আজ খুব কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। কষ্টের কথা কাকে বলি ভেবে পাচ্ছিলাম না। কষ্টের কথা শেয়ার না করলে নাকি কষ্ট আরো বেড়ে যায়। কিন্তু এমন কেউ নেই যাকে বলবো। অবশেষে অনেক চিন্তা করে দেখলাম একমাত্র ব্লগেই দুঃখের কথা শেয়ার করা যায়। কারণ, এখানে দুঃখ শেয়ার করলে বাড়িতে কেউ জানতে পারবে না।
আজ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কারণ মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে ও চলে গেছে। চলে গেছে সাত সুমদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে সেই সুদূর আমেরিকায়। সেই সুদূর নিউ ইয়র্কে। অথচ দুঃখ রয়েই গেল আমার হৃদয়ে। ওকে কিছু বলতে না পারার দুঃখ। যাবার আগে ওকে খুব বলতে ইচ্ছে ছিল আমার ভাল লাগার কথা। জানাতে ইচ্ছে ছিল আমি সেই ছোটবেলা থেকেই ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। এখনও দেখি। কিন্তু মনে হয় সে স্বপ্ন চিরজীবন স্বপ্নই থেকে যাবে।
ও আমার খুব কাছের এক আত্মীয়। এখন সপরিবারে আমেরিকায় থাকে। আমি যখন খুব ছোট, প্রাইমারিতে পড়ি, তখন থেকেই ওকে আমার ভাল লাগতো। ও তখন খুব ছোট। মাঝে মাঝে আমার মায়ের কোলে বসে থাকতো। সেখান থেকেই ভাল লাগার সুত্রপাত। তখন প্রেম কি জিনিস বুঝিনি। তবু কোন এক অজানা ভাল লাগা আমাকে তাড়িত করতো।
ভাল লাগার অনেক কারণও আছে। ওর স্বভাব কিছুটা আমার মত। আমি যেমন কোলাহল পছন্দ করি না, সেও ঠিক তেমনি আমার মত নিভৃতচারী। আমি যেমনি পড়াশোনা করতে ভালবাসি, সেও ঠিক তেমনি পড়তে ভালবাসে। আমার গায়ের রং যেমন ফর্সা নয়, তেমনি ওর গায়ের রং ওর বোনদের মত অতটা ফর্সা নয়, উজ্জ্বল শ্যামলা। আমি হাসলে আমার যে দাতটা বাঁকা দেখা যায়, ও হাসলেও ঠিক সেই দাতটাই বাঁকা দেখা যায়। আমি নিজে চশমা না পড়লেও ছোটবেলা থেকেই চশমা পড়া মেয়েদের আমার খুব ভাল লাগে; ও সবসময় চশমা না পড়লেও পড়াশোনা করার সময় চশমা ছাড়া করতে পারে না। তবে সবচেয়ে যে বিষয়টা আমাকে ওর প্রতি আকৃষ্ট করতো তা হলো- ওর ঠান্ডা স্বভাব আর ছোটবেলা থেকেই আমার প্রতি ওর আগ্রহ। কিন্তু ওর সাথে আমার সবচেয়ে বড় যে অমিল রয়ে গেছে, সেটা হলো প্রাচুর্যের বৈষম্য। ওদের টাকার পাহাড়ের সামনে আমার অবস্থা কিছুটা বস্তিবাসী টোকাইয়ের মত। তাইতো অনেক সুযোগ পেয়েও নিজের আত্মসম্মানের কুরবানী দিয়ে বলতে পারিনি, আমি তোমাকে ভালবাসি। পাছে আবার ও ভাবতে পারে, আমি ওর প্রাচুর্যের প্রতি দূর্বল বলেই ওর প্রতি আমার নিছক ভালবাসা প্রদর্শন করছি।
