somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বগা লেকে পৌছলাম (তাজিংডং-4)

২৭ শে মার্চ, ২০০৭ সকাল ৭:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা জানতাম পাহাড়ে অন্ধকার হঠাৎ করেই নামে। তাই খুব জোরে জোরে হাটছিলাম। হাটতে হাটতে ঠিক সন্ধ্যার শুরুতে আমরা একটা প্রশস্ত উপত্যকায় গিয়ে পৌছলাম। তখনও গোধূলীর আলো আছে। পুরোপুরি অন্ধকার হয়নি। এতোক্ষণ আমরা যেখান দিয়ে হাটছিলাম তা ছিল কয়েকটি পাহাড়ের মাঝের সংকীর্ণ এলাকা। সেখান থেকে আশপাশের কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। কিন্তু এখন অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। দূরের একটি পাহাড়ের উপরে কয়েকটি বেড়ার ঘর দেখা গেল। কিন্তু সেখানে যাবার পথটা দেখা যাচ্ছিলো না।
এ সময় কিছুদূরে একটা আগুন দেখা গেল। আবছা অন্ধকারে আগুনের পাশে কয়েকজন মানুষ আছে বলে মনে হলো। আমরা ভয় না করে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি ছোট্ট একটা পাহাড়ি গ্রাম। অল্প কয়েকটা বাড়ি। একটু আগেও আগুনের পাশে কয়েকজন মানুষ ছিল কিন্তু এখন তারা কেউই নাই। গ্রামে ঢুকে দেখি কোনো জনপ্রাণি নাই। গ্রামের লোকজন সব গেল কোথায়? সবার ঘরের দরজা বন্ধ। তবে কি আমাদের দেখে সবাই ভয়ে পালিয়েছে? মহা সমস্যায় পড়লাম।
অনেক ডাকাডাকির পর একজন লোক বের হয়ে আসল। সে স্থানীয় চৌকিদার। অল্প বাংলাও বলতে পারে। সে আমাদের বগা লেকের পথটা দেখিয়ে দিল। এখান থেকে খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠলেই বগা লেক।
অন্ধকার নেমে এসেছে। খাড়া পাহাড়ের একপাশে গভীর খাদ। খাদের ধার দিয়ে বিপদজনক পায়ে হাটা রাস্তা। অন্ধকারেই আমরা উঠতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ হাটার পর সবাই হাপাতে শুরু করলাম। সারাদিন কম ধকল যায়নি। পথ ভুল করার জন্য সবাই গাইড সাং লিয়েনকে ইচ্ছেমতো ধমকাতে শুরু করলাম। ওর কারণেই আমাদের এতো ভোগান্তি। পথ হারিয়ে না ফেললে বিকালেই আমাদের বগা লেকে গিয়ে পৌছানোর কথা। আমি অবশ্য লিয়েনের ওপর একটুও রাগ করিনি। পথ না হারালে আর ঘুরার মজাটা থাকলো কোথায়! অন্ধকারে খাড়া পাহাড় যেন আর শেষ হতেই চায় না। ক্লান্তিতে আমাদের হাত-পা আর চলে না। হাপরের মতো উঠানামা করে বুক। শুকনো বাশে আগুন জ্বালিয়ে মশাল তৈরি করা হলো।
এ পথের শেষ কোথায়, আর কতদূর উঠতে হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। একটু সমতল স্থান দেখে কয়েকবার বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। তারপর আবার উপরে ওঠা। এভাবে একসময় পাহাড়ের উপরে পৌছলাম।
এবার পথটা নিচের দিকে। পাহাড় থেকে নামার সময় পরিশ্রম কম হয়। কিছুক্ষণ নামার পর অন্ধকারেও জায়গাটা সমতল বলে মনে হলো। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় আশপাশে জলাভূমি আছে বলে মনে হলো।
রাত প্রায় 8 টার সময় আমরা বগা লেকের পাড়ে গিয়ে পৌছলাম। একটু এগোতেই পাহাড়িদের বসতি দেখতে পেলাম। এই এলাকায় আর্মি ছাড়া সাধারণত কোনো বাঙালি আসে না। লেকের ধারেই আমরা আমাদের তাবু খাটালাম। তাবুটা খাটানো খুব সহজ। অ্যান্টিনার মতো দুইটা লম্বা স্টিক আছে। সেগুলো তাবুর সঙ্গে লাগালেই তাবু দাড়িয়ে যায়। এরপর তাবুর চারপাশে কয়েকটা গজালের মতো জিনিস পুতে দিতে হয়। এ কাজে সাধারণত দুই মিনিটের বেশি সময় লাগে না।
আশপাশ থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে তাবুর পাশে আগুন জ্বালালাম। পরিশ্রমে এতোক্ষণ মনে ছিল না, আবহাওয়া অসম্ভব ঠান্ডা। তাবুর ভেতর মাটিতে শুয়ে কিভাবে ঘুমাব ভাবতেই পারছিলাম না।
আমাদের প্রথম কাজ হলো খাওয়াদাওয়া করা। ক্ষুধায় নিজের কাপড়চোপড় খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। তাড়াতাড়ি রান্নার বন্দোবস্ত করতে হবে। আমাদের রান্নার পদ্ধতিটি খুবই মজার। আগুনের উপরেই গরম পানির একটি ডেকচি চাপিয়ে দিলাম। পানি কিছুক্ষণ গরম হবার পর সেখানে দিলাম কয়েক প্যাকেট নুডলস। এরপর সেখানে দেয়া হলো মসলা, লবণ, মরিচ ইত্যাদি। থালা হাতে নিয়ে আগুন ঘিরে বসে আছি। কতোক্ষণে রান্না শেষ হবে বুঝতে পারছি না। এক চামচ ঝোল সহ নুডলস থালায় উঠিয়ে টেস্ট করলাম, আহ অমৃত। কি দরকার পানি শুকিয়ে নুডলস খাবার। পানি সহ ঝোল ঝোল নুডলস সবাই থালায় উঠিয়ে নিলাম। নিমেষেই খেয়ে নিলাম ধোয় উঠা নুডলস। ব্যাপক চাহিদার কারণে দ্্বিতীয়বার রান্না করা হলো নুডলস। এবারও একই পদ্ধতিতে নিমেষেই খাওয়া হয়ে গেল। এর পরও যাদের ক্ষুধা যায়নি তারা বিস্কুট খেতে পারবে বলে জানানো হলো।
ভারী ব্যাগ বহন করতে করতে পিঠে-কাধে ব্যথা হয়ে গেছে। হাটতে হাটতে ব্যথা হয়েছে সম্পূর্ণ পা। এরপরও আমরা সবাই বয়সে তরুণ। উত্তেজনায় টগবগ করছি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে এলো। আবার হাটতে বেরোলাম।
অন্ধকারেই গেলাম বগা লেকের পাড়ে। প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি বগা লেক। সাগর সমতল থেকে প্রায় 1800 ফিট উপরে এর অবস্থান। একদম স্থির আর স্বচ্ছ পানি। রাতের বগা লেকের প্রকৃতি অসম্ভব সুন্দর। তাবুতে ফিরে আসলাম।
সারা রাত তাবুর পাশে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়। পালা করে একজন পাহারায় থাকি।
(ছবি: মশাল হাতে গাইড সাং লিয়েন এবং তার পেছনে আমরা। বগা লেকে পৌছানোর আগে উপরে ওঠার সময় তোলা)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০০৭ সকাল ৯:১২
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×