বাঙালির চেতনার সঙ্কট ও একুশের প্রেরণা
ফকির ইলিয়াস
======================================
তবে কি আবার আরেকটি রক্তক্ষয়ী অর্জনের মুখোমুখি বাংলাদেশ? এ প্রশ্নটি গোটা বাঙালি জাতিকেই একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশে একটি হায়েনাচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বেশ পরিকল্পিতভাবে। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের খুন করা হয়েছে। ঢাকায় এবিএম ফারুক হোসেন নামে আরেক ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
জাতিকে তীব্র সঙ্কটের মুখোমুখি ঠেলে দেয়ার এই যে প্রক্রিয়া এর নেপথ্যে কারা? কি তাদের উদ্দেশ্য?
এর উত্তর খোঁজার আগে একটি সংবাদের দিকে চোখ ফেরানো যাক। যুক্তরাষ্ট্রের এন্টি টোরোরিজম বিভাগ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। খবরটির একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। এ সংবাদটি প্রচারিত হওয়ার পর এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। যারা শিবির-জামায়াতকে সমর্থন করে তারা বলছে, আমেরিকা নিষিদ্ধ করার কে? তারা তা করলেই কি আর না করলেই কি? আমরা কি থোড়াই কেয়ার করি।
আর সংবাদটিকে যারা সমর্থন করেছে তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিবিরের স্বরূপ দেখিয়েছে। তারা যে জঙ্গিবাদের সহচর, তা বলছে যুক্তরাষ্ট্র।
কথাটি ঠিক, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে গিয়ে শিবির-জামায়াতের সহিংসতা, রগকাটার রাজনীতি বন্ধ করতে পারবে না। তা করতে এগিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। এগিয়ে আসতে হবে গোটা বাঙালি জাতিকে।
বিষয়টি নিয়ে ওয়েবসাইটের বিভিন্ন ব্লগ, আলোচনা গ্রুপে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। লক্ষ্য করছি, শিবিরের রগকাটার রাজনীতির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে তুলোধুনো করছেন বেশ কিছু বুদ্ধির ঢেঁকি বুদ্ধিজীবী। তারা বলছেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাকি শিবিরের হাতেই বেশি নিরাপদ !
প্রকারান্তরে তারা সেই পরাজিত রাজাকার শক্তির পক্ষেই সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছেন। যেহেতু সন্ত্রাসী শিবিরকে সরাসরি সমর্থন দিতে পারছে না, তাই তারা ছাত্রলীগের অপকর্মের চিত্রগুলোকে খুব বড় ক্যানভাসে এনে, তা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঘায়েল করার চেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছেন।
কথা হলো, ছাত্রলীগের কেউ দোষ করলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে। শাস্তি দেবে। এর সঙ্গে তুলনা করে সন্ত্রাসী শিবিরকে কি ধোয়া তুলসিপাতা বানানো উচিত? রগকাটার রাজনীতিকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত?
না উচিত নয়। কোনভাবেই উচিত নয়। তারপরও এটার মধ্যপন্থি সুবিধাভোগী পরাজিত শক্তিরা মওকা নেয়ার জন্য মাঠে নেমেছে। 'সাংবাদিক নির্যাতন করা হচ্ছে' বলে লাউড স্পিকার হাতে নিয়ে কিছু ডানপন্থি সাংবাদিক 'আন্দোলনের' হুমকি দিচ্ছে। অথচ শিবিরের সশস্ত্র আক্রমণের বিরুদ্ধে তারা একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না।
দুই.
একটি বিষয় খুব গভীরভাবে লক্ষণীয়। গেল দু'সপ্তাহে দেশজুড়ে পরাজিত রাজাকার-আলবদর শক্তি যেভাবে সভা-সমাবেশ করেছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির তেমন কোন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ এখন চলছে মহান একুশের মাস। যে একুশ এ জাতিসত্তাকে জাগরণের পথ দেখিয়েছিল।
বাঙালি জাতির যে একটি স্বাধীন দেশের প্রয়োজন, মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সেই জানানই দিয়েছিল বাঙালি বায়ান্ন সালে। প্রতিরোধ-প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল। রক্ত দিয়েছিল। এবং অর্জন করেছিল সেই স্বাধিকার। যার পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছিল এ জাতির স্বাধীনতার পথ। এর বাস্তবায়নে ৪০ বছর সময় লাগলেও একাত্তর সালে এসেছিল মহান বিজয়।
সেই বিজয় কি সহজ ছিল? না ছিল না। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এসেছিল সেই বিজয়। খুব সত্য কথা হচ্ছে, সেই যুদ্ধের সময়েও এই রাজাকার-আলবদরচক্র বলেছিল পাকিস্তানি হানাদারদের হাতেই নাকি বাঙালি নারী-পুরুষ বেশি নিরাপদ! যে কথাটি এখনও তারা বলে বেড়াচ্ছে, এই রগকাটা সন্ত্রাসীদের হাতেই নাকি জাতি সুরক্ষিত। তার অর্থ কি দাঁড়ায়?
