সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায় এবং ইসলাম ও অনৈসলামের দ্বন্দ নিত্যদিনের। রাজনীতি, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি তথা সর্বক্ষেত্রে এর বিস্তার। এটি ঘটে কখনও সরবে, কখনও নীরবে, আবার কখনও বা অতি সহিংস ভাবে। কথা হলো এত দ্বন্দের মাঝে কি নিরপেক্ষতা চলে? অন্যায়কে ন্যায়ের, অসত্যকে সত্যের সমকক্ষতা দিলে কাউকে কি ন্যায়পরায়ণ বলা যায়? এমন নিরপেক্ষতা মিথ্যার পক্ষে যেমন পক্ষপাতিত্বই, তেমনি প্রচন্ড প্রতারণাও। ইসলাম ও অনৈসলামের দ্বন্দে নিরপেক্ষতা মূলতঃ কবীরা গুনাহ। মুসলমানের উপর ফরয শুধু এ নয় যে শুধ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। বরং সাক্ষ্য দিবে প্রতিটি সত্য বা হকের পক্ষে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি সহ জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে। শাহাদতে হক হবে জীবনের মূল মিশন। নইলে সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে কি করে? তাছাড়া নিরপক্ষতার খোলসে সত্যের বিরুদ্ধাচারন তো চিরকালের। এ পক্ষটির হাতে ইসলামের উপর্যোপরি পরাজয় বা গৌরবহানি হয়েছে। এবং আজও সে ষড়যন্ত্র চলছে। নিরপেক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে ঘটনা বস'নিষ্ঠ বিচার বিশ্লেষণে। এমনকি পবিত্র কোরআনেও নিরপেক্ষ নিরীক্ষণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন' ইসলাম কবুলের পর মুসলমান আর নিরপেক্ষ থাকে না, সে তখন আল্লাহর পক্ষের শক্তি। কোরআনী পরিভাষায় হিযবুল্লাহ বা আল্লাহর দলভুক্ত। তখন আল্লাহর দ্বীনের বিজয় হয় সর্বোচ্চ বাসনা ও বাঁচবার প্রধানতম লক্ষ্য। তখন বিলুপ্ত হয় নিরপেক্ষতার নামে ইসলামকে অন্য ধর্মের সম-পর্যায়ভূক্ত করার প্রবণতা। মুসলমান হওয়ার শর্তই হলো ইসলামকে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্মরূপে কবুল করা এবং সর্ব ক্ষেত্রে ইসলামের পক্ষ নেয়া। ধর্ম গ্রহনে জবরদসি- নেই। তবে ইসলাম কবুলের পর ইসলাম-অনৈসলামের দ্বন্দে নিরপেক্ষ থাকার অবকাশ নেই। সেনা বাহিনীতে যোগ দেওয়াটি ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়। কিন' যোগ দেওয়ার পর নিরপেক্ষ থাকার অনুমতি থাকে না, যু্দ্েধ গিয়ে বরং স্বপক্ষে প্রাণও দিতে হয়। তাই নিরপেক্ষলোকদের নিয়ে যেমন সেনাদল গড়া যায় না, তেমনি গড়া যায় মুসলিম জাতিও।
আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসের পূর্বে অন্যসব উপাস্যকে অবিশ্বাস করতে হয়। ইল্লাল্লাহর পূর্বে তাই ’লা ইলাহ’ বলতে হয়। অন্যান্য ধর্ম অবিশ্বাস করা মুসলমান হওয়ার পূর্বশর্ত। শুধু মুখের কথা‘য় নয়, কাজের মধ্য দিয়ে সেটির প্রকাশও ঘটাতে হয়। মুসলমান হওয়ার দাবী একজন দুর্বৃত্তও করতে পারে। অথচ কে কতটা মুসলমান বা ইসলামের পক্ষের সে বিষয়ে ব্যক্তির নিজস্ব রূপটি যতটা রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রকাশ হয় সেটি অন্যত্র হয় না। ঈমান অদৃশ্য, কিন্তু সেটিই নিখূঁত ভাবে প্রকাশ পায় ব্যক্তির রাজনীতির মধ্য দিয়ে। এটি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে অতিশয় কপট মুনাফিকও তার কপটতাকে গোপন রাখতে পারে না। যে কপট বিশ্নাস মসজিদের জায়নামাযে ধরা পড়ে না, ধরে পড়ে না রোযা বা হজ্বে, সেটি এখানে দৃশ্যমান হয়। এমনকি নবীর যুগেও বহু মুনাফিক তাদের কপট বিশ্বাসকে বছরের পর বছর লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন' তাদের সে ভন্ডামি স্বমুর্তিতে ধরা পড়েছিল রাজনীতি ও জ্বিহাদের ময়দানে। রাজনীতি হলো রাষ্ট্রীয় অঙ্গণে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জ্বিহাদ। মুসলমান