আমি প্রাইমারী থেকে হাইস্কুলে উঠতে উঠতেই ওরা সপরিবারে আমেরিকা চলে যায়। তারপর একবার এসেছিল 2003 এ। 2003 এর আচরণগুলিই আমাকে ওর প্রতি আবার নুতন করে আকৃষ্ট করে। সে সময় যে কয়টা দিন বাংলাদেশে ছিল, আমাকে ছাড়া যেন কিছুই বোঝেনি। নিভৃতচারী হবার পরেও লাজ লজ্জা ভুলে আমার পাশে এসে বসে থাকতো। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম। এবং নিজের বিত্তবৈভবের কন্ডিশন উপলব্ধি করে নিজেই ওর কাছ থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অত্যন্ত নিকটাত্মীয় হবার কারণে বিভিন্ন কাজের সময় ওর কাছে যেতেই হতো। আর সে সময় ও আমার পাশে এসে বসে থাকতো কিংবা কখনো শরীরে শরীর ঘেষে গল্প শুরু করতো। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম, বড় হয়ে তুমি কি হবে? ও বলতো, আমি ল-ইয়ার হবো। কিন্তু আমি বলতাম- "না, আমার খুব ইচ্ছা তুমি ডাক্তার হবে।" ও বলেছিল, "ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন আমি চেষ্টা করবো।"
ব্যাপারটা ওর মায়েরও দৃষ্টিগোচর হলো। কিন্তু তিনি কাউকে বুঝতে দিলেন না। উচ্চাভিলাষী ওর মা নিজের মেয়েকে মফস্বলের একটা বোকা টাইপের ছেলের সাথে মিশতে দিলেন না। নিয়ে চলে গেলেন ওর নানার বাড়ি। এবং সেখান থেকেই সোজা আমেরিকা। কৌশলে জানিয়ে দেয়া হলো ফ্লাইটের দিন যেন বয়োজ্যেষ্ঠ ছাড়া এয়ারপোর্টে কেউ না আসে। তাই আমার এয়ারপোর্টে যাওয়া হলো না। আমার মা গেলেন। আর নিজের অজান্তেই আমার চোখ ভিজলো ওর যাবার মুহুর্তে। এরপর আর দেখা হয়নি। চেষ্টাও করিনি। কারণ ওকে আমি মনে মনে ভাল বেসেছিলাম। সেও হয়তো আমাকে বেসেছিল, কিংবা এখনো বাসে। কিন্তু দুজনেই নিভৃতচারী বলে হয়তো কেউ কাউকে কোনদিন বলতে পারবো না নিজেদের মনের কথা। তাছাড়া একাকী যোগাযোগের তেমন কোন সুবিধাও নেই দুজনের মধ্যে। তাই চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
এরপর আবার 2006। আর এবার এসেছে এক কোটিপতি ছেলের সাথে ওর বড় বোনের বিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু আমি যতটা সম্ভব দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। আমি জানি ওর কাছাকাছি থাকলে শুধুই মানসিক যন্ত্রনা বাড়বে। ওর ছোট বোন প্রায়ই বলেছে- "আপনার সাথে মেঝো আপার খুব মিল, দুজনের কথাবার্তা, স্বভাব-চরিত্র, এমনকি দুজনের একই রকমভাবে দাত বাঁকা।" কিন্তু আমি বলতে পারিনি- "আমার মত একটি মেয়ে আমার জীবনে চাই বলেই তোমার মেঝো আপা আমার মত।" আরেকদিন জিজ্ঞেস করেছিল- "আপনি কাকে লাইক করেন?" আমি বললাম- "তুমি গেইস করতো আমি কাকে লাইক করি।" ও চট করে উত্তর দিল- "আপনি মেঝো আপুকে লাইক করেন, তাই না?" কিন্তু আমি তখন নীরব থেকেছি। নীরব থাকা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। কারো কাছে ছোট না হওয়া এবং আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে ত্যাগ স্বীকার করার দীক্ষা পরিবার থেকে পেয়েছি বলেই হয়তো এবারও সরাসরি বলা হলো না আমার মনের কথা। সেজন্যই হয়তো ওকে বলতে পারিনি-
তোমার জন্য মরতে পারি, ও সুন্দরী তুমি গলার মালা
এই যে দেখ তোমার জন্য আনছি ফুলের মালা।
কিংবা এতটুকুও বলতে পারিনি-
বলব না আকাশের চাঁদ এনে দেব
বলব না তুমি রাজকন্যা
শুধু জিজ্ঞেস করি-
দেবে কি পাড়ি, হোক যত ঝড় বন্যা?
