একে একে সবাই এসে গিয়েছে।এবার যাবার পালা।নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই বাসা থেকে বের হলো সবাই।বন্ধুরা কে কিভাবে কার সাথে যাবে তাও ঠিক হয়ে গিয়েছে।আমাকে যেতে হবে বাবা মায়ের সাথে।এদিকে মা এখনও নামাজ পড়ছেন,নফল নামাজ।সারাদিন রোজা ছিলেন।আরেক রুমে নানী জায়নামাজে।সবার ডাকা ডাকিতে একটু হুস হয়।এক সময় সবাই ঠিক ঠাক মতো এয়ারপোর্টে এসে পৌছালাম।চারদিকে মানুষ আর মানুষ।এর মাঝে আমাদের গ্রুপটাই বিশাল।আমাকে ঘিরে রেখেছে আমার বন্ধুরা সব।তাদের পাশে মামা আর আম্মা।বাবা কে দেখা যাচ্ছে দূরে দূরে হাটছে।সিগারেট টানছে আর চোখ মুছছে একটু পর পর।কান্নার জন্য আমার মা,নানী বিখ্যাত।ছোটখাট সুখ বা দুঃখ ,নিজের বা অন্যের ,যাই হোক তার চোখ ভিজে উঠে।এখন ও কাদছে।সেই কখন শুরু হয়েছে....তন্ময় বার বার বলছিল মা বাবা কে সময় দিতে।আমি জানি ওদের পাশে গেলে ওরা নিজেদএর স্থির রাখতে পারবে না।জড়ায়ে ধরে হাউ মাউ শুরু করে দিবে।সবার ছোট ভাইটা এদিক সেদিক ঘুরছে,একটু পর পর এসে জাড়ায়ে ধরছে।ঘাড় গরম স্পর্শে ভিজে উঠে।সাজু যে সেই জরায়ে ধরে আছে ছাড়ার নাম নাই। তার সবচেয়ে কাছের মানুষ আজ দূরে যাচ্ছে।একটু এদিক সেদিক হাটছি।কথা বলছি,হাসি ঠাট্রা করছি।মামা আর নানু ব্যাস্ত কে কে ভিতরে ঢুকবে তা নিয়ে।আম্মা কে নেয়া হবে না।বাবা কে ও না।
ভিতরে ঢুকার টিকেট কিনার কাউন্টারে বিশাল জটলা।মানুষ এর উপর মানুষ।যাবার সময় হয়ে আসে।সাজু হুট করে জড়ায়ে ধরে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয়।ও আমাকে ছাড়ছে না। ওকে বুঝানোর চেস্টা করছি....সবাই বুঝাচ্ছে....ঐ দিকে লিমা কাদছে।ওর কান্না দেখে আমার মা ,গলা ছেড়ে কাদেন।আত্মিয় সজন কেউ আর কাছে নেই।আমার ভাই দুটো ও না।ছোটমামা শক্তমানুষ ,সবাইকে সে একাই বুঝাচ্ছে,সাথে তন্ময়।একে ওকে ডেকে এনে জড়ো করছেন।আব্বাকে তার সিগারেট খাওয়ায় বিগ্ন ঘটিয়ে ডেকে আনা হলো।কয়েক মুহূর্ট চেস্টা করলেন নিয়ন্ত্রন কারার।না পেরে হাল ছেড়ে দিলেন। জীবনে প্রথম সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদলেন।তাকে এই প্রথম কাঁদতে দেখলাম।আমার চোখে পানি চলে এলো,নির্লিপ্ত সেই পানি।কোন কষ্টবিহীন চোখের পানি।যদিও আরও ঘন্টাখানেক পর ভিতরে গেলে ও হয়,আমার আগ্রহেই ভিতরে ঢুকে গেলাম,সাথে মামা,নানু,তন্ময়।বেগ মাপা শেষ করে পিছনে তাকাতেই দেখি মামুন,মাসুদ,লিমা দাড়িয়ে কাদছে।