দুর্নীতির বিচারে দৃঢ়তা দেখিয়ে বর্তমান সরকার যে সময়ে ঘরে-বাইরে সুনাম অর্জন করে চলেছে ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বিশেষ মহল জনগণের দৃষ্টিকে সুকৌশলে অন্য দিকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার দাবি তুলে পানি ঘোলা করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। এই দাবি গণফোরামের নেতা ড. কামাল হোসেনকে রাখতে দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। কারণ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ার বিষয়টি তিনি অন্য অনেকের চাইতে বেশী অবহিত রয়েছেন। ইতিবৃত্তে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার দ্বিতীয় বিজয় বার্ষিকীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী বন্দীদের একটা বড় অংশ মুক্তি পায়। ওই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় বলা হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে দালালির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তারা এর আওতায় আসবে না। সমগ্র দেশের বিভিন্ন জেল থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা ১০১৫ থেকে কমিয়ে করা হয় ১৯৫। তাদের বিচার হয়নি। যদিও প্রকাশ্য জনসভায় বাংলার মাটিতে তাদের বিচার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং। কিন্তু এ ঘোষণা ঘোষণাই থেকে যায়। কারণ, ১৯৭৪ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির ১৪ এবং ১৫ ধারার অধীনে এই বিচার রহিত করা হয়। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর কামাল হোসেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমেদ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সে চুক্তির আলোচ্য দু’টি ধারা নিচে উল্লেখ করা হল।
ধারা ১৪ এ সম্পর্কে তিন মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিরোধ মীমাংসায় অটলভাবে কাজ করে যাওয়ার তিন দেশের অঙ্গীকারের আলোকে বিষয়টির পর্যালোচনা হওয়া উচিত। মন্ত্রীরা আরো উল্লেখ করেন যে, স্বীকৃতি দানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সফর করবেন এবং বন্ধুত্ব স্থাপনের লক্ষ্যে অতীতের ভুলভ্রান্তিকে ক্ষমা ও ভুলে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। একইভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত নৃশংসতা এবং ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে তিনি চান যে, জনগণ অতীত ভুলে যাবে, এবং নতুন করে শুরু করবে এবং বাংলাদেশের জনগণ জানে কীভাবে ক্ষমা করতে হয়।
ধারা ১
পরিহার করার মনোভাবের আলোকে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অতীতকে ক্ষমা ও বিস্মৃত হবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার অনুকম্পা হিসেবে বিচার কাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে দিল্লী চুক্তির শর্তাধীনে পাকিস্তানে যুদ্ধ বন্দী প্রত্যার্পণের যে কাজ চলছে, তাদের সঙ্গে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকেও প্রত্যার্পণ করা যেতে পারে।
দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বাংলাদেশে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা ভারতের সঙ্গে শান্তি, সমঝোতা ও বন্ধুত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার পরিহার করেছিলেন। তখনকার রাজনীতিতে বিশেষ করে যে প্রেক্ষাপটে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি তাতে এ ধরনের চুক্তির যৌক্তিকতা যে কোন বিবেচক মানুষ স্বীকার করবেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের প্রথম হাইকমিশনার ও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জেএন দীক্ষিত ‘লিবারেশন এণ্ড বিয়ণ্ড’ গ্রন্থে দাবি করেছেন, ১৯৭২ সালের জুনে শেখ মুজিব তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পরমেশ্বর নারায়ণ হাকসারের সঙ্গে আলোচনায় সকল পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিদের পাকিস্তানকে ফেরত দিতে রাজি হন এবং আভাস দেন যে, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আগ্রহী নন। মুজিব এই আপস করেছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে। তার মতে, ৪৪০ জন যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ১৯৫ থেকে ১১৮ জনে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ১১৮ জনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে বাংলাদেশ সরকার গড়িমসি করে।
এ সম্পর্কে জানা যায়, মূলত ভারতের অনাগ্রহের কারণেই বাংলাদেশ পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারেনি। তবে ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের মধ্যে এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বিচার চেয়েছিলেন। তার সিনিয়র উপদেষ্টা ডিপি ধরও সকল বন্দিকে ছেড়ে দেয়ার পক্ষে ছিলেন না। ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে দু’দেশের মধ্যে অব্যাহত আলোচনার এক পর্যায়ে তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব এনায়েত করিম দিল্লিতে যান। জানা যায়, ওই সময়ে পিএন হাকসার স্পষ্ট ভাষায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে বলেন, কোন পেশাদার আর্মি অপর পেশাদার আর্মির বিচার আশা করেনা- ভারতের সেনাবাহিনী এই যুক্তিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়না। ভারতের অনাগ্রহের অবশ্য অন্য কারণও ছিল বলে অনেকে মনে করেন। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত সিমলা চুক্তিকালেই ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, যুদ্ধাপরাধীদের কোন বিচার হবেনা এবং সকল বন্দিকে ফেরত দেয়া হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর তার কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। মূল আসামীর বিচার না করে দালাল বা সহযোগীদের বিচার করতে চাওয়া আইনের চোখে কতটা যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন সচেতন মহল সঙ্গত কারণেই তুলতে পারেন। এই বিচার এতদিন যারা করেননি তাদের পক্ষ থেকে যখন এ দাবি তোলা হয় তখন তার উদ্দেশ্য নিয়ে সবার মনে প্রশ্ন জাগে বৈকি! তারা যদি রাজনৈতিক নেতা না হতেন, কখনো ক্ষমতায় না থাকতেন তাহলে এ দাবিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে কারও অসুবিধা ছিলনা। বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশাসমূহের মধ্যে এই দাবিকেও একটি উত্তম প্রত্যাশা হিসাবে দেখা যেত।
যুদ্ধপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে তারা যদি সত্যি আন্তরিক হতেন তবে তাদের ব্যর্থতার জন্য আগে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতেন তারা। আসলে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা আছেন যারা সবসময় সাধারণ মানুষকে আহাম্মক মনে করে থাকেন। তারা মনে করেন, জনগণের স্মৃতিশক্তি ক্ষীন। তারা অতীতকে ভুলে যায়। অতীতে কারা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও বরখাস্তের ক্ষমতা হাতের মুঠোয় নিয়েছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছে তাদের কীর্তিগাঁথা এদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। নিজেদের ভুল-ত্রুটি ও ব্যর্থতার জন্য নেতারা যদি অনুতপ্ত হতে শেখেন তাহলে সেটাই হবে দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য কল্যাণকর। আমরা রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি। জাতিও সুন্দর ভবিষ্যতের কথা শুনতে আগ্রহী। অতীতের ব্যর্থতার কথা ধামাচাপা না দেয়াই হবে জাতির জন্য মঙ্গলজনক। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা না করাই ভাল। আশার কথা এই যে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনভাবেই এই ফাঁদে পা দিচ্ছেনা।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