আমি জানি, এখন ওরা অনেক অনেক বড়লোক। নিউ ইয়র্কে ওদের নিজেদের বাড়ি, নিজেদের মালিকানায় হোটেল। ঢাকা শহরেও যাত্রাবাড়িতে ওদের নিজেদের বাসা হয়েছে। সেইসাথে ও সেদেশের একটি নামী স্কুলের ক্লাশ টেনের ছাত্রী। ও এখন আর ল-ইয়ার হতে চায় না। ওর ইচ্ছা ডাক্তার হওয়া। হয়তো আর কয়েক বছর পরে একজন ডাক্তার হয়ে বাংলাদেশে আসবে। আর আমি? আমি এক গরীব দেশের অনেক অধিকার বঞ্চিত একটি মফস্বল শহরের এক নিম্নবিত্ত পরিবারের দায়িত্বশীল বড় ছেলে। পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে মাঝেই মাঝেই যার অনার্সের পাঠ থেমে যাবার উপক্রম হয়। কিন্তু বিদ্যার প্রতি অদম্য উৎসাহের কারণে নিভু নিভু প্রদীপের মত এখনও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। কতক্ষন পর প্রদীপ নিভে যাবে জানি না। আর তাই এরকম একটা অনিশ্চিত জীবনের সাথেও ওকে আমি জড়াবো না। কিন্তু এ কথা তো আর মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না যে, জীবনে একমাত্র ওকেই আমি ভালবেসেছি। আর কাউকে ভালবাসিনি, কখনো বাসতেও পারবো বলে মনে হয় না।
2 সেপ্টেম্বর 2006, সকাল 6 টার ফ্লাইটে যাত্রাবাড়ীর বাসা থেকে যাত্রা করে ও চলে গেছে নিউ ইয়র্কে। আমি এই মফস্বল শহর থেকে এয়ারপোর্টে যেতে পারিনি। পারিনি কারণ আমার প্রতি ওর মায়ের সন্দেহ। কিংবা পারিবারিক জটিল বলয়ে আমি বন্দী। সামাজিকতার মাথা খেয়ে এয়ারপোর্টে ওকে বিদায় জানানো সম্ভব হবে না। আবার কবে আসবে তা জানি না। যখন আসবে তখন এই আমি সেই আমি থাকবো কিনা তাও জানি না। কখনো আমার মনের কথাটা ও জানবে কিনা তাও জানি না। জানি না বলেই মনটা আমার খুব খারাপ। কেমন খারাপ তা হয়তো আমার মত ভুক্তভোগীরাই বলতে পারবেন।
কিন্তু ব্লগের বন্ধুদের কাছে আমার অনুরোধ, ওর জন্য আপনারা দোয়া করবেন। ও যেন নিউ ইয়র্কের একজন ভাল ডাক্তার হতে পারে। নিউ ইয়র্কের জ্যাকশন হাইটে ওর দিনগুলি যেন জীবনানন্দের শিশিরের শব্দের মতন করে কেটে যায়। আপনাদের দোয়া চাওয়া ছাড়া আমার আর কিছু চাইবার নেই। এখানে তাও চাইতে পারছি একটা সাহসে। আমার ফ্যামিলির কেউ যেহেতু কম্পিউটার জানে না সেহেতু এ লেখাটা কেউ পড়তে পারবে না। অনেক কষ্ট করে সম্পূর্ন লেখা পড়ার জন্য আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। পারলে একটা সান্তনার বাণী পাঠাবেন।
সুপ্ত সবুজ
2-8-2006
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