না এখানেও বেশী সময় থাকা যাবে না।গুটি গুটি পায়ে ওদের কাছে দারালাম।মামুন আপ্পাগো বলে আবার চিৎকার করে কান্না।সাথে বাকী দুইটাও।ওর ঘাড়ের উপর দিয়ে দেখছি আশে পাশের মানুষ তাকিয়ে আছে।আমার চোখে ও পানি,কিন্তু কষ্ট নেই।একবার লিমা জড়িয়ে ধরে একবার মামুন।তাড়া হুরা করে চেকইন করতে গেলাম,পিছনে ওদের কান্নার শব্দ শুনা যাচ্ছে।না আমি পিছন ফিরে তাকাইনি।যত দূর দেখা ,তারা দাড়িয়ে ছিল।ধীর পায়ে হাটতে হাটতে সেই কাচে ঘেরা ঘরে পৌছে গেলাম।
চারদিকে মানুষের ছড়াছড়ি।এক বাচ্চা কেদে চলছে তারস্বরে।মা চেস্টা করছে খাওয়াতে কিন্তু সে খাবে না।তার বাবা সাথে নেই।
পাশে এক ভদ্্রলোক কি একটা ম্যাগাজিন পড়ছে।দুই পিচ্চি স হ আরেক পরিবার কাচের বাইরে দাড়ানো আত্মিয়ের সাথে কথা বলছে,যাদিও কেউ কারো কথা শুনতে পারছে না।আরও একজন কে দেখা গেল কাউকে খুজছে।হয়তো সে পৌছাতে দেরী করেছে,এর মাঝে প্রিয় কেউ এখানে চলে এসেছে।শেষ বার দেখতে এসেছে।কিছু উজবেক খেলোয়ার বসে জম্পেস আড্ডা জমিয়েছে।তারা দেশে ফিরে যাচ্ছে।আমি একা বসে বসে মানুষ দেখছি।ভুলে গিয়েছি এখনও আমার সব বাইরে দাড়িয়ে আছে।অপেক্ষা করছে প্লেন ঠিক ঠাক মতো আকাশে উড়ছে তার মেয়েকে নিয়ে তা নিশ্চিত হবার জন্য।কিছুক্ষন আগের সে কন্না ও ভুলে গেলাম।ঢাকা নরসিংদী করতে 1ঘন্টার বাস জার্নিতে ও কত অতীত ,বর্তমান ভবিষ্যত এর চিন্তা করেছি।আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর অতীত এর কথা জেনেও নির্লিপ্ত এি আমি। একবার ও মনে হয়নি, মা ,মামা বাসায় যাবে আবার কাদবে ফেলে আসা খাবার গুলো দেখে।যা অতি যত্ন করে রান্না করেছিল।এমন কি ক্যান্টন চাইনিজের স্যুপ,ফ্রাইড রাইস ও পড়ে আছে টেবিলে।বেশ ভাল লাগতো আমার ।অতীত ,বর্তমান ,ভবিষ্যত সব এসে এই কাচ ঘরে স্থির হয়ে আছে।আমার কিছু নেই.....চারদিকে ঘটমান কিছু দৃশ্যাবলি ছাড়া।নির্বাক আমি প্রতিবন্ধির মতো বসে বসে এই ওইদিক তাকাই।একে ওকে দেখি।কত বিষন্ন,আনন্দিত মুখ দেখি।শিশুর নিশপাপ মুখ দেখি।কিছুই আমাকে বিচলিত বা উদ্্বেলিত করে না।সামনে দরজা ।প্লেন এসে দাড়ালে ই এটা খুলে যাবে।নিজের অজান্তেই ঐ দিকে হেটে যাবো।কাচের দেয়ালে ছায়া পড়ে....পরিচিত....কিন্তু আমার নয়.....মানুষ নয় শুধু ছায়া।কোন আবেগ অনুভুত হয়না....ও এভাবেই থাকার কথা........
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