অর্থটি হচ্ছে এই তারা সেই একই সমানুপাতে জাতিকে পাকিস্তানি তমুদ্দনপন্থি বানাতে চাইছে। তারা সেটাই বলতে চাইছে আমরা পাকি আমলেই ভাল ছিলাম।
ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তল্লাশিতে বেরিয়ে এসেছে, আইএসআই নামক পাক-গোয়েন্দা সংস্থাটি বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা চালাতে বিশাল পরিমাণের অর্থ ঢেলে আসছে। জামায়াত-শিবিরের বেশ কিছু প্রাক্তন কর্মী যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান করছে, তারা নানাভাবে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পন্ড করা।
এদের দেশী-বিদেশী এজেন্টরা এতই সক্রিয় যে তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা মুখে বলে হলেও মানুষকে ধোকা দেয়ার চেষ্টা করছে। 'দেশ বাঁচাও'-এর দোহাই দিয়ে তারা স্বরূপে আবির্ভূত হচ্ছে।
গেল ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ বুধবার দুটি জাতীয় দৈনিকে দুটি খবর ছাপা হয়েছে। যা সত্যিই ভয়াবহ। 'যমুনার চরে চলছে জঙ্গি প্রশিক্ষণ' (কালের কণ্ঠ)। 'ঢাকায় জামায়াত-শিবির চক্রের ৪১ স্থায়ী আস্তানা শনাক্ত' (সংবাদ)।
সংবাদ দুটি এই সাক্ষ্য বহন করছে, এরা বসে নেই। তারা তাদের কাজ করেই যাচ্ছে। এই যে অশনি সঙ্কেত তাতে কি প্রধান বিরোধীদল বসে আছে? না তারাও বসে নেই। তারা আন্দোলনের নামে বিভিন্নভাবে রাজাকারদের সঙ্গে আবার ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। ঢাকা বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে। স্মারকলিপি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। টিভিতে সেই দৃশ্যটি দেখলাম। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বিএনপির নেতাদের বলেছেন, 'আপনারা বসুন। সামনে আপনাদের অনেক দৌড়াতে হবে। বসে বিশ্রাম নিন।'
বাংলাদেশে কে দৌড়ে আর কে কারে দৌড়ায় তা বলা বড় কঠিন। তবে খুব পরিকল্পিতভাবে রাজাকারচক্র দেশে যে ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করতে চাইছে তাদের জনগণ সায়েস্তা করতে পারবে কি?
একুশ আমাদের একটি প্রেরণা দিয়েছিল, আর তা হচ্ছে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর। বাঙালি জাতি সেই পথ ধরেই এগিয়েছে। সেই চেতনাও ছিনতাইয়ের চেষ্টা হয়েছে। কুখ্যাত রাজাকারকে 'ভাষাসৈনিক' বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে এ বাংলাদেশেই। কিন্তু জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে বার বার।
একটি কথা মনে রাখা দরকার ১৫ আগস্টের পরাজিতরা হাত মিলাবে একাত্তরের পরাজিতদের সঙ্গেই। কারণ ১৫ আগস্টের বেনিফিসিয়ারিরা জানে গণতান্ত্রিক উপায়ে এই শহীদদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশে তাদের সিংহভাগ রায় নেই। আর সেজন্যই তাদের একমাত্র পথ 'শর্টকার্ট', যা তারা বারবার করে এসেছে।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই এখন আর প্রধান নয়। কারণ চারপাশের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে যত বেশি ভাষা রপ্ত করতে পারবে তার জন্য তত বেশি খুলে যাবে বিশ্ব দরজা। একথা আজকের প্রজন্ম জেনে যাচ্ছে প্রতি পদে পদে। দেশের আধুনিক বিদ্যানিকেতন এবং এর প্রসারতা সেই প্রমাণ করছে।
আজ যা বেশি প্রয়োজন তা হচ্ছে ভাষার চেতনা। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষি, আদর্শের উৎস সন্ধান করে সত্যের পক্ষে প্রজন্মের মনন বিনির্মাণ।
এদেশে যারা তরুণ প্রজন্মকে চাকরি, চিকিৎসা সুবিধাসহ অন্য সুবিধাদি দিয়ে বিপথগামী করছে, তাদের প্যারালাল শক্তি গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাদী শক্তির এ বিষয়টি সিরিয়াসলি ভাবা দরকার। যারা বিত্তবান, তারা নিজ নিজ এলাকায় মেধাবী প্রজন্মকে সাহায্যের মাধ্যমে হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। কারণ মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে অপশক্তি যতটা তাদের অনুসারীদের সাহায্য করছে, যুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি তা করছে না। কেন করছে না? আমাদের গাফিলতি কোথায়? এ কারণগুলো সবাইকে খুঁজে দেখতে হবে। সরকার ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন গণমানুষের ঐক্যই পারে একুশের চেতনা ধরে রাখতে।
নিউইয়র্ক, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০
---------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ ।ঢাকা । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১০ শুক্রবার প্রকাশিত
আলোচিত ব্লগ
'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!
প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন
এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে
একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।
গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।