদেশ পাশে পাবে? না পেলে কোন প্ল্যান বি কর্তাব্যক্তিদের মাথায় আছে? মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন!!!
আপনারা কি বলেন?
এই প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত একটা লাইন মনে পড়ে গেল। কোন একটা দেয়ালে লেখা ছিল, এখানে প্রস্রাব করিবেন না করিলে জরিমানা করা হইবে। এখন কেউ যদি জরিমানা দেয়ার ভয়ে সেখানে প্রস্রাব করে, তাকে কি দোষ দেয়া যায়? শুধু একটা কমা'র অভাবে মানে কিভাবে বদলে যায়, তাই না!! জায়গামতো থামতে পারাটাও একটা যোগ্যতা। এই লাইনটা যার শিল্পকর্ম, তার মতো এই জাতিও কমা, ফুলস্টপ সম্পর্কে ঠিকমতো জ্ঞান রাখে না। ফলে জনসংখ্যা অতিমাত্রায় শুধু বৃদ্ধিই পেতে থাকে। কিন্তু চানক্যশাস্ত্র বোঝার মতো মাথার আবির্ভাব ঘটে না। আফসোস!!!
ছবি
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