শুধু নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতে ক্ষান- দেয় না, রাষ্ট্রীয় জীবনেও আল্লাহর হুকুমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায়। আর ইসলাম-বিরোধী শক্তির সাথে রাজনৈতিক সংঘাত এজন্যই অনিবার্য। মুসলমান যতই শানি-বাদী হোক, এ লড়াই এড়িয়ে চলা অসম্ভব। এড়াতে পারেননি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শানি-বাদী নেতা শেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)। শুধু নামায-রোযার মাঝে ধর্মকে সীমাবদ্ধ রাখলে জিহাদের মত সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতের প্রয়োজন হতো না। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত বা বিজয়ী হত না ইসলাম। সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে ইসলামকে বাস্তবায়ীত করতে গিয়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)কে বহুবার যুদ্ধে নামতে হয়েছে, প্রতিটি যুদ্ধে মৃত্যৃর মুখোমুখী দাঁড়াতে হয়েছে। কিন' যারা ইসলামে অঙ্গিকারহীন তাদের কাছে এমন জ্বিহাদ গুরুত্বহীন। নিজেদের জীবনকে এমন যুদ্ধে তারা বিপন্ন করতে চায় না। তাই নামাযের জায়নামাযে অসংখ্য মুনাফিকের অনুপ্রবেশ ঘটলেও জিহাদের কাতারে সেটি ঘটেনি। সত্যিকার মুসলমান বাছাইয়ে জিহাদ এভাবে ফিল্টারের কাজ করে। ফলে ভন্ড মুসলমানদের পক্ষে রাজনীতিতে বা জ্বিহাদের ময়দানে ইসলামের পক্ষ শ্রম, অর্থ ও রক্তদান অসম্ভব। দ্বন্দ-সংঘাতে নিরপেক্ষ হওয়াটি মহৎ গুন - এ কপট শ্লোগানে এরা শানি-র অবতার সাজে এবং আড়াল করে নিজেদের ইসলাম-বিরোধী শত্রুতাকে। অথচ সুযোগ পেলে এরাই হালাকু-চেঙ্গিজ সাজে। এমন ঘটনায় ইতিহাস ভরপুর। নবীজী (রাঃ) ইসলাম-অনৈসলাম ও ন্যায়-অন্যায়্যের দ্বন্দে শুধু পক্ষই নেননি, নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধও করেছেন। জালেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও নির্মম না হলে তাকে ঈমানদার দূরে থাক, আদৌ কি তাকে সভ্য বলা যায়? পশুও হামলার মুখে ধেয়ে আসে। মুসলমানেরা প্রতিবাদহীন উদ্ভিদের জীবন পাবে ইসলামের আগমন সে জন্য ঘটেনি। ইসলাম এসেছে মানুষকে জান্নাতমুখী করতে। এসেছে আল্লাহর আনুগত্যপূর্ণ উন্নত সভ্যতার নির্মানে। সভ্যতার এ নির্মানকাজে যেমন বিরোধীতা আছে, তেমনি সংঘাতও আছে। বিরোধী পক্ষের হামলার মুখে মুসলমানেরা নিরপেক্ষ ভূমিকা নিবে সেটি কি ভাবা যায়? নবীজীর (সাঃ) আমলে মুসলমানতো দূরে থাক, মুনাফিকরাও নিজেদেরকে নিরপেক্ষ রূপে পেশ করার সাহস পায়নি। কারণ, এমন নিরপেক্ষতার অর্থই ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে অবস'ান নেওয়া। নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মুসলমানেরা যেখানে নিজ দেশ ও ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়, লাখে লাখে আহত ও নিহত হয়, সেখানে নিরপেক্ষতা কি শোভা পায়? পবিত্র কোরআনে ঈমানদারের গুলাবলীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে ’আশাদ্দু আলাল কুফ্ফার’ অর্থাৎ কাফেরদের বিরুদ্ধে তারা কঠোর। ফলে নিরপেক্ষ হওয়া কি মুসলমানের সাজে? তাছাড়া উম্মাদ ও মৃতরা ভিন্ন এ সমাজে কে নিরপেক্ষ? যে ব্যক্তির স্বার্থ আছে, তার একটি পক্ষও আছে। ধর্মের পক্ষে যারা নয়, তারা নিশ্চিত ভাবেই বিপক্ষে। ইসলামের সমগ্র ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে কোন শব্দ ব্যবহৃত হয়নি বস'ত একারণেই । এ শব্দটি নিতান্তই এ কালের এক অভিনব আবিস্কার।
(চলবে.............)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